অকুল দরিয়ায় মাঝে তোমার ভাঙ্গা নাও, মাঝি বাইয়া যাও রে—-/ সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

smriti

এ জগতে যদি তুমি কিছু করতে চাও তাহলে নিন্দা বা সমালোচনার সম্মুখীন হতেই হবে। গতানুগতিক জীবনের মধ্যে কোনো আনন্দ-সুখ নেই, সমালোচনা ও তাই নেই। প্রকৃতির দোরগোড়ায় আমরা আর সকল প্রাণীদের মতই। মানুষ ব্যতীত অন্য প্রাণীকুল  প্রকৃতির দয়া দাক্ষিণ্যের মধ্যে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত। কিন্তু মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে সদা সচেষ্ট। প্রকৃতি বলতে শুধু বিশ্বপ্রকৃতি বা nature নয়। আপন আপন আচরণবিধি হল আপন আপন প্রকৃতি।

   অতএব নিজ প্রকৃতির বশীভূত না হয়ে যিনি বা যাঁরা অসাধারণ কিছু করতে আগ্রহী স্বাভাবিকভাবেই তিনি বা তাঁরা বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হবেন। এসব প্রতিকূলতাকে গ্রাহ্য না করে এগিয়ে যেতে হবে। শেষে বিরুদ্ধবাদীরাও তোমার প্রশংসা করবেন।

     হে বীরশ্রেষ্ঠ— রিপুর উত্তেজনা ও ইন্দ্রিয়ের উৎপীড়ণ মুক্ত হোও, বিস্মৃত হও সাপ্তাহিক আধিব্যাধি, ছিন্ন কর ভ্রম ভেদ ভ্রান্তির কুসংস্কার, ধর বিবেক বৈরাগ্যের শানিত কৃপাণ।

     তোমার বিবেক উদ্যানে তুমি সুগন্ধি ফুল। সেই সুগন্ধি দিয়ে সর্বদা “পরিত্রাণ কর পতিতকে, রক্ষা কর বিপন্ন কে, নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দান কর আর শান্তি-সুখ বিতরণ করা সন্তপ্তককে”।

      তুমি সমস্ত কিছু অন্যায়ের বিরুদ্ধে বীরদর্পে অবতীর্ণ হও। আপন স্বার্থ ভুলে সকলের জন্য কল্যাণব্রতে দীক্ষিত হোও।

     অক্লান্ত  মেধার দ্বারা ধর্মকে সর্বদা সকলের মধ্যে জাগ্রত কর। ঘুমিয়ে থেকো না। অসংখ্য কর্ম তোমার জন্য অপেক্ষারত।      তোমার জীবন হোক আদর্শ, আদর্শ সাধনের সঙ্কল্পই হোক জীবনের প্রধান ব্রত। সঙ্কল্প সাধনে জীবনটাকে উৎসর্গ কর, জীবনের জন্য আদর্শকে কখনোও বিসর্জন দিও না। আদর্শ হীন জীবন মৃত্যুরই নামান্তর।

        কর্ম কর।কর্ম বিমুখ হয়ো না।কর্মই প্রধান। কর্মহীন জীবন মানে জড়। জড় পদার্থের প্রাণশক্তি নেই, তাই মৃত্যুও নেই। তোমার প্রাণশক্তি আছে তাই দিয়ে মৃত্যুর অমোঘ শক্তিকে প্রতিহত করতে অগ্রসর হোও। তাহলে মহাকালও তোমার জন্য দুদণ্ড অপেক্ষা করবে।

   ধৈর্য ও স্থৈর্য হোক তোমার বিজয়রথের চক্র। সঙ্কল্প প্রতিজ্ঞা হোক তোমার অস্ত্র। তোমার স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রাখ। তোমার বীর্য বিশ্বের মহান কাজে ব্যয়িত হোক। তুমি মহাশক্তির আধার। নিজেকে উপলব্ধি কর।

      অকূল দরিয়ায় মাঝে একাকী বসে কেন মিছে কালক্ষেপ করছ? জলের মধ্যে তোমার প্রতিবিম্বের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ কর। দেখ, নৌকার মধ্যে আত্মীয় পরিজন, সমাজ ,দেশ, রাষ্ট্র তথা সমস্ত বিশ্ববাসী তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তুমি শক্ত হাতে হাল ধর। পরিত্রাণ কর সকলকে। অসম্ভব বলে তোমার কাছে কিছু নেই। তুমি অগ্রসর হলেই ওরা পালাবে।ওরা ভীতু। তোমার বিবেক সদা জাগ্রত। তাকে সামনে রেখে উষ্ণ

রক্ত সিঞ্চন কর অপরের দেহে মনে।

      ব্রহ্মচর্য পালন করে। নৈরাজ্য ও নিরুৎসাহতা যেন তোমাকে গ্রাস না করে । অযথা বিচলিত হয়ো না।কারণ, একমুঠো চাই ভস্ম ছাড়া এ দেহের কোনো মূল্য নেই। সেটা উপলব্ধি করে প্রলোভন মুক্ত হোও।

     শেষ বা অন্ত বলে কিছু নেই এই অখণ্ডময় সংসারে। মৃত্যুর কথা ভেবে তাই অযথা চিন্তা কোরোনা,  দুঃখ কোরোনা। মৃত্যু আজ না হয় কাল আসবেই। মৃত্যুর কাছে আমরা প্রত্যেকেই ঋণী। সেইঋণ মৃত্যু দিয়েই পরিশোধ করতে হবে। অতএব যতক্ষণ এ দেহে প্রাণ আছে মনুষ্যত্বের জন্য বীর বিক্রমে এগিয়ে চল। যা কিছু পাপ অন্যায়কে চিরতরে ধ্বংস করে মহাজাগরণের পথে

নিজের আত্মাকে নিবদ্ধ কর।

     ক্ষণিকের রতিসুখে সত্তাকে বিসর্জন দিও না।সততা তোমার স্তম্ভ। সেই  স্তম্ভের উপরেই তূমি দাঁড়িয়ে আছ। তুমি দৃশ্য হতেছ।অদৃশ্য নিরাকার ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া দুর্লভ। তুমি নিজেকে সেই স্থানে উত্থিত কর।

     তুমিই সেই ঈশ্বর। তোমার মধ্যেই পরমেশ্বর বিরাজ করছেন। তাকে সন্তুষ্ট কর। কারণ, দেহ হত হলেও আত্মার বিনাশ নেই।

      ” ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্নায়ং

           ভূত্বা ভবিতা বা না ভূয়ঃ।

আজো নিত্য: শাশ্বতোহয়ং পুরানো

            ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।”

   শ্রীমদ্ভাগবত গীতা–সাংখ্যযোগ ২০শ্লোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: