অঙ্কুরে বিনষ্ট হয় যে প্রেম // সঞ্জীব ধর

SDHAR

(১)

রমজান মাস ছিল তখন। মেজ ভাইয়া নতুন দোকান দিয়েছিল।স্বর্ণের দোকান।আমি সবে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ছিলাম।লেখাপড়ার পাশাপাশি দোকানেও বসতাম।মেজ বৌদির ডেলিভারী।সবাই হাসপাতালে।বাসায় ছিলাম আমি, মা আর বৌদির কাকাতো বোন।ভাইয়া সাথে লেনদেনের ভিত্তিতে আমাদের বাসায় সবসময় আসা যাওয়া করতো কেজি স্কুলের এক কেরানী। উনি সকালে বললেন

“চলো, থালতো বোনকে নিয়ে আজ সন্ধ্যার সময় ইফতার পার্টির আয়োজন করি।”

আমি বললাম, “ঠিক আছে।”

থালতো বোন বলল, “আপনি তো এখন দোকানে চলে যাবেন।”

আমি বললাম, ” সন্ধ্যা দিকে ভাইয়া আসতে পারে। উনি আসলে আমি এসে যাবো।”

“কচু”

আমি জোর দিয়ে বললাম, “আপনারা আয়োজন করেন আমি ঠিক এসে যাবো।”

(২)

বিকাল গড়িয়ে যাচ্ছিল। ভাইয়া আসবে না। ঐ সময়ে দোকান বন্ধ করাও সম্ভব ছিল না।তাই কথা রাখাও সম্ভব হয়নি। রাত সাড়ে দশটা দিকে বাসায় আসি।এসে শুনি, সে চলে গেছে। ওর মা এসে ওকে নিয়ে গেছে। কেরানী থেকে জানলাম ইফতারের আয়োজন করা হয়েছিল।আমি আসেনি বলে সে খায় নি – হেসে হেসে এ কথা শুনিয়ে দিতে ভুললেন না কেরানী সাহেব। সেদিন পর আর দেখা হয়নি ওর সাথে। বছরও পেরিয়ে গেছে প্রায় ছয় সাত বছর।

(৩)

ওর সাথে প্রথম পরিচয় ছিল মেজ ভাইয়ার বিয়েতে।তখন আমার ইন্টার পরীক্ষা শেষ হয়েছিল।তখন আমার প্রচুর বন্ধু ছিল। ভাইয়া বিয়াতে বন্ধু একটাকেও বাদ রাখিনি।বিয়েতে বন্ধুদের একটাই দাবি ছিল থালতো বোনের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে হবে।আমি এটা জানতাম যে, বৌদির আপন কোন বোন ছিল না।তবে এটা নিশ্চিত কাকাতো বোন ছিল।

আমদের সমবয়সী কনেপক্ষের একজনকে আমি চিনতাম। থালতো বোন হতে পারে এমন একটি মেয়ের সামনে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “উনি কি কনের বোন?” সমবয়সী লোকটা দুষ্টমি করে বলল,”আরে ভাই, উনি কনের ভাইঝি।” যাহোক বিয়ের শেষে দিকে কন্যা সম্প্রদানের সময়ে যখন কনের মা-বাবা আমাদের জড়িয়ে ধরে কান্না করছিল তখন ঐ মেয়েটিও থালতো ভাই বলে কান্না করতে করতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। অবশ্যই পরে সে আমাকে জানিয়ে ছিল যে, ও মূলতো আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল এটা জানান দেওয়ার জন্য যে, সে কনের বোন ছিল।

(৪)

ওর চেহারাটা আমার কাছে অন্য সবার থেকে আলাদা লাগতো।গায়ের রং খুব ফর্সা। তবে গঠন হালকা পাতলা এবং খাটো করে।(যদিও আমি স্বাস্থ্যবান এবং লম্বায় প্রায় ৫ ফুট ১১ ছিলাম)। বিয়ের পর দিন নাকি ওর এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা ছিল। তাই নতুন বৌদির সাথে আসে নি।পরীক্ষা শেষে বেড়াতে এসেছিল। দাদা গিয়ে নিয়ে এসেছিল। প্রায় বিশ পঁচিশ দিনের মত ছিল।মেজ বৌদি তেমন কিছু না বললেও বড় বৌদি এবং আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা দুষ্টমি করতো আমাদের দুজনকে নিয়ে। একদিন সে হাতে মেহেদি লাগাচ্ছিল।

আমি বললাম, “আমাকে একটু দিয়ে দিন।”

সে আমার হাতটা নিয়ে হাতের তালুতে মেহেদি দিয়ে একটা ‘LOVE’ আঁকল। তারপর ভিতরে ‘S+’ দিয়ে বলল বাকি অক্ষর টা কি দিবে? পাশে আমার এক বন্ধু ছিল।

বন্ধুটা বলল,”R” দিন।

আমি বুঝেছিলাম সে ঐ অক্ষর দিবে না। কারণ ওটা ছিল ওর নামের প্রথম অক্ষর।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “P দিন”

একটু আমার দিকে চাইল।

তারপর বলল,”আপনার GF এর নাম কি P দিয়ে শুরু ?”

তারপর একটা কাল্পনিক নামও বলে ফেলল। আমি শুধু বললাম, “হুম।”

তারপর সে যখন P লিখল আমি ওর থেকে মেহেদি টা নিয়ে P এর নিচে একটু টান দিয়ে R বানিয়ে দিলাম। এ ঘটনা চলে গেল বড় বৌদির কানে।উনি সেটা নিয়ে উঠে-পড়ে লাগলেন।

(৫)

এর ভিতর একদিন ওর মা ফোন করে বলল যে পরদিন ওর টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে।আমি বললাম,”রেজাল্ট ভাল হলে আমাকে কি দিবেন?”

সে বলল, “আপনি যা চান”

রেজাল্ট ভাল হল।আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তার সাথে সব কিছু শেয়ার করতাম। বন্ধুর সাথে পরামর্শ করে শিখে আসলাম কি চাওয়া যায়।

এসে বললাম, “রেজাল্ট তো ভাল হল কি দিবেন?”

ও বলল, কি চান?”

আমি বললাম, “আপনাকে ”

একটু বিব্রতবোধ করে কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলল “আমি তো আছি-ই”

আমার পক্ষেও আর কিছু বলা সম্ভব হলো না।ফরম ফিলআপ করতে হবে। তাই চলে যেতে হবে। দিয়ে আসার দায়িত্বটা পড়ল আমার উপর।নতুন কুটুম্ব হিসাবে পোশাকও দিতে হবে। ওটা কেনা হয়নি। তাই একেবারে শপিং করিয়ে তারপর বাসায় দিয়ে আসতে হবে। বড় বৌদি বলে উঠল,”ছোটদা, এ সুযোগ হাত ছাড়া করিও না।” যাহোক যাওয়ার দিন উপস্থিত দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে শপিং এর জন্য যেতে হল বহদ্দার হাটে।

রাস্তা পার হওয়ার সময় সে আমার হাতটা চেপে ধরে। রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাটার সময়ও দেখি সে আমার হাত টা ধরে আছে। লোকজন আমাদের দিকে তাকাচ্ছে দেখে আমি হাতটা সরিয়ে নিই। শপিং করে আমরা রিকশায় উঠলাম।যেতে হবে তুলাতলি। আমি বা রিকশাওয়ালা দুজনের কেউ ঠিক লোকেশন টা চিনি না। সে বলল, “কাছাকাছি গেলে আমি চিনবো।”

ঐদিন রিকশায় ঠিক কি কি বলেছিল সে, তা আমার এখন হয়তো মনে নেই, শুধু এটা মনে আছে যে, সে আমার মোবাইল নাম্বার টা মুখস্থ করেছিল।

আর বলেছিল,”আমার তো ফোন নেই কারো কাছ থেকে কল করতে পারলে কল করবো।”

রিকশা চলছিল ধীরে ধীরে।রিকশায় গেলেও পথ অনেকখানি। আমরা কথায় এত মশগুল ছিলাম যে রিকশাওয়ালা তুলাতলি পেরিয়ে কখন যে রাজাখালী চলে গিয়েছিল খেয়াল করা হয়নি।

হটাৎ সে বলল, “আমরা তো তুলাতলি ফেলে চলে এসেছি।”

রিকশাওয়ালাকে বললাম, “ভাই,গাড়িটা ঘুরান।”

শেষ পর্যন্ত ওদের বাসায় পৌঁছালাম। রিকশা থেকে নেমে দোকান থেকে নাস্তা কিনলাম। তারপর ওদের বাসায় ঢুকলাম। সবাই খুব থাকার জন্য জোর করলেও আমি ঐদিনই চলে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম বাসায় ঠিক ভাবে পৌছেছি কিনা সে অজুহাতে একটা কল করবে।কিন্তু না।

এরপর প্রতিদিন ভাবতাম আজ হয়তো কারো মোবাইল থেকে কল করবে।তাই অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলেই ব্যাক করতাম। ওদের বাসা থেকে কিন্তু মেজ বৌদির কাছে কল করতো।ওরা কথা বলতো। মনে হয় সবার কথা জিজ্ঞাসা সময় আমার কথাও একটু জিজ্ঞাসা করতো। আমিও ধীরে ধীরে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করি।কারণ আমিও ততদিনে “বিষাদ সিন্ধু ” উপন্যাসের এই উক্তিটি পড়ে ফেলেছি “যে আমার হতে চায় না,আমি তার হতে যাবো কেন?”

(৬)

প্রায় সাত-আট মাস পর বৌদির সাধভক্ষণ অনুষ্ঠানে আবার এসেছে।প্রথমে ভেবেছিলাম আমাদের বাড়িতে মেহমান হিসাবে এসেছে,কথা না বলাটা ঠিক হবে না। কিন্তু কেন জানি তার সামনে যেতেই মন চাইছিল না। এবং শেষপর্যন্ত কোন কথাও বলিনি।

আমাকে দেখলে মেজ বৌদিকে শুনিয়ে বলতো, “দিদি, আমাদের সাথে কেউ তো কথাও বলতেছে না?”

তখন মেজ বৌদি বলতো,”কেউ যদি বাসার মেহমান সাথে কথা না বলে, তাহলে আর কি করবি?”

বিকালবেলা ওরা চলে যাচ্ছিল। আমার একটা ক্রিকেট ম্যাচ ছিল তাই আমি ওদের গাড়িতে করে কিছু দুর গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। নামার সময় দেখি ও একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।ঐ দৃষ্টিটা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল যে আমি হয়তো তাকে ভুল বুঝেছি। সত্যি ভুল বুঝেছিলাম।আমার ভুলটা ভাঙে কয়েক মাস পর যখন শেষবার বেড়াতে এসেছিল।

সে আমাকে নিজে বলেছিল যে, মেজ বৌদি তাকে নাকি বলেছিল যে, প্রেম করে উনি যে কষ্ট পেয়েছেন তা যেন তার বোন না পায়।যাহোক মনে হয় তারও একবছর পর ওর বিয়ের নিমন্ত্রণ টা পেয়ছিলাম।কিন্তু কোন এক কারণে আমার উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি।

সাধনপুর, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: