অনুভূতি  //   শুভ্র_ঘোষ

আমাদের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা আমরা কখনো প্রকাশ করি না বা প্রকাশ করতে পারি না। সমাজ, লজ্জা, বদনামের ভয়ে। আমরা চেপে রাখি, সেই সব ঘটনা। রাখতে রাখতে ভুলে যাই বা প্রকাশ করা হয় না। অবশ্য সবার,ওরম মনে হলেও।আমার ওরম মনে হয় না। আমার জীবনে একটা সময় এসেছিল,যেদিন অনুভূতিরা অবাধ্য আচরন করতে শুরু করেছিল। যদিও সেদিন তাদের কড়া শাসনে সামলে নিয়েছিলাম। সেই গল্পই লিখছি… 

 তখন সবে যুবতী হয়েছি।কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আমার দিদি-জামাইবাবু  কলকাতার টালিগঞ্জে থাকতো। ওদের নিজস্ব ফ্ল্যাটে। ওরা প্রেম করে বিয়ে করেছিল। দুই বাড়ি থেকেই প্রথমে মেনে নেয়নি। তবে সৌম্য খুব ভালো মানুষ। আমি প্রথম দিনই বলেছিলাম, ‘শোন এই সময়ে দাঁড়িয়ে, আপনাকে জামাইবাবু, জিজু বলতে পারব না। ডাইরেক্ট সৌম্য… চলবে?!’ সেই থেকে আপনি সম্বোধনের সাথে সৌম্য বলে কথা বলি।

উনিও আপত্তি না করে খুব সহজে আপন করে নিয়েছিলেন। সৌম্য মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীতে সার্ভিস করতেন।ওদের বিয়ের প্রায় দু বছর বাদে খবর পেলাম দিদি প্রেগন্যান্ট। মা বলল, ‘এখন ডাক্তার বেড রেস্ট নিতে বলেছে, কী হবে ? আমি যেতে পারব না মেয়েটার কাছে, তোর অসুস্থ বাবাকে নিয়ে। তুই একবার যা না মা, সৌম্য টা একলা করছে সব। মেয়েটা কী করবে, তুই গিয়ে কদিন থাকনা মা ওদের সাথে। আর তোর তো কলেজে এখন ফার্স্ট ইয়ার, অসুবিধা হবে না।’

মা এর কথায় গেলাম আমি, দিদির ৮ মাস চলছিলো, এতো দিন সৌম্য একাই সব কিছু দেখভাল করছিলেন। একটা ঠিকা কাজের লোকও রেখেছিলেন। আমি যেতে, সৌম্য হাফ ছেড়ে বাঁচলেন মনে হলো। সৌম্য দিদি কে খুব ভালোবাসেন। সকালে অফিস যাবার আগে নিজের হাতে সব করতেন। নিজের হাতে দিদিকে চুল আঁচড়ে দিতেন। দিদি কে ফ্রেশ করে, নিজে ফ্রেশ হতেন। নিজে ব্রেক ফাস্ট করে, দিদি কে ব্রেক ফাস্ট করিয়ে তারপর অফিস যেতেন। মাঝে মধ্যে দেখতাম,সৌম্য অফিস থেকে ফিরে একটু ক্লান্ত হয়ে পরতেন। 

দুপুরে আমি আর দিদি গল্প করতাম। দিদি সৌম্য র গল্পই বেশী বলত। সৌম্য কী খেতে ভালোবাসে, কী পছন্দ করে, কী করে না। এমনকি কী কী খুনসুটি করতে ভালোবাসে দিদির সাথে। সেসবের গল্পও থাকত। আস্তে আস্তে সময় এগিয়ে আসতে দেখে ডাক্তার বললেন, ‘বাড়িতে রাখা আর উচিত হবে না। নার্সিং হোমে ভর্তি করা দরকার। না হলে প্রাণ সংশয় হতে পারে’।

ভর্তি করা হলো দিদিকে নার্সিং হোমে। আমি সৌম্য আর মা গিয়ে ভর্তি করে দিলাম দিদি কে।সেদিন ফিরে এসে রান্না করলাম আমি। সৌম্য কে একটু আপসেট লাগছিলো। রাতে খাওয়ার টেবিলে গল্প করলাম দুজনে অনেকক্ষণ। দিদির কথাই বেশী ছিলো সেই গল্পে। খাওয়া সেরে, সৌম্য নিজের ঘরে শুতে গেলেন। আমি পাশের রুমে শুলাম। টু বেড রুম ফ্ল্যাট ওটা।

রাতে হটাত ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখি সৌম্য র ঘরে লাইট জ্বলছে। ঘরের সামনে গিয়ে দেখলাম, সৌম্য ঘরের ভেতর পায়চারি করছিলেন। আমি সামনে গিয়ে বললাম, — ‘কী হয়ছে সৌম্য ? শরীর খারাপ লাগছে ?’

বললেন, ‘খুব চিন্তা হচ্ছে?ভয় লাগছে’ ।

বললাম, ‘ভয় পাবার কী আছে , এটা তো স্বাভাবিক। এখন চোখে মুখে জল দিয়ে, ঘুমিয়ে পরুন। কাল আবার সকালে যাবো দুজনে।’ সকালে উঠে শুনি সৌম্য একাই চলে গেছেন,দিদির কাছে। বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে আমিও গেলাম নার্সিঙহোমে। দিদির সাথে কথা হল। দিদি সৌম্যকে বলল ‘ওকে একদিন কলকাতা ঘুরিয়ে দেখাও।আসা থেকে তো আমাকে নিয়েই রয়েছে’।

সৌম্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।ফেরার পথে সৌম্য বললেন,’ চলো এখনো বেশ কিছু সময় আছে। কাছাকাছির মধ্যে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখাই তোমায়।কদিন এসেছো! সারক্ষণ তো দিদির সেবা করে গেলে।’ বলেই হা হা হা করে হেসে উঠলেন।

আমরা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গেলাম।আমি প্রথম গেলাম সেখানে। ওখানে গিয়ে পুরোটা ঘুরে খুব গর্ব হল দেশের জন্য।দেশের সংস্কৃতির জন্য। বাড়ি ফেরার আগে,ভিক্টোরিয়ার বাইরের বিশাল বাগানের চারপাশটা ঘুরে, একটা জায়গা বেছে বসলাম। 

বসে বসে চারপাশে দেখতে থাকলাম ! চারিদিকে যেমন মনোরম পরিবেশে প্রাকৃতিক! তারই মাঝে দেখি, গাছের তলায় বসে কিছু জোড়া শালিক। 

শুধু কি বসে আছে ?এখানে তারা নিজেদের মধ্যে সবাই ব্যস্ত, কামে কম্মে! কে কাকে দেখলো কী যায় আসে ! আমাদের চেয়ারের পাশে, ছাতার আড়ালে গভীর প্রেমে মত্ত এক যুগল। আমি মাথা নিচু করে ফেলেছি। সৌম্য বুঝতে পেরে বললেন, ‘আরে এখানে এটাই স্বাভাবিক, আমরা অস্বাভাবিক।’

আমার তো আরও লজ্জা লাগছিল।এমন সময় কোথা থেকে হুড়মূড় করে কালো মেঘ এসে, মাথার উপরের আকাশকে ঢেকে দিল। তার সাথে দামাল হাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হল। আমরা একটা গাছের তলায় আশ্রয় নিলাম। একটাই ছাতা ছিল। আসলে বুঝতে পারিনি,এভাবে বৃষ্টি আসবে।তাই সৌম্য চেষ্টা করছিলেন আমাকে বৃষ্টি ভেজার হাত থেকে রক্ষা করতে। একহাতে ছাতা ধরে, আর এক হাত দিয়ে আমার একটা কাঁধ ধরে আমাকে কাছে টেনে ধরলেন।

সৌম্য র শরীরের গন্ধ পাচ্ছিলাম আমি।নিজের শরীরে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল পায়ে কোনো জোর পাচ্ছি না।  সৌম্যর হাতের ভেতর আমি প্রায় ঝুলে রইলাম। আমার কাঁধ দুটো সৌম্যর বুকের ভেতর অনায়াসে লুকিয়ে পড়ল।

চোখ বুঝে সৌম্য র শরীরের সাথে জুড়ে রইলাম। বৃষ্টি থেমে গিয়েছিলো। গাছের জমে থাকা জলের টুপটাপ শব্দে,প্রথমে বুঝতে পারিনি। পাশের দিক থেকে লোকজনের কথায় বাস্তবে ফিরলাম দুজনেই। মুখ তুলে তাকালাম সৌম্য র দিকে। মুখে মৃদু হাসি এনে বললেন, ‘চলো, বৃষ্টি থেমে গিয়েছে!’

একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আমি বললাম, ‘সৌম্য, তাড়াতাড়ি স্নান করে নিন, নাহলে সর্দি লাগবে।’ আমিও স্নান করে নিলাম। সৌম্য রুমে বসে টি.ভি দেখছিলেন। আমি চা বানিয়ে, সৌম্য কে চা দিয়ে রান্না ঘরে গেলাম রাতের খাবারের আয়োজন করতে।

কাজ করতে করতে ভিক্টোরিয়ার কথা গুলি মনে পরছিল বারবার। কখন সৌম্য পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, বুঝতে পারিনি। ‘কী ভাবছো ? সরি …. আসলে তখন ওভাবে হটাত বৃষ্টি এসে যেতেই…মানে ঐ… মানে কিভাবে বোঝাব…?’  হাবিজাবি শব্দ গুলোকে এক করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলেন সৌম্য।

 ‘না না,ঠিক আছে। আর বোঝাতে হবে না, বুঝেছি ?’ মাথা নিচু করে কিচেন টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলাম আমি।আমার দু কাঁধে হাত রাখলেন সৌম্য। ‘সত্যি বলছ?’ আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না।

তখনকার মতন পরিস্থিতি সামলে সেদিন রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে, আমি আমার ঘরে ছিটকিনি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। সৌম্য বারকয়েক ডাকলেন। দরজার বাইরে থেকে কিছু একটা বোঝাতে চেষ্টা করলেন। আমি বললাম, ‘প্লিজ।

সৌম্য, আজ রাতটা আমায় একলা থাকতে দিন, যা বলার কাল বলবেন।’ কি বুঝল! কে জানে, রাতে আর ডিস্টার্ব করেননি।নিদ্রাহীন চোখে অনেক অগোছালো ভাবনারা ঘুরপাক খেতে লাগল, সারা রাত। সব ভাবনার ভেতর ঘুরে ফিরে বৃষ্টির সময়ের,

সেই অনুভুতির কথাই মনে পরছিল বার বার।শঙ্কাও হচ্ছিল এই ভেবে,যে অনুভূতিরা আবার জন্ম না দিয়ে দেয় অকাঙ্খিত ভালোবাসার। তাই অবাধ্য হতে চাওয়া অনুভূতিকে, জোর করে শাসন করার চেষ্টা করেই কাটিয়ে দিলাম সারা রাত।

অবশেষে অবাধ্য অনুভূতিরা শোষিত হল,নতুন দিনের আলোর কাছে! দরজায় আবার টোকা পরল। ওপার থেকে সৌম্যর কন্ঠস্বর, ‘… তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। এক্ষুনি নার্সিঙহোমে যেতে হবে। আমাদের মেয়ে হয়েছে…’

সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: