অন্ধের প্রাতঃরাশে নীল পিকাসো

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

সৃজনশীলতার চর্চায় শোক হলো শক্তির অনন্য বীজতলা। এই শক্তি সৃজনঋদ্ধ মননকে দেয় অনিরুদ্ধ অভিব্যক্তি। শোক কখনো কখনো বদলে দেয় সৃজনশীলতার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি।

রবীন্দ্র জীবনে শোক কিংবা নজরুলের জীবনে শোক তাদের সৃজনশীলতায় এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। চিত্রকলায় শোক সাহিত্যের চেয়ে অনেক বেশি নান্দনিক ও বাঙ্ময়। অন্তর্গত অস্থিরতা ও শোক চিত্রকলায় হয়ে ওঠে জীবন্ত ও প্রবহমান। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর চিত্রকলায় শোক এসেছে বিষাদের বিউগল বাজিয়ে,নীলের আশ্রয়ে।

নীল হলো স্বর্গের রঙ। নীল হলো বিষাদেরও রঙ।স্বর্গ হতে এই নীল বিষাদের ছায়া আপতিত হলো যেন তার মনের ওপর। বন্ধু ক্যাসাগেমার মৃত্যুর পর নীল বিষণ্নতায় আকণ্ঠ ডুবে যান ঊনবিংশ শতকের প্রভাবশালী স্পেনিশ চিত্রকর, ঘনকচিত্রকলার অন্যতম স্রস্টা পাবলো রুজ পিকাসো।ক্যাসাগেমার মৃত্যু পরবর্তী ঊনিশশো এক হতে ঊনিশশো চার সাল অব্দি তাই পিকাসোর কর্মজীবনে বিখ্যাত হয়ে থাকে নীল পর্ব বা ব্লু পিরিয়ড নামে।

এসময় তার বেদনা ও বিষণ্নতাকে ফুটিয়ে তুলতে ছবির কবি পিকাসো বেছে নেন নীলের আশ্রয়। যারা সমুদ্রগামী জাহাজে কাজ করেন তাদের জন্যে আছে এক অভিনব রীতি।জাহাজে যাত্রাকালীন কোন ক্যাপ্টেন বা কর্মী মারা গেলে নীল রঙের পতাকা উড়িয়ে সেই জাহাজকে ভিড়তে হতো কুলে।

অর্থাৎ নীলের মধ্যেই নিহিত আছে শোক। রক্তে কার্বন মনো-অক্সাইড বেড়ে গেলে রক্ত হয় নীল বর্ণের। নীলাভ রক্ত যেন শোক নিয়ে বিষণ্ণ থাকে যুগ যুগ। বন্ধুর মৃত্যুতে এমনই প্রগাঢ় দুঃখে নিপতিত ছিলেন অমিত প্রতিভাধর ঘনকচিত্রকলাবিদ পিকাসো।

ঊনিশশো এক হতে ঊনিশশো চার সাল পর্যন্ত অন্তরসখার নির্মম বিদায়ে পিকাসো ছিলেন নীল বিষণ্নতায় বুঁদ হয়ে। তাঁর এই প্রগাঢ় বেদনা মুদ্রিত হতে থাকে একে একে নীল পর্বের অসাধারণ চিত্রকলায়। অথচ মা বলেছিলেন তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে।

যদি পিকাসো সেনাবাহিনীতে যেতেন তবে তিনি হতেন একজন জেনারেল। কিংবা যদি যেতেন আধ্যাত্মিক পথ ধরে তবে তিনি হতে পারতেন পোপ। কিন্তু বাবার কাছে হাতেখড়ি পাওয়া পিকাসো পথ চলেছেন তার রঙতুলির মহাসড়ক ধরে।

তার সেই পথচলাই তাকে প্রমাণিত করেছে সঠিক পথের পরিব্রাজক হিসেবে। নীল বিষণ্নতায় বুঁদ হয়েও পিকাসোর নীলপর্বের ছবিগুলো হয়ে উঠেছে বিশ্বসেরা। এই পর্বের ছবিগুলোর মধ্য দ্য ওল্ড গীটারিস্ট,দ্য উওম্যান উইথ ফোল্ডেড হ্যান্ডস,দ্য গ্রীডি চাইল্ড,দ্য বীয়ার গ্লাস,দ্য ব্লু রুম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।বন্ধু কার্লোস ক্যাসাগেমার মৃত্যুর পর পিকাসো তার মরণোত্তর অবয়ব চিত্র নির্মাণ করেছেন যেখানে বিষাদই ছিল মুখ্য বিষয়।

দ্য ব্লাইন্ডম্যান’স মিল এই ব্লু পিরিয়ড বা নীল পর্বেরই একটি অনন্য ছবি যার পিছনের পটটি শূন্যতায় ভরা, নীলে বিষণ্ন। অন্ধ লোকটি একাকী নিঃসঙ্গ,দরিদ্র ও সম্বলহীন। আহার নিয়ে বসে থাকা অন্ধ মানুষটি যেন এক বেদনাবহুল জীবনকে টেনে টেনে নিয়ে যেতে যেতে ক্লান্ত,অবসন্ন। এ যেন পিকাসোর নিজের প্রতীকী অবয়ব যা তার অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা ও বেদনাবিধুরতাকে প্রকাশ করে।

সাধারণত নীল পর্বের ছবিগুলো বৃদ্ধ,অন্ধ, দরিদ্র,পতিতা, লোভী,অসচ্ছল, রোগজীর্ণ, ক্লিশে, ভিখারি এই জাতীয় চরিত্রের একক চিত্রকলা হিসেবে আঁকা হয়েছে যা সত্যিকার অর্থেই জীবনের গভীর কষ্টের নীল উপাখ্যানরূপে হয়ে উঠেছে মহাকাব্যিক।

যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর হতে তাঁর অনুসারীরা কিছু কিছু ধর্মীয় সংস্কার পালন করা শুরু করেছিলো। এর মধ্যে একটি সংস্কার ছিলো রুটি ও মদের আহার। যীশুর নির্দেশ মতে,ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর শিষ্যরা তাঁর স্মরণে নৈশ আহারে মিলিত হয়।

রুটি হলো তাঁর দেহের প্রতীক আর কাপে ভরা ওয়াইন বা দ্রাক্ষারস হলো যীশুর দেহের শোণিতধারার প্রতীক। ‘দ্য ব্লাইন্ডম্যান’স মিল’ নামের সেই নীল সময়ের চিত্রকলায় এই সংস্কারকেই পরিস্ফুটিত করা হয়েছে।

যে অন্ধলোকটি এই আহারে প্রবৃত্ত ছিলেন তার বাম হাতে ধরা ছিলো রুটি আর ডান হাতে ওয়াইনভরা পানপাত্র ধরার প্রয়াস। অন্ধ লোকটি বাইবেলে বর্ণিত প্রতীক যে আত্মিকভাবে ঈশ্বরের মাহাত্ম্য উদ্ঘাটনে বিশ্বাসী।

আহাররত অন্ধ মানুষকে পাহারা দেওয়া কুকুর হলো নিরাপত্তার প্রতীক।আহাররত অন্ধের ছবিটি আসলেই একটি আধ্যাত্মিক ছবি যা বিষণ্ন পিকাসোর আত্মমু্ক্তির প্রয়াসকে প্রতিবেদিত করে।

পৃথিবীর মানুষ মাত্রেই পারমার্থিক ভিখারী।আত্মমুক্তির পথ খুঁজে পেতে বিষণ্নতায় অন্ধ শিল্পী শরণ নিয়েছেন আধ্যাত্মিক মূর্ত প্রতীকের। পিকাসোর চিত্রকলাসমূহ সাধারণ কোন ফিগার নয়,এগুলি প্রতিটি এক একটি পুরাণ ও ইতিহাসের স্তম্ভের মতো। এর মধ্যেই পিকাসো ব্যক্ত হয়ে আছেন বাঙ্ময় হয়ে।

নীল পর্বের পিকাসোর চিত্রকলায় বিষাদের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। ঘনককলাবিদের চিত্রের মাঝে নীলের আবেশ যেন দেবরাজ জিউসের কান্নায় নীল হয়ে ওঠা মেঘমালার বেদনার পুরাণ।

আহার কখনো ভরায় উদর, আহার কখনো আত্মার পূর্ণতাকে ফুটিয়ে তোলে। অন্ধ লোকটির আহারের প্রতীকে পিকাসো ফুটিয়ে তোলেন তার পার্থিব ক্ষুধা নয় বরং ত্রাণকর্তা কর্তৃক মুক্তি লাভের আকাঙ্খা।

লোকোত্তর ফসলে মনের বিমুক্তি ঘটানোর আকুল আকাঙ্খায় রুটি আর পানীয়ের আহারের আয়োজন পিকাসোর বিষাদমুক্তির অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করে তোলে।অন্ধব্যক্তিটির অস্থির নির্মাণ এবং তার চর্মসার দেহ পিকাসো এতই নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন কাউকে ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই যে দারিদ্র্যের সাথে অন্ধত্বের পরম সখ্য।দীর্ঘদিনের অপুষ্টি তাকে করে তুলেছে শারীরিকভাবে দুর্বল ও বেঢপ।

তার এই অবয়বের মধ্যেই নিহিত আছে তার অক্ষমতা আর অসামর্থ।তার দুইখানা দীর্ঘ ও বিস্তৃত হাত আর বাম হাতে ধরা রুটির অনুপাত শুধু একথাই বলে,এই মানুষের সত্যিকারের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে সামান্য রুটিটুকু যথেষ্ট নয়।

বন্ধু ক্যাসাগেমার অকাল স্বেচ্ছামৃত্যু পাবলো পিকাসোকে যে গভীরতায় বিষাদসিক্ত করে তুলেছিলো তা থেকে মুক্তি পেতে কেবল আধ্যাত্মিক শরণ নয় বরং তার চেয়েও অধিক দরকার মানবিক সংলগ্নতা। অবশ্য পরবর্তীতে পিকাসো নিজেই নিজের বিষাদে পরিত্রাণ লাভ করেন এবং নীলের ঘোর হতে উত্তরণ ঘটিয়ে রোজ পিরিয়ডে অবতীর্ণ হন যা তাকে রঙ এর বৈচিত্র্য অর্জনে ঋদ্ধিময় করে তোলে।

পিকাসো যেমন শিল্পস্রস্টা তেমনি একজন শিল্প দার্শনিকও বটে। তার শিল্পদর্শনে বিষণ্নতা ও নান্দনিক প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে চরম মূর্ত হয়ে। ব্লু পিরিয়ডের পিকাসোই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনন্য সত্ত্ববান এক সৃষ্টিমুখর ঘনকচিত্রকলাবিদ।

আঠারোশ একাশি সালে জন্ম নেওয়া ছবির কবি ঊনিশশো তিয়াত্তরের পঁচিশে অক্টোবর বিদায় জানান বিষাদগ্রস্থ পৃথিবীকে বেদনাময়ী নীলের অভিঘাতের মধ্য দিয়ে। যাওয়ার আগে অনন্য চিত্রকলায় পৃথিবীর মানুষের মনকে পরিত্রাণ দিয়ে গেছেন মায়ের অমতে চিত্রকর হয়ে ওঠা পাবলো রুইজ পিকাসো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: