অপেক্ষার অবসান

ফরহাদ হোসেন

বাগানে অনেক ফুলের গাছ।একটি গাছে কোন বসন্তেই ফুল ফোটে না।তার জন্য বাগানের আফসোসের অন্ত নেই।এই ভাবে পঁচিশ বসন্ত অপেক্ষা…।তারপর যদি হঠাৎ কোন এক বসন্তে সেই গাছে ফুল ফোটে..তাহলে ভাবুন তো বাগানের কেমন আনন্দ হবে!
.
অমলেন্দু অপেক্ষায়,কোন সুন্দরী নারীর।খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত কিন্তু খুঁজে আর পায় না।তার মনকে নাড়া দেবার মত কি কোন মেয়ের জন্ম হয়নি!হঠাৎ যদি সে সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করতে করতে দেখতে পায় পাশের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে এক রুপবতী নারী।অজান্তেই যদি হেসে ফেলে।মানে সে রকম হাসি না;মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে বা ধরুন ভালো করে দেখার আশায় আরো জোরে জোরে চোখ কচলাতে থাকে।তাহলে কি ভাববেন?
.
এটাই তো অমলেন্দুর স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা পাশের বাড়ির বারান্দায়।কত দিনের স্বপ্ন অমলেন্দুর কেউ একান্ত আপনজন হবে।বন্ধুরা কতবার বলেছে-
‘রাস্তা ঘাটে এত মেয়ে আর তুই মেয়ে খুজেঁ পাইস না।তোর বিয়ে হবে না বুঝলি।‘
.
যদি সে সময় অমলেন্দু তাদের কল্পনায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারতো।তাহলে দেখিয়ে বলতো-
‘দেখ রে দেখ,কাকে বলে সুন্দরী।দেখ আমার কল্পনা।‘
এবার হয়তো সেই কল্পসুন্দরী নেমে এসেছে মাটিতে।তাও আবার পাশের বাড়ির বারান্দায়!সত্যি মনে হয় অমলেন্দুর প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে।
.
হিমানি সুন্দরী।বি.এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।বিশ্বজিতের মামাতো বোন।সকালে অমলেন্দু বারান্দায় যাকে দেখেছে।সে এই হিমানি।ভাবছেন খুব সুন্দরী মনে হয়।না না মোটেও না।তেমন সুন্দরী না তবে সুন্দরী।অমলেন্দুর বন্ধুরা এবার হয়তো বলবে-
‘এর চেয়ে অনেক সুন্দরী মেয়ে ছিল।‘
অমলেন্দু হয়তো বলবে-
‘সবার চোখে কি সবাই সমান।আমার দৃষ্টিতে হিমানিই সবচে সুন্দরী।‘
.
বিকেলে হিমানি ঘুরতে বেড় হয় বিশ্বজিতে সঙ্গে।অমলেন্দু আগে থেকেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল।হিমানিকে আসতে দেখে চোখ তুলতে পারছে না।আজ একটু বেশিই লজ্জা পাচ্ছে অমলেন্দু।ছেলেটা লাজুক কিন্তু আগে তো মেয়ে দেখে ফেললে এমন লজ্জা পেত না!দেখে ফেললে মানে-অমলেন্দু সচরাচর মেয়েদের দিকে তাকায় না।হঠাৎ যদি কোন মেয়ে চোখের সামনে চলে আসে তাহলে মুখটা হা করে তাকিয়ে থাকে!মুখ হা করা অমলেন্দুর বদ অভ‍্যাস।বিশ্বজিৎ অমলেন্দুর কাছে টিউশন পড়ে।তাই বিশ্বজিৎ এসে পরিচয় করিয়ে দিল।
..
-‘অমল দা আমার দিদি হিমানি।‘
আধুনিক মেয়ে Hello বলে সামনে হাত বাড়িয়ে দিলে,অমলেন্দু Handshake করার আগেই কাঁপতে শুরু করে।যদি সেখানে থাকতেন দাঁতে দাঁত ঘসার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেতেন।তারপর গলা পরিস্কার করে,কেসে বলে
-‘কয়েক দিন থাকবেন মনে হয়।‘
-পরিকল্পনা তো সে রকমি।‘
অমলেন্দু রুমাল বেড় করে কপালের ঘাম…..।
-‘আপনি যে ঘেমে গেছেন!’
-‘না না ঘাম না।কি জানি উপর থেকে পরলো?’
-ওহ!…
.
হাসতে হাসতে চলে যায় হিমানি।আর যেতে যেতে যতবার ফিরে তাকালো ততবারি অমলেন্দুর কাঁপুনির মাত্রা বাড়তে লাগলো।শেষ বার যখন পিছন ফিরে তাকালো কাঁপুনির প্রভাবে যে বাইকে বসে ছিল সেই বাইকের স্টান্ডটা একটু গেল নড়ে।ফলে ড্রেনের নোংরা জলে ডুবে উঠতে হল।
.
দুটি পাখি খরখুটো জোগাড় করতে লাগলো।বাসা বাধবে।শুরু হল প্রেমের খেলা।দুজন দুজনকে সকাল বিকাল বারান্দা থেকে দেখতো।ইশারায় কত কি যে বলতো?সময় পেলে বাড়ির বাইরে চলে আসতো।বসতো গিয়ে বটতলায়।হিমানি পিসির ভয়ে বেশিক্ষণ থাকে না,কিন্তু অমলেন্দু অনেকক্ষন সেখানেই পরে থাকতো।বট গাছকে কেন্দ্র করে গোলাকৃতি পাকা বসার জায়গাটা এদিক থেকে ওদিন শুয়ে শুয়ে পরিস্কার করে দিত।যেন কোথাও শান্তি পাচ্ছেনা।অবশ‍্য এতে অন্যদের জায়গাটা আর পরিস্কার করতে হত না।
.
বেজে গেল বিদায়ের ঘন্টি।হিমানির বাড়ির ফেরার সময় হল।শনি বার বিকেলে দেখা করলো বটতলায়।এই দিন হিমানির আর ভয় নেই।রোববার হিমানিকে নিতে আসবে বাবা।অনেক কথা হল দুজনের….চোখে চোখ রেখে হারিয়ে যেতে চাইলো দূর দিগন্তে।শেষে একটা আবদার করে বসলো হিমানি-
-‘কাল আমাকে একটা গোলাপ এনে দিতে পারবে?লাল,টুকটুকে।‘
অমলেন্দুর রাতে ঘুম নেই।পরের দিন সকালেই বেড়িয়ে পরলো গোলাপের সন্ধানে।মোড় পেরিয়ে বাজার।বাজারে ছোট্ট ফুলের দোকান।
.
-দাদা লাল গোলাপ আছে?
-নেই গো ভাই,একটু আগে আসলেই পেতে।অন্য ফুল নিয়ে যাও।
-না মানে দাদা,আমার লাল গোলাপেই চাই।
-ওহ!প্রেমিকাকে দেবে?
লজ্জায় লাল হয়ে মৃদু স্বরে বলল-‘হ‍্যাঁ।না মানে দাদা বন্ধু চেয়েছিল।তার প্রেমিকাকে দেবে।‘
দোকানের আশেপাশের লোকেরা হাসতে লাগলো অমলেন্দুর তোতলামির দেখে।এক জন বুড়ো বলে উঠল-
‘লজ্জা কিসে বাপু।অনেক বড় হয়েছ তো।’
না পেয়ে গোলাপ,ব‍্যথিত হৃদয় নিয়ে ফিরছে বাড়ি।বার বার মনের গহনে ধ্বনিত হতে লাগলো ধনীর মায়াবী কন্ঠ-
“গোলাপ আনবে আমার জন্য।”
যে দিকে তাকালো শুধু গোলাপের মরিচিকার।আকাশের মেঘেরাও দুষ্টু।এরা গোলাপের পাপড়ির মত করছে কেন ?
.
অবশেষে,বন্ধুর বাড়ির ফুল বাগানে পেয়ে গেল লাল টুকটুকে গোলাপ।ছিঁড়তে গিয়ে কাটার আঘাতে রক্তিম হল হাত।পাগল অমলেন্দু!গোলাপের সাথে কথা বলে-
‘হায়রে গোলাপ!রক্তিম করেছে হাত,রক্তিম করেছো মন।নিজেও আরো রক্তিম হলে আমার এক দু ফোটা রক্তে।‘
হিমানির হাতে গোলাপ তুলে দিল অমলেন্দু বীরের মত।হিমানি মুগ্ধ হয়ে গোলাপ দেখলো;দেখলো গোলাপ আনা বীরকে।যদি দেখতেন সে সময় হিমানির চোখ,বুঝতেন কি অসম্ভব খুশি হয়েছে!
”অপেক্ষার অবসান।“
..
হিমানির মুগ্ধ মন,মুগ্ধ নয়ন দেখে আনন্দে মাতোয়ারা হল অমলেন্দু।আর কিছুই চাওয়ার নেই যেন পৃথিবীতে।সত্যি তো যদি সে আলেকজান্ডার মত বিশ্ব জয়ী বীর হত।তাহলে কি এত সুখ পেত?কক্ষনেই পেত না!সে কি করতো পৃথিবীর মালিক হয়ে?অমলেন্দু শুধু চেয়েছিল একটি হৃদয়ের জয়।যে হৃদয় হবে তার সিংহাসন।যার হবে সে রাজা।
.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: