অভিমন্যু //   রনেশ রায় 

456

পাড়ার মোড়ে রিক্সা স্ট্যান্ড সংলগ্ন একটা বাঁধানো বটগাছতলা। একদিকে শীতলা মন্দির আরেকদিকে একটা সুন্দর বাঁধানো প্রায় গোল করে ঘেরা জায়গা। রিকশাচালকরা না,  সেখানে রোজ আড্ডায় বসে কিছু বয়স্ক লোক। রিক্সাচালকরা “স্বেচ্ছায়“ ভদ্রলোক বয়স্কদের জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছে। চল্লিশ বছরে কখনো জায়গাটা নিজেদের বলে দাবি করেনি। আড্ডার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে।

এই চল্লিশ বছরে   আজ আড্ডাবাজদের সবার বয়স সত্তর ছুই ছুই। কয়েকজনের সত্তর পেরিয়ে। রোজ -ই এক মুখ পিন্টু নিলু সুনু কানু এদের-ই জমিদারী।গত চল্লিশ বছরে অনেক রং এলো গেল কিন্তু এই আড্ডার রং একই আছে। এখানে রং-এর বদল হয় না। সব রং-এর সমাহারে একটাই রং। রংগহীন রং। আড্ডা চলে রাজনীতি অর্থনীতি নাটক সিনেমা সব নিয়েই। মহিলারাও আড্ডার বিষয়।  সত্তর ছুলেও আদিরস থেকে কেউ বঞ্চিত হতে রাজি না। এই আড্ডা বয়স্কদের আড্ডা হলেও তা বয়সের ভারে নুব্জ হয়ে যায়নি। আড্ডা চলাকালীন দেখা যায় কারও না কারও নাতি বা নাতনি দূর থেকে মুখ ভেংচে চলে যাচ্ছে।

রোজের মত আজও  আড্ডা শুরু হবে। আড্ডা স্থানে  এককোনে রিক্সাচালক কালিচোর বসে। কিছুদিন হল ও এই লাইনে এসেছে। আগে  ওর চুরি পেশা ছিল বলে ওকে সবাই কালিচোর বলে ডাকে। ওটাই ওর ডাক নাম হয়ে গেছে, কালি থেকে কালীচোর । এখন ও চুরি ছেড়ে রিক্সা চালায়। একশ ভাগ সত  হয়েও ও কালিচোর-ই হয়ে আছে। সবাই আদর করে ওই নামেই ডাকে। একে একে সবাই হাজির। সাধারণত এই আড্ডায় তৃতীয় কারো থাকার রেওয়াজ নেই। বলতে হয় না। কেউ থাকলেও আড্ডা শুরুর  আগে সে চলে যায়। গত চল্লিশ বছর ধরে এটা হয়ে আসছে। জোর করে দখলের গল্প নেই। এটা যেন একটা প্রথা । কেউ আপত্তি করে না। এত সুন্দর জায়গাটা অথচ নতুন করে দখলের কেউ নেই। বুড়োদের দখলে। এই দখলদারির  যুগে দখলদারির জন্য যুদ্ধ নেই।

সবাই প্রায় এসে গেছে। কিন্তু কালিচোরের ওঠার লক্ষণ নেই। আজ কি হলো? তবে কি রিক্সা চালকরা দখল চাইছে? কালিকে দিয়ে তার সূচনা ? এটাত   মেনে নেওয়া যায় না। শেষে কিনা চল্লিশ বছরের অধিকার বেহাত হয়ে যাবে। আর কোনো মাস্তানগোষ্ঠী নয়, দখল নেবে কালিচোর আর তার সাকরেদ রিক্সাওয়ালারা! না তা হতে পারে না। কিছুদূরে বসা ছোটরা যদি এটা দেখে তবেত সর্বনাশ! কালিকে মেরে তুলে দেবে । ভয় হয় রিক্সাচালকরা জড়ো হলে   একটা দাঙ্গা না বেধে যায। অত ঝামেলার কি দরকার। আমরাই বলে কয়ে দেখি যদি ওঠানো যায়। তৃতীয় ব্যক্তির উপস্হিতিতে আড্ডা জমে না। তাই কানুই উদ্যোগ নেয়। কালিকে আউট করতেই হবে। মামার বাড়ি নাকি ! চল্লিশ বছরের অধিকার বলে কথা। বেদখল হয়ে যাবে ! চল্লিশ বছর বাস করলে মালিকনাত আইন-ও স্বীকার  করে নেয়। অতএব ওকে উঠতেই হবে।

   কানু ওকে ওঠাবার জন্য ইনিংস শুরু করল । এই  দিয়েই আজ আড্ডার শুরু। কানু কাউকে সম্বোধন করলে আগে শ, ব, বা দিয়ে এমন শব্দ ব্যবহার করে যা ভদ্র সমাজে গ্রহনযোগ্য নয়।  কিন্তু আড্ডায় গ্রহণ যোগ্য। খিস্তি আর গুল ছাড়া আড্ডা জমে না। কালির উদ্দেশ্যে কানু বাউন্সার ছাড়ে

——— শালা কালিচোর  তুই এখানে কেন ?

——– তোমাদের কাছে শিখতে এসেছি। তোমরা কত ভালো কথা বল, ভালো ভালো বিষয়ের ওপর আলোচনা কর।   সবাই বোঝে কালি আওয়াজ দিচ্ছে। এখানে ভালো কথা কেউ বলে না । রাম কৃষ্ণের কথামৃত নিয়ে কেউ আলোচনা করে না। অন্য রিক্সা চালকরা একটু দূরে থাকলেও কেউ কালিচোরকে সমর্থন করে না। বরং কেউ কেউ ওকে উঠে যাবার কথা বলে। বোঝা গেল আমাদের অনুমান ভুল। রিক্সা চালকদের দলগতভাবে  সেরকম কোন উদ্দেশ্য নেই। কানু এবার দ্বিতীয় বাউন্সারটা ছাড়ে।

——  আরে শুয়োর, তুই দিনে রিক্সা চালাস আর রাতে চোর। ওঠ, এখানে এসে পুলিশ ঝামেলা করবে। তোর জন্য আমরাও ঝামেলায় পরব।

——- ধরবে না। আমি চুরি ছড়ে দিয়েছি। পুলিশ জানে। নিরুত্তাপ উত্তর কালিচোরের।

——- তবে লোকে কালিচোর বলে কেন ? এটা কি তোর বাপের সম্পত্তি !  এবার বাউন্সার নয়। একেবারে বডি লাইন। বাপ তুলে কথা। আমরা ভাবছি, এতে কালি আপত্তি না জানায়। তবেত অন্য রিক্সাচালকরা ওর পাশে এসে দাঁড়াবে, হাঙ্গামা হতে পারে। আমাদেরও বলার কিছু থাকবে না। কিন্তু  কালির ভাবাবেগে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। একটুও রাগ করেনি। ও জানে ও ছোটলোক তার ওপর একসময় চুরি করত তাই এধরনের সম্বোধন তার প্রাপ্য। তবে বোধহয় ভাবে বাপের সম্পত্তি হলেত তাকে আর রিক্সা চালাতে হত না। খুব শান্ত গলায়  বলে

——- ওটা আদর করে বলে। সকলে  জানে আমি অন্যায় করতাম। তবে শিক্ষা নিয়েছি। এখন  আর চুরি করি না। অন্যায় করলে শুধরে নিতে হয়। শুধরে নিয়েছি। তবে এখন লজ্জা করবে কেন ? আর আমার জীবনটাই একটা শিক্ষা।  এরপর কার কি বলার থাকতে পারে ! কানুর মুখ দিয়ে কথা নেই। কালির প্রতি যেন শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। তুই থেকে সে তুমিতে নেমে আসে। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে  বলে

——  তুমিত খুব ভালো কথা বলতে পার। শিখলে কোথা থেকে।

—— সে অনেক কথা। অনেক অভিজ্ঞতা। বই পড়ে  শেখা নয়। জীবন থেকে শেখা। দশটা বছর চোরের দলে থেকে শেখা। কালি পাশ। ও   আমাদের আড্ডায় যোগ দিলে আমাদেরই লাভ। আড্ডায় আলোচনার উপাদানে বৈচিত্র বাড়বে। আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়বে। অভিজ্ঞতয় আড্ডার  উত্সাহ বাড়ে। নান্টু বলে

——– কয়েকটা অভিজ্ঞতার কথা বল না।  কালি শর্ত দেয়:

——–   আমাকে এখানে বসতে দিতে হবে। রিক্সা চালাবার ফাঁকে ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেব। তোমাদের সঙ্গে গল্প করব। আমরা এতদিন বুঝিনি যে রিক্সা চালাবার ফাঁকে ফাঁকে সত্যি ওদেরই দরকার  একটু জিরিয়ে নেওয়া। আমাদের আড্ডা থেকেও সেটা জরুরি।কালি কি নির্লিপ্ততায় আমাদের সেটা বুঝিয়ে দেয়। আমরা ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। জিরোতে দেবার জন্য নয় রাজি হই আমাদের আড্ডাটা আরও জমবে বলে। তবে এই রিক্সা স্ট্যান্ডের অন্যান্য রিক্সাচালকরা একটু দূরে রাস্তার ধারেই জিরোতে বসে। তাদের এখানে জায়গা হয় না।

কালি চোরের বয়স আন্দাজ করা কঠিন। দেখলে মনে হয় বুড়িয়ে গেছে। কিন্তু হিসেব অনুযায়ী বছর চল্লিশের বেশি হবে না। সব রিক্সাচালকদের এরকমই হয় তাই ছোট বলে  আমাদের তরফ থেকে তুই বলায় অপরাধ ছিল না। কিন্তু আমরা আমাদের থেকে বড় রিক্সা চালকদেরও তুইই বলি। আমাদের থেকে অনেক ছোটরাও তাই বলে। এটাই হলো চলতি সংস্কৃতি।  ধরে নিই যে ওরা নিরক্ষর তাই অশিক্ষিত। সেজন্য সমাজ এই তুই বলাকে স্বীকৃতি দিয়ছে। জীবনের অভিজ্ঞতাও যে একজনকে শিক্ষিত করে তুলতে পারে সেটা আমাদের বিবেচনায় থাকে না। যাই হোক কালি আজ থেকে  আড্ডার সদস্য হয়ে যায়।

    এখন এই আড্ডায়  যোগের অঙ্ক শুন্য। বরং বিয়োগের অঙ্ক দেখা দিয়েছে। হৃদরোগে বা অন্য কোন অসুখে মাঝে মধ্যেই কেউ না কেউ ঝরে পরে। এই স্বাভাবিক বিয়োগ ছাড়া অন্য কোন কারনে আড্ডাটা ছোট হওয়ার কারণ দেখা যায়নি। তবে দুচার বছর হল অনুপস্থিতের সংখা বেড়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যু না হলে এ হেন আড্ডা যে অমরত্ব লাভ করত তা আমরা  আড্ডাবাজরা সবাই বিশ্বাস করি।

এটা হলে বট গাছটার অন্তযাত্রা ঘটত কিন্তু আড্ডা-টা চলতই। আড্ডায় যোগের অঙ্ক শুন্য কারণ এখানে জায়গা পাওযার জন্য একটা ইন্টারভিউ ব্যবস্থা চালু আছে। খিস্তি বিশেষজ্ঞ একজন যাচাই করে নেয় প্রার্থী কতটা তা হজম করতে পারে আর কতটা তা দিতে পারে। তাছাড়া বয়সের বাধা মানা হয়।  সিনিয়র সিটিজেন ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। এই বয়েসে কেউ ইন্টারভিউ দিতে ভরসা পায় না। তবে কালির ক্ষেত্রে এই সব বাধা মানা হয়নি।

জীবনের দেওয়া নেওয়ার হিসেব প্রায় সব আড্ডাবাজদের শেষ। পাতি মধ্যবিত্ত এই মানুষগুলোর দেনা পাওনার খাতায় পাওনা যেমন নেই তেমনি দেনার খাতাও শুন্য। লেনদেন মোটামুটি সমতা রেখেই চলে। জীবন সমুদ্রে তরঙ্গের অভাবে তা নিস্তরঙ্গ। তবে আড্ডায় এই তরঙ্গ যতটুকু সৃষ্টি হয় সেটাই পাওনা। কালির যোগদানে প্রত্যেকেরই অভিজ্ঞতার পুঁজি বেড়ে ওঠে। জ্ঞানের গর্ভ স্ফিত হয়। আর তা খিস্তি খেউরে ভরা জ্ঞান নয়। জীবনের অভিজ্ঞতার মর্মান্তিক শিক্ষা।  এই অভিজ্ঞতার পুঁজি যত বাড়ে কালির কাছে দেনাও যেন তেমন বাড়ে। বাড়িতে এসে বউ বাচ্চাদের কাছে গল্প বলার রসদ বাড়ে। চল্লিশ বছরে এই আড্ডা থেকে যা সামান্যই পাওয়া গেছে।কালির দৌলতে বাড়িতেও যেন কিছুটা প্রানের সঞ্চার হয়।

      কালি মধ্যে মধ্যে এসে নানা বিষয়ে কথা বলে। সবটাই তার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা। সবটা একসঙ্গে বলার সুযোগ নেই। রিক্সা চালাবার ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু বলা যায়। এ যেন এক চলমান জীবনের সিরিয়াল। এতে  জীবনের গতি প্রবাহিত। আমরা টিভি-তে যে বাস্তববর্জিত একঘেয়ে টেনে টেনে বড় করা নিষ্প্রান সিরিয়াল দেখি এই সিরিয়াল সেরকম নয়। বাস্তব জীবনের প্রেম প্রীতি ভালবাসা বঞ্চনার উপাদান নিয়ে এ এক উপাখ্যান। কালির জীবনের এক একটা পর্ব শেষ হলে আমরা অপেক্ষা করি পরের পর্বের জন্য। কালি এলে আমাদের চল্লিশ বছরের আড্ডার খাতটাই বদলে যায়। আড্ডাটা হয়ে ওঠে অনেক বাস্তব অভিমুখী। আমরা যেন জীবন থেকে নতুন করে শিক্ষা পাই।

একদিন আড্ডায় কালিকে উস্কে দেওয়ার জন্য বাবু বলে

——-  তুমিত চুরি করে অনেক মাল কামিয়েছ। তবে এখন রিক্সা চালাও কেন ? কালির উত্তর

——– কামিয়েছ বোল না। বল অনেক মাল চুরি করেছ।

——– ওই ত হলো। চুরি করছ মানেই ত কামিয়েছ।

——- না দুটো এক হলো না। তোমরা-ত বল সর্বহারা  শ্রমিকরা অনেক উত্পাদন করে। কিন্তু কামায় কত ? সবটাই মালিক খেয়ে নেয়। বিশু বলে  

——-  তোমরা কি শ্রমিক নাকি?

——– আলবাত। আমরাও মানে চোরেরাও   শ্রমিক। সর্বহারা শ্রমিক।কালি যেন একটু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। রহস্যটাত জানা দরকার,তাই পিন্টু প্রশ্ন  করে

——- তুমি কিভাবে শ্রমিক হলে ?   

——- তবে শোন। কারখানার যেমন মালিক থাকে তেমনি আমাদের চুরির কোম্পানিরও মালিক থাকে। আমাদের দিয়ে চুরি করায়। একজন ঠিক করে দেওয়া  ক্যপ্টেন-এর কাছে বা তার ঠিক করে দেওয়া কোন দোকানে আমাদের চুরির মাল জমা দিতে হয়। চুরির পরিমানের উপর নির্ভর করে আমাদের সামান্য কিছু দেওয়া হয়। তা দিয়ে নিজের সংসারও চলে না।

আমাদের বুঝতে বাকি থাকল না যে এরা কিভাবে শোষিত হয়। এক অর্থে সত্যিইত এরা সর্বহারা শ্রমিক। আর কালির  বাকপটুতায় তার জীবন কাহিনী যেন আরও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থকলেও অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা ওর যে আমাদের থেকে অনেক বেশি তাতে সন্দেহ নেই। এরই মধ্যে কে যেন প্রশ্ন করে

——- তবে চুরির দলে  ঢুকলে কেন?

——- সে অন্য এক কাহিনী।  ছোটবেলায় বাবা মারা যান। আমি বাধ্য হয়ে একটা গ্যারেজে কাজ শুরু করি। পনের বছর সেখানে কাজ করার পর   গ্যারেজে একদিন চুরি হওয়ায় মালিক আমাকে মিথ্যে দোষী সাব্যস্ত করে। অত্যাচারত করেই সেই সঙ্গে আমাকে পুলিশে দেয়। আমি এই অপমান সহ্য  করতে পারি না। প্রতিজ্ঞা করি, যে করে হোক এর বদলা নেব। তখন আমার বয়স পঁচি কি ছাব্বিশ । জেলে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়।তারা চোরের দলের সদস্য। আমি ভাবি যখন চুরি না করেও চোর বনেছি, আর এ বদনাম আর ঘুচবে না তখন সত্যিকারের চোর বনতে আপত্তি কোথায় ? তাতে মাল কামানো  যাবে।বাড়িতে অভাব দূর হবে।জেল থেকে ছাড়া পেয়ে চোরের দলে ভিড়ে গেলাম। প্রথমেই প্রতিশোধের কথা মাথায় এল।

গ্যারেজের মালিকের বাড়িতে ঢোকার আর বেরুবার সব পথ আমার জানা ছিল। আরও জানতাম যে মালিকের দুনম্বরী ব্যবসা আছে। বাড়িতে অনেক টাকা সোনাদানা থাকে। গ্যাং নিয়ে চুরি করলাম। সব সাফ করে দিয়ে বেরোলাম।  সেই আমার প্রথম চুরি আবার একই সঙ্গে প্রতিশোধ বলতে পার। শুনেছি চুরিতে সম্পত্তি হারাবার শোকে সেই মালিক হৃদরোগে মারা গেছে। আমার সে কি আনন্দ।। যেন বদলার মত বদলা নিতে পেরেছি । প্রথম এসেই এত বড় চুরিতে নেত্রিত্ব । কেউ ভাবতে পারেনি। চোরের মালিক ভাবলো আমার চুরিতে হাতযশ আছে। আমি অন্য কোন চুরির কোম্পানিতে হাত পাকিয়েছি।। প্রথমবারের চুরিতে ভালো ভাগ দিল। আস্তে আস্তে আমি দলের স্থায়ী  সদস্য হয়ে গেলাম।

কালি জানালো যে ওর সঙ্গে পাড়ার  একটা মেয়ের ভাব ছিল। কিছুটা পড়াশুনো  করা। সে কখনই চাইত না কালি চুরি করুক। ওর সান্নিধ্যে থেকে কালি কিছুটা লেখাপড়া শিখেছে। কালিও ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ওকে বিশু  প্রশ্ন করে

——- আগেই  বেরিয়ে এলে না কেন ? কালির উত্তর

——- সে আরও কঠিন কথা। একবার ঢুকলে সহজে আর  বেরোবার পথ থাকে না। অভিমন্যু হয়ে যেতে হয়। সেদিন আর কথা হয় না। একজন আরোহী এসেছে দেখে কালি ওঠে।

নিলু সবাইকে রবিন চোরের কথা মনে করিয়ে দেয় । এ পাড়ায়  রবিন রায় বলে একজন ভদ্রলোক আছে সে নাকি এককালে চুরি করত। তার এখন যথেষ্ট পয়সা আর পসার। আমরা জানতাম ও ভালো হয়ে গেছে। নিলু আমাদের জানালো ওর পুরনো সাকরেদদের সাথে যোগাযোগ আছে। তবে ও আর রাতে বেশি বেরোয় না বরং সন্ধ্যে হলেই পাড়ার মোড়ে  হাজির হয়। সেখানে ওর খুব খাতির। পুজোয মোটা টাকার চাঁদা দেয়। আজ আমরা কালির অভিজ্ঞতা শুনে বুঝলাম যে রবিনবাবু নিজে চুরি না করলেও চুরির ব্যবসা করে। চুরি করে এত টাকা পাওয়া যায়না। কালিকে ওর কথা বললে সে রবিন রায়কে চিনতে পারে। ও নাকি অন্য একটা দলের মালিক। আমরা রবিনবাবুর সত্যি পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হই।  

কালি দুদিন পরে আবার আড্ডায় আসে। আমাদের-ও জানার তীব্র ইচ্ছে কিভাবে একটা চোর মহাভারতের অভিমন্যু হয়ে যায়। মহাভারতের অভিমন্যুত্ ইতিহাসে নায়ক। কিন্তু এরা সেই স্বীকৃতিটা পায়না। জানতে চাওয়া হয়

——- সেদিন তুমি বললে চোরের  দলে একবার ঢুকলে অভিমন্যু হয়ে যেতে হয়। ব্যাপারটা কি বলত ! কালি শুরু করে

—— দেখো চোর বদনাম একবার হলে আর চাকুরী পাওয়া যায় না। তখন জীবিকার জন্য এখানেই পরে থাকতে হয়। আর মালিক-পুলিশ মিলে আমাদের ফেরার পথ বন্ধ করে রাখে।  

—— এখানে আবার পুলিশ এলো কি  করে ? প্রশ্ন অতীনের

—— মালিক পুলিশের ষাট না থাকলে এই ব্যবসা চলে না। যা চুরি হয় তার একটা ভালো অংশ পুলিশও  পায়। তাই চোরের দলে আমাদের টিকিয়ে রাখা দরকার পুলিশেরও স্বার্থে। সেখান থেকে বেরোবার চেষ্টা করলে মিথ্যে মামলা দিয়ে পুলিশ এমন পেদাবে না !

—– পুলিশের মারেত তোমরা অভ্যস্ত হয়ে যাও। তবে এত ভয় কেন?

—– সেটাইত রহস্য।পুলিশ ধরলেও আমরা মার তেমন খাই না। বরং থানায় বেশ মজা। ফাই ফরমাস খাটি। নিয়ম মত খাবার পাই। মালিক বাড়ির জন্য কিছু খোরাকিও  দেয়। আর জেলে গেলেত কথাই নেই। তবে আমাদের জেলে বেশিদিন রাখে না। অল্প কয়েকদিন রেখে ছেড়ে দেয়। জেলে থাকলে আমাদের লোকসান নেই কিন্তু লোকসান মালিক আর পুলিশের। ছেড়ে দিলে আবার মাঠে নামতে হয়। বরং থানায় বা জেলে কয়েকদিন বিশ্রাম পাওয়া যায় । চোরের দল ছাড়লে পুলিশ মিথ্যে মামলা দিয়ে শুধু ধরে না, বেধরক মারেও। এমন কি খুন হয়ে যাওয়ারও ভয় থাকে। বেশ রসিয়ে রসিয়ে কালি বলে। যেন জীবনের এই মর্মান্তিক অধ্যায়টাকে কালি উপভোগ করে এসেছে।   

——-  তবে তুমি দল ছাড়তে পারলে কিভাবে? প্রশ্ন নীলুর

——-  একবার থানায় একজন ভালো বড়বাবু আসে। সে চুরিকরা  পছন্দ করে না। চোরকে পেদিয়ে লাস করে দিত। আমাদের চুরি ছাড়তে উপদেশ দিত।এর মধ্যে আমার ওপর চাপ। যে মেয়েটা আমায় ভালবাসে সে শর্ত দেয়  যে দল ছেড়ে ফিরে এলেই আমাকে বিয়ে করবে। তা না হলে একেবারে তালাক। আমার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই বলায় ও নিজে থানায় বড়বাবুকে সব বলে।বড়বাবু আমাকে ডেকে দল ছাড়তে বলে। এও জানায় যে আমার ভয় নেই। তারপর থেকেই আমার এই নতুন জীবন। আমি বিয়ে করি। ওপাড়া   থেকে এই পাড়ায় চলে আসি। এখন খাল পারেই আমার বাস।

আমরা জানলাম কালির একটা প্রেমের ইতিহাস আছে। আর সেই প্রেমই তাকে চুরির অন্ধকার  জগত থেকে মুক্তি দিয়েছে। এইজন্যই কাব্যে উপন্যাসে প্রেমকে মহিমান্য়িত করে থাকেন কবি সাহিত্যিকরা। তবে কালি আর তার প্রেমিকার এই বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে কোন কবি বা সাহিত্যিকের কলম উঠবে কিনা জানি না।

এভাবে আমাদের আড্ডা চলে দিনের পর দিন। কালি  প্রায়ই উপস্তিত থাকে। সে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে গেছে। একদিন আড্ডায় কথায় কথায়  জানায় রিক্সায় যা রোজগার তাতে সংসার চালানো দায়। তার ওপর ছেলেকে একটা ভালো স্কুলে পড়ানোর খরচ শুরু হবে। তাই বলে

——— আয় বাড়াতে  একটা চোরের স্কুল খুললে মন্দ হয় না। আর তাতে রবিনবাবুর মত প্রতিষ্ঠা পাওয়া যাবে সমাজে।কালির কথায় যেন একটা রোমান্টিকতার সুর। ওর এই মতান্তর দেখে সবাই শঙ্কিত হই । একযোগে সবাই ওকে ওই পথে যেতে বারণ করি । সুনু  বলে

——- দেখ তবে আমরা তোমাকে শুধু বয়কট করব না, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। ও বলে

——– কি ব্যবস্থা  নেবে ?

——– পুলিশে দেব। কালি হেসে ওঠে। পুলিশ-ইত চায় আমি আবার ও লাইনে যাই।

——– কেন ভালো পুলিশত আছে। আমাদের মধ্যে কে যেন বলে।

——– ও বদলি হযে গেছে। ভালো পুলিশ বেশিদিন থানায় থাকে না। মানে তাকে থাকতে দেওয়া হয় না।

——– তবে তোমার  বউকে গিয়ে বলি। বিশু বলে।

——– ওরে বাব্বা, ও  ঝামেলা করবে।

——- তবে আমরা এখন-ই যাচ্ছি। একটু যেন ভয় পেয়ে কালি হাত জোর করে বলে

—— ওই উপকারটা কর না। যতই অভাবে থাকি শান্তিতে আছি । অশান্তি চাই না। ওটা

আমি  ঠাট্টা করে বলেছি । ওই পথে ফেরার আর  কোন ইচ্ছে আমার নেই। আর ফিরলে বউ বাচ্চা দুজনকেই হারাব।  পয়সার পসার থেকে সংসার টেকানো আমার কাছে বেশি দরকার । তাছাড়া  তোমাদের এই আড্ডাও আমি ছাড়তে চাই না। আমরা ভেবে তৃপ্তি পাই যে এই আড্ডার-ও কিছু মূল্য কারও  কাছে আছে। অন্তত গরিব রিক্সাওয়ালার কাছে। আড্ডা মারি বলে বাড়িতে চিরকাল-ই গঞ্জনা শুনতে হয়।

ইদানিং প্রায়ই   একজন এসে কালিকে আলাদা করে  ডেকে নিয়ে যায়। একটু দুরে গিয়ে দুজনের মধ্যে  কথাবার্তা হয়। বোঝা যায় আগুন্তুক প্রধানত বক্তা আর কালি শ্রোতা। একটু পরে দুজনের মধ্যে তর্ক বাঁধে।  লোকটা চলে গেলে মুখ গোমরা করে কালি এসে বসে। লোকটা কে জানতে চাইলে কালি মুখ খোলে না। সেদিন বাকি সময়ের জন্য  ও চুপচাপ বসে থাকে। আগুন্তুক সম্পর্কে আমাদের সবার-ই সন্দেহ হয়। কেউ কেউ এটাও ভাবে যে কালি হয়ত আবার তার পুরনো অন্ধকার জগতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা  করছে। আবার কেউ কেউ ভাবে লোকটা বোধহয় মহাজন। অভাবের সংসার তাই হয়ত কালি ওর থেকে ধার করেছে। সেই নিয়েই বিবাদ। এই সন্দেহ প্রকাশ করে কালু ওকে কিছু টাকা দিতে রাজি হয় যাতে ও ধার থাকলে তা শোধ করে দিতে পারে। কালি  তাতে রাজি হয় না। আমাদের মধ্যে ধোয়াশা তৈরী হয়।

একদিন  আমাদের আড্ডা প্রায় শেষ। কালি আসেনি।  ওকে রিক্সার কোন খেপ মারতেও দেখা যায়নি। এটা সাধারণত হয় না। ও রোজগার বন্ধ করে সাধারণত কোথাও যায় না। ট্রিপের মধ্যে মধ্যে বড়জোর আড্ডায়। সবাই ধরে নিয়েছে  যে হয়ত অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাই আজ ও আসতে পারেনি। এমন সময় এক রিক্সাচালক খবর দেয় যে খালপাড়ে একজন খুন হয়েছে। কে এসে গুলি করে গেছে।

রটেছে যে ও আমাদের কালি। খবরটা পেয়েই আমরা সব শিউরে উঠি। একি  কালি খুন ! যেন কতদিনের এক প্রিয় ঘনিষ্ট আত্মীয় বিয়োগের ব্যাথা আমরা অনুভব করি। সবাই প্রায় দৌড়ে খালপারের দিকে রওনা দিই। গিয়ে দেখি ইতস্তত জটলা। পুলিশ একটা মৃতদেহ ঘিরে রেখেছে। কাছে গিয়ে জানতে পারি  ওটা কালির মৃতদেহ। দিনদুপুরে কালি খুন! পিন্টু একটু এগিয়ে এক পুলিশ-এর কাছে জানতে চায় কি হলো। সে নির্বিকার থেকে বলে

——- ওই  চুরির বখরা নিয়ে বোধহয় ঝগড়া। আর তার থেকেই এই খুন। কাছেই কালির স্ত্রী  বাচ্চা নিয়ে দাড়িয়ে। পাশের লোকজনকে বলছে কালি রোজ সন্ধ্যেবেলা থেকে সারারাত বাড়ি থাকে। চুরি ও কখন করবে? তবে ওর এই যুক্তিকে কে কতটা বিশ্বাস করলো সন্দেহ  আছে।

এর মধ্যে একটা গাড়ি এসে কালির দেহ তুলে নেয়। একজন পুলিশ কালির স্ত্রীর কাছে জানতে চায় বাড়ির কেউ সঙ্গে যাবে নাকি। স্ত্রীর চোখে জল। সে পুলিশের কথার উত্তর না দিয়ে  বিড় বিড় করে বলে

——- আমার-ই দোষে ও মারা গেল। ওকে ভালো রাস্তায় নিয়ে এলাম বলেই আজ এটা ঘটলো।   

আমাদের মনে হল কালির সেই কথা। “আমরা অভিমন্যু  হয়ে যাই“। বছরে কালির শেষ বাসনাটাও আমাদের সন্দেহগ্রস্ত করে তোলে। ভাবি “চুরি নিয়ে বখরা“ নয়তো ! যে কারণেই হোক অভিমন্যু ওকে হতেই হয়।     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *