অসমাপ্ত

আব্দুল্লাহ্ আল সিয়াম

বাসে করে ঢাকা যেতে আর কত সময়ই লাগবে। দুই থেকে তিন ঘন্টা।কিন্তু রাস্তার যা অবস্থা ছয় ঘন্টার আগে মনে হয় পৌছুতে পারব না।ছয় ঘন্টা বসে বসে পার করা ভালোই কঠিন। এক কাজ করা যায়, ঘুম পারা যায়।তবে পকেট সামলে।কোন দিক দিয়ে পকেটের সব হাওয়া হয়ে যাবে  টেরেই পাবো না।দশ মিনিট চোখ বন্ধ তরে রাখলাম ঘুম ঘুম ভাব আসবে হঠাৎ একটা ঝাকি খেয়ে এক হাত লাফিয়ে উঠলাম,আবার চেষ্টা করলাম।এভাবে মনে হয় ছয় ঘন্টা কেটে যেতে পারে।

যাইহোক,বাস নিদিষ্ট সময়ের থেকে পনেরো মিনিট দেরি করে ছাড়ল। আমার ছিট জানালার  পাশে।পাশের ছিটে এক ভদ্র মহিলা বসলো।বয়সে আমার বড় বোনের মতো।কোলে একটা মেয়ে।বয়স তিন-চার হবে।মিষ্টি কালারের ফ্রক পড়া।মাথার চুলগুলো বেশ বড়।মায়াকারা চেহেরা,দেখলেই কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্চে করে।

দশ মিনিট ধরে চোখ বন্ধ করে রেখেছি।ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছে।এখন তাহলে ঝাকি খাওয়ার কথা।আরে সত্যি ঝঁকি খেলাম তবে গাড়ির নয়,কেউ মাথার চুল ধরে ঝাঁকাচ্ছে।তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসলাম।তাকিয়ে দেখি পিচ্চি মেয়েটি আমার মাথায় হাত দিয়ে ঝাঁকাচ্ছে আর মামা মামা বলছে।মহিলা মেয়েটির হাত টান দিয়ে তাকে চুপ হতে বলল।এতে কাজ হলো কিন্তুু মুখ মলিন করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

–আপনি কিছু মনে করবেন না।

–না,না। মনে করার কি আছে।ও বাচ্চা মেয়ে।

মেয়েটিকে কোলে নিলাম।

-তোমার নাম কি মামনি?

-মনিকা

-তোমার আব্বুর নাম কি?

-আব্বু।

ওর উত্তর শুনে আমি হেসে ফেললাম।সাথে মেয়েটিও হেসে ফেলল।

-আচ্ছা তুমি কবিতা বলতে পার?

-বলতে পারি না।

মহিলা আমাদের সব কথা শুনছিলেন।তিনি বললেন,

-প্রথম এক দুই লাইন বলে দিলে তারপর বলতে পারে।

মনিকা বলতো ,আতা গাছে তোঁতা পাখি…

পরেরটুকু মনিকা বলল।

অনেক সময় পাড় হয়ে গেছে।মনিকা এখনো আমার কোলে,একবারের জন্যেও ওর মায়ের কোলে যায়নি।আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।ও সারাদিন কী করে, কোথায় কোথায় ঘুরতে গেছে ,কী কী করছে তাও ইতিমধ্যে বলা হয়ে গেছে।

মহিলাটি এবার প্রশ্ন করল,আপনার মনে হয় ডিস্টার্ব হচ্ছে?

মানুষকে কী করে আপন করে নিতে হয় তা আমি ভালোই জানি।

-না,না ডিস্টার্ব হবে কেন?ভালো লাগছে।আর আপনি আমাকে আপনি করে বলছেন কেন?আমি আপনার অনেক ছোট।তাছাড়া মনিকা আমাকে মামা ডাকছে,সে হিসেবে আমরা ভাই বোন।বড় বোন ছোট ভাইকে কখন আপনি করে বলে না।

-আচ্ছা,বুঝলাম।ঢাকা কোথায় থাক?

-মহাখালী।আপনি?

-উত্তরা। তোমার নামটাই জানা হলো না।

-মেহেদী।

উত্তরা প্রায় এসে গেছে।উনি নেমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।উপর থেকে ব্যগ নিচে নামালেন।মনিকাকে তার কোলে যাওয়ার জন্য ডাকলেন।মনিকা নির্বিকারে বসে রইল।যাওয়ার কোন লক্ষন নেই।

-আমার কাছে এসো মামনি।

-না, আমি যাব না।মামার কাছেই থাকব।

-আমার এখন নামবো মামনি, এসো আমার কাছে।

-না।

সামনে না নামলে ওদের একটানে আরো সামনে নিয়ে যাবে।এই জায়গায় আবার আসতে হবে।তারমধ্যে আবার বাচ্চা আছে।মহা মুশকিল।দেখি আমার কথা শুনে কিনা।

-মামনি মার কাছে যাও।

-না,তোমার কাছে থাকব।

-তোমাদের সামনে নামতে হবে।

-আমি নামব না।

-তাহলে তোমার সাথে আর কথা বলবনা।

-কেন বলবেনা?

-তুমি যদি এখন মার কাছে না যাও।

এতে কাজ হলো।মনিকা ওর মার কাছে গেল।ওরা উত্তরা নেমে পড়ল।অবশ্য নামার আগে আমার ফোন নাম্বার নিয়ে গেলেন।

সেই দিনের পর এক মাস কেটে গেছে।এর মধ্যে একদিনও বাসা থেকে কোথাও হাঁটতে যাইনি।মনটা এমনিতেই খারাপ তার উপর শরীরও খারাপ।ভাবছি আজ হাঁটতে হাতিরজিল যাব।বাসার পিছনেই হাতিরজিল।বড়জোর পাঁচ মিনিট লাগবে অথচ যাওয়ার উপায় নেই।উঁচু দেয়াল তোলা।অাগে যাওয়া যেত দেয়াল টপকে।মানুষ এভাবে যাওয়ার কারনে দেয়াল আরো উঁচু করেছে।এখন গুলশান১ ঘুরে যেতে হবে।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়।তবে ঢাকা শহরে তেমন শীত নেই।হাতিরজিল ব্রিজ এ হাঁটছি।আজ মনে হয় শীত বেশী পড়েছে।ব্রিজ এ লোকজন মোটামুটি ভালোই।বেশির ভাগই প্রেমিক প্রেমিকাদ্বয়।হাঁটতে ভালোই লাগছে।হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো।আমাকে ফোন দেওয়ার মতো কেউ নেই।মনে হয় সিম কোম্পানি থেকে না হয় কেউ ভুল করে ফোন দিয়েছে।যে ফোন দিত তাকে অনেক আগেই ব্লাক লিস্টে ফেলে রেখেছি।

অচেনা নাম্বার।ফোন ধরলাম,

-হ্যালো

-হ্যালো,তুমি কী মেহেদী?

-হ্যা,কিন্তু আপনি কে?

-মনিকার আম্মু।

-ভালো আছেন?মনিকা ভালো আছে?

-হুম,তুমি কেমন আছ?

-ভালো।

-শোন,আজকে তোমার ভাগনির জন্ম দিন।তোমাকে আসতে হবে।আসতে বেশী সময় লাগবে না।রাত বারোটার আগে আসতে পারলেই হবে।ছোট খাটো একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। তারপর বাসার ঠিকানা বললেন।

-চেষ্টা করব।

-চেষ্টা করলে হবে না ,আসতেই হবে।

ফোন রেখে দিলাম।ভালো লাগলে যাব নয়তো একটা গিফট পাঠাবো মনেমনে ঠিক করলাম।যদি না যাই গিফট পাঠাবো কী করে।অনুষ্ঠান তো একটু পরই।

হাঠাৎ একটা মেয়ের দিকে চোখ পড়ল।আমার চোখ আপনা আপনি বড় হয়ে গেল।ক্রিম রং এর সুয়েটার পড়া,রুহি।মাথায় কয়েকটা প্রশ্ন দ্রুত খেলে গেল।ও এখানে কেন?কী করে এলো?এখানে দেখতে পাব কখনোই ভাবনি।বিয়ে হয়ে যাবার পর থেকে ওর সাথে আর দেখাই হয় নি।অব্যশ আমি ইচ্ছে করেই আর দেখা করিনি।

কোন মতেই ওর চোখের সামনে পড়া চলবে না।যাকে হারিয়েছি তাকে আর ফিরে পেতে চাই না।সে এখন পাকাপোক্ত ভাবে অন্য কারো।তার থেকে দূরে থাকাই ভালো। পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।দুই কদমও যেতে পারি নাই, পরিচিত কন্ঠস্বর ডেকে উঠল,

মেহেদী..

ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক চাইলাম।রুহির দিকে  চোখ পড়লো অবাক হওয়ার ভান করলাম।অভিনয় মনে হয় ভালো হয়নি।এগিয়ে এসে বলল,

-আমাকে দেখে চলে যাচ্ছিলে কেন?

-কই না তো।তোমাকে আমি দেখিইনি।কিন্তু তুমি এখনে?তোমার সাথে এখানে দেখা হবে ভাবতেও পারিনি।

প্রিয় মানুষগুলোর মিথ্যা কথাগুলোও সত্য মনে হয়।

ওর মুখ দেখে অবশ্য তাই মনে হলো।

-ঘুরতে এসেছি।

-একা কেন?তোমার হ্যাজবেন্ট কোথায়?

-ও কিছু দিনের জন্য অফিসের কাজে বিদেশ গেছে।

-তোমার বাসা কী আশেপাশে কোথাও?

-হুম।গুলশান ২ এ।

এরপর কী বলব মাথায় কিছুই আসছেনা।আশেপাশে যাদের দেখছি তারা ঘন্টার পর ঘন্টা কথা চালিয়ে যায় কীভাবে?

-কী ভাবছ?

-কিছুনা।

-আমাকে দেখে তুমি খুশি হওনি?

-খুশি হওয়ার কী আছে?

-ওর মুখটা কালো হয়ে গেল।  

উত্তরটা দেওয়ার পর মনে হলে এত রুক্ষ ভাষা ব্যবহার না করলেও পারতাম।

ও জিজ্ঞাসা করল,

-তুমি কী সিম বদলে ফেলছ।

-না।

-তাহলে ফোন যায় না কেন?

-তোমার নাম্বার ব্লাক লিস্টে।

-ব্লাক লিস্টে রেখেছ কেন?

-সে উত্তর দিতে আমি রাজি নই।আচ্ছা চলো একটা খেলনার দোকানে যাই।

-কেন?

-খেলনা কিনব।

-কার জন্য?

-সেটা পড়ে বলব।

-আচ্ছা চল।

রাত আটটা।রুহিকে নিয়ে একটা কফি হাউজে বসলাম।আমার হাতে একটু আগের কেনা খেলনাগুলো।কফি আর্ডার দিলাম।ওয়েটার কফি দিয়ে গেল।কফিতে চুমুক দিয়ে রুহিকে বললাম,

-আচ্ছা রুহি তুমি কী আমাকে এখন ভালোবাস?

-হুম,ভবিষত্যেও বাসব।একটুও কমবে না।

-ওখন তো তোমার কোন কাজ নেই?বাসায়ও একা তাই না?

-হুম।

-বাইরের গাড়িটা ঐইটা তোমার নিজের না?

-হুম

-আমার জন্য একটা কাজ করতে পারবে?

-তোমার জন্য অামি সব করতে পারব।

মনিকাদের বাসার ঠিকানা আর খেলনাগুলো ওর হাতে দিলাম।বললাম,

এই ঠিকানায় চলে যাও আর গিফটা দিয়ে এসো।আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি।

-তুমিও চলো…

-না।এখন উঠি।

-তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও।

-আগেরটাই আছে।

-আবার কবে দেখা করবে?

-তার দরকার নেই।হয়ত আবার এভাবে হঠাৎ দেখা হতেও পারে।    

-কোথায় থাক তা বলে যাও..

সিধান্ত নিয়ে ফেলেছি এ প্রশ্নের উত্তর দেব না।

এখন সোজা দরজার দিকে হাটা দেব,ওর দিকে একবার তাকাবও না।কারন ও এখন কী করবে আমি জানি।ও কিছুক্ষন বসে কাঁদবে। রাস্তায় বের হয়ে এলাম।ভাবছি মেয়েটা আমাকে কত ভালোবাসে আর আমি ওর সাথে শুধু অবহেলার অভিনয়ই করে গেলাম।

(সম্পূর্ন কাল্পনিক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *