আধুনিক বাংলা //   প্রিয়নীল পাল

smriti

বাড়ির পাশে অমল বাবু কিংবা পারার সুকান্ত বাবু সবাই নিজের মেয়ে বা ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে দিতে চান কিংবা দিয়ে দিয়েছেন। বাংলা মিডিয়ামে ইতিহাস ভূগোল অঙ্কের থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে হিস্ট্রি, জিয়গ্রফি, ম্যাথ এগুলোই হয়তো প্রাথমিক ভাবে বেশি কিছু বুঝিয়ে দেয় তাই হয় তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ার এত হিরিক! 

সারাদিনে সবজি থেকে চিরুনি সে যতোই বাংলার ব্যবহার হোক না কেনো বাংলাতে পড়াশোনা করে কিংবা দক্ষ হয়ে নাকি কোনো লাভ নেই। তা থাকবেই বা কেন! বঙ্কিম এর বাংলা আর মাইকেল এর বাংলা বুঝতে গিয়ে দাঁত ভাঙা আধুনিক বাঙালি মনে হয় নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে ইংলিশ বিপ্লবে নিজেদের নাম লিখিয়ে নিয়েছেন। আধুনিক বাঙালি সে তো নামেই তাদের আধুনিকতার প্রথম শর্ত হল ইংলিশ! ভারী অদ্ভূত তাই না? হবেই তো বাজারে ডিম ওয়ালা থেকে দুধ ওয়ালার সাথে যতোই পাতি বাংলায় দাম দর করা হোক না কেনো ছেলেকে মেয়েকে কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামেই পড়াতে হবে নাহলে সে কিন্তু মানুষ হতে পারবে না।

কোনো এক অজ্ঞাত মহাপুরুষ লিখে গিয়েছিলেন মানুষ হওয়ার প্রথম নিয়ম ইংলিশ আর ইংলিশ। নিজের মাতৃভাষা তো আজ বাড়ির দেয়ালে মাথা ঠোকে কিন্তু বিশেষ হল বাংলার মা যেনো আজ অতীত! বাংলার মা এখন পুরোটাই ‘মম’ কিংবা ‘মামমি’! সাধু সাধু।  এটাই তো আমরা বাঙালি। আদর্শ সচেতন বাঙালি। 

রবি ঠাকুর কি ভাষা তে সাহিত্য রচনা করেছেন সেটা বড় বিষয় নয় আমরা বাঙালি হয়েও সেই লেখার ইংরেজী অনুবাদ পড়ব এটাই আদর্শ, এটাই নাকি আধুনিকতা! 

এত কিছুর পরে নিজেকে বাঙালি বলার দরকার কি পরে নিজেকে ইংরেলি বললেও তো হয় সেটাই বরং বেশি স্মার্ট দেখাবে। 

আজ কাল ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ আর ‘I love u’ এর যুদ্ধ শেষ কারণ কোন সেই অতীতে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে যতোই আমরা ‘ভালোবেসে সখী’ গান শুনি বলার সময়ে I love u ছাড়া কিছু বেরোয় না, হয়তো সময় বেঁচে যায় কিংবা এতে ভালোবাসা বেশি মধুর হয়। নিশ্চয়ই কোনো কারণ তো থাকবেই নাহলে বাঙালি তো আর অশিক্ষিত নয় কি বলেন!! 

বাংলার সাহিত্য আজ অনেক মার্কেট লো, তাই বাজার চরা এখন ইংরেজী সাহিত্য, মানলাম অনেক লেখক আছে বাংলা থেকেই বিশ্ব সাহিত্য কে সমৃদ্ধ করেছেন কিন্তু আমাদের ইংরেজী টাই চাই কারণ বাঙালির কাছে উপন্যাস এর থেকে নভেল এর গুরুত্ব বেশি। 

বাংলা মিডিয়াম স্কুল এ আমরা ছেলে পাঠাবো না বাংলা মিডিয়ামে নাকি পড়াশোনা হয় না বাংলায় পরে কিছু করা যায় না কিন্তু চাকরির বেলায় সেই বাংলা মিডিয়া স্কুলের দিকেই তাকিয়ে থাকে বাঙালি। বাংলা অল্প একটু আধটু বলতে পারলেই হলো ইংলিশ টা যেন মাখো মাখো হয়, সে বাঙালি হয়ে নিজের মাতৃভাষা তে দুর্বল হলে ক্ষতি নেই লজ্জা নেই কিন্তু ইংলিশ একটু বেলাইন হলেই সেটা নাকি চরম লজ্জা! 

সত্যিই বাঙালি আজ বাংলা বোঝে। 

আমরা রবীন্দ্রনাথ থেকে সুকান্ত রাস্তার নাম থেকে স্কুল কলেজে মূর্তি সব কিছুই করে দিয়েছি কিন্তু তাদের সৃষ্টির স্রোত বাংলা ভাষা সেটাকেই দূরে সরাতে বেশি সময় লাগাই নি। এটাই আধুনিক বাঙালি এখানেই বাঙলার আধুনিকতা। 

সম্পূর্ন বাংলা ভাষা তে কথা বলা কিংবা লেখা কোনো ভাবেই সমাজ এখন মেনে নেবে না আসলে মানতে চায় না তাই আমাদের মতোন মানুষ থেকে লেখক দের বাজার চালাতে ইংরেজির সাথে সাথে বাঙলা মিশিয়ে বাংলা লেখা লিখতে হয় সেটাই নাকি বিপ্লব সাহিত্য! এখানেই বাংলা ভাষাকে আমরা চেপে ধরে রেখেছি কোনো ভাবেই তাকে আর পাখা মেলে উড়তে দেওয়া হবে না, তুমি ইংরেজির পিঠে চেপে ঘোড়া ঘোড়া খেলো সেটাই আধুনিক বাঙালির গর্ব ।

বাঙালি এখন দরখাস্ত লেখে না কারণ নতুন সংবিধান সংশোধন হয়ে বলা হয়েছে আর দরখাস্তে কাজ হবে না তাই বাঙালি আজ অফিসে অ্যাপ্লিকেশন জমা দেন, কি করবেন বলুন তাদের তো নিজেদের কাজ টা করাতে হবে শুধু বাংলা বাংলা করে লাফালাফি করলেই তো আর হবে না। 

সেরকমই বাঙালি এখন মুরগির ঝোল খাওয়া ভুলে গিয়েছেন এখন ওনারা চিকেন কারি খান। 

বাংলা ভাষা কিন্তু চারিদিকে খুব উন্নত,খাতা কলম থেকে টেক্সট বুক, পেন বহু কাল আগেই হয়েছিল, সেটাই কতটা প্রভাব পড়া শুরু হয়েছিল ঠিক বলতে পারবো না কিন্তু বর্তমানে ইংলিশ যদি কোনো কারণে না বলা যায় তাহলে কিন্তু সমাজ আপনাকে এক ঘরে করে দিতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা বোধ করবে না তাই ব্যাগডেটেড বাংলা ছেড়ে আধুনিক বাংলা ধরে ফেলুন নাহলে এই সব আধুনিকতা ছেড়ে বাংলার ঐতিহ্য বাজায় রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: