আবৃত্তিকারের বােধ থাকতে হবে – ঊর্মিমালা বসু

sahityasmriti

গানটা এরকম, ‘আজ খেলা ভাঙার খেলা খেলবি আয়,

সুখের বাসা ভেঙে ফেলবি আয়।। মঞ্চে উপবিষ্ট গাইয়ে মহিলা গাইবেন,

আইজ খেলা ভাঙ্গার খেলা, খেলবি আয় সুখের বাসা ভেঙ্গে ফেলবি আয়, আয়।।

কানে লাগলাে আইজ, ভাঙ্গা আর সুখের উচ্চারণে ভুল। কবিগুরুর গানের শব্দের কী বিকৃতি। এঁরা আবার নিজেদের শিল্পী মনে করেন। আমি কিন্তু আজও নিজেকে শিল্পী বলে মনে করি না। কেউ যদি আমাকে শিল্পী বলেও থাকেন আমি লজ্জা পাই। কেন জানেন ? তার কারণ শিল্পী সবাই হতে পারে না। শিল্পী হবেন শিল্পের জন্য পাগল। অন্য কোনাে জড়তা তার মধ্যে থাকবে না। থাকবে না অন্য কোনাে আকর্ষণ।

কিন্তু আমরা কি এরকম হতে পারি। দৈনন্দিন কাজকর্ম, চাহিদা, দেনা-পাওনার মধ্যেই হারিয়ে ফেলি সেই অনাবিল সৃষ্টিকে। যাকে পেতে অনেক কিছুই হারাতে হয়। সেই হারানােটা আমরা সচরাচর পারি না হারাতে। আমার এটা ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়। আমার এ ধারণা, মনােভাবকে কেউ উপেক্ষা করতেই পারেন। কিন্তু আমি এ ধারণাকেই আঁকড়ে ধরেছি। ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে চাই।

আর ধরে রাখার মধ্যে চাই কিছু সংস্কৃতি সম্পন্ন মানসিকতা। আমি নিজের জন্য কবিতা পাঠ করি। সম্পূর্ণ নিজের জন্য। হ্যা, হয়তাে আমার বাচনভঙ্গি, পঠন পদ্ধতি কারাের কারাের ভালে লাগে, তার প্রশংসা করেন। ভালাে লাগে। আর আমার মনে হয় এইটুকু পাওনা। বােধহয় এ ভাগ্যও সবার কপালে জোটে না। তাই যেটুকু বলব স্পষ্ট শুদ্ধভাবে বলব। নচেৎ বলাটাই সার। আমার কথা আদ্যোপান্ত কেউ কিছুই বুঝবে না। প্রথমেই আমি যে গানের কথা উল্লেখ করলাম,এরকম উচ্চারণে সামান্য চর্চা করেন যে মানুষ তারও অস্বস্তি হবে।

দেখবেন যে মানুষ খুব কথা বলেন, তাদের স্বাভাবিক কারণেই আমরা আমাদের অজান্তেই একটু এড়িয়ে চলি। আবার আমরাই এঁদের জলি খেতাব দিই। এখানে প্রশ্নটা হল অযথা কথা বলা, কারণে-অকারণে বকবক আমরা পছন্দ করি না। ঠিক সেরকমই আপনি যা বলছেন, গাইছেন সেটাকে শ্রুতিমধুর করে তুলতে হবে। নচেৎ ওই এড়িয়ে যাওয়াই সার।

আমি নিজে আবৃত্তি করি। ভালাে কবিতা শুনতেও চাই। আর এখানে যখন আবৃত্তিচর্চা নিয়েই কথা বলছি, সেখানে প্রথম না হলেও দ্বিতীয় সারিতে উচ্চারণকে রাখতেই হবে। যিনি কবিতা পাঠ করছেন, তাঁর গলার মধ্যে সেই ভাব আনতে হবে যা কবি চান। আর সঙ্গে চাই স্পষ্ট প্রত্যেকটা শব্দ উচ্চারণ। সম্প্রতি আমি একটি কবিতা পাঠের আসরে গিয়েছিলাম। গুরুমন্দ্রিত  স্বরে এক ব্যক্তি কবিতা পাঠ করছেন। তিনি নিঃসংকোচে ভাষাকে বাসা চলে চললেন। ভালাে লাগাকে বিকৃত করে উচ্চারণ করলেন। আশ্চর্য, কেউ কোনাে প্রতিবাদ করলেনই না। তাই বক্তারও ভুল শুধরােলাে না।

উচ্চারণের ক্ষেত্রে সবারই উচিত অত্যন্ত সজাগ হওয়া। এমনভাবে যে কোনাে কথা বলতে হবে যাতে সেটা কোণে সবার শেষের সিটে বসা মানুষটির কানেও পৌঁছয়। আবার অনেক সময় অনেক শিল্পীরই টেল ড্রপ হয়ে যায়। সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত। কারণ টেল ড্রপ হওয়াটা মনােযােগী হতে বাধা দেয়। তাই সজাগ হয়ে কবিতা পাঠ করতে হয়। অনেকে এত ছােট ছােট ব্যাপারগুলােকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু আমি মনে করি, এ ব্যাপারগুলােকে নিখুঁত করে ধরতে হয়।

কারণ আপনার প্রেজেন্টেশান বা উপস্থাপনা আকর্ষণীয় করে তুলতে উচ্চারণের একটা ভূমিকা আছে। যদি কোনাে শব্দের মাথার ওপর রেফ থাকে যেমন ধরুন সর্বনাশ। কিন্তু বাস্তবিক চলতি কথায় আমরা বলি সরবােনাশ। তাহলে বুঝতে পাচ্ছেন, উচ্চারণগত ভুল কতটা হয়। আবার অনেক সময় রেফ-এর মান ঠিক করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ধরুন যে শব্দটার ওপর রেফ আছে, আমরা তার ওপর রেফ না দিয়ে তার পাশের শব্দে রেফ ব্যবহার করে ফেলি। এটা তাে ভুল। আর যে শব্দের ওপর রেফ থাকবে, সেই শব্দটা জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। এ দিকটা লক্ষ্য করতে হবে যে-কোনাে আবৃত্তি-শিক্ষার্থীকে।

তারপর ধরুন কমা (,)-র ব্যবহার। কমা অতিশয় স্বল্পকালব্যাপী বিরতির চিহ্ন। একই বাক্যের একাধিক অংশের মধ্যে যখন সামান্য সময়ের জন্য থেমে থাকার দরকার, তখন এই বাক্য ব্যবহার করা হয়। এবার যিনি কবিতা পড়ছেন, আবৃত্তি করছেন, তাঁকে ওই জায়গাটা ফঁক রাখতেই হবে। তিনি কখনই ওইটুকু একটা চিহ্নকে অবহেলা করতে পারবেন না।

“একা দেখি কুলবধূ, কে বটে আপনি?” – এই যে কুলবধূ বলে একটা স্ট্রোক, এটা দিতেই হবে। নচেৎ ছন্দপতন।এবার ধরা যাক সেমিকোলন (;) এই চিহ্নটি যে বিরামকাল নির্দেশ করে, তা আবার কমার চেয়ে কিছুটা বেশি। সেটাও আবৃত্তিকারকেবুঝেনিতে হবে।এইদিকগুলাের গুরুত্ব বুঝতে হবে। দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ। এখানে আবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পষ্ট উচ্চারণের সঙ্গে চিহ্নর সংযােগ ঘটানােই কোনাে একজন সফল আবৃত্তিকারের পক্ষেই সম্ভব।

সঠিক শব্দের প্রয়ােগ সঠিকভাবে করা।‘আমি যাব। এই দুটো শব্দকে অনেকভাবে বলা যায়। কিন্তু কবিতা বলার সময় বুঝতে হবে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে এটা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি ও লেখনি কী বলছে।তরেই সেই দুটো শব্দ সেইভাবে উচ্চারিত হবে। মানে আমি বলতে চাইছি সঠিক শব্দক্ষেপণ জানা দরকার। জানি এগুলাে একদিনে হয় না।

কিন্তু যেহেতু শিক্ষার্থীদের ব্যাপার, সেহেতু শব্দক্ষেপণ জানা দরকার।জানি এগুলাে একদিনে হয়না। কিন্তু যেহেতুশিক্ষার্থীদের ব্যাপার, সেহেতু প্রথম থেকেই ব্যাপারগুলাের দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। নচেৎ প্র্যাকটিস থাকবে গ। যাই হােক, আরাে একটা ব্যাপার, সেটা হল ভাষার ভুল ধরা। ধরুন ছাপার ভুলের জন্য

শব্দের মানেই বদলে গেল, কেমন একটু বলি, কোথাও আছে তুমি খেয়াে’,এবার ছাপার * হল ‘খাও’ কোথায় খাও হবে আর কোথায় খেয়াে হবে এটা যিনি আবৃত্তি করছেন তাকে ৩হবে। এই যে জানার প্রয়াস এটা দরকার। শব্দ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে, পড়াশুনাে ফলে কখনই প্রকৃত শিক্ষার্থী হয়ে ওঠা যায় না। এই ব্যাপারটাও আয়ত্ত করা দরকার।

এবার যেটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সেটা বলব। একজন ভালাে আবৃত্তিকারের। বােধ থাকা দরকার। আমি কী বলছি, কী পড়ছি এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার তার কাছে। শুধু তাই , যেটা বলছি সেটা আমি নিজে বুঝেছি তাে! একটা বই খুললাম, গড়গড় করে মুখস্থ করলাম আর ঝরঝরে করে পড়ে ফেললাম। কী হল? ওই নুনবিহীন খাবার হবে।

কিন্তু আমার যদি বােধটা থাকে তবে আমার মধ্যে সেইভাবটা জাগবে। আর ভাব জাগানােটাই তাে শিল্পীর বিশেষত্ব। উপস্থাপনার জোরেই দর্শক শ্রোতা বসে থাকবে আপনার কথা শােনার জন্য। এটাইপ্রধানভাবে দরকার। যে ভাষায় আমি কথা বলছি, কবিতা পড়ছি, সেই ভাষাটাকে ভালাে করে জানতে হবে। আধখেচড়াভাবে জেনে বলে এলে হবে না।

যা বলব সেটা আমার কাছে স্পষ্ট হতে হবে। তবেই আমি আরেকজনকে বােঝাতে পারব। তাই আমি নতুনদের বলব, যে যে ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ সেই ভাষাটাকেই সম্যকভাবে জানার চেষ্টা করতে হবে। তবেই ভালাে করে কবিতাটা বােঝা যাবে। জানবেন,কবিরভাবে থাকবে আবৃত্তিকারেরঅনুভাবন।তবেই সেইশব্দ বা সেই পাঠ কবিতাকে বিশেষ মাত্রা দেবে। আবার কবি যে শব্দ বা ভাব বােঝাতে চেয়েছেন, সেটার সঠিক প্রয়ােগ দরকার।

কবিতার ভাব, স্বর যে কোনাে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। আমি কবিতা পাঠ করি বলেই যে সদা মেঘমন্দ্রতন্দ্রে কথা বলব তা তাে হয় না। এটা ঠিকও নয়। বিষয় অনুযায়ী আপনাকে গলার স্বরের বৈভিন্নতা আনার পদ্ধতি করায়ত্ত করতে হবে। এটা যে প্রকৃত আবৃত্তিকে ভালবাসবে তার মধ্যেই দেখা যাবে। নিজেকে বােঝার, নিজের ভাষা উচ্চারণ করার কৌশল থাকে না, ঠিক সেইরকমভাবে কথা বলাটা অঙ্গের ভূষণ করে নিতে হবে, তবেই জীবনে ভাল আবৃত্তিকার হওয়া সম্ভব।

মেয়ের মতােকণ্ঠ আপনার কথা শুনবে এমনভাবে তৈরি করতে হয়। এটা একদিনে হয় না, দীর্ঘদিনের সাধনার ফসল। তাই দেরি না করে, যদি সত্যিই আপনি আবৃত্তিকার হিসেবে নিজের কাছে নিজে উপস্থাপিত হতে চান তবে আজ থেকেই এভাবে নিজেকে গড়ে তুলুন। জানবেন, সবাই বিখ্যাত হতে পারেন না। তাতে দুঃখ করে লাভ নেই।

পারফেকশনও কিন্তু আবার সবার থাকে না, কারণ এটা দীর্ঘ সাধনার সিদ্ধিলাভ।নামী, বিখ্যাত শিল্পীদেরও প্রায়ই দেখা। যায় বহুক্ষেত্রে তারা পারফেকশনিস্ট হতে পারছেন না। এগুলােকে খেয়াল রাখা দরকার। সুতরাং আমি কী হতে পারলাম না এ দুঃখ করে লাভ নেই। আমি কী হতে চাই সেটাই যেন আমার কাছে। বড় হয়ে দাঁড়ায়। আর শিল্প-সৃষ্টিতে কখনও পরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে চলতে নেই। আপনার। ভাললাগা আপনার দায় নয়। সেটাই আপনার ভালবাসা। তাই তাকে ভালাবাসার মতাে উপযুক্ত করে তুলুন। সেটাই যেন হয়ে ওঠে আপনার গর্ব।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী // যোগাযোগ : ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *