আবৃত্তিতে চিত্রকল্প – সুমন্ত্র সেনগুপ্ত

sahityasmriti.com

যে মানুষ গান করেন, অভিনয় করেন, ছবি আঁকেন, আবৃত্তি করেন, কিংবা সেতার, সরােদ, বেহালা বা পিয়ানােতে সুর তােলেন অথবা যাঁর ছেনি, বাটালি, হাতুড়ির আঘাত পাথরে, মাটিতে রূপাের ফুল’তােলে তারা প্রত্যেকেই শ্রোতা ও দর্শকের কাছে ছবি তৈরি করেন। সেই ছবি সমস্ত ইন্দ্রিয় দ্বারা মনে প্রকাশ করে। মন তার চেতনা, মনন, বােধ ও দর্শন দিয়ে সেই ছবিকে লালন করে। আসলে সারাটা জীবন পরিক্রমা তাে আনন্দ আহরণের জন্য, কল্পনায় জারিত সেই ছবি মানুষকে আনন্দ দেয়।

যিনি তাঁর নিজের শিল্প মাধ্যম দিয়ে ছবি তৈরি করে, তিনি যেমন আনন্দ পান যিনি গ্রহণ করেন তিনিও আনন্দ পান। কল্পনায় কোন ছবি তৈরি না হলে তাকে অনুসরণ করা যায় না। শ্রোতা বা দর্শকতার কল্পনার পটে নেশার বরণে রসের তুলি’দিয়ে সেই ছবি তৈরি করে, তার সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে নেয়।

ক্ষণিকের আনন্দকে চিরায়ত করার নাম যদি শিল্প হয়, তবে বলা যায় ক্ষণিকের পাওয়া সেই আনন্দ মনের নিভৃত কোনাে অ্যালবামে চিরস্থায়ী ছবি রেখে যায়। দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে যখন শুনি “আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ…..”তখন শিল্পীর কণ্ঠ-সুর-গায়কী গানের বাণীকে আমাদের সামনে মূর্ত করে তােলে নিজের অস্তিত্ব নিজের অবস্থান, অসীম নীল আকাশের নীচে আদিগন্ত বীজময় পৃথিবী আমাদের বিস্মিত করে,

– এও তাে এক ছবি, বাণী সুর গায়কীর মূৰ্ছনা আমাদের কল্পলায় যে ছবি তৈরী করে তাতে আমরা প্লাবিত হই, ভেসে যাই এক আশ্রয় থেকে আর এক আশ্রয়ে।বার বার শুনতে ইচ্ছা করে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে ছবি হয়ে ফুটে ওঠেআমাদের চোখের সামনে। আরও পরিস্কার করে বললে বলা যায় চোখে নয় মনের মাঝারে। এইরকম আরও অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায় অধিকাংশ তােমরাও জানাে।

আমরা যারা একটু আধটু আবৃত্তি করার চেষ্টা করে থাকি, তাদের অভিজ্ঞতায় আবৃত্তিতে এইরকম অনেক ছবি তৈরি হতে দেখি, না হলে ক্ষণিকের আনন্দ চিরায়ত হবে কি করে? প্রয়াত শিল্পী শম্ভু মিত্র যখন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র-র ‘মধুবংশীর  গলি’ কবিতায় উচ্চারণ করতেন “কাউকে তাে দেখিনা বেশ বলিষ্ঠ হেসে/ জীবনের দ্বিধান্বিত মুঠোয়/ শক্ত করে চাপ দিয়ে ধরে/ পৃথিবীর কঠিন জাগ্রত পিঠের ওপর/ চলে ফিরে বেড়ায়”তখন“কাউকে তাে দেখি না” থেকে “পিঠের ওপর” যে গতিতে বলতেন তার থেকে অনেক দ্রুত গতিতে “চলে ফিরে বেড়ায়” উচ্চারণ . করতেন, এর ফলে আজীবন নেতৃত্বহীন মানুষের উদ্দেশ্যহীন ছুটে চলার এক অমােঘ ছবি আমাদের চেতনায় প্রতিভাত হয়।

কিংবা ধরা যাক জীবনানন্দ দাশের বােধ। “আমি চলি সাথে সাথে সেও চলে আসে, আমি থামি সেও থেমে যায়।” “আমি চলি” থেকে “চলে আসে” পর্যন্ত ক্রমশ কণ্ঠস্বরের তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি করে ও গতি বাড়িয়ে উচ্চারণ করার পর“আমি থামি সেও থেমে যায় পঙক্তিতে গতি ও তীক্ষ্ণতা ক্রমশ কমতে থাকে শম্ভু মিত্রের উচ্চারণে।

তখন মাথার ভিতরে স্বপ্ন -শান্তি – প্রেম সমস্ত তুচ্ছ হয়ে অন্যতম  কোনাে বােধের ছবি তৈরি করে নাকি? অথবা রবীন্দ্রনাথ” ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’কবিতার প্রদীপ ঘােষ যখন উচ্চারণ করেন“জল শুধু জল দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল” তখন প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত সমস্ত দর্শকের অস্তিত্ব মুছে গিয়ে অসীম জলরাশির ছলচ্ছল শব্দ নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় না কি?

এখন প্রশ্ন হল এটা সম্ভব হয় কি করে? কোন্ জাদুর স্পর্শে কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত শব্দতরঙ্গ শ্রোতার মনােজগতে ছবি তৈরি করে, কল্পনায় স্থান পাওয়া চিত্র স্থায়ী ভাবে থেকে যায় তার নিজস্ব মনােভূমে?

কবিতা সাহিত্যের সেরা সৃষ্টি ! কবিও তার লেখায় ছবি তৈরি করেন, কখনও সে ছবি বিমূর্ত কখনও মূর্ত কখনও তা জল রঙে আঁকা কখনও বা তেল রঙে হয়ত বা কখনও পেন্সিল স্কেচে। শিল্প যেহেতু (a+b)2 -এর সূত্র নয় (যেদিক থেকে দেখ একই তার অর্থ) এক এক কোন থেকে ছিটকে ছিটকে পড়ে এক এক ধরণের আলাে।

আবৃত্তিশিল্পী তার মনন-চেতনা-বােধ দিয়ে সেই আলাের রস-রূপ-গন্ধ আহরণ করে নিজের ভিতর তার এক ছবি তৈরি করে। এইবার সেই ছবি পৌছে দিতে হবে দর্শকের বা শ্রোতার কাছে। এই যে আর এক ছবি তৈরি হল তখনই শিল্পীর হৃদয়ে শিল্পের জন্ম হ’ল। এইবার আবৃত্তির প্রকরণে তাকে জারিত করে চিত্রকল্প তৈরি করতে হবে। সহজভাবে কথাগুলাে লেখা গেলেও কল্পনায় ছবিটি ফুটিয়ে তােলা অত্যন্ত দূরুহ। ব্যাপার।

কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে, প্রতিটি শব্দের নিজস্ব নিজস্ব ওজন আছে, আবরণ আছে, ব্যঞ্জনা আছে, গতি আছে, গুরুত্ব আছে। আবৃত্তি করার সময় প্রতিটি শব্দ নিয়ে ভাবতে হবে আবৃত্তি-শিল্পীকে। উচ্চারণ করতে হবে নিজস্ব অনুভবে, ভাবতে হবে কোন শব্দের কি গুরুত্ব, কোন শব্দ কোন ইঙ্গিত বহন করছে। এই অনুভবের উচ্চারণে দেখা যাবে আবৃত্তি শিল্পীর মনের ভিতর রাখাছবিটা কণ্ঠের উত্তাপেকণ্ঠের আলপনায় পৌঁছে যাচ্ছে শ্রোতার গভীরে।

আবৃত্তিশিল্পীকে শিখে নিতে হবে স্বরের সঠিক স্থাপত্য, ছন্দজ্ঞান, উচ্চারণ ব্যঞ্জনা, অভিব্যক্তি প্রকাশের সমস্ত রকম পদ্ধতি প্রকরণ, এবং অবশ্যই জেনে নিতে হবে সময়কে-সমাজকে-ইতিহাসকে। পাঠক হিসাবে কোনাে কবিতা বা গদ্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মধ্যে থেকে একটা ছবি ক্রমশ imarge করতে থাকে,

সে তার শব্দবন্ধনীর জন্য হােক, ছন্দের দোলার জন্য হােক অথবা গভীর কোনাে অনুভূতির প্রকাশের জন্য হােক। ধরা যাক অনিতা অগ্নিহােত্রীর ‘সুখের দিন’কবিতাটার কথা, একদিকেনষ্টালজিক ছেলেবেলার কথা, চারিদিকে প্রাণ আর স্পন্দনের কথা অন্য দিকে সর্বগ্রাসী বিচ্ছিন্নতার কথা, ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্কের কথা যা খুব দ্রুত গতিতে প্রবেশ করছে আমাদের রক্তে মিশে যাচ্ছে শ্বেত আর লােহিতে। কবিতাটি শুরু হচ্ছে এই ভাবে,

“আমাদেরও সুখের দিন ছিল ।

শীতের রােদ ছিল আর লাল উলের বল

কালাে বেড়াল ছানা সেই বল নিয়ে ছুটে বাগানে নেমে যেত

মা চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন, তার কোল থেকে

খসে পড়ত কল্কা পাড় শাল। আর সেই সময় কড়া নড়ত বাবা ফিরতেন

গায়ে দেশ জয়ের গন্ধ, হাতের ব্যাগ থেকে কোনওদিন  

কবিরাজি কাটলেট বের হয়ে আসত  কোনওদিন ভিজে জামরুল।”

এখন যাদের বয়স চল্লিশ বা তার থেকে বেশী তাদের অধিকাংশরই শৈশবের ছবি ধরা আছে পঙক্তিগুলাের মধ্যে, তফাৎহয়ত উনিশ-বিশ। ভেবে নিতে হবে যে ছবি এইবার উপরের পঙক্তিগুলাের উচ্চারণে তৈরী হবে তার সঙ্গে যেন ঐ মধ্যবয়সী শ্রোতার নিজেদের মেলাতে পারেন, সমস্ত অভিব্যক্তিতে যেন ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলাের স্মৃতি।

কবিতাটি শেষ হচ্ছে এই ভবে,

“আমরা দেশ দেশান্তর ঘুরছি

একছিটে জমি আর একফালি বাড়ির জন্য

হাতে পায়ে ধরছি ভিন গ্রহের দালালদের।

মাঝে মাঝে ইষ্টিশনে দেখা হয়ে যায়

আমার সঙ্গে বড়দির

রাঙার সঙ্গে মেজদার

কেউ আপ ট্রেন ধরছে কেউ ডাউন ট্রেন,

ষ্টেশনে ঠা ঠা রােদ তারমধ্যে বাতি বুড়াে

ঘষা কাচ মুছে যাচ্ছে লণ্ঠনের

ট্রেনের শব্দ এগিয়ে আসতে থাকলে

আমরা এ ওকে বলি, হ্যা আমাদেরওতাে

সুখের দিন ছিল

সুখের দিন। চাকার ঝক্ঝক্ শব্দ পাশে পাশে হাটে, বলে

সুখের দিন ছিল হাঁ

ছিল দিন সুখের।”

এই যে একটা গতির আর দিকের পরিবর্তন ঘটল কবিতায় সেটি বুঝে নিতে হবে ঠিক ঠিক। এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অথচ প্রবল ভাবে ফিরে আসার ইচ্ছে তার যে হাহাকার, কণ্ঠস্বরের সঠিক স্থাপত্যে তার ছবি আঁকতে হবে শ্রোতার মনে।

যে যার পরিধিতে নিরন্তর ঘুরে চলেছে, পরস্পরের সঙ্গে দ্রুত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ছুটে চলা ট্রেনের ধ্বনির সঙ্গে“সুখের দিন ছিল হা/ ছিল দিন সুখের”ছদ প্রবাহ মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়, এবং বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ মিলিয়ে যেতে যেতে সমগ্র বিশ্বকে যেন গ্রাস করে।

একজন চিত্রশিল্পী পেন্সিল, তুলি, রঙ দিয়ে সাদা কাগজে ছবি তৈরি করেন, সেগুলাে তার উপাদান, ছবি আঁকার উপাদান, সেইরকম আবৃত্তিতে চিত্রকল্প তৈরির উপাদান, স্বর, উচ্চারণ, ব্যঞ্জনা, যতি জ্ঞান ছন্দ জ্ঞান ও অভিব্যক্তি প্রকাশের কলাকৌশল। আর এর সঙ্গে তাে অবশ্যই জড়িয়ে আছে শিল্পীর চেতনা বােধ ও মনন।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী // যোগাযোগ : (৯১) ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: