আবৃত্তি শিল্পী শ্রী উৎপল কুণ্ড ‍ু

dance-2.jpeg

দূর থেকে শেখা

শম্ভ ‍ু মিত্রের একটা লেখায় পড়েছিলাম, তার অভিনয় জীবনের প্রথম দিকে বা সেভাবে অভিনয়শুরু করারও আগে, গলা উচ্চারণ এসব তৈরি করার জন্য তিনি প্রতিদিনই আবৃত্তি করতেন। সেখানে আরও একটা ভীষণ জরুরী কথা ছিল যে , অসুস্থতা বা তেমন কোনও জরুরী কাজ (যা এড়ানাে যায়নি), এরকম কোনও বিশেষ কারণ ছাড়া সেই অভ্যাস কোনওদিন বন্ধ থাকত না। এই কথাগুলাে কোনও একটা আলোচনা সভায় তার মুখ থেকে শুনেছিলাম। এই উন্মােচন আমার সারাজীবনের শিল্পচর্চার বীজমন্ত্র হয়ে রয়ে গেল। এ কথা জানার আগেও রােজ রাত্রে পড়াশুনাের শেষে চিৎকার করে আবৃত্তি করাটা আমার কাছে মুক্তি খোঁজার মতাে ব্যাপার ছিল।  সেজন্য পাড়ার লােকে খোঁজ খবর করতে শুরু করেছিল। আমার মাথায় কোনও গােলমাল দেখা দিয়েছে কি না। আজ পর্যন্ত, জ্ঞানত, আমি এই নিয়মানুবর্তিতাকে কখনও লঙঘন করিনি। শুনেছি দীক্ষা নিলে গুরু কানেকানে একটা মন্ত্র দিয়ে দেন। সেটা রােজ জপ করতে হয়। আমি কখনও শম্ভু মিত্রের নিকট সান্নিধ্যে যাইনি। কিন্তু এই মন্ত্রের সাধনই আমার সমস্ত সাফল্যের চাবিকাঠি। সেই অর্থে , সেই প্রেক্ষিতে তিনি আমার দীক্ষাগুরু। শম্ভু মিত্রের অভিনয়, আবৃত্তি, বহুরূপীর মতাে একটা দলগঠন, তার শৃঙ্খলা ও অনুশীলন, শিল্পকলা সম্বন্ধে তার নানা ভাবনাচিন্তা, সব কিছু থেকেই নানা সময়ে নানা শিক্ষা ও প্রেরণা পেয়েছি। ছন্দনীড় আবৃত্তি সংস্থা গঠন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বহুরূপীর অনুশীলন, নিয়মাবর্তিতা ও কার্যপ্রণালী আমাদের কাছে আদর্শস্বরূপ ছিল। যদিও কর্মক্ষেত্রে তার ভগ্নাংশমাত্রই প্রতিফলিত করা গিয়েছিল। সেইসব দূর থেকে দেখে শুনে শেখার দু-চারটে গল্প করা এই লেখার উদ্দেশ্য। আবৃত্তি কী করে একটা নান্দনিক মাত্রা পেতে পারে, এইসব চিন্তাভাবনা যখন আমার মধ্যে উঁকি মারছে, আর বিভিন্ন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক এ অধ্যাপকদের লেখায় বা বক্তৃতায় জানছি যে কবির ভাবনাটাকে, মানসিকতাকে, কবিতা রচনার প্রেক্ষাপটে খুঁজে ও বুঝে নেওয়াই উপায়, এমনকী আবৃত্তিটা ঠিক হচ্ছে কিনা সেটাও জীবিত কবির কাছে গিয়ে তাকে শুনিয়ে আসা বা তার পরামর্শগ্রহণ করাটাই ঠিক পথ বল নির্দেশ দিচ্ছেন কোন কোন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাম্প্রতিক আবৃত্তিশিল্পী এবং আমি বা আমার মতাে অনেকে সেই পথকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে তেমন প্রচারও শুরু করে। দিয়েছি, সেই সময় রবীন্দ্রসদন আয়ােজিত এক আলােচনা সভায় আমাদের প্রায় চমকে দিয়ে শম্ভু মিত্র বলেছিলেন, শেক্সপিয়র কবে কীভাবে কী পরিস্থিতিতে একটা কথা লিখেছিলেন, সেটা কোনও জরুরী ব্যাপারই নয় আবৃত্তির ক্ষেত্রে, জরুরী হল, আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমি কেন সেই কথাগুলাে উচ্চারণ করার প্রয়ােজন অনুভব করছি। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন কথাগুলাে। বলাবাহুল্য মগজভর্তি সাহিত্যতত্ত্বের পুরােনাে বুলি নিয়ে, সেদিন মেনে নিতে পরিনি ওই নতুন তত্ত্ব। তবে কি কবি কেউ নন? তার ভাবনা তার অনুভব এসব তবে কোথায় থাকবে ? এই ছিল শুরু আমার আর একতীর্থযাত্রার। কোথায় কীভাবে পাওয়া যাবে এই দ্বন্দ্বের নিরসন? ওই  কথা শােনার আগে আমার কাছে যা ছিল আবৃত্তির শিল্প, জানার পরে তা আর সন্দেহের উর্দ্ধে রইল না।

Utpal Sir.png

তারপর অনেকগুলাে মাস বছর নিয়ােজিত রইল এইসব অনুসন্ধানে, শিল্পতত্ত্ব কি, কাকে বলে শিল্প, দেশ ও বিদেশের শিল্পতাত্ত্বিকরা কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন নানা শিল্পকে,কী বলেছেন চিত্রকর, কী বলছেন সঙ্গীতকার, কীভাবে শিল্পে রসসঞ্চার করছেন ভাস্কর, নাট্য বা চলচ্চিত্রের মতাে সাহিত্যনির্ভর শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে সেই শিল্পের সঙ্গীদের ভাবনাচিন্তা কতটা প্রতিফলিত হয়, নৃত্যকলায়ই বা স্রষ্টার ভূমিকা কি, ইত্যাদি। এ এক দাহ, দাউ দাউ জ্বলছে আমার ভিতরে, খুঁজে বেড়াতে বাধ্য করেছে আবৃত্তি শিল্পের মূল তত্ত্ব। সেই অগ্নৎপাতের প্রথম স্ফুলিঙ্গটি শ্রী মিত্রেই দান। ক্রমশ যখন এই সত্যে পৌছেছি যে, কোনও প্রয়ােগশিল্পের , ইংরাজিতে যাকে ‘পারফর্মিং আর্ট’ বলে, তত্ত্ব উদ্ধার করতে হয়। প্রয়ােগশিল্পীকেই, তার অভিজ্ঞতা কেউ সেই তত্ত্ব নিরূপণ করে দিতে পারেন না, তখন আর বুঝতে অসুবিধে হয়নি, শম্ভ ‍ু মিত্রের উক্তির সারবত্তা। বেশ কয়েকবছর পরে, শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি শােনার একটি ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গেল, তার তত্ত্ব আর প্রয়ােগ পরস্পরের পরিপূরক। এ গল্প আমি অনেকবার অনেক লেখায় ও বলায় করেছি। কয়েকটা নাট্যদলমিলে মুদ্রারাক্ষস’ অভিনয়ের  আয়ােজন হয়েছিল। যেখানে মূল চরিত্র ‘চাণক্য’র ভূমিকায় অভিনয় করেছিলনে শম্ভ মিত্র। নাটকের শেষে যখন সকলে একসঙ্গে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন, শ্রোতাদের মধ্য থেকে অনুরােধ এল একটা আবৃত্তি করার জন্য। মঞ্চের সামনে দিকে দু-পা এগিয়ে এসে তিনি আবৃত্তি করলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা :

অনেক হল দেরি।

আজও তবু দীর্ঘপথের অন্ত নাহি হেরি।

তখন ছিলদখিন-হাওয়া    আঘুমাে আজাগা

তখন ছিল সর্ষে ক্ষেতে    ফুলের আগুন লাগা

তখন অমি মালা গেঁথে     পদ্মপাতায় ঢেকে

পথে বাহির হয়েছিলাম    রুদ্ধকুটীর থেকে।

অনেক হল দেরি,

আজও তবু দীর্ঘ পথের অন্ত নাহি হেরি।

একটু থেমে, যেন আলাদা করে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন,

বসন্তের সে মালা

আজ কি তেমন গন্ধ দেবে নবীন সুধা ঢালা?

                এই জায়গাটা থেকেই, প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারল যে তিনি শুধু রবীন্দ্রনাথ কী ভেবে কী লিখেছেন, তা শােনাচ্ছেন না। তিনি তাঁরই অভিনয় জীবনের কথা বলছেন। বলছেন যে তিনি যখন নাটকের সম্ভার নিয়ে নবীনযৌবনে পথে বেরিয়েছিলেন, সে তাে অনেককাল আগের কথা। এখন দিন বদলেছে। আজও কি তার নাট্য, তার অভিনয়, দর্শকদের তেমন আনন্দ দিতে পারছে ? প্রায় কুড়ি বছর আগে শােনা এক তত্ত্বকথা, একটাই বাস্তব চেহারা নিয়ে হাজির হল, তারই কণ্ঠে। তখনও আমার মনে জ্বলজ্বল করছিল সেই দৃঢ় কণ্ঠ, সেই আত্মবিশ্বাস। আজও যেমন জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। তার সেই আবৃত্তির স্মৃতিও তার মধ্যে পাওয়া আমার পূর্বশ্রুত তত্ত্বকথার সতত্যাপলব্ধির রােমাঞ্চ।

             এরকম করে আর কে শেখাবে ? কত তাে আবৃত্তির স্কুল। কেউ কি শেখাচ্ছে কোন্ উৎস থেকে উৎসারিত হতে হবে কারও নিজস্ব আবৃত্তি ? আমাদের কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণ করা হলে প্রধানত তিনটে সুর থেকে। শারীকি পরিচয়ের দিক থেকে এই তিন প্রক্ষেপণ স্থানকে বলা হয়, লিপটাং, ন্যাজাল ও অ্যাবডােমেন। এছাড়াও আছে হেড রেজিস্টার। আবার অন্যভাবে চেষ্ট রেজিস্টার ও হেড রেজিস্টারও বলা হয়। এসব হল পুঁথিপড়া বিদ্যা। বই পড়ে তাে গালভারী সবনাম জানা গেল, সেগুলাের কী  রকম প্রয়ােগ হয় বাস্তবে তা জানা যাবে কীভাবে ? স্বরের এইসব স্তর যে সত্যিই ব্যবহার করা হয়, তা শিখেছি মঞ্চে অভিনেতাদের সংলাপ বলা অনুধাবন করে। আর

বেতার নাটকে তাদের স্বরপ্রয়ােগ শুনে। বহুরূপীর বিভিন্ন নাটকে স্বরের এই বর্ণময়তা যত্ন করে গড়ে তােলা হত। বিশেষত, রক্ত করবীতে উচ্চাবচতা প্রায় Symphony-র মতাে। শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে রাজার সংলাপ শুনে স্বরপ্রক্ষেপণ অনুধাবন করার জন্য আমি বারবার এই নাটকটি দেখেছি। শম্ভু মিত্র ছাড়াও অন্য যেসব মহীরূহের স্বরপ্রক্ষেপণ আমায় ঋদ্ধ করেছে তাদের মধ্যে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ইত্যাদি অনেকেই আছেন। এই প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প বলি।

শম্ভ ‍ু মিত্র বহুরূপীর ‘ টেরােড্যাকটিল্’ নাটকে এক জাদুকরের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। মঞ্চের ডানদিকে (শ্রোতাদের দিক থেকে ডানদিকে) একটা ছােট টুল রাখা থাকত। সংলাপ বলতে বলতে তিনি এই জায়গাটায় এসে বসতেন। নাট্যাভিনেতাদের কাছে শুনেছি, মঞ্চের এই অংশটি নাকি সবচেয়ে সংবেদনশীল। ওইখান থেকে যে কোন গভীর কথা সঞ্চার করা যায়।

শম্ভ ‍ু মিত্র ওই টুলটায় বসে, সংলাপের মাধ্যমে শ্রোতাদের একটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের পরিবেশে নিয়ে যেতেন। কথাগুলাে কেমন ক্রমশ আস্তে হয়ে যেত, আর আলােও সেই সঙ্গে কমে আসত। কণ্ঠস্বর অনুধাবন করে যেন সত্যিই কোনও দূরযুগে পৌছে যাওয়া যেত। স্বর ক্রমে মৃদু থেকে মৃদুতর এবং যেন অনেক দূরে চলে যাচ্ছে, এমন মনে হত। অথচ প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট শােনা যেত। স্বরে যে ঠিক কী ক্রিয়া হত, প্রথমদিন আমি অনেক ভেবেও নির্ণয় করতে পারিনি। বাড়ি এসে ভাবতে ভাবতে মনে হল, স্বরটা বােধহয় ধাপে ধাপে অ্যাবডােমেনের নিম্নতম স্থানে নামিয়ে আনা হচ্ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে স্বর তাে ভারী হওয়ার কথা। স্বর আরও নিকটে আসছে মনে হওয়ার কথা। দূরগামী মনে হবে কী করে? ফলে নাটকটা আরও দুবার দেখতে হল, তখন বুঝে ওঠা গেল যে স্বরটা নামিয়ে আনা হচ্ছিল না স্বর ক্রমশঃ চড়া থেকে আরও চড়ায় ন্যাজাল অংশে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে তার আওয়াজ কমিয়ে নেওযা হচ্ছিল, আর স্বর শুদ্ধ পর্দা থেকে ক্রমে কোমল পর্দায় চলে যাচ্ছিল।

স্বরপ্রক্ষেপণ নিয়ে তার ভাবনা অনেক বলায় অনেক লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। সেসব উদ্ধৃতি দিয়ে-দিয়ে আলােচনা করতে গেলে গােটা একটা বই হয়ে যাবে। ওপরে যেসব ঘটনার উল্লেখ করেছি, তার প্রায় কুড়ি বছর পরের কথা। বেতারে তার সাক্ষাৎকারের একটা সিরিজ’ প্রচারিত হয়েছিল। প্রধানত, পরবর্তীকালে খ্যাত আবৃত্তিশিল্পীরাই সে সাক্ষাৎকারগুলি নিয়েছিলেন। পার্থ ঘােষ তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, গলা অনুশীলনের ব্যাপারে হার্মোনিয়ামের সাহায্যে নিলে উপকার হয় কি না। তার স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে উত্তর ছিল, “ওসব অনেক করিচি, জানাে,…”। তারপর সুন্দর করে

একটা গল্প বলেছিলেন। একটা ছেলে নাটকে অভিনয় করে। তার ফিরতে রােজই অনেক রাত হয়। মা তার জন্য ভাত নিয়ে জেগে বসে থাকে। রােজই বকাবকি করে। রােজই সে বলে যায়, সকাল-সকাল ফিরবে। রােজই একই ঘটনা । মা একদিন বলল, আর সে ভাত নিয়ে বসে থাকতে পারবে না। সে প্রতিজ্ঞা করল, সকাল সকাল ফিরবেই। সেদিন আরও অনেক দেরি হয়েছে। সে অন্যদিকের দরজার চাবি খুলে, পা টিপে টিপে বাড়ি ঢুকে, বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আর কোনও শব্দ না করে, রান্নাঘরের দিকে না গিয়ে ভেবেছে চুপি চুপি নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়বে। যেই সে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে, দ্যাখে, রান্নাঘরের দরজায় মা দাঁড়িয়ে। মা শুধু বলল, ‘রান্নাঘরে ভাত ডাকা আছে, খেয়ে নেওয়া হােক।

উনি এই সংলাপটা বললেন, তারপর পার্থ ঘােষকে জিজ্ঞাসা করলেন,“এই যে একটা কণ্ঠস্বরে মা এই কথাগুলাে বলল, এই আওয়াজটা তােমার হারমােনিয়ামের কোন্ রীডে আছে?”

যার মনে করেন, সঙ্গীতের ধরনে সরগম বা তান অভ্যাস করলেই আবৃত্তি বা অভিনয়ের গলা সাধা হয়ে যায়, তারা কি ঠিক পথ দেখান? শম্ভু মিত্র যেসব আলােচনা করেছে বা লিখেছেন, কোথাও ঝিনুকে করে খােকাকে দুধ খাইয়ে দেওয়ার মতাে শিল্প গিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। শুধু ইঙ্গিত দিয়েছেন। উনি চাইতেন, যার শেখার ইচ্ছে আছে, সে খুঁজে নিক।

এই ইঙ্গিতময়তাই ছিল তার বক্তৃতা কিংবা আলােচনার অমােঘ আকর্ষণ। তার বক্তৃতার মধ্যেও স্বর-পরিবর্তন, বাকভঙ্গির বদল, থামা-চলা, মৃদুনাটকীয় অভিঘাত অত্যন্ত লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ছিল। বােধ বুদ্ধিতে আপনি সজাগ রেখে দিত তার বলা। অন্যমনস্ক হওয়া যেত না। আমি অনেকেরই বক্তৃতার ভক্ত। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরিপদ ভারতী এঁদের বক্তৃতা আমাকে বলতে শিখিয়েছে। কিন্তু আমার বক্তৃতা করার প্রেরণা, সাহস ও আনন্দ আমি শম্ভু মিত্রের বক্তৃতা শুনেই অর্জন করেছি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে যােদ্ধাদের সাহায্যে ও সমর্থনে কলকাতার রবীন্দ্রসদনে গান ও আবৃত্তিরআসর বসেছিল। বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীরা এবং কয়েকজন আবৃত্তিশিল্পী দু’দিন ধরে অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছিলেন। প্রথম দিনে ছিল শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি।নতুন কিছু নয়,তার কণ্ঠে বহুশ্রুত মধুবংশীর গলি’ই শােনালেন। স্তব্ধ পূর্ণপ্রেক্ষাগৃহ। আবৃত্তির সমস্ত সময় জুড়ে শ্রোতারা যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসেছিলেন। আবৃত্তি শেষ হওয়ার পরও তার রেশ রয়ে গেল যেন। সে এমনই এক পরিবেশন যে তারপর যখন সুচিত্রা মিত্র গাইতে বসলেন, মনে হল গান যেন আর

কানে ঢুকছে না। দুটো গান এমন করেই পার হয়ে গেল, তারপর যেন ধাতস্থ হওয়া গেল। আমি ভেবেছিলাম, আমি তার এবং আবৃত্তিশিল্পের ভক্ত বলেই হয়তাে আমার ও রকম মনে হয়ে থাকবে। কিন্তু সুচিত্রা মিত্রের গানের পরে আমার পার্শ্ববর্তী অপরিচিত শ্রোতা হঠাৎই বললেন, গানটা যেন প্রথম দিকে জমছিল না, তাই না ? তারপর বললেন, ওহ কী প্রচণ্ড আবৃত্তি ! এই প্রচণ্ড’ শব্দটা আমার আজও মনে আছে।

শুধু কষ্ঠের উত্থানপতন আর উচ্চারণের ক্ষমতা যে কতদূর, যা বাজনাসহ গানকেও ম্লান করে দিতে পারে, এ তাে তার আবৃত্তি শুনেই জানা। এই জানা কত অনুষ্ঠানে মঞ্চে যে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে কোলাহলময় বাজনা-গান-এর মােকাবিলা করতে ! আজ যখন তরুণ প্রজন্মের আবৃত্তিশিল্পীরা বাজনা-আবৃত্তি , আলাে-ছায়া-আবৃত্তি ইত্যাদির মােহে খালি গলার আবৃত্তিকে প্রত্নসামগ্রী’র ফতােয়া দিচ্ছেন, তখনও যে খালি গলার আবৃত্তিকেই হাতিয়ার করার সাহস অটুট রয়েছে, যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দিয়ে গেছেন তিনিই।

তাঁর এক থেকে দেড় ঘন্টার একক আবৃত্তি শুনেছি, বেশ কয়েকবার। এত অমােঘ টান সেই আবৃত্তির যে, মনে হত, শ্বাস নিতে গিয়ে নড়েচড়ে বসতে গেলেও যেন কিছু না কিছু মিস করব। হাতটা চেয়ারের হাতলে যেমন রাখা থাকত আবৃত্তির শুরুতে, শেষেও তেমনই হাতলে থেকে যেত এবং আড়ষ্ট হয়ে যেত। শুধু কণ্ঠস্বর আর উচ্চারণেই তৈরি হত এমন পরিবেশ। আবৃত্তির ফাঁকে ফাঁকে কথাও বলতেন না । শুধু একটা কবিতা থেকে আর একটা কবিতায় যেতেন। সেই যাওয়া, কণ্ঠস্বরের স্থাপনও সঞ্চালন, বাঙ্গির বদল—আমার মতন একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সে সবই বিন্দু বিন্দু শুষে নেওয়ার উপাদান। দুটি আবৃত্তির মাঝখানের যে বিরতি এবং বিরতির আগে পরে কণ্ঠস্বরের যে অবস্থান, সবই ছিল অনুধাবনীয়। কেন, না বিরতিগুলাে সব একরকম নয়। কখনও বিরতির কোনও অর্থ বহন করত। কখনও বিরতি পরবর্তী আবৃত্তির পরিবেশ তৈরি করে দিত। কখনও বিরতি পরবর্তী কথনের স্বর, বাচনভঙ্গি বা অভিব্যক্তি কী হবে, এই কৌতুহল জাগিয়ে অপেক্ষায় রাখত। সমস্ত কিছুই যেন পূর্বপরিকল্পিত, বহু অনুশীলিত এবং বারবার সৃজিত। যে সামগ্রিক পরিবেশ তৈরি হত তা যেন মহড়ার মধ্যে দিয়ে এক নিপুণ পারফেকশানে পৌছে তবেই মঞ্চে আনা হত।

তার একটা ওরকম আসর, কাউকে সারাজীবন নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে আবৃত্তি করতে উদ্বুদ্ধ করার পক্ষে যথেষ্ট। সে আবৃত্তি শুনে অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে এ কেবল স্বভাব প্রতিভার বশে যেমন যেমন আবেগ আসছে তেমনই বলে যাওয়া নয়, এ আবৃত্তির প্রতিটি ইঞ্চি অনেক ভাবনা-চিন্তা, ভাঙা-গড়া ও বিপুল অনুশীলন দিয়ে সৃষ্টি করা। সেই পথ ধরেই হেঁটেছি। হাঁটছি আজও।

তাঁর যেমন অসংখ্য ভক্ত আছেন আমার মতন, তেমনি আবার অনেকেই তার আবৃত্তি পছন্দ করেন না। বলেন, কেমন যেন ম্যানরিজম। কেউ বলেন, কেমন ন্যাজাল, সব কিছুই নাকী সুরে বলা। কেউ বলেন ,ঠিক স্বাভাবিক লাগে না। ওঁরা এই বিরাগবশত তার আবৃত্তি থেকে কিছুই শেখবার মতাে খুঁজে পান না। না চিনতে পারায়, অনেকখানি শিক্ষালাভের সুযােগ থেকে তারা বঞ্চিত হন। আবার, তার ভক্ত ও অনুকারকদের মধ্যে দেখেছি তাকে নকল করার প্রবণতা। অনেক অনুকারক ছিলেন তাঁর, তাঁরা মনে করতেন, আবৃত্তি করতে হলে ওরকম ভঙ্গিতে, ন্যাজাল সুরেই বলতে হবে। তাঁরা তার ভঙ্গিটাকে নকল করতেন। কীরকম অদ্ভুত লাগতাে। শম্ভু মিত্র যখন কথা বলেন, তার মধ্যেও ওই ভঙ্গি ওই স্বরের ন্যাজাল গড়ন থাকে। ওটাই ওঁর স্বাভাবিক কথা বলার ধরন, কিন্তু অনুকারক যাঁরা , তারা যখন কথা বলেন একদম সরল স্বাভাবিক। আবৃত্তি করলেই ওরকম নাকীসুরের টান।

আসলে, আবৃত্তিকে বরাবরই একটা বাচনভঙ্গি ভাবা হয়েছে। তাই আবৃত্তি শােনার সময়ে বা অনুসরণ করবার বেলায় সেই ভঙ্গিটাই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আবৃত্তি যে শুধুভঙ্গিমাত্র নয়, তার মধ্যে রয়েছে স্বরের নানা বিভঙ্গ, রয়েছে উচ্চারণের কারুকৃতি, অভিব্যক্তির অভাবনীয়তা এসব বােঝবার দরকার বােধ করেননি কিভক্তজন কি বিরােধীরা। ব্যক্তিগত ওই ভঙ্গিটা ছেকে নিলেই সেগুলাে বােঝা সম্ভব।

এখানে প্রশ্ন উঠবেই, সেটা আবার সম্ভবনা কি? কারও ভক্তিবাদ দিয়ে কী ভাবে গ্রহণ করা হবে আবৃত্তিটাকে?

তা হলে একটা ভাবনার কথা বলি। শচীনদেব বর্মনের গানও অনেকেপছন্দ করেন না। ওই খনা ধরনের গলা নাকী সুর ইত্যাদির জন্য। বলা বাহুল্য, তারা ততটা। গানের শ্রোতা নন,যতটা ভালাে কণ্ঠের শ্রোতা। এটাও আপাতত আলােচ্য নয়। বলবার কথাটা অন্য।

শচীনদেব হিন্দী চলচ্চিত্রে বহু বিখ্যাত গানের স্রষ্টা। স্টার গায়করা সেইসব গান গেয়েছেন। শচীনকর্তা সেই সব গান গেয়ে-গেয়ে যখন সেই গায়কদের শেখাতেন বা তােলাতেন, তিনি নিশ্চয় তার নিজস্ব ঢঙেই সেটা করতেন। ওই খনা ও ন্যাজাল প্রক্ষেপন যা তার, ইংরেজিকে যাকে বলে অরিজিন্যালিটি’, সেটা বাদ দিয়ে বা আড়াল করে নিশ্চয় শেখাতেন না। কিন্তু আমাদের মহম্মদ রফি, আশাজী, লতাজী, হেমন্ত মুখার্জীর গলায় যখন সেইসব গান শুনি তাকে কী শচীনকর্তার ওই বিশেষ গলা বা ভঙ্গির দেখা পাই? গায়ক গায়িকারা তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই তার করা সুরটি  আমাদের শােনান। তারা তা হলে কী করে ফিল্টার করে নিতেন ওই বিশেষ ভঙ্গিটিকে?

কেউ হয়তাে বলবেন, ওগুলাে তাে গান। গানে তাে শুধু ভঙ্গি থাকে না, তার সুর-তাল-লয় থাকে। ওটা তাই সম্ভব। এইখানেই তাে গােলমাল। আবৃত্তিতেও শুধু ভঙ্গিই থাকে না। স্বরস্থান, স্বরবৈচিত্র, স্বরবিহার থাকে। শব্দ থেকে শব্দের উচ্চারণে ব্যঞ্জনা থাকে। তাল-লয় তাে থাকেই। কিন্তু কোনও আবৃত্তির বেসিক শিক্ষাগুলি লাভ করতে হবে। তখনই আর শম্ভু মিত্রের আবৃত্তিকে নিতান্ত ম্যানারিজম কি নাকী-নাকী বলে তুচ্ছজ্ঞান করা যাবে না। তা থেকে অনেক কিছু আহরণ করা যাবে এবং নিজস্ব বাচনভঙ্গির মধ্যেই তাকে প্রয়ােগ করাও যাবে।।

এমনই নিজের উপলব্ধি। অনেকদিন অনেক মনােযােগীও আনন্দময় অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে তার আবৃত্তি থেকে নানা মণিমাণিক সংগ্রহ করেছি ও নিজের আবৃত্তিতে প্রয়ােগ করতে চেষ্টা করেছি। আবার তার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে , সম্যক বুঝেও বর্জন করেছি। কারণ আমার মেজাজ ও মানসিকতার সঙ্গে, আমার কবিতা সংক্রান্ত ধ্যানধারণার সঙ্গে তাঁর এই বৈশিষ্ট্যগুলাে খাপ খায় না।

এভাবেই আমার দূর থেকে শেখা।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকার আবৃত্তি উৎসব সংখ্যা । জন্ম – শতবর্ষের স্মারণিক ১৯১৫-২০১৪ ।

সম্পাদনা : স্বপন নন্দী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *