আবৃত্তি :সঠিক সমবেত-র আনন্দ চাই- পরিমল চক্রবর্তী

sahityasmriti.com

ঠিক কিভাবে শুরু করলে ঠিক হবে বুঝতে পারছি না। এমনিতে লেখালেখি খুব একটা করি না, মানে পারি না। তবু কেন লিখতে বসা ?কারণ খুবই সহজ। অনেকদিন একটা আবৃত্তির দল চালাচ্ছি অর্থাৎ আবৃত্তি শিল্পের সঙ্গে বেশ কয়েক বছরের সখ্যতা।

আমাকে বলা হয়েছে সমবেত আবৃত্তি প্রসঙ্গে যা হােক কিছু লিখতে লিখতে বসে যে শব্দটায় আমার প্রথমে খটকা লাগল সেটা হচ্ছে‘সমবেত’। আসলে কোনাে সমবেতই বেশীদিন একভাবে থাকে না। কখন যে টুক করে ঢুকে পড়ে একক ব্যক্তিত্ব প্রকাশের প্রতিযােগিতা।

তার উপর যদি হয় সৃজনশীল কাজের জন্য সমবেত হওয়া। আমি বিশ্বাস করি আবৃত্তির সৃজনশীলতায় যে অভিনিবেশ দেওয়া প্রয়ােজন তা আমরা দিতে পারি না। আমরা প্রায় সকলেই আংশিক সময়ের জন্য কাজটা করি। অন্যান্য সমস্যা  তাে আছেই। এবার আসি সমবেত আবৃত্তি প্রসঙ্গে। প্রথমেই ভাবতে হবে সমবেত আবৃত্তিতে যারা অংশগ্রহণ করবে তাদের প্রত্যেকের মধ্যে কোন কোন দিকগুলাে এক আছে।

সঠিক সময়ে ক’জন আসে, ক’জন বাড়িতে ঠিক ঠিক নিজস্ব চর্চা করে, সংকলন বাদ দিয়ে অন্যান্য কবিতা পড়ার অভ্যাস ক’জনের, নিজেরটা বাদ দিয়ে অন্যকে শােনার সদিচ্ছা আছে কিনা, অংশগ্রহণের অংশ (ভাগ) নিয়ে উদার কিনা, সর্বোপরি, পরিচালকের প্রতি আস্থাভাজন কিনা।

ধরা যাক, এরকম প্রায় সমভাবাপন্ন দশজনকে পাওয়া গেল। প্রত্যেকের স্বরকে একটা তানে বাঁধবার জন্য একটি কবিতা নির্বাচন করে বিভিন্ন স্কেলে বলাবার চেষ্টা করলে দেখা যাবে একেক জনের স্বর একক স্কেলে যাচ্ছে। এটাকেই ঠিক করতে বেশ কয়েক মাস কেটে যাবে। modulation এর জন্য একটি তালের কবিতা নিয়ে বিভিন্ন লয়ে অনুশীলন করা যেতে পারে। প্রত্যেকের খাদের স্বর এবং নাসারন্ধ্র ছুঁয়ে যাওয়া স্বরকে সমান দক্ষতায় এক করত হবে। যেমন, প্রার্থনা করার সময় যেরকম স্বরের বিস্তার হয় ঠিক সেরকমই হবে।

এদিকে সংকলনে যে বিষয়ের উপর আলােকপাত করা হল সে বিষয়টা একসঙ্গে বসে মনােযােগ দিয়ে বিষয়টাকে অনুধাবন করতে হবে। সংকলনের প্রত্যেকটি কবিতা আলাদা আলাদা পড়লে যে অনুভূতি হয়, যে ব্যঞ্জনা হয়, সমবেত অংশগ্রহণে সেই কবিতাই অন্যরকম ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্ত হয়।

কবিতার পর কবিতা গেঁথে যে মালা তৈরী হলাে সে মালার কাকে দিয়ে কোন অংশ ফুটিয়ে তােলা যাবে সেদিকটা ভাবতে হবে।যিনি সংকলন করবেন তিনি প্রতিটি সংকলনে চেষ্টা করবেন কবিতার নিজস্ব বার্তাছাড়াও যেন সংকলনটার দ্বারা একটা বার্তা পৌঁছায় যাতে সমবেত আবৃত্তি করার মধ্যে সার্থকতা থাকে।

আমাদের প্রত্যেকের স্বরের বৈচিত্র্য একরকম নয়। বাচনভঙ্গীও এক নয়। কার স্বরের

পর কার স্বর যাবে এটা কিন্তু খুব important. পরিচালককে ঠিক করতে হবে কাকে দিয়ে কোন অংশের কাজ ভালাে হবে। সবার মধ্যে আলাদা করেও কাদের মধ্যে tonal মেজাজের মিল আছে, বা একই সঙ্গে উল্টোটাও ভাবতেও হবে। ধরা যাক, একটা জায়গায় খুব প্রতিবাদী স্তর আছে। যাদের গলায় জোয়ারিটা আছে তাদের দিয়ে ঐ অংশ করিয়ে পরে যার মধ্যে কোমল স্বর ভালাে আসে এবং বলার মেজাজে একটা বাড়তি softness আছে তাকে দিয়েই পরের অংশটা করালে ভালাে হয়।

আর একটা ব্যাপার জরুরী, নিস্তব্ধতা। voice থেকে voice-এ যাবার সময় কতখানি বিশ্রাম দিয়ে আবেদনে বৈচিত্র্যময়তা বাড়াতে হবে সেটাই বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার। কোন সংকলনে মিছিলে যাবার সময়টা উল্লেখ আছে তখন প্রথমে দুটো বা তিনটে voice দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে voice-এর সংখ্যা বাড়িয়ে একটা tonal বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে স্বর বিন্যাসের বৈচিত্র্য দেখাতে গিয়ে যেন সংকলনের বিষয় এবং কবিতার বিষয় মার না খায়।

নদীর বহমানতা, নদীর বর্ণনা করতে গিয়ে নদীর নানা রকমের গতি, নানা পরিবেশের মধ্যে গতি ঢেউয়ের যে প্রবলতা, যে শ্লথতা, নানা রকম শব্দ নদীর দু’পারের দৃশ্যকল্পতাগুলি ঠিকঠিক ফোটাতে যেমন স্বর-বিন্যাসের পারঙ্গমতা দরকার তেমনি প্রত্যেকের কল্পনাশক্তিও দরকার এবং সমবেত আবৃত্তিতে একটা ব্যালান্স অনুভূতির প্রয়ােজন। সমবেত সমঅনুভূতিতে সমবেত আবৃত্তির সাফল্য আসে বেশী।

সমবেত আবৃত্তি করতে গেলে মনে রাখতে হবে সমবেত উপস্থাপনা যেন সমবেতই থাকে। সেখানে বিষয়ের প্রয়ােজন একক অংশগ্রহণ থাকবে কিন্তু তা কখনই যেন মিলিত ভাবকে ক্ষুন্ন না করে। ব্যক্তিগত ক্যারিশ্ম এখানে সমবেত প্রয়াসকে অনেক সময় মাটি করে দেয়। একটা মালায় যেমন অনেকগুলি ফুল থাকে কিন্তু একেকটা ফুল কখনাে মালা হতে পারে না। তেমনি সমবেত উপস্থাপনায় প্রত্যেকে একেকটি ফুল মাত্র, কেউ পুরাে মালাটা নয়। তবে…

সবটাই এতাে সুন্দর নয়। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি সমবেত প্রয়াসটা যে ঠিক কি, কিসে করতে চাওয়া হয় সেটাইতাে আমরা অনেকে বুঝিনা। অনেককে বলতে শুনি “আমার তাে ওইটুকু অংশ, আমি ঠিক করে দেব।”“আমার তাে অনেক পরের দিকে আছে একটু পরে আসলে চলবে না?”অনেকে আবার নিজের অংশটুকু ছাড়া সংকলনের বাকীটা মুখস্থই করতে চায়না।

অনেক অভিভাবক বলেন আমার ছেলে/মেয়েকে ওইটুকু অংশ দিলেন! এই নিয়ে ছেলে-মেয়েদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। ব্যাপারটাই বােঝানাে যায় না অংশতে অংশগ্রহণ নয় এটা সমবেততে অংশ নেওয়া। ভুলে যায় সংকলন পুরােটা মুখস্থ না করলে পুরাে বিষয়টাই মাথার বাইরে দিয়ে চলে যাবে। এতে সমবেত আবৃত্তির বৈচিত্রটাই যে হারাবে তাই নয় কোন বার্তাই পোঁছাবেনা।

যে দশ-বারাে জন সমবেত কাজটায় অংশ নেবে প্রত্যেককেই সময়মতাে নিয়ম করে আসতে হবে। সংকলন বা যে কবিতার আবৃত্তি হবে সেটাকে রিডিং রিহার্সাল করতে হবে। খুঁটিনাটি বিষয়গুলাে আগে প্রত্যেককেবুঝে নিতে হবে। অনুভবের আদান-প্রদান করতে হবে। সর্বোপরি আবৃত্তি শিল্পের যে আঙ্গিক দিকগুলি আছে সেগুলি ঠিকভাবে প্রকাশ পাবে ঠিক কিভাবে, সেগুলি দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে এখানে প্রত্যেকের সমান গুরুত্ব এবং সমান প্রয়ােজন। সপ্তাহে চারদিন হলে ভালাে হয় না হলে দু’দিন তাে অবশ্যই বসা দরকার।

যে কোন একক প্রচেষ্টা,এককউপস্থাপনার চাইতে সমবেত প্রচেষ্টায় সমবেত উপস্থাপন অনেক বেশী উপভােগ্য ও সমাদৃত হয়। আবেদনের ভিন্নতার সুযােগ থাকে। সামগ্রিক নিবেদনে যেহেতু অনেকগুলি মানুষের অংশগ্রহণ থাকে, শ্রোতার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম অভিমত শােনার সুযােগ থাকে। এতে কাজের মধ্যে গতিময়তা লক্ষ্য করা যায়। সমাজের নানান। দিকেরমানুষজন আসে এই সমবেত প্রয়াসকে স্বাগত জানাতে। এত মানুষের প্রশংসাও সমালােচনা দুই-ই আগামী দিনের পাথেয় হয়।

সমবেত আবৃত্তি পরিবেশনেমনােরঞ্জনের দিকটার সঙ্গে সৃজনশীলতার আনন্দের নানান দিকগুলি তথা পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনেক সুযােগ আছে। যদি আমাদের মেধা ও মননকে সুদৃঢ় ও সংযত করে মনোেযােগ দিয়ে কাজটা করি তাহলে শুধু যে আনন্দই পাব তা নয় ভাবী সময়েও উদাহরণ হয়ে থাকবে।

দল চালাতে দেখেছি ছােটদের মধ্যে এই কাজটার প্রতি বেশ আগ্রহ আছে, করেও ভালাে। কারণ তারা খুব নিয়মিত (যতদিন না ক্লাস এইটে উঠছে) এবং আনন্দ ও প্রাণ দিয়ে কাজটা করে। তবে কিছুদিন কাজটা করার পর অভিভাবকরাই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তখন হয় আমাদের সমস্যা। তার কারণ নিশ্চয়ই আছে। পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ।

কেরিয়ার সর্বস্ব ছেলে-মেয়েদের তৈরী করা এখন তাে সমাজ ব্যবস্থার একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর কেরিয়ার মানে তাে বড় চাকরী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করা। শিল্প-টিল্প করা বড় ঝকমারি, অনেকটা সময় নষ্টও বটে। কিন্তু আমরা যারা সময় নষ্টও করতে চাই তারা নষ্ট করবই। স্বপ্ন দেখবাে সমবেত হওয়ার। দেখব সঠিকভাবে সমবেত আনন্দ পাওয়ার স্বপ্ন।

 

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা // সম্পাদনা : স্বপন নন্দী  // যোগাযোগ : (৯১)৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: