আমাদের গ্রামে টিভি ছিল না

সাহিত্য শ্রুতি =লেখার জগতে কি ভাবে এলেন? প্রথম লেখাটি সম্পর্কে কিছু লিখুন।

বিশ্বনাথ পাল =আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন হা ডু ডু খেলতে গিয়ে প্রথম পা ভাঙে। পা ভেঙে গৃহবন্দী হয়ে  বই কে সঙ্গী করি। তখন তো আর আমাদের গ্রামে টিভি ছিল না। রেডিও শোনার মন থাকলেও পেতাম না। আমার মত অর্বাচীনের রেডিও শোনা ছিল শুধু শুধু ব্যাটারী পড়ানো । দাদার তখন ক্লাস নাইন।

কবি অক্ষয় কুমার বড়ালের” মধ্যাহ্নে” কবিতার ‘ডাকে কুব কুব’ শুনে মনের মধ্যে খুব আন্দোলন শুরু হয়। কবিতা লেখার জন্য মনে প্রবল তাড়না অনুভব করতে থাকি। তা ছাড়া ঐ বয়সে গৃহবন্দী শিশুর  একাকীত্ব দূর করার জন্য যারা এসেছিলেন তারা সব মহিলা। পুরনো এটা রামায়ণ আর তেল চিটে মহাভারত সুর করে পড়তাম।

যুক্তাক্ষর ঠিকঠাক উচ্চারণ করতে না পারলেও আমার ঠাকুমার ঈশ্বর ভক্তির জন্য আগ্রহী শ্রোতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে দেখে পড়াশোনার বই সিকেয় রেখে কবিতা লেখার কাজে গোপনে লিপ্ত  হই। ঠাকুমা কাছে খুব কান্নাকাটি করে  গাঁয়ে কাঁসারিদের কাছ থেকে ছটাকা দামের একটা কত্তাল আদায় করি। কত্তাল যাতে না হারিয়ে যায় সে জন্য একটা শক্ত দড়ি দিয়ে জোড়া ছিল। দড়িটাকে গলায় ঝুলিয়ে টুং টাং

করে গুণ গুণ করতে করতে একদিন সন্ধ্যায় ঝোঁক নিয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি  দেওয়া ভাইকে নিয়ে বানিয়ে ছিলাম”অন্ধকারে গড়াগড়ি /দাওনা কেন সারাসুরি” ।অন্য আর একদিন পূজারী নামে জনৈক ভদ্রলোক বাড়িতে এলে তাঁকে নিয়ে তাৎক্ষণিক “পূজারী পাঁচটা কথা  বল না” গান গেয়ে বাড়ির সকলকে অপ্রস্তূতে ফেলেছিলাম। দুটি ক্ষেত্রেই প্রকাশের বেদনা সত্যি সত্যিই বেদনাবহ হয়েছিল। কিন্তু যন্ত্রণাকে টপকে কোথায় যেন আনন্দ হতে লাগল 
তাই বড় কবিদের অক্ষম অনুকরণে লেখা শুরু করলাম। হে কবি সুকান্ত/তুমি যে ক্লান্ত. – – এই সব। ফাইভ থেকে  সিক্সে উঠেই  “ঠাকুর” নামে একটা কবিতা ছাপা হল নদীয়া জেলার’ রূপসী’ পত্রিকায়। আনন্দ আর ধরে না। তখনও গাঁয়ে বিদ্যুৎ আসে নি। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে  হ্যারিকেন জ্বালিয়ে সেই আলোতে শুধু কবিতা বা নাম দেখি নি। নখ দিয়ে ঘষে পরখ করেছি ছাপার কালির নাম টা মোছে কি না।
বহুদিন এই এক্সপেরিমেন্ট করেছি। ঐবছরেই বৃহদায়তনে পূজা সংখ্যায় ছাপা হয়:মোর পল্লীগ্রাম/গ্রীষ্মে দুটি প্রধান ফল  পাকে আম আর জাম/সকলে মিলিয়া করি মোরা চাষ। /বর্ষাতে কসকলে করি মোরা বাস। /সকলের একতান, একণ সুর/মোর পল্লীগ্রামের নাম অমরপুর। /সকলেই এক মানুষ, মানুষই জাত। /মোদের খাদ্য ডাল আর ভাত।। (আমার গ্রাম)
তারপর লিখতে থাকি। সদ্য লেখা কবিতা পোষ্ট করার জন্য  ৪৫ মিনিট আলপথে হেঁটে রামগোপালপুর গিয়েছি অনেকবার। এই সময় মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশিত “চলন্তিকা” পত্রিকায় দেশবন্ধু কবিতাটি ছাপা হয়। ইতিমধ্যেই কবি হিসাবে পরিচিত হয়েছি বাড়ীতে  তাই আত্মীয় বা  অন্যগ্রামের কেউ এলে কবিতা শোনানো জন্য আমার ডাক পড়ত। শুনে তারাধন্য ধন্য করতেন।
উৎসব অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা শোনানো জন্য ডাক  আসতে থাকে। ইতিমধ্যে “বাঁশী”নামে একটি গল্প ছাপা হয় চলন্তিকায়। রামগোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পত্রিকাতে লেখা বের  হতে থাকে। যে বছর মাধ্যমিক (১৯৮৬) পরীক্ষা দিই সে বছর ছিল বিশ্বকবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকী।গলসী ১নং ব্লকে ব্লক যুব উৎসবে প্রবন্ধ কবিতা আবৃত্তি সবেতেই প্রথম হই।
ঐ বছরেই গলসীর উদয়ন সংঘের উদ্যোগে রবীন্দ্র জন্মোৎসবে ‘রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা’ বিষয়ক সর্বসাধারণ বিভাগে দ্বিতীয় হই ।চলন্তিকা পত্রিকা রজত জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আমিই ছিলাম বয় কনিষ্ঠ প্রতিনিধি ।প্রবীন ও প্রাজ্ঞ মানুষদের ভীড়েও  ঝুঁকি না নিয়ে রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে  বক্তব্য  রাখা মাত্র  নৈহাটীর বার্তালিপি পত্রিকার সম্পাদক ধোপগ্রস্ত  যুগলকিশোর মাইতি জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন “আপনি আমাকে কথা দিন-এবার থেকে আমার পত্রিকাতে  নিয়মিত লেখা পাঠাবেন”। ফুলহাতা! শার্ট  আর ঢলঢলে পাতলুন আর হাওয়াইপরা গাঁয়ের ছেলেকে আপনি সম্বোধন শুনে স্তম্ভিত হই। 
এরপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখালেখি শুরু করি। দৈনিক রাজপথ, বঙ্গলোক, অক্ষর ভারত, শিক্ষা সমাচার প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতে  থাকে।
ইতিমধ্যে অর্থনীতিতে অর্নাস সহ এম. এ, বি এড করে হাটগোবিন্দ পুর কলেজে অংশকালীন শিক্ষক হিসাবে যোগদান করি। পরে মেমারী কলেজে যাই। মেমারী কলেজে যাওয়ার সময় ট্রেন ফেল করি।মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। অন্যকোন প্রোগাম না থাকায় বাধ্য হয়ে বর্ধমানের  বাসায় বন্দি হয়ে লিখে ফেলি বেশ কিছু ছড়া।
ঐ ছডা় গুলি নিয়ে “স্বাস্থ্য বিধানের ছড়া” ছাপানোর  উদ্যোগ দিনই  নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত বইটির তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এর পর একেএকে স্বাস্থ্য -জিজ্ঞাসা, সবারজন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা চেয়েছিলেন মা সারদা, স্বামিজী বলছেন, সর্বশিক্ষার ছড়া, মানুষ রামকৃষ্ণ, ছড়াই ছড়া, মাটির ছন্দে, গীতামাধুর্য, জগৎকর্তা শ্রীকৃষ্ণ কথা, মিশন নির্মল বাংলার ছড়া, এবং আই এস বি এন যুক্ত একটি বড় বই “চৈতন্য চিন্তন” প্রকাশিত হয়েছে।
ঐ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। মাটির ছন্দে  বইটি মাটি উৎসবে স্বাক্ষর করে উদ্বোধন করেন মহাশ্বেতা দেবী। মানুষ রামকৃষ্ণ বইটি ঠাকুরের ১৭৫তম জন্ম তিথিতে বেলুড়মঠের শ্রী শ্রী ঠাকুরের
গর্ভমন্দিরে উদ্বোধন করেন পূজনীয় পূজারী মহারাজ।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =লেখা কি শিখে লেখা যায় না অনুভবের প্রয়োজন আছে?
বিশ্বনাথ পাল =অনুভূতি না থাকলে অনুভব আসে না। অনুভব থেকেই লেখা শুরু হয়। তাই শিখে লেখা যায় না। কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শেখাটা জরুরী না হলেও কবিতার সাজসজ্জার ক্ষেত্রে তা জরুরী।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ বিষয়ে কিছু বলুন।
বিশ্বনাথ পাল =বাংলা সাহিত্য বিশাল এক অক্ষয় বট বৃক্ষ।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর   বঙ্কিমচন্দ্র  রবীন্দ্রনাথ  শরৎচন্দ্র  জীবনানন্দ সুকান্ত সুনীল শঙ্খ শক্তি থেকে জয় গোস্বামী শীর্ষেন্দু সঞ্জীব – – – – যেখানে  নিরন্তর সাধনা করছেন  তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল থাকবে। তবে জেরক্সের দৌলতে যেমন লেখা কমে গেছে তেমনি বোকাবাক্সের দৌলতে ব ই পড়ানো কমে গেছে। মোবাইল আমাদের বই পড়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =ইদানিং কত গুলি পত্র পত্রিকায় লেখা লিখি করছেন?
বিশ্বনাথ পাল =ইদানিং দশ বারটি পত্রিকাতে নিয়মিত লেখা বেরোচ্ছে।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =ফেসবুক কি বাংলা সাহিত্যকে নতুন আলো দেখাচ্ছে?
বিশ্বনাথ পাল =আংশিক সত্য। কেন না শক্তি শালী এই মাধ্যমে ও সাহিত্য চর্চা হচ্ছে।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =ভালো লিখতে গেলে ভাল বই পড়তে হবে কি?
বিশ্বনাথ পাল =সাহিত্য তো বহতা নদীর মত। মাঝে মাঝে বাঁক বদল হয়। এই বাঁকের  সঙ্গে পরিচিতির জন্যই ভাল বই পড়া দরকার।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =লেখকের কোন গুণটা থাকা জরুরী?
বিশ্বনাথ পাল =ছোট রং পাত্র নিয়ে যেমন বড় ছবি আঁকা যায় না তেমনি ছোটমন নিয়ে মহৎ সৃষ্টি সম্ভব নয়। লেখকের চোখ কান এ জন্য সর্বদা খোলা থাকা জরুরী।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =বর্তমানে কি ধরনের লেখা বেশি লিখছেন?
বিশ্বনাথ পাল =ছোট গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, গান, ছড়া সবই লিখি। গল্প আর প্রবন্ধ টাইপ করতে বেশী সময় লাগে বলে সাহিত্য – শ্রুতির বন্ধুরা পান না। এই জানুয়ারিতে একটা ছড়ার বই বের হচ্ছে।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =ভালো লেখার সংজ্ঞা কি?
বিশ্বনাথ পাল =পাঠক যা গিলবে তা নয়, পাঠকের অনুভূতিকে লেখার জন্য পাঠক যে লেখাকে একান্ত  নিজের বলে স্মৃতির মণিকোঠায় সংগ্রহের জন্য উদগ্রীব হবেন আমার মতে সেটাই ভাও লেখা।
.
সাহিত্য – শ্রুতি =আপনার ভাবনায় পাঠকেরা কি খূব উপকৃত হচ্ছেন ফেসবুকে প্রকাশিত লেখা থেকে?
বিশ্বনাথ পাল =ফেসবুকে কবিতা লিখব – এই রকম ইচ্ছা আমার ছিল না। একদিন হটাৎ আপনাদের ঠিকানা আমার মোবাইলে ভেসে ওঠে। কৌতুহলবশত তাৎক্ষণিক ভাবাবেগে চটজলদি একটা লেখা পাঠিয়ে দিই। পরক্ষণেই ঠিকানা ইত্যাদির জন্য রিকোয়েস্ট পাই। ঠিকানা পাঠানোর কিছুক্ষণ পরেই আপনাদের ওয়েব পেজে তা স্থান পায়।
তার পর মোবাইল নিয়ে খুটখাট করে আমার অদক্ষ হাতে টাইপ করে যখন যা পাঠিয়েছে তা-ই শুধু স্থান পায় নি। সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য প্রশ্নমালাও পাঠিয়েছেন। এজন্য আপনাদের শুধু ধন্যবাদ দিলে আপনাদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হবে।
আপনাদের পেজে লেখা পড়ে আমার কাছে অপরিচিত কিন্তু এই পরিবারের প্রাণের সম্পদেরা যে ধরণের মন্তব্য করেছেন তাতে আমি আপ্লুত। আমার লেখায় পাঠকেরা উপকৃত কিনা এ ভার পাঠক ওপরেই রেখে সবিনয়ে জানাই মরমী পাঠকদের মন্তব্যে আমি বিশেষভাবে উপকৃত  হয়েছি বলেই কল্পতরু দিবস থেকে যে নতুন বছর শুরু হয়েছে তা যেন আপনাদের সকলের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সমাজ জীবনে সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি ডেকে আনে। নমস্কার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *