আমার আমিকে প্রতিনিহিত খুঁজে ফেরা

 বন্য মাধব

সোনারপুর থেকে আমারই তৈরি বেসরকারি শিশু সংসদ স্কুলটি ১৫ কিমি দূরে ভাঙড় থানার( ভাঙ্গড়) চন্দনেশ্বর( চংসর) বাজারে, ঝাউতলায়।ওখান থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে আমাদের চোদ্দপুরুষের বাসস্থান শাঁকসর( শাঁকশহর) অঞ্চলের ডিঙেভাঙা( ডিঙ্গাভাঙ্গা) গ্রাম।১৯৯৩ সালের প্রথমে যখন স্কুলটি গড়ি সহপাঠী দু’জনকে নিয়ে তখন বাস সার্ভিস এত ভাল ছিল না।

হুটহাট বন্ধও হয়ে যেত।সে আরেক ভোগান্তি।তখন ট্রেনে করে চাম্পাটি ( চম্পাহাটি) হয়ে যেতে হত। সেখানেও সকাল সকাল কিছু পাওয়াও যেত না। মাছের গাড়িতে করেও গেছি।সে সময় সোনারপুর থেকে তাপস চট্টোপাধ্যায় এবং অপর্ণা চট্টোপাধ্যায়ও আমার সঙ্গে যেত।বিদ্যালয়টি গড়ে তুলতে এরা দু’জনেই অক্লান্ত সময় দিয়েছে ও পরিশ্রম করেছে।

বিদ্যালয় দাঁড়াল, বাস সার্ভিসও ভাল হল।কিন্তু বাধ সাধল আমার জীবিকা পরিবর্তন।স্কুল তৈরির সময় পার্ক স্টীটের, মল্লিকবাজারের মুখে সেন্ট জুডস্ একাডেমিতে ইভিনিং সেকশনে পড়াতাম।সি বি এস ই স্কুল। আমার ক্লাস, নাইন থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত।কিন্তু স্কুলটি এ্যাফিলেটেড নয়।ফলে অন্য স্কুলের নামে ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষা দিত।আর আমার সাবজেক্ট বাংলায় এরা খুব খুব কাঁচা ছিল।

যাই হোক, রোজ যেতাম ডিরোজিওর সমাধির পাশ দিয়ে।আবার একটু দূরেই মাইকেল শায়িত। এরপরে স্কুল, বাড়ি পরিবর্তন করে এশিয়াটিক সোসাইটির কাছে গেল। তখনও সেই আগের মতই পার্ক সার্কাস নেমে হাঁটা পথে স্কুল করেছি। সকালে শিশু সংসদ, বিকালে সেন্ট জুডস্, আর সন্ধ্যায় যাদবপুরে বি.এড পড়া।ক্লান্ত, বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফেরা।এই নিত্যদিনের রুটিন বদলালো স্কুলে আমাদের ইভিনিং সেকশন বন্ধ হবার ফলে।

বি.এড শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম জার্নালিজমের এম.এ তে।ডে কোর্স।কয়েকমাস পরেই সি.পি.আই এর মূখপত্র কালান্তরে রিপোর্টার হিসাবে যোগ দিলাম।আবার তিনমুখি কাজ।

এভাবেই চলছিল।শেষে ১৯৯৭ এর মাঝামাঝি রাজ্য সরকারের সেচ ও জলপথ বিভাগে ঢুকে পড়লাম লোয়ার ডিভিশন এ্যাসিটেন্ট হিসাবে।প্রথম পোষ্টিং মেদিনীপুর টাউনে। কালান্তর, শিশু সংসদ দু’টোই ছাড়তে বাধ্য হলাম।২০০৭ এ আবার শিশু সংসদ পুনর্গঠনে লেগে পড়লাম।এর সেকেন্ডারি সেকশন খোলা হল।টিমটিম করে শুরুও হল।

যাতায়াতের সুবিধার জন্যে মোটরবাইক চড়া শিখলাম। একটা বাইকও কিনে ফেললাম। সময় বেশ হার মেনেছিল এইসময়।কিন্তু ২০১৩ এর ৫ জুলাই গুরুতর বাইক দুর্ঘটনায় পড়লাম। মৃত্যুর সঙ্গে কুস্তি করে জয়ও পেলাম।কিন্তু অনেক কিছুই জীবন থেকে হারিয়ে গেল। ১ম কুস্তি আই সি সি ইউ তে – ১৪ দিন। ২য় কুস্তি অর্থোপেডিক বিভাগে – ৪০ দিন।মোটমাট ৫৪ দিন কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কপাল ভাল সে সময় আমার চক্ষুচিকিৎসক দাদা এই হাসপাতালে ছিলেন।

আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে তিনিই ছিলেন সেনাপতি।৩য় কুস্তি নতুন করে হাঁটতে শেখা – ১২০ দিন পর। ৪ র্থ কুস্তি কাজে যোগ দেওয়া -১৮০ দিন পর।ফলাফল — ৫০ শতাংশ শারীরিক সক্ষমতা হারানোর সরকারী সার্টিফিকেট লাভ।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যখন নট নড়ন চড়ন করে দিন কাটতো তখন আমার শুধু কান্না পেত। প্রায়ই ডুকরে কাঁদতাম। ভাঙা কোমর আর বাঁ হাটুতে অসহ্য যন্ত্রনা। নিজের কোন কাজ করবার ক্ষমতা ছিল না।ওঠে বসা দূরস্থান পাশটুকুও ফিরতে পারতাম না। বাঁ পায়ে হাঁটুর নীচে আর ডান পায়ে থাই এবং হাঁটুর নীচে হাড় এফোঁড় ওফোঁড় করে রড ঢুকিয়ে ট্র্যাকসনে ঝোলানো দু’পা।

এখন জীবন অন্যখাতে। আমার আমিকে প্রতিনিহিত খুঁজে ফেরা। দিন চলে যায় রাত চলে যায়। আছি আজও বেঁচে আছি।

( দুর্ঘটনাবেলা   )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: