আমার কলকাতা !!

সেবন্তী গঙ্গোপাধ্যায়

উমা দেখে বেরোনোর সময়ে মনে হয়েছিল, একজন অসুস্থ শিশুকে দুর্গাপুজো দেখানোর জন্য,একটা গোটা শহর মেতে উঠলো-এও কি সম্ভব? তারপরই মনে হলো,হয়তো সম্ভব,কেবলমাত্র শহরটার নাম কলকাতা বলে। লেক মলে সিনেমা দেখে বেরিয়ে, রাসবিহারী মোড়ে দাঁড়িয়ে,তাকালাম একবার চারিদিকে-আমার শহরটার দিকে।

মালতি বিদ্যামন্দির,লেক মার্কেট, চার মাথার ক্রসিং, মাদার টেরেসার ছবি,হলুদ ট্যাক্সি, নীল-হলুদ বাস,প্রায় অবলুপ্ত হওয়া ট্রাম আর সিগনালে আটকে থাকা অজস্র গাড়ি-সব কিছুকে কেমন যেন ভীষণ নিজের মনে হলো। সবাই বলে শহরটা যেন কবেকার যুগে থমকে গেছে-চাকরি নেই, শিল্প নেই,নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা নেই,গোটা শহরটা নাকি একটা আস্ত বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হতে চলেছে আগামী কিছু বছরে।

আছে বলতে খানিকটা বস্তাপচা আবেগ,ফাঁকা হুঙ্কার,খানিকটা পলিটিক্স,ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল এর অন্ধ সমর্থন,আর আছেন আমাদের একজন কবি যিনি মোটামোটি সব পরিস্থিতির জন্য ভেবে ভেবে গান লিখে গেছেন-বাঙালির জীবনের অগ্রগতির ইতিহাস এখানেই এসে থেমেছে-এইসব শুনতে শুনতে বড় হওয়া  সত্ত্বেও কিভাবে যেন শহরটাকে বড্ডো ভালোবেসে ফেললাম।

চাকরিসূত্রে কলকাতার বাইরে গিয়েও, সর্বক্ষণ খুঁজে বেড়াই রবীন্দ্রাসদন,নন্দন চত্বর,নিউ মার্কেট-খুব মন থেকে কাউকে চাইলে নাকি মানুষ তার দেখা পায়-আমরাও খুঁজে পেলাম ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে ‘মিন্টো পার্ক-এক্সাইড-পার্ক স্ট্রিট’।commercial street এ গিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি ‘দেখ এই জায়গাটা ঠিক আমাদের নিউ মার্কেটের মত না?ট্রিনিটি সার্কেল এর আশপাশটা আমাদের exide এর মত লাগে।

অর্থাৎ প্রবাসে গিয়েও নিজের দেশ কে খুঁজে বেড়ানো।এত বছর history, civics পড়েও কিরকম নিজের জায়গটাকে ‘দেশ’ বলে ফেললাম! আমরাই বোধহয় একমাত্র জাতি যারা দেশটাকে দুভাবে ভাগ করেছি – ‘বাঙালি’ আর ‘অবাঙালি’।।যাইহোক দুবছরে শেষ হলো আমার প্রবাসের মেয়াদ। ফেরার আগে অনেকেই বলেছিল, এত ভালো শহর ছেড়ে আবার ওই ‘dead city’ টায় ফিরে যাবি? একেবারে যে ভয় পাইনি তা বলতে পারিনা।

একটা নিশ্চিত career ছেড়ে আবার পড়াশোনা- অনির্দিষ্টের দিকে পাড়ি- তবু শেষ পর্যন্ত সাহস করে কাজটা করেই ফেললাম।আবার শুরু হয়েছে পড়াশোনা। বেশ অনেকটা শহরের মধ্য দিয়ে রোজ পৌঁছে যাই গন্তব্যে- আবার একটু একটু করে চিনছি তিলোত্তমা কে।

বেশ কয়েকদিন ধরে সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা দৃশ্যে চোখ আটকে যাচ্ছে-রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা তাঁবু-তাতে তিনজনের সংসার- বলা বাহুল্য আদর্শ সুখী গৃহকোণ বলা যায়না তাকে-তবু রোজ যাওয়া আসার পথে আমি অনেকখানি বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পাই সেখানে- বেশিরভাগ দিন দেখি,ওই একচিলতে জায়গার মধ্যে ভদ্রলোক ঘুমোচ্ছেন ,হয়তো দৈনিক পরিশ্রমে ক্লান্ত,ভদ্রমহিলা একদিকে স্টোভে রান্নায় ব্যস্ত,অন্যহাতে একটা হাতপাখা , প্রচন্ড গরমে স্বামীকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন-আজ আবার দেখলাম উল্টো ছবি, স্ত্রী ঘুমোচ্ছেন, ভদ্রলোক হাওয়া করছেন।৫-৬বছরের শিশুপুত্রের মুখে কি অনাবিল হাসি।

নতুন করে চিনলাম আবার জীবন কে-adjustment মানে হেরে যাওয়া নয়-নিজের একচিলতে আনন্দ বাকিদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার নাম ও adjustment-প্রচণ্ড গরমে,ফুটপাথের ধারে, একটা তাঁবুতে কষ্ট করে বেঁচে থাকা সংসারে কি হতে পারে এতখানি আনন্দের উৎস?এর উত্তর বোধ হয় আমাদের শহর জানে।

ভিড় মেট্রোতে একজন বৃদ্ধাকে নিজের জায়গা ছেড়ে বসতে দিতে,তিনি আমার ব্যাগটা হাত থেকে নিয়ে টানাটানি করেন সেটা নিয়ে আমার দাঁড়াতে অসুবিধে হবে মনে করে-আমি যত বলি ব্যাগটা বেশ ভারী, ধরতে হবেনা,উনি বলেন নানা আমাকে দাও এত ভারীটা নিয়ে কেন দাঁড়াবে? তারপর পাশের সিটটা খালি হওয়ায় প্রায় ধমকের সুরে বলেন “এখানে আর কেউ বসবে না,ওকে বসতে দাও।”

আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের মধ্যে থেকে দুম করে গিয়ে বসে পড়বো,সেই কথা ভেবে আমিও অপ্রস্তুত-এইভাবে সমস্ত শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছেন আমার কত অচেনা আত্মীয়-আত্মীয়া। বৃষ্টিতে ছাতা ছাড়া বেরিয়ে ভাবছি কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিলে একটু কম ভিজবো-হঠাৎ পাশের দোকানের কাকু একটা প্লাস্টিক দিয়ে বললেন “এটা মাথায় দিয়ে নাও,তাহলে ভিজবে না।”

ধন্যবাদ কথাটা বড্ডো ছোট-এত গুলো বছর ধরে এই শহরটার কাছে একটু একটু করে বাঁচতে শিখেছি-শিখেছি পড়ন্ত বিকেলে গঙ্গার ঘাটে কিচ্ছু না করে বসে থাকা যায়,শিখেছি দক্ষিণাপণের সিঁড়িতে বসে ac ছাড়াই দিব্বি ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা মারতে, জেনেছি আকাশের অনেকগুলো নাম হয়, মেঘলা আকাশ,পরিস্কার আকাশের পাশাপাশি ‘পুজোর আকাশ’ ।

মহালয়ার দিন পুরো শহরটা একসঙ্গে ভোর ৫টায় উঠে পড়ি ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির’ এর সুরে। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে রাস্তায় বেরোলে সারা শহর জুড়ে জুঁই ফুলের গন্ধ, আর নানা রকম সুরে চারিদিক থেকে ভেসে আসে ‘হে নুতন,দেখা দিক আরবার, জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’  শিল্প নেই, ভাল প্রজেক্ট আসেনা,

সবাই ব্যাঙ্গালোর,চেন্নাই কিংবা বম্বেতে পাড়ি দিলেও, যখন কোনো একটা বিশেষ দিনে রাস্তায় বেরোই, সকলের হাসি-হাসি মুখগুলো দেখে মনেই হয়না যে এই শহরটায় কিছু নেই। শীতকালের বিকেল বেলায় নন্দন চত্বরে এখনো বারবার যাই আর প্রত্যেকবার নতুন করে উপলব্ধি করি অনেক কিছু না পাওয়ার মাঝেও ‘কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: