আমি ছেলে তাই

 সম্পূর্ণা সাহা

বারান্দার ইজি চেয়ারে বেশ জাঁকিয়ে বসে চোখ বুজলেন সত্যবাবু।কিছুদিন ধরেই তাঁর শরীরটা খুব একটা ভালো না।বয়স তো হচ্ছে নাকি!এক এক করে রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে।সাথে চলছে নানা পথ্য।ঘন্টা দেড়েক আগেই আজ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।জ্ঞান যখন ফেরে, তখন উনি ডাক্তারসহ পরিবারের সদস্যবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত।ডাক্তারবাবু কিছু টেস্ট দিয়েছেন,সেগুলোর জন্য কাল আবার যেতে হবে।এসব ভেবেই কেমন একটু শিহরিত হলেন।বুড়ো বয়সে মন আর এসব চায় না।

সত্যবাবু মানে সত্যপ্রদ সেন হলেন বছর আটাত্তরের এক বৃদ্ধ।দুই ছেলে-বউমা,নাতি-নাতনি,গিন্নী নিয়ে তাঁর সংসারটা সাবেকী বাড়িটাকে ঘিরে বেশ জমজমাট।তাই তাঁর অসুস্থতায় বাড়িটা নিস্তেজ হলে যেন ভালোলাগে না।সাধারণত একটু আধটু অসুস্থ লাগলে চেপেই যান,নাহলে বাড়িসুদ্ধু সকলকে ব্যস্ত করা।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তাঁর বাবার কথা মনে পড়ে।বাবাও বার্ধক্যে এমনটা করতেন।শরীর খারাপ হলে বলতেন না।আজ তিনি বুঝছেন কারণটা।একটা সংসারকে আগলে রাখা মুখের কথা নয়।’সংসারের কর্তা’ বলতে যতটা সহজ,কাজটা ততটাই কঠিন।আপনজনদের ভালোমন্দ বুঝে ভালোবাসা,শাসন করা,প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া,সারাজীবন অর্থ উপার্জনের চিন্তা নিয়ে চলা,

পরিবার যেমন হোক-তাদের ভালো রাখার দায়িত্বটা মাথায় সবসময় ঘুরতে থাকে।প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও যেন রেহাই নেই।বিপদে ঘরে বসে থাকলে লোকে আঙুল তোলে,কাপুরুষ বলে।খুব কষ্টে চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়ালে তা মুছতে হবে আড়ালে,নাহলে লোকে বলবে মেয়েদের মতো কাঁদে।

মাসের শেষে সঞ্চয় থেকে বউকে নতুন শাড়ি কিনে দিলেও নিজের তিন বছরের পুরানো জামাটা এখনও “ভালো আছে” বলে কাটিয়ে দিতে হবে।নিজে একটু বেশি কষ্ট করে হলেও ছেলেমেয়েকে ভালো করে লেখাপড়া শেখাতে হবে।আবার পত্নীনিষ্ঠ স্বামী হলে মা-বাবাকেও ছাড়তে হতে পারে।স্কুল-কলেজের জীবনে বন্ধুদের সাথে মারামারি করতেই হবে-বাকি ছেলেদের মতো।বাড়িতে দিদি বা বোনের বিয়ের প্রস্তুতির সময় “এমাসে খরচটা বেশী তাই হবে না” কথাটা শুনে মেনে নিতে হবে।

সাধারণ পরিবারের ছেলে হয়ে বড়লোকের মেয়ের দিকে তাকানোটাও যেন অপরাধ মনে হবে।চাকরী না পেলে বেকার বলে সবার কাছে কথা শুনতে হবে।হয়তো বা প্রেমিকার বিয়েতে ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে হাসি মুখে দাঁড়াতে হবে নতুন বরের পাশে।ছোটো থেকেই একটু অন্য আচরণ দেখলে “মেয়েলী”-কথাটা শুনতে হবে।তুমি ছেলে তাই এরকম করবেনা-এসব শেখানো হবে।

একের পর এক এসব কথা মাথায় আসে সত্যবাবুর।ওই সাইকোলজির ‘স্ট্রিম অফ কনশাসনেস্’-এর একটা ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় ছুটে বেড়ানো মতো সত্যবাবু ভাবনায় ছুটতে মশগুল।মনে পড়ে গেল তাঁর লেখক বন্ধু সত্যেনের সাথে একটা পুরানো আলোচনা।সত্যবাবু একদিন তাঁকে বলেছিলেন ছেলেদের জীবন নিয়ে একটা লেখা লিখতে।উত্তরে সত্যেনবাবু জানান ছেলেদের নিয়ে লিখলে পাঠক মহলে ঠিক চলবে না।

এযুগ নারীদের লড়াইয়ের,নারীশক্তি প্রতিষ্ঠার;এযুগে মেয়েদের নিয়ে লিখলে বেশী গ্রহনযোগ্য হবে।তবে সত্যবাবুর মন মানেনি,তিনি বারংবার অনুরোধ করেছিলেন।শেষে সত্যেনবাবু বলেন-“মনকে স্বান্ত্বনা দিতে হবে এই ভেবে যে আমাকে সবকিছু মেনে নিতে হবে মুখ বুজে।সময় আর পরিস্থিতির সাথে লড়তে হবে পরিবারকে একটা আঁচড় না লাগতে দিয়ে।দুশ্চিন্তাতেও শান্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে,সাথে এরকম অগুণতি কতকিছু করতে হবে।আমি ছেলে তাই করতে হবে।এতকিছুর পরেও কৃতিত্ব দেবে না কেউ…”।

“এই নাও ওষুধটা”-গিন্নীর ডাকে চিন্তাভগ্ন হলো তাঁর।ছোট বৌমা দেখে বলল-“সত্যি মা বাবাকে সবসময় আগলে রাখেন”।

“হ্যাঁ,একদম ঠিক কথা বউমা”-বলে গিন্নীর দিকে তাকিয়ে করুণ হাসি হাসলেন সত্যবাবু।এই হাসিটায় যেন তিনি লুকিয়ে রেখেছেন নিজের সমস্ত দায়িত্ব-কর্তব্যের হিসাব আর সমস্ত কৃতিত্ব দিয়েছেন নিজের স্ত্রীকে;আগলে রাখার কৃতিত্ব;বৃহত্তর পুরুষশ্রেণীর একজন দৃষ্টান্ত হয়ে মাত্র।

.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: