আর্দ্রতা  //  অভ্র  ঘোষাল

অনুভব বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। ন’-তলার flat থেকে দেখে শহরটাকে সম্পূর্ণ অন‌্যরকমের মনে হয়।এতো ওপরে flat নেওয়ার ইচ্ছে ছিলো না ওর;lift-টিফট খারাপ হয়ে গেলে বিপত্তি হবে। তা ছাড়া, উঁচুতে উঠলে মাথা ঘোরে অনুভবের, যাকে বলা হয় vertigo। ইতি এসব পাত্তা দেয়নি। খুব জোর করেছিলো। বলেছিলো, “বোকা বোকা কথা বলো না তো। তা হলে তো footpath-এ থাকাই সর্বোত্তম! তোমার মাথাও ঘুরবে না।

আমাকে বিয়ে না করে কোনও এক footpath-বাসিনী ‘বনলতা সেন’-কে বিয়ে করলেই পারতে! Footpath-এ হতো তোমার আর তার লাল-নীল সংসার। দেখো, তোমার মাথা ঘুরুক যা-ই হোক আলিপুরের flat-টা না কিনলে আমি কিন্তু Salt Lake-এ বাবার ওখানে back করছি.. এবার ভেবে নাও কাকে choose করবে? Footpath, না, তোমার বউ? “

ইতির এই মজার মজার কথাগুলো শুনতে অনুভবের বেশ লাগে! ইতি যতোই যা কিছু বলুক না কেন, সবই যেন মন দিয়ে শোনে ও।ওর ভালো লাগে ইতির কথাগুলো শুনতে।খুব ভালো কথা বলার ক্ষমতা সকলের থাকে না, কিন্তু সৌভাগ‌্যবশত তা ইতির রয়েছে।তবে অনুভব এখন বেশ বুঝতে পারছে ইতি জোর করে flat-টা কিনিয়ে নিয়ে ঠিকই করেছে।আর অদ্ভুতভাবে বিয়ের সাত মাসের মধ‌্যেই এই vertigo-র ব‌্যাপারটা যেন বেমালুম vanish হয়ে গিয়েছে! মনে মনে এর জন‌্য প্রায়ই ধন‌্যবাদ জানায় ও ইতি-কে।

এই বারান্দাটা না থাকলে হয়তো কোনও দিন কলকাতা মহানগরীর এই অপূর্ব রূপ ওর দেখাই হতো না। সাহিত‌্য নিয়ে খুব বেশি চর্চা অনুভব কোনও দিনই তেমন গভীরভাবে করেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই এতো সকালে বর্ষামুখর কলকাতা-কে দেখে যেন স্বত:স্ফূর্তভাবেই romanticism জেগে ওঠে অনুভবের মনে। 

আজ ঘুমটা ভেঙেছে ঠিক সাড়ে ছ’-টা নাগাদ। ঘুমটা ভাঙতেই খাটে উঠে বসতে গিয়েছিলো ও কিন্তু পারলো না। দেখে, ওর বুকের ওপর চিবুক রেখে শুয়ে আছে ইতি, এক-দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মুখে একটু একটু হাসি লেগে আছে। আর ঠিক মাথার কাছের জানলাটা দিয়ে ঝিরিঝিরি আর্দ্র বাতাস এসে ঢুকছে ঘরের মধ‌্যে, আর ঘরের মধ‌্যে একটা অদ্ভুত আলো-আঁধারির খেলা চলছে তখন।অনুভবের মনে হয়েছিলো, এই মেয়েকে যেন কতো আগে থেকে ও চেনে। ইতি যেন ওর কবেকার প্রেমিকা।

অথচ বিয়েটা ওদের একেবারেই প্রেমঘটিত নয়, সম্পূর্ণরূপে arranged। কিন্তু এই সাত মাসের মধ‌্যেই ও যেন স্রেফ ডুবে গিয়েছে ইতির প্রেমে। ইতি ওর নাকটা নাড়াতে নাড়াতে বললো, “কী ব‌্যাপার, আজ এতো তাড়াতাড়ি নিদ্রাভঙ্গের কারণটা কী? স্বপ্ন দেখছিলেন? Any ways, আজ কিন্তু office যাওয়া বন্ধ sir! আজ আপনি সময় কাটাবেন আমার সঙ্গে। কোনও কথা শুনবো না। “

অনুভব একটু হেসে ঘুম-জড়ানো স্বরে বলেছিলো, “আজকে না যেতে দেওয়ার কারণটা একটু জানতে পারি madam? আজ তো বিশেষ কোনও দিন বলে আমার মনে পড়ছে না। “

ইতি একটু গাল ফুলিয়ে বললো, “তুমি না ভীষণ unromantic! আজকের আবহাওয়াটা একবার তো দেখো ! মেঘলা আকাশটা যেন স্থিরভাবে ঢেকে রেখেছে গোটা শহরটাকে, হাওয়ায় ভাসছে হালকা হালকা ঠান্ডা আমেজ! কাল সারা রাত ধরে, তুমুল বৃষ্টি হয়েছে। হাওয়ায় প্রেমের উপস্থিতি বুঝতে পারছো না?”

অনুভব হেসে বললো, “আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি! ওতো আর গাল ফোলাতে হবে না। আজকে যাচ্ছি না। “

ইতি খুশি হয়ে বললো, “That’s like a good boy! নাও, এবার ওঠো তো! আটটার আগে তো আর ঘুম ভাঙে না! আজ যখন একটু আগে ঘুম ভেঙেছে তখন আর শুয়ে থেকো না! ওঠো; উঠে বারান্দায় গিয়ে একটু দাঁড়াও। অপূর্ব একটা ‘bird’s eye view’ feel করতে পারবে! আমি চা বানিয়ে আনছি। “ইতি উঠে দাঁড়ায়, তারপর nighty-র ওপরে house-coat-টা চাপিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। “

এখন সকাল সাতটা ; বিছানা ছেড়ে উঠে সোজা সেই যে এই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, এখনও এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সত‌্যিই, অপূর্ব সুন্দর দৃশ‌্য! সাত সকালের আকাশ আজ বোধ হয় প্রাউ তিন বছর পরে দেখার সুযোগ পেলো ও।কলকাতা কাল রাতের বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছে। বৃষ্টি এখনও হয়ে চলেছে, ঝপঝপ… ঝপঝপ…। এই নতুন flat-এ সাত মাস হলো এসেছে ওরা। এতোগুলো মাস কাটিয়েও ওর মনে হয়, যেন একটা অচেনা জায়গায় এসে রয়েছে। এর মধ‌্যে ইতিও বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।

হাতে চায়ের tray। সেই tray পাশের tool-এর ওপরে রেখে স্বামীর কাঁধের ওপর শরীরের ভার খানিকটা রেখে খুশি-খুশি গলায় আলতো সুরে গাইলো, “মন মোর মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিক-দিগন্তের পানে, নি:সীম শূন‌্যে শ্রাবণবর্ষনসঙ্গীতে রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম। “অনুভব বলে উঠলো, “Splendid! তোমার গানের গলা তো দারুণ! এই ব‌্যাপারটা তো জানতাম না! বিয়ের পরে এটা কিন্তু একটা surprise দিলে তুমি আমাকে! আগে বলোনি কেন তুমি গান জানো? “

ইতি অল্প হেসে বললো, “বলিনি তো ইচ্ছা করেই। এরকম একটু আধটু চমক দেওয়া ভালো! নয় কি? তোমাকে তো কতো দিন পরে একটু কাছে পেলাম। নইলে তোমার কি একটুও ফুরসৎ আছে office থেকে? আজকে পেয়েছি তোমাকে আমার অনেক কাছে। “

এতোক্ষণ অনুভব সব শুনছিলো, এবার ঘুরে দাঁড়ালো। ইতির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ একটা চুমু এঁকে দিলো ওর গালে। ইতির গাল, নাক, ঠোঁট লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। জড়িয়ে ধরলো ও অনুভবকে। ইতির মাথার ওপর থুতনি রেখে অনুভব বললো, “We all are struggling for our existence ইতি। যুগের তালে ছুটতে ছুটতে আর ভালো লাগে না !

কিন্তু তা বললে খাবো কী? ছুটে চলাই জীবনের আরেক নাম। জীবনে বেগ এলেও আবেগটা যেন কোথাও উধাও হয়ে গিয়েছে ইদানীং। তবে, thanks to you madam। আপনি আছেন বলে তবু একটু শান্তি। “

ইতির শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর হয়ে আসে। এবার ঘোর কাটিয়ে ও বলে ওঠে,”আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে, নাও এবার চা-টা ধরো তো দেখি! ঠান্ডা জল মনে হবে এরপর। “

অনুভব নির্বিকার, ও আবার বলে ওঠে, “Thank you so much ইতি, thank you so much for coming in my life! I love you! “

ইতি অনুভবের চোখে চোখ রেখে বলে, “তোমাকে খুব ভালোবাসি অনুভব! খুব! “আকাশে তখন চলছে কালো মেঘেদের ঘনিষ্ঠতার খেলা আর দুটি প্রাণকে ঢেকেছে প্রেমের আবরণ। চায়ের পেয়ালা থেকে উঠে আসে বাষ্প,মিলে যায় আর্দ্রতার সঙ্গে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: