ই মেলা কেমন মেলা

অমৃতাভ দে

ঝিরি ঝিরি বহে লদী   ।  সিরি সিরি হাওয়া   ।  চল মিনার মা সৃজন মেলা যাব” মনের আর দোষ কী বলাে! মন তাে ছুটবেই। কবি যেন আমার কথা ভেবেই চলেন ‘মন ছােটে মাের তেপান্তরে’!

কয়েকজন কবির ডাক পড়ল পুরুলিয়ায়, সৃজন উৎসবে। কোনদিন পুরুলিয়া যাই নি।

আমন্ত্রণ লুফে নিলাম। নভেম্বরের প্রথম  রাত ১১-০৫’এর চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারের রিজার্ভেশন কামরায় উঠে বসলাম ততাপাগলরা। যদিও আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য কবিতাপাঠ নয়,

লাল মাটির কন্যাকে প্রথম খার আবেগটাই কাজ করছিল বেশি। সেখানকার মানুষের প্রাণের উৎসব সৃজনভূমির সৃজন উৎসবের গল্পই শােনাই আজ।

চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারের টিকিট কাটা ছিল আদ্রা পর্যন্ত। আদ্রা থেকে ট্রেনটা দুটো ভাগ হয়ে যায়। একটা অংশ যায় বােকারাে, অন্য অংশ পুরুলিয়া হয়ে চক্রধরপুর।

পুরুলিয়া স্টেশন থেকে আমরা মানবাজার হয়ে পৌঁছলাম কুমারী গ্রামে। ছবির মতাে সাজানাে পুরুলিয়ার খড়িদুয়ারা-কুমারীগ্রাম। নবেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনদিন ধরে এখানকার সৃজনভূমিতে হবে সৃজন উৎসব।

ভােরের ট্রেন পূর্ণিমার চাঁদকে সাক্ষী করে লালমাটি ছুঁয়েছে। খড়িদুয়ারা পুরুলিয়া শহর থেকে সত্তর কিলােমিটার দূরে। এই গ্রামের সৌন্দর্য চোখে লেগে থাকবে দীর্ঘদিন।

ঢেউ-খেলানাে রাস্তার ধারে পাহাড়ি-টিলা যার স্থানীয় নাম ডুংরি তারই উপরে উৎসবের আয়ােজন। চারিদিকে জঙ্গল। দূরে বয়ে চলেছে কুমারী নদী। মুকুটমণিপুরের বিপরীত দিক এটি। মানবাজার আর বান্দোয়ানের মাঝে অবস্থিত খড়িদুয়ারা-কুমারীগ্রাম।

এখানে থাকার বিশেষ কোনও ব্যবস্থা নেই। মানবাজার কিংবা পুরুলিয়ার হােটেলে থাকতে হবে। উৎসবের সময় গাড়ি করে এসে সারারাত উৎসবে মেতে থাকার মজাই আলাদা।

উৎসবে এসে নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে ভুলবেন না। আমরা বেরিয়েছিলাম – জঙ্গলের পথ পেরিয়ে নদীর ধারে।

কুমারী নদীর উপরে গড়ে উঠেছে কুমারী-ড্যাম। জানা গেল ড্যামে জল থাকার সময়গুলােতে তারা ওই জমিতে চাষ করে। অন্যসময় মাছ ধরে। নদীর ধারে যে দুই-ঘর মানুষ থাকে তাদের আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতাে।

বাড়ির বউটি-ই তার স্বামীকে বললেন তিনি যেন আমাদের টিলার উপর নিয়ে যান আর সেখান থেকে একদিকে বিকেলের সূর্যাস্ত ও অন্যদিকে নদীর নীল জলরাশিতে গাছদের প্রতিবিম্ব দেখান।    চোখ জুড়িয়ে গেল।

পাহাড় নদীর কোলে মাথা রেখেছে। উঁচু টিলার উপরে দাঁড়িয়ে ।  নদীর কাছ থেকে নিলাম নীরবতার পাঠ। কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি শান্ত মুজের মধ্যে জীবনের অন্য অর্থ খুঁজে পেলাম যেন। তাদের ঘরে মা মনসার পুজো হয়। সন। সন্ধেবেলায় তারা মেলায় যাবে।

মাতবে মাদলের তালে। কোনরকম সরকারি গ ছাড়াই কয়েকজন সহৃদয় মানুষের চেষ্টায় তেইশ বছর ধরে এই উৎসব পালিত সেখানে।

এই উৎসব ওদের কাছে শিল্পের মেলামেশি জীবনের মহাসংগম।  উৎসব নিয়ে রচিত গানে শােনা যায় হৃদয়ের কথা – “ই মেলা কেমন মেলা ভাইরে কেমনে বলি ডুংরি জঙ্গলে ঘেরা প্রেমনদী মনােহর।”

পুরুলিয়া শহর থেকে এত দূরে নির্জন অপরূপ পরিবেশে সারারাত ধরে চলে ঝুমুর, ভাদু, টুসু, জাওয়া, বাউল গান, কীর্তন গান, মনসার পালা, রামকথা, রকমারি আদিবাসী নৃত্য, করম নাচ, ঘােড়া নাচ, নাচনী নাচ, রণ-পা নৃত্য, আদি শবর নৃত্য, ছৌ নৃত্য। ভিন্ন রাজ্য’র সংস্কৃতিও আপ্লুত করে।

নানা লােকবাদ্য সহযােগে লেপচাদের লােকনৃত্য, মিজোরামের লােকশিল্পীদের সুরমূৰ্ছনা চাদনি রাতকে প্রাণময় করে তুলেছিল। সর্ব অর্থে ব্যতিক্রমী এই মেলা।

এখানে রাজনীতি নেই, নেতা নেই, ভাষণ নেই, উদ্বোধন নেই, দর্শকাসনে নারী-পুরুষের দড়ি ধরে বিভাজন নেই। এখানে চাদ আছে, প্রেম আছে, টিলা আছে। আছে নানা আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক বাজনা-ঢাক-ঢােল-নাগরা-ফুলেট-ধামসা-মাদল।

সত্যিই হলদে টিলা, নীল জঙ্গল, সােনালি নদী আর জ্যোৎস্না নিয়ে তিন রাত ধরে চলা নাচ-গানের এই মহা উল্লাস আমাদের নাগরিক ক্লান্তির উপরে ছড়িয়ে দেয় মহুয়ার ফুল।

পুরুলিয়ার এই অঞ্চলের মানুষের অভাব, দারিদ্র্য, দুঃখ আছে। সব ভুলে তারা মেতে ওঠে আনন্দ-পরবে, আঁকড়ে ধরে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে।

তাদের মুখের হাসি, বাঁধভাঙা আবেগ জঙ্গলমহলের আতঙ্ক মুছে দেয়। মহুয়ার নেশায় মাতাল এই মানুষগুলাে বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের সংস্কৃতি।

খাবারের দোকানের পাশাপাশি বসেছে নানা হস্তশিল্প’র দোকান। যত রাত বাড়ে মানুষের ঢল নামে উৎসব প্রাঙ্গণে। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদমামা। দলে দলে শিল্পীরা আসছেন। কয়েকটা টেন্ট করা হয়েছে। শিল্পী-অতিথি-অভ্যাগতদের জন্য একটিই খাবারের জায়গা।

ভালােবাসার আবেশ-জড়ানাে খাবারের তৃপ্তিও আলাদা। একদিকে ধামসা-মাদলের তালে নৃত্য অন্যদিকে ঝুমুর গানের সুরে মাতােয়ারা একদল মানুষ।

আমাদেরও ইচ্ছে করে গাইতে –“মাথা বাঁধব বল খুঁপায়/শাড়ির আঁচল ফুল-তুলা/চল মালতি, সৃজনমেলা যাব/ইলিক-ঝিলিক-সিলিক শাড়ি পরবে চমকাব।”

আর একটি বিষয় সবার সঙ্গে শেয়ার না করে পারলাম না। নাচ দেখে ফেরার পথে মানুষের জটলা দেখে জানতে পারলাম এখানে মােরগের লড়াই চলছে।

মােরগ-লড়াইকে ঘিরে কয়েকশাে মানুষের উন্মাদনা অবাক করার মতাে। আহত মােরগের জন্য ডাক্তারবাবুও উপস্থিত। মােরগগুলিকে লড়াইয়ের আগে ট্রেনিং দেওয়া হয়। আহত মােরগ পরাজিত বলে গণ্য হয়।

শহরের ব্যস্ততা গ্রাস করেনি এখানকার লােকদের। হাজার হাজার মানুষ সন্ধে থেকে ভিড় জমান সৃজনভূমিতে। তাদের ভিড়ে আমি কখন হারিয়ে ফেললাম নিজেকে।


কখন যাবেনঃ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি বেড়ানাের আদর্শ সময়। সৃজন উৎসবের কথা মাথায় রেখেই যাওয়া উচিত। কীভাবেযাবেনঃহাওড়া থেকে বােকাবরা/চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার অথবা পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ধারে পুরুলিয়া। সেখান তেকে গাড়িতে কুমারীগ্রাম।

সরাসরি গাড়ি ভাড়া করে উৎসবে যাওয়া ভালাে। কোথায় থাকবেন। মানবাজার অথবা পুরুলিয়ায় হােটেল আছে। উৎসবের সময় সারারাত খােলা। আকাশের নিচে উৎসবে মেতে থাকতেই ভালাে লাগবে।

 

 

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: