একটি কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম

সঞ্জীব ধর

ফেব্রুয়ারি এসেছে,কিন্তু এখনো আসেনি বসন্ত।বসন্তের নির্লাজ সাজে এখনো সাজেনি বাংলা। এখনো চারদিকে কনকনে ঠাণ্ডার দাপট।শীতের কুয়াশায় এখনো মুখ ঢেকে রেখেছে বাংলাার শ্যামল।সারি সারি রসের হাঁড়ি ঝুলছে খেজুর গাছগুলোতে। ঘাসের উপর শিশিরবিন্দুগুলুসকালের রোদে মুক্তার মত ঝলমল করে।

শীতকালীন ছুটিতে শহর থেকে বাড়ি এসেছি কিছুদিন হচ্ছে।সন্ধ্যার পরপর-ই এখানে নিস্তব্ধ নিরবতা নেমেছ আসে।একে তো কৃষ্ণপক্ষের রাত তার উপর ঘন কুয়াশায় কিছু দেখা যায় না বাইরে।আমার শয়নকক্ষটা মূল ঘরের একেবারে দক্ষিণে।কক্ষটিতে একটি পুরাতন টেবিল ও চেয়ার রয়েছে। টেবিলটি ঘরের জানালা বরাবর।

জানালা দিয়ে বড়পুকুরটি দেখা যায়।পুকুরপাড়ে অসংখ্য কলাগাছ।দক্ষিণ কোনায় একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ পুকুরের দিকে ঝুঁকে রয়েছে।হয়তো কবিদের পর্যবেক্ষণে একে শোকে ঝুঁকে পড়ে বলবে।রাতেরবেলা এই গাছটি দিকেই নজর পড়ে বেশি।সন্ধ্যার পর বাইরে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে।তবু জানলাটা বন্ধ করতে ইচ্ছা হয় না।

কাল রাতেও একইরকম ঘটেছিল।রাত প্রায় দশটা পেরিয়ে গেছিল। খাবার শেষে সবাই শুয়ে পড়েছিল। ঘড়ির কাঁটাটা ঠিকঠিক করে ঘুরছিল।চেয়ারটা জানালার সামনে টেনে নিয়ে পুরানো কবিতার ডায়েরীটা খুললাম।অনেক দিন পর একটি কবিতা লিখতে ইচ্ছা জাগল।কিন্তু মনেরভাব ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না।

হটাৎ হাওয়াটা জোরে বইতে শুরু করল।একবার মনে হল জানালাটা বন্ধ করে দিই।কিন্তু হাত দুটো এগালো না।ঠাণ্ডায় হাত দুটো অসাড় হয়ে আসছিল।এক আধটু তন্দ্রাও লেগে আসছিল।মনে হচ্ছিল শরীরটা দূর্বল হয়ে আসছে। জানলার বাইরে চোখ পড়তে কিছু একটা আবছা ভেসে উঠল চোখের সামনে।আমি ভয়ে প্রথমে চমকে উঠেছিলাম।পর ধীরে ধীরে সবকিছু স্পষ্ট হতে লাগল।

একজন ছাত্র। হাতে দুএকটি বইও ছিল।মেডিকেলের বই হয়তো।গায়ের শার্টটির পকেট বরাবর একটি ছিদ্র। ঠিক সেখান থেকে রক্ত ঝরে ঝরে নিচের অংশটা লাল হয়েছে যাচ্ছে।চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল আমারই সমবয়সী। তার দৃষ্টিটা আমার দিকে নয়,আমার ডায়েরির দিকে।কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়বলে উঠলাম-

“আরে ভাই,দেখতেছেন না কবিতা লিখতেছি,এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

একটু ভালভাবে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। মনে হল আমার কবিতা লেখা দেখে তার ঈর্ষা হচ্ছে। একটু বিনয়ের সুরে বললাম-

“ওমা,কাউকে কবিতা লিখতে দেখলে বুঝি কাঁদতে হয়?”

হটাৎ শরীরটা কেন জানি তীব্র ঝাঁকা দিয়ে উঠল।ঘড়িরকাটার মত হৎস্পন্দনের ধ্বনিটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এই শীতেও কঁপাল থেকে ঘাম ঝরছে।আর তখনই স্পষ্ট শুনতে পেলাম-

“একটি কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম,শুধু একটি কবিতা। এই ভাষায় একটি কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম।লিখতে দিল না ওরা,লিখতে দিল না।”

জ্ঞান ফিরে আসলে দেখি আমি চেয়ারসহ মাটিতে পড়ে আছি।মস্তিষ্কের এই মতিভ্রমটা সকালে কাউকে বলতে না পারার দু:খ নিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: