একদিন সুনামগঞ্জের হাছান রাজার বাড়িতে

মিজানুর রহমান মিজান

জুলাই মাসের ১৮ তারিখ ২০১৭ সাল। আমি সবেমাত্র অপারেশন করে ডাক্তারের পরামর্শানুযায়ী বিশ্রামে আছি।আমার অসুষ্থতার খবর পেয়ে আমার লন্ডন প্রবাসী ভাগিনা দবির উদ্দিন স্ত্রী সন্তানসহ আসেন আমাকে দেখতে। আমি অপারেশন করালাম তাদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ও নিবিড পরিচর্যায়ে থেকে।একটু সুস্থ্যতার পথে।

ভাগনা ফিরে যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে।তাদের অভিলাষ একবার সুনাম গঞ্জের যাবার।ভাটি এলাকা পরিদর্শন ও কিছু পারিবারিক কাজ জগঝাপ ইউনিয়ন ভুমি অফিসে। সুনামগঞ্জ পরিদর্শন করা আমারই মতো আমার প্রবাসী ভাগিনী ও নাতিদের। তাই তাদের আর্তি পূরণার্থে এবং আমার ও দারুণ ইচেছ একবার সুনাম গঞ্জ ভ্রমণ করা। দিন তারিখ ঠিক করে ভোর ৮ ঘটিকায় রওয়ানা দিলাম নোহা যোগে লামাকাজি হয়ে সুনাম গঞ্জ রোড ধরে।

আমরা সকাল নয় ঘটিকায় পৌছলাম জগঝাপ ভূমি অফিসে। অফিস খোলা পেলাম। কিন্তু কর্মকর্তার আগমন এখন ও ঘটেনি। তাই চা পানের উদ্দেশ্যে পার্শ্বের অনতিদুরে স্টলে গেলাম। গাড়িতে রয়ে  গেলেন আমার প্রবাসী ভাগিনী তিন নাতিসহ।চা পান করলাম। আবার আসলাম অফিসে। পেয়ে গেলাম কর্মকর্তাকে। আমাদের কাংখিত কাগজের কথা বলতেই এবং আমি সাংবাদিক শুনেই তিনি আমাকে আশ্বস্থ করলেন, আপনি ঘুরে আসুন। আমি কাগজ রেডি করে রাখবো। আশ্বস্থতায় আনন্দই পেলাম। আমরা ছুটলাম লক্ষ্যপানে।

    বেলা সাড়ে বারোটায় পৌছলাম সুনাম গঞ্জ শহরে। চলে গেলাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে কিছু কাগজ সংগ্রহের নিমিত্তে। এখানে প্রায় ঘন্টা খানেক সময় অতিবাহিত হল। উদ্দেশ্য আমাদের সফল হয়নি। কারন আমাদের যে সকল কাগজ ও তথ্যের প্রয়োজন তা নাকি জমা হয়নি। তাই মনস্থ করলাম কিছু খেয়ে নেবার।

তাই ঢুকলাম একটি বড় হোটেলে।খাবার গ্রহণ শেষে অনেক আলাপ আলোচনায় সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম তাহির পুর তথা টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে আসা সম্ভব হবে না। সময় আমাদেরকে যাত্রা সংক্ষিপ্ত করণের আভাস দিচেছ। তাই সে আশা ছেড়ে দিয়ে মনোনিবেশ করলাম সুনামগঞ্জ শহরের অনতিদুরে অবস্থিত হাছন রাজার বাড়ি দর্শন করে বাড়ির দিকে ফিরে আসা।যেমন কথা বা সিদ্ধান্ত, তেমনি কাজে হলাম ধাবিত। আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিলাম সে উদ্দেশ্য সার্থক ও সফলতার চুড়ান্ত রুপদানে।

   দশ মিনিটের ব্যবধানে আমরা পৌছলাম হাছন রাজার বাড়ির ফটকে। সুরমা নদীর তীর ঘেষে হাছন রাজার বাড়িটির অবস্থান। আমাদের গাড়িটি ফটক অতিক্রম করে ভিতরে নিয়ে গেলাম। মুল গৃহের একটু আগে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম সবাই একে একে।ভিতরে প্রবেশ করলাম যখন আমরা তখন যাদুঘরটি একেবারে জনশুন্য। একজন তরুণ সেখানে সার্বক্ষণিক থাকেন।যার নাম হল রেদোয়ানুল ইসলাম হৃদয়। তিনি আমাদের গাইড লাইন দিলেন।

আমরা দেখতে লাগলাম যাদুঘরের প্রতিটি কক্ষ ঘুরে ঘুরে। ঐ তরুণ আমার পরিচয় জেনে আমাকে জানালেন তিনি হাছন রাজার গান গেয়ে শুনাবেন যদি আমরা আগ্রহ প্রকাশ করি। আমি সানন্দে সম্মতি প্রদান করলে তিনি একে একে তিনটি গান গেয়ে শুনালেন। বেশ ভালই লাগলো। আমরা দেখছিলাম প্রতিটি কক্ষে রক্ষিত হাছন রাজার ব্যবহৃত পোষাক, তাঁর বংশ পরিচয়, নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী, গানের পান্ডুলিপি,সঙ্গিত চর্চায় ব্যবহৃত ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং নানা  দুর্লভ উপকরণ সমুহ।

  যাদুঘর থেকে বের হয়ে দেখতে গেলাম হাছন রাজার বাড়ি। ঘুরে ঘুরে দেখলাম সব কিছুই। বাড়িতে একটি তিনতলা, একটি দুতলা ভবনসহ প্রাচীন আমলের কাঠ ও টিনের চালার মোট সাতটি গৃহ। তিনতলা ঘরের নিচতলার চারটি ঘর নিয়ে হাছন রাজা মিউজিয়ামের অবস্থান।

  অভ্যর্থনা কক্ষের সম্মুখ দেয়ালে রয়েছে হাছন রাজার একক একটি ছবি এক পাশে এবং অপর পাশে রয়েছে ঘোড়ার উপরে বসা অবস্তায় হাছন রাজারই ছবি।অভ্যর্থনা কক্ষের ভিতরে একটি ফ্রেমে বাঁধা রয়েছে হাছন রাজার বংশ পরিচয়। দেখা গেল সুরমা নদী তীরের তেঘরিয়া ( লক্ষণশ্রী) গ্রামে ১৮৫৪ সালের ২১ শে ডিসেম্বর জন্মেছিলেন এ সুর সাধক।পিতার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ও মাতা হুরমত জান বিবি।হাছন রাজার পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের অধিবাসী।

ভাগ্যন্বেষনে তাঁরা আসেন বাংলাদেশের যশোর জেলায়।সেখানে একটি খন্ড রাজ্য স্থাপন করে ও স্থায়ী হতে পারেননি।এ রাজ্যের প্রতিষ্টাতা রাজা বিজয়সিংহ দেব পারিবারিক কলহ ও ছোট ভাই দুর্জয় সিংহের শত্রুতায় চলে আসেন সিলেটের বিশ্বনাথ থানার অন্তর্গত কোনাউরা গ্রামে।সময়টা তখন ছিল ষোড়শ শতকের শেষের দিকে। বানারসীরাম ছিলেন তাঁর অধ:স্তন পুরুষ।

বানারসীরামের ছেলে বীরেন্দ্র চন্দ্র ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন এবং মুসলিম নাম বাবু খান গ্রহণ করেন।তিনির কয়েক পুরুষ পর বাবু খানেরই উত্তর পুরুষ দেওয়ান আলী রাজার দ্বিতীয় সন্তান হচেছন হাছন রাজা। মায়ের দিক থেকে হাছন রাজা হচেছন হুরমত জাহান বেগমের সন্তান।দেওয়ান আলী রাজা তৎকালীন মোমেনশাহী জেলার খারিয়াজুরী পরগণার ভূইয়া পরিবারের মজলিশ প্রতাপ সাহেবের বংশধর হুরমত জাহান বেগমকে বিয়ে করেন।

সুতরাং হাছন রাজার নানার বাড়ি হচেছ ময়মনসিংহ।দেওয়ান আলী রাজা হুরমত জাহান বেগমকে বিবাহ করার পর বৈবাহিক সুত্রে শ্বশুর প্রদত্ত সুনামগঞ্জের লক্ষণছিরিতে (তেঘরিয়া) অনেক সম্পত্তি লাভ করেন এবং সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন।তাই দেখা যায় হাছন রাজার পিতা, পিতামহ প্রপিতামহ সকলই ছিলেন বিশ্বনাথের রামপাশা গ্রামের অধিবাসী। অপরদিকে দৃষ্ট হয় হাছন রাজার একটি গানে ও আত্ম-পরিচয় দিতে গেয়েছেন-“ হাছন রাজা মরিয়া যাইব না পুরিতে আশা, লক্ষণছিরি জমিদারী বাড়ি রামপাশা”।

   জাদুঘরের একটি সকেছে রাখা হাছন রাজার পোষাক, একটি মখমলের আলখেল্লা ও সাদা দু’টি গেঞ্জি। জানা যায় তিনি বেশির ভাগ সময় সাদাসিধা পোষাকে পরতে ছিলেন অভ্যস্থ। সাদা ধুতি পরতেন লুঙ্গির মত করে এবং গায়ে থাকত সাদা গেঞ্জি।পায়ে দিতেন কাঠের খড়ম। আর কোন অনুষ্ঠান বা উৎসবে পরতেন জরির কারুকার্য খচিত আলখেল্লা। জাদুঘরের একাংশে লক্ষিত হল চেয়ার-টেবিল। তাতে বসেই হাছন রাজা নাকি গান লিখতেন।

 যাদুঘরের একটি কক্ষে রয়েছে একটি বজরা( বড় নৌকা)। এ নৌকায় চড়ে হাছন রাজা নাকি বের হতেন নৌবিহারে। বর্ষাকালে হাছন রাজা নৌবিহারে বেরুলে নৌকায় নাচ-গানের আসর বসাতেন। এখানে থাকতো বাদ্যযন্ত্রসহ নাচের ব্যবস্তা।অনেক সময় হতেন তিনি নিমগ্ন গান, কবিতা রচনায়।

  অপর একটি রোমে আছে হাছন রাজার হাতের স্পর্শ পাওয়া একটি দোতারা ও দু’টি ঢোল। আবার কখন  ও কখন ও ঘোড়া বা হাতিতে চড়ে ও বের হতেন শিকারে। যাদুঘরে রক্ষিত একটি হাতে অঙ্কিত ছবিতে দেখা যায়, তিনি হাতিতে চড়ে শিকারে যাচেছন। যাদুঘরে আরো আছে তাঁর ব্যবহৃত দুধের পাত্র ও পানদানি। আছে তিনির স্বহস্তের লিখিত গানের পান্ডুলিপি।

আমাদের আগমণের খবর পেয়ে আসলেন তত্ত্বাবধায়ক সামারীন দেওয়ান।তিনির সাথে আলাপ হল। জানলাম অনেক কিছু। মুল বাড়ি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। বললেন ভিতরে যেতে। চলে গেলাম ভিতর বাড়ি। প্রাচীন আমলের পাকাযুক্ত গৃহের ছাদ দেয়া হয়েছে বড় বড় তক্তার দ্বারা। গৃহের চাল আগেকার দিনের টিনের দ্বারা চাউনি যুক্ত তা আমাদেরকে জানান দিচিছল।

কাঠগুলি আজো রয়েছে অক্ষত। কোন পোকা ধরেনি। হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম ঘর পেরিয়ে পুকুর পাড়ে। সামান্য ঝোপ-জঙ্গল বেষ্টিত পুকুর পাড়, পুকুর আজকের প্রজন্ম করছেন ব্যবহার। তিনি ১৯২২ সালে মারা যান। তাঁকে কবরস্ত করা হয় রামপাশা গ্রামের পারিবারিক কবর স্থানে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বিদায়ী সাক্ষাতে মিলিত হলাম সামারীন দেওয়ানের সঙ্গে।

তিনি একটি বই আমাকে উপহার প্রদান করলেন হাছন রাজা সম্পর্কিত। আমার বাবা একজন বাউল শিল্পী ছিলেন জেনে তিনি আরো আনন্দিত হলেন। অত:পর সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম সুরমা নদীর তীরে। দেখলাম নৈসর্গিক দৃশ্য।সময় কম হাতে থাকায় নদীর তীরে বেশিক্ষণ থাকা হয়নি। রওয়ানা দিলাম বিশ্বনাথের তথা বাড়ির দিকে। আসার বেলা কিন্তু শহিদ মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য ও পাগলার মসজিদ ঘুরে আসতে এবং ছবি তোলতে ভুল করিনি।অন্যদিন পাগলার বড় মসজিদের সম্পর্কে লেখার আশাবাদ ব্যক্ত করে আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ান্তে এখানেই সমাপ্য ঘোষণা করছি।          

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: