এক টুকরো স্মৃতিকথা….. মনের গলি থেকে রাজপথ // সংঘমিত্রা রায়চৌধুরী

213213

। আমার শীত ।

আমি মোটেও শীত কাতুরে নই, শীতকে আমি আষ্টেপৃষ্ঠে উপভোগ করি। তবে শীতকালে কুয়াশা ঘেরা সকাল অথবা রোদ ঢাকা মেঘলা আকাশ আমার ভারী অপছন্দ।

শীত ঢুকলেই আমি আজকাল ছোটবেলায় ফিরে যাই, মনে পড়ে কাঁচা কুল খেয়ে প্রবল কাশির কথা, ঠাকুর ঘরের কাঁচের বয়াম থেকে খেঁজুর পাটালি গুড়ের ডেলা চুরি করে খেয়ে ঠাকুমার কাছে কানমলা খাওয়ার কথা। আর শীত দুপুরে দাদুর সঙ্গে পুকুর পাড়ে চটে বসে ঠায় ফাতনার দিকে চেয়ে থাকা। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে যেন এক উত্তরণ ঘটতো মুষিক থেকে বাঘে এবং বলাই বাহুল্য এই বাঘগিরি চলতো সরস্বতী পুজো মেটা পর্যন্ত।

শীত মানেই মামারবাড়ীতে দিদার হাতের গরম ধোঁয়া ওড়া পিঠে পুলি আর পাটিসাপটা প্রচুর খেয়ে মায়ের চোখ রাঙানি। স্নানের সময় তেল মাখতে না চাইলে পিঠের মাঝ বরাবর মায়ের হাতের কিল খেয়ে ঠাকুমা অথবা দিদার আঁচলের তলায় আশ্রয় নেওয়া। প্রতি শীতেই ভুটিয়াদের কাছ থেকে আমার মাপের থেকে অনেকটা বড় ঢলঢলে একটা সোয়েটার বাবা আনতো আর মা তার হাতা গুটিয়ে পরাবার সময় গজগজ করতো বাবা রোজ দেখেও আমার মাপ কী করে ভুলে যেতো। আমি কিন্তু ভারী মজা পেতাম গুটোনো হাতাটা খুলে দিয়ে পুরো হাতটা ঢেকে নিয়ে বাড়ি শুদ্ধ সবাই-এর মুখের সামনে হাত নেড়ে নেড়ে ভূতের ভয় দেখাতে।

পুরোটা শীত জুড়েই চোখের সামনে যেন স্লাইডশো চলতেই থাকে। কোনো মন্ত্রবলে যদি আবার ছোটবেলায় ফেরা যেতো, আবার সেই প্রতিটি ফেলে আসা হারানো মূহুর্তে !

। চড়ুইভাতি ।

এই এক সাংঘাতিক নস্টালজিক শব্দ বাঙালীর অভিধানে… চড়ুইভাতি। একবার ছোটকা আমাকে “পথের পাঁচালী”র কিশোর সংস্করন একটা এনে দিয়েছিল বার্ষিক পরীক্ষার পর। গোগ্রাসে সে বই একবেলাতেই শেষ। সেই থেকে অপু-দুর্গা-ইন্দির ঠাকরুন মনে গেঁথে বসল আর কচি মনটার অন্দরমহলে আরও অনেককিছুর সাথেই বাসা বাঁধল আরও একটি শব্দ “বনভোজন”…..ভারী পছন্দ হোলো কথাটি…… চড়ুইভাতির চেয়ে অনেক বেশী আপন…..মনছোঁয়া !

উঠেপড়ে লেগে পড়া গেল “বনভোজন” রূপায়নে। প্রথম খটকা “বনভোজন” কি বনেই করতে হয়? সহায় হোলো দাদু, দাদুর মত বাড়ীর পেছনের বাগানটাকেই বন ধরা যেতে পারে, দাদুর পরামর্শ মতো দলও গড়ে ফেলা গেল… আমি ছাড়া বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মামারবাড়ীতে বেড়াতে আসা পিসতুতো তিন ভাইবোন, পাশের বাড়ীর এক দিদি, মালীকাকার ছেলেমেয়ে, রান্নাঘরের সহযোগী অনি মাসীর মেয়ে এবং আমার অত্যন্ত বশংবদ বুড়ি। প্রাথমিক পর্বের সমাধা এবং পরবর্তীতে বনভোজনের বাকী আয়োজন।

ঠাকুমার বিস্তর বকাবকি হজম করে চাল ডাল আলু পেঁয়াজ টমেটো এমনকি তেল নুন মশলাপাতিও জোগাড় হোলো অনি মাসীর সৌজন্যে। গোল বাধল ডিম নিয়ে, পয়সা কিছুতেই জোগাড় হোলো না, এক দিদি রাস্তা বার করলো স্টেশনে গিয়ে ভিক্ষা করে ডিমের দাম জোগাড় করা হবে। কিন্তু যাবো কি করে? সঙ্গে ধরা পড়ার ভয়। বুড়ি এক জব্বর আইডিয়া দিল… আমরা পুকুরপাড়ে অপেক্ষা করব, মাঝেমধ্যে চরতে আসা হাঁসেরা পুকুরপাড়েই ডিম পাড়ে। চারদিন পালা করে নজরদারি করে তিনটে ডিম পাওয়া গেল।

আহা হা বাকীটা ইতিহাস !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *