কথা রাখা,না রাখা

 ফরহাদ হোসেন

প্রাকৃতিক পরিবেশ মনোরম।মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের ডাল পালা ফুর্তিতে মেতে উঠেছে।নীল আকাশে নিসঙ্গ সূর্য,আজ নিসঙ্গতার কারণে তেমন রেগে-টেগে নেই।আপন মনে দাঁড়িয়ে আছে দুটো টিনের ঘর,কোন বিবাদ নেই।খুটি ভেঙ্গে গেছে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস নেই।মালিকের প্রতি অভিমান নেই।ঘর দুটো কত বছর ধরে এমন ভাবে আছে হয়তো অনেকের মনে নেই।
উত্তর পাশের ঘরটা একটু সবল;দরজা,জানলা বন্ধ কিন্তু ঘরে আলোর অভাব নেই।বেড়া ভেদ করে দুষ্ট আলো প্রবেশ করছে সর্বদা।এই ঘরেই শুয়ে আছে,বছর ছাব্বিশের বিনয়।এক সপ্তাহ ধরে জ্বর।বাইরে বেড়োনোর শক্তি নেই।তাই তার কাছে বাইরের মনোমুগ্ধকর পরিবেশের মূল্য নেই।
অজয় দেখা করতে এসেছে বিনয়ের।দুজনের খুব ভালো বন্ধুত্ব।ছোট ছোট আনন্দানুভূতি,দুঃখ-কষ্ট পরস্পর পরস্পরকে আদান প্রদান করে।শুয়ে শুয়েই বিনয় বলে-‘এতদিনে আসার সময় হল।’অজয় বোঝানোর চেষ্টা করে,সে জানে না।জানতে পেরেই ছুটে এসেছে।দুজনের কথোপকথনের মাঝে চা আসে।চায়ে চুমুক দিতে দিতে চলে কথনগাড়ি।
-‘আচ্ছা অজয় এই পৃথিবীতে কেউ মনে হয় কথা রাখেনা!’
-‘কেন?হয়তো পারে না।চেষ্টা অনেকেই করে।‘
-‘বিশ্ব বিখ্যাত সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিল তার সাম্রাজের কোন দিন সূর্য অস্ত যাবে না কিন্তু সূর্য অস্ত গেছে।নেপোলিয়ন কথা রাখতে পারেনি।’
অজয় তর্ক করে না।বুঝতে পারে বুকে জমাট বাধা যন্ত্রণা থেকেই বিনয় কথাটা বলেছে।এর নেপথ্যে আছে বিনয়ের দাদা নিলয়ের ইতিহাস।নিলয় খুব মেধাবী ছাত্র ছিল।তখন চাকরি পায়নি।সাজানো গুছানো কথায় মুগ্ধ করেছিল বাবা মায়ের মন।স্বপ্ন দেখতে বাধ্য করেছিল চাকরি পেলে পরিবারের হাল ফিরবে।কত যে স্বপ্ন দেখেছিল বাবা মা,তা শুধু বাবা-মায়েই জানে!দারিদ্রতার মাঝে‘সুখ আসবে’এই কল্পনাই ছিল বিনয়ের পরিবারের সুখ‌।
নিলয় ভালো মাইনের চাকরিও পায় কিন্তু সুখ বারান্দা পর্যন্ত এসে লজ্জায় ঘরে ঢুকেনি।চাকরি পাওয়ার এক বছরের মধ্যে বিয়ে করে চলে যায় শহরে!প্রথম কয়েক মাস টাকা পাঠিয়েছিল।তার পর থেকে টাকা তো দূরের কথা,বাবা মায়ের খরর নিতেও গ্রামে আসেনি।
নিলয়ের এমন ব‍্যবহারে বাবা মা যেমন কষ্ট পেয়েছিল তেমনি বিনয় প্রথম বুঝেছিল সবাই কথা রাখতে পারেনা।দাদার দেখানো স্বপ্নগুলোকে কোন নিশী রাতের স্বপন মনে করে বাবা মাকে ভুলে যেতে বলেছিল।
বিনয় দাদার সঙ্গে দেখা করে বলে এসেছিল বাবা মাকে পৃথিবীর সমস্ত সুখ এনে দেবে।কিন্তু পাঁচ বছরেও সুখ এনে দিতে পারেনি।কত কি করেছে?কত জায়গায় ছুটেছে।প্রতিবার শুধু বিফলেই হয়েছে।ফলে দিনে দিনে তলিয়ে গেছে নিরাশার সমুদ্রে।
অজয় বলে-‘ও সব ভুলে যা।দাদা কি করেছে করেছে।‘
-‘দাদার কথা ভাবার সময় নেই।ভাবি বাবা মায়ের কথা।সুখ কি জিনিস দেখতে পেল না!’
-‘বাবা মায়েরা ছেলের কাছে বড় বড় বাড়ি,আরাম আয়েশের জীবন চায় না।‘
-‘সে তো ঠিক।কিন্তু বাবা মা যে এত কষ্ট করলো!আমার কি দায়িত্ব নেই সুখে রাখার?’
-‘হুঁ আছে।ভালো রাখার চেষ্টা তো করে যাচ্ছিস।‘
বিনয়ের আক্ষেপের কথা যেন ফুরোয় না।প্রসঙ্গক্রমে বাবা কেমন করে দু-বিঘে জমিতে ফসল ফলিয়ে,মানুষের বাড়িতে দিন মুজু্রি করে সংসার চালিয়েছে,সে কথা উঠে আসে।বিনয় বলে-‘জানিস অজয় আমি যখন মাঠে কাজ করি।বাবা দূর থেকে ডেকে বলে-বাবা!বাড়ি আয়।এত কাজ করতে হবে না।
আমরা তো সুখেই আছি।‘বিনয় বলতে বলতে কেঁদে ফেলে।বিনয়ের বাবার বয়স হয়েছে।কাজকর্ম করে না।বিনয় অভাব,অনটনের মধ্যে দিয়ে কোনক্রমে সংসার চালায়।আগে যে কাজ করতে ভালো লাগত না;এখনো তার সে কাজ ভালো লাগে না,তবু করে।কাজ থেকে ফিরে মায়ের পাশে বসে সুখ দুঃখের কথা বলে।
বিনয় জ্বরের শরীর নিয়ে উঠে বসে।দুঃখ করে বলে-‘দাদার মত আমিও দোষী।কথা রাখতে পারলাম না।কত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে বাবা-মা সুখ দেখবে বলে।আশায় আশায় দিন গুনছে।ভাবছে হয়তো আশা পূর্ণতা পাবে,আজ না হোক কাল।কিন্তু দেখ আমিও সুখ এনে দিতে পারলাম না।ভবিষ্যতে পারবো কি না সন্দেহ!’অজয় বলে-‘ভালো দিন আসবে।চিন্তা করিস না।আগে সুস্থ হয়ে উঠ।‘
অজয় বাড়ি চলে আসে।বিনয়ের জ্বর কমে না।জ্বরের প্রভাবে নানা রকম কথা বলতে থাকে।বাবা মায়ের কাছে মাপ চায়।এক মাস লাগল মোটামুটি সুস্থ হতে।বারান্দায় বসে উদাস চোখে দূরে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখে প্রখর রোদ্দুরে বাবা মাঠে কাজ করছে।বাবার শরীরের ঘাম যেন বিনয়ের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরে।
সেই ছোট বেলায় বাবা যেমন শরীরের সমস্ত শক্তি বিসর্জন দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতো আজো সেই প্রয়াস।কেউ কথা রাখুক বা না রাখুক।বাবা মায়েরা কথা রাখে।বিনয় মনের মধ্যে শক্তি সংগ্রহ করে,উঠে দাঁড়ায়।দুর্বল শরীর নিয়ে এগিয়ে চলে বাবাব দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: