কবিতার আবৃত্তি প্রসঙ্গে –  সুজিত সরকার

sahityasmriti.com

জীবনানন্দ মনে করতেন, কবিতার ওপর আলােচনা কবিদেরই করা উচিত। সে। আলােচনায় হয়তাে পাণ্ডিত্য থাকবে না, কিন্তু থাকবে জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্যের চেয়ে জ্ঞান পরিচ্ছন্ন। শুধু জীবনানন্দ কেন, বিশ শতকের প্রধান এক কবি বিশ্বখ্যাত এলিয়টকেও কি আমরা অনেকটা এরকম কথাই বলতে শুনিনি ?

এলিয়টের গুরু ছিলেন এজরা পাউণ্ড। তাে, সেই পাউণ্ড ফরাসী কবিতার ওপর যে আলােচনা করেছিলেন তা মেনে নিতে পারেননি এলিয়ট, কারণ সেখানে মালার্মের আলােচনা নেই, ভালেরির শ্রেষ্ঠ রচনাটিরও উল্লেখ নেই। তবু, এলিয়ট স্বীকার করেছেন যে পাউণ্ডের কাব্যসমালােচনা তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার যাবতীয় সমালােচনা আসলে একজন কবিরকবিতার ওপর নিজস্ব ভাবনাচিন্তার আলােচনা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কবিতার আবৃত্তি সম্বন্ধে আমার নিজস্ব মতামত জানাতে গিয়ে আমি খামােকা এসব বলছি কেন? বলছি একারণেই যে কবিতার আলােচনার ব্যাপারে জীবনানন্দ কিংবা এলিয়টের যে ধারণা, কবিতার আবৃত্তির ব্যাপারে আমার ধারণা অনেকটা সেরকমই। আমার ধারণা কবিতার আবৃত্তি কবিদেরই করা উচিত। একজন আবৃত্তিকার হয়তাে সুকণ্ঠের অধিকারী হতে পারেন, তার উচ্চারণ অনেক বেশি স্পষ্ট হতে পারে, তার বাচনভঙ্গী পরিশীলিত হতে পারে, কিন্তু কবি তাঁর নিজের কবিতাটি আবৃত্তির মাধ্যমে শ্রোতার কাছে যেভাবে পৌঁছে দিতে পারবেন, একজন প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তিকার তার আন্তরিক প্রয়াস সত্ত্বেও সেভাবে পৌছে দিতে পারবেন না।

প্রথমে কবি তাঁর কবিতাটি পড়বেন। পরে সেই কবিতাটিই আবৃত্তিকার পড়বেন— এরকম অনেক অনুষ্ঠানেই উপস্থিত থেকে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই উল্লিখিত কথাগুলি বললাম। মনে আছে, একবার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এক অনুষ্ঠানে তার একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন এবং তারপর বিশিষ্ট আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘােষ সেই কবিতাটিই আবৃত্তি করলেন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আবৃত্তি যে প্রদীপ ঘোষের আবৃত্তির চেয়েও শ্রোতাদের হৃদয়কে আরাে গভীরভাবে স্পর্শ করতে পেরেছিল, তা শুধু আমার কিংবা অন্যান্য শ্রোতাদের অভিমতই ছিল না, প্রদীপ ঘােষ নিজেও উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে একথা স্বীকার করেছিলেন।

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্বকণ্ঠে কবিতাপাঠ অনেকেই হয়তাে শুনেছেন। একবার ভাবুন তাে, যেতে পারি কিন্তু কেন যাবাে’কবিতাটি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেভাবে পড়েছেন, কোনাে নামকরা আবৃত্তিকার কখনও সেভাবে পড়তে পারবেন? তর্কের খাতিরে হয়তাে মেনে নিলাম যে আবৃত্তিকারের পাঠ অনেক বেশি শ্রুতিমধুর, কিন্তু এতৎসত্ত্বেও বলুন তাে, শক্তি যেভাবে একজন শ্রোতাকে ভিতরে ভিতরে নাড়িয়ে দিতে পারতেন, আবৃত্তিকারের পক্ষে তা কি সম্ভব? না, সম্ভব নয়।

যে আবেগ থেকে কবিতাটি রচিত হয়েছে, তা কবির ভিতর থেকে উঠে এসেছে, ফলত তিনি যখন কবিতার শব্দগুলি উচ্চারণ করেন, তখন সেই আবেগকে তিনি নিজের ভিতরে জাগিয়ে তুলতে পারেন, কিন্তু কবিতাটি যেহেতু আবৃত্তিকারের  নিজের রচনা নয়, শব্দগুলি যেহেতুতার বিশেষ কোনাে মুহূর্তের অনুভূতিকে ছুঁয়ে সরাসরি উঠে আসেনি, সেহেতু তিনি চেষ্টা করে অনুশীলনের মাধ্যমে সেই আবেগের কাছাকাছি পৌঁছতে পারেন  ।

কিন্তু হুবহু সেই আবেগটিকেই নিজের ভিতরে জাগিয়ে তুলতে পারেন না। আর এখানেই পার্থক্য ঘটে যায়। এ যেন অনেকটা মূল কবিতাও অনূদিত কবিতার পার্থক্য। অনূদিত কবিতাটি হয়তাে সাজগােজের কারণে মূল কবিতাটির চেয়েও উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু সুন্দরতর হওয়া সম্ভব নয়। কারণ অনুবাদক যতই চেষ্টা করুন না কেন, কবিতাটি তাে তার ভিতর থেকে | উঠে আসেনি !

মনে পড়ছে সেই গল্পটির কথা। প্রেমিক প্রেমিকাকে বলছে, তুমি যা চাইবে,সব দিতে পারি। প্রেমিকা তখন তাকে বলে, তােমার মায়ের হৃৎপিণ্ডটা তাহলে উপড়ে নিয়ে এসে আমাকে দাও। প্রেমিক তাই করলাে। পথে ছুটে আসতে আসতে যেই সে হোঁচট খেলাে, হাতে ধরা হৃৎপিণ্ডটি বলে উঠলাে বাবা, লাগেনি তাে? কবি যেন মা, আবৃত্তিকার যেন প্রেমিকা। কবিতাকে দুজনেই ভালােবাসেন। একজন তাকে জন্ম দিয়েছেন, আর একজন তাকে তার জীবনের সঙ্গী হিসেবে পেতে চান। |

তাঁর  আবৃত্তিকারদের কাছে আমার একটা অনুরােধ আছে। সাধারণত দেখা যায়, যে সব কবিতায় কাহিনীর উপাদান আছে, নাট্যগুণ আছে, সেসব কবিতাই  তাঁরা অনুষ্ঠানে আবৃত্তির জন্য নির্বাচন করেন। তাৎক্ষণিক সাফল্যের মােহে কিংবা হাততালি পাবার লােভের্তারা এসব কবিতার দিকেই ঝোকেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার, আবৃত্তিকার হিসেবে বিশিষ্টতা অর্জন করতে গেলে তাঁদের অন্য কবিতার দিকে ঝুঁকতে হবে। কারণ, কোন জিনিসই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেলে

মানুষের আর ভালাে লাগে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ’শুনে শুনে লােকের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। মানুষ এখন অন্যরকম কিছু শুনতে চায়। আবৃত্তিকারদের বলি, আপনারা বিনয় মজুমদারের ফিরে এসাে, চাকা’ থেকে কিংবা প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর নির্বাচিত কবিতা থেকে অনেকগুলি কবিতা বেছে নিয়ে মালার মতাে গাঁথুন।

তাহলে লােকে সেই কবিকেও সঠিকভাবে চিনতে পারবে এবং অন্য ধরনের কবিতা আবৃত্তির কারণে আপনারাও বিশিষ্টতা অর্জন করবেন। তাছাড়া, কবিতা যে গল্প নয়, নাটক নয়, কবিতা যে কবিতাই তা একমাত্র আপনারাই আপনাদের কবিতা নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষকে সবচেয়ে ভালােভাবে বােঝাতে পারেন। সত্যিই যদি কবিতাকে আপনারা ভালােবাসেন, তাহলে সত্যিকারের মহৎ কবিকে মানুষের কাছে চিনিয়ে দেওয়ানােও তাে আপনাদেরই  কাজ ।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা  //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী  

যোগাযোগ : (৯১) ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: