কবিতা : স্বপন নন্দী

তৃষ্ণা

এর একটা চাঁদ উঠল।

অরণ্যকে বলল সবাই

একলা থাকা আর সাজে না

চাঁদের আগুন ভীষণ রাগী

লজ্জা তুমি ঢাকবে কিসে?

অরণ্যে আজ উলটো হাওয়া

সমস্ত দিন অধিক দহন

মনাত্তরে কোলাহলে

ছড়িয়ে পড়ে পল্লবে তা

স্বপ্ন মেখে অনেক ডানা

নীড় বেঁধেছে অনিকেতে।

আর একটা চাঁদ উঠলে সবার শঙ্কা জাগে

কিছু মানুষ বসলাে উবু

জমিয়ে জমিয়ে আড্ডা হল –

কেমন করে পেখম থেকে ময়ুর দেবে বর্ণমালা।

এইভাবে স্রোত বইতে থাকে।

ঝড়ের দিনে খােয়া গেছে যেসব বসত

এখন সেথায় ভােরাই ভােরাই

কুঠার ছিল যে-যার হাতে আপন বেগে

লুটিয়ে পড়ে একটি দুটি

তবু বৃক্ষরােপণ জন্মকথা।

আর একটা দিন আসবে ব’লে

প্রজাপতি মন্ত্র জপেন ‘জবা কুসুম’……..।

বৃষ্টিমঙ্গল ও সেতু

কখনাে কান্না হয় কখনাে পান্না

রজস্বলা মেয়ে দুটি হাত পেতে রাখে শ্রাবণ পৌরুষের কাছে

কান্না যখন, আঁচলে কুড়িয়ে কষ্টের উপমা হয়

পান্না হলে তার একেবারে নিজস্ব, মৃদুল অহঙ্কার।

করতল থেকে ধুয়ে যাচ্ছে মেহেদি, শিল্পজ বীথি

অঙ্কুরের যতাে যন্ত্রণা ততাে প্রতিভাস

তততা অনুষ্টুপ আকাঙক্ষা

সমস্ত তুমি’রা ব্রাহ্ম মুহূর্তে প্রেমিক হয়ে যাচ্ছে।

রাস্তা ভাসছে সর্বনাশে, সর্বনাশ ভাসছে স্বপ্নে,

ইচ্ছে-দিঘির একটি-দুটি পদ্ম দুলছে আলাপে

আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী।

আমাদের বারমাস্যা এখন রাঙতার মােড়কে লুকিয়ে রাখলাম

ফুল্লরার জন্য ছড়িয়ে দিলাম টাপুর-টুপুর, কোজাগরী জ্যোৎস্না।

বিবাহ-বার্ষিকী আমাদের এই ক্লান্ত গােধূলিতে;

তাই প্রত্যেকের নামে কিশলয়ের মতাে নিমন্ত্রণের চিঠি

ভিজতে ভিজতে আসুক এক ঝাঁক তিতির

আমরা স্বাগত উষ্ণতায় পালক থেকে বৃষ্টি মুছে দেবাে

আমাদের দু’জনের মধ্যিখানে সেতু। সেতু

মানে দুই প্রজন্মকে বাঁধতে চলেছে এক শিশুর করতল

 

সমস্ত ডানার মর্মে দেখে যাও কেমন বৈনিক তরঙ্গ।

মন খারাপি তর্জমা

 

মন খারাপ করলে আষাঢ়ের কাছ থেকে কিছু স্মৃতি

ধার নেওয়া যায়; নেবব, আবার ফিরিয়ে দেবাে।

জ্বালাবাে, আবার নিভিয়ে দেবাে।

এতটুকু বুকের জমি, তাতে কতাে বড়াে নবান্ন

মরি হায় পৌষালি নারীর হাতে লক্ষ্মীর ঝাঁপি

উৎসব

তবু বুকের বিস্তারে কততা নষ্ট দিন, শােকতৰ্পণ

টুপটাপ অশ্রু যতাে সবটুকু নেবাে

এবং চাতক এবং তিতির

সবার জন্য নিবিড় শ্রাবণ বর্ষামঙ্গল

সবার জন্য বাউল মন দু’হাতে বিলিয়ে দেবাে

একা থাকে অনতিদূরের শাপলাশালুক দুঃখী মেয়ে

মন খারাপ করলে চোখের অক্ষরে তাকে লিখবাে দু’কলম

‘আমরাও ভালাে নেই।

আরােগ্য এসেছি

 

কারাে স্নেহাদ করতলে আমার ললাট ছুঁলে

যেন আরােগ্য এসেছি, বিষন্ন অসুখ থেকে মনে হয়

পেয়েছিআরােগ্য-প্রশস্তিকা

এবার ইচ্ছে- পাখি উড়তে উড়তে জটায়ু

এবার জটায়ু সব ভুবনডাঙার ইজারাদার

সােনার মঞ্জুষ থেকে উপচে পড়ছে নিবিড় পাঠ

আহা এক নৈঃশব্দ্য সুন্দর

আহা এক প্রশান্ত অন্ধকার

প্রজাপতির ডানায় খসে পড়ছে অনুপম ক্রোধ

কুড়িয়ে নিচ্ছেন আমাদের পারুল-মা

আমার জন্যে।

স্বপ্নের বাড়ি

♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠♠

ওই যে উঁচু টিলার ওপর একফালি জমি

ওখানে আমার স্বপ্নের বাড়ি

একচিলতে বাগান ধানক্ষেত

প্রতিদিন ওখানে আবাদ

সৌম্যতা নিয়ে অতিথি আসে যেমন পাখি

নীল ফাগ মাখে অনেক আকাশ যেন উৎসব

ওইখানে আমার স্বপ্নের বাড়ি

আমি থাকি না।

আমি থাকলে ঝড় ওঠে

অজস্র পাখির সঙ্গে তার কথা বলা হয় না

সে উচ্চারণ করতে পারে না চর্যাপদ গাথাসপ্তশতী

আমি থাকলে বৃষ্টি আসে না।

আমার স্বপ্নের বাড়িতে আমি থাকি না

ঝড় নিয়ে আমরা অরণ্যের কাছে যাই

সংঘবদ্ধ হই

প্রাণদ খুঁজি বৃক্ষের কাছে

একা থাকুক সে আমার স্বপ্নের বাড়িতে

উচ্চারণে, অনুবাদে।

রবীন্দ্রনাথ

♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣

তিনি ছিলেন আমার আকাশ

এবং সমুদুর

তিনি আছেন সবখানেতে

সবার হৃদয়পুর।

স্বজনপুরের আপন কথা

গদ্যে এবং পদ্যে

রবীন্দ্রনাথ জেগে থাকেন

নিবিড় অনবদ্যে।

রবীন্দ্রনাথ আছেন বলেই

আমার কণ্ঠে গান

এক বালিকার তা-থই নৃত্যে

প্রাণ করে আনচান

পৌষ মেলায় বাউল হবাে

একতারাটি হাতে

রাঙা মাটির রাঙা বসত

রবীন্দ্রনাথ সাথে।

 

আবির ছুঁয়ে রাঙিয়ে দিলাম

বসন্ত উৎসব

জ্যোৎস্না হাসে মঞ্জুভাষে

ছন্দের কলরব।

রবীন্দ্রনাথ আছেন বলেই

আবহমান তাই

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বলেই

তােমার কাছে যাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *