সুন্দরের জন্য কলম – স্বপন নন্দী

প্রতিদিন কবিতা

sahityasmriti.com

মাধবীলতার কাছে একটি পাখি এসে বসল

কী যেন বললাে ফিসফাস

পাতায় পাতায় অনুকম্পা জাগাল মাধবী

পাখিটার ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে মাধবীর শরীর

যেন তৃষ্ণা, যেন জীবন, যেন ঝর্ণা

যেন কত নিরীহ শান্ত শব্দকে ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে

পাখিটা উড়ে যায়

মাধবীলতা রােদ্দুরে অভিমানে হলুদ, যেন রাঙাবসতের বউ-টি

যার ডানা থাকে সে একলা থাকে না

কখনাে আকাশে কখনাে কোনাে তরুময়তায়

তার স্বপ্ন ভেসে বেড়ায়।

 

আমার আঁকার খাতায় কুড়িয়ে রাখি সেসব

মাধবীর কথা, পাখিটার কথা এবং আকাশের অহংকার

আমি ধরে রাখি ছবিতায় একাত্ম ইজেলে

 

কোনাে এক ফিরে দেখা সময়ে

একটি মেয়ে তার খাতায় আমার নামটি লিখে ফেলেছিল

কোচিংয়ের ক্লাসে

সেই তার সঙ্গে মাধবী যেন উপমা হয়ে রইল

সেই তাকে আমি সবকথা বলবাে।

ফিরে দেখা

জল টইটই এই সমতল

মেঘ টইটই আকাশ

হাঁস চইচই দিঘির পাশে

স্বপ্ন প্রতিভাস।

 

পূর্বরাগের রাধাই যেন

লক্ষযুগের প্রণয়

সেই বালিকার সঙ্গে আমি

পথ হাঁটি নির্ভয়।

 

পেতেই ছিল দুই করতল

শূন্য হলাম দিয়ে

অকস্মাৎই বাজল সানাই

অন্য সিঁদুর নিয়ে।

 

মিতুল নামের সেই বালিকার

বর হল না ভাল

মাতাল হাতের কিল চড় খায়

কারণ, মেয়ে কালাে।

 

একদিন সে ফিরে এল

সাক্ষী করে টাটকা ক্ষত

সাঙ্গ হল পুতুল খেলা

নষ্ট হল স্বপ্ন যত।

 

তারপর এক দৃশ্যপতন

তারপর এক মঞ্চ নূতন।

 

আগের মতই আমার কাছে

চাওয়ার আঁচল পাতলাে মেয়ে

আগের মতই জল টইটই

বৃষ্টি হয়ে উঠল গেয়ে।

 

ক্ষত থেকে তার রক্ত নিয়ে

আঁকতে দিলাম বর্ণমালা

সিঁদুর যখন পুরুষ-শিকল শিকল

ছেড়ার নতুন পালা

তার শােনিতে ছড়িয়ে দিলাম

 

জল টইটই এক সমতল আবার পেলাম।

 

নীলাম্বরী মেয়ে এবার

নান্দনিকে গেয়ে

স্বপ্ন দেখা করল শুরু

আমার দিকে চেয়ে।

ধ্র ‍ুপদী

একটি পাথর আমাকে শেখায়

কী করে সময়ের কাছে ধ্রুপদী হতে হয়

একটি আকাশ বলে : সাগর হও

 

আলাে ও অন্ধকারে আমি সংহতি খুঁজে ফিরি।

 

এক অনিবার্য অসুখের দিনে একটি শুদ্ধ হাত

আমার ললাট স্পর্শ করে, চিবুকে খোঁজে স্মৃতি

এমন নৈকট্যে এমন নিবিড়ে থাকেন মা।

একটি পদ্ম মেলতে পারে সহস্র পাপড়ি

সব পদ্ম তা জানে না।

 

অপলক চেয়ে থাকি ছবিটির দিকে

মুগ্ধ বিস্ময়ে শুধু ছবিটিকে চিনি।

 

ঘর

ঘর কখনাে আমার,কখনাে সবার

যখন আমার,দরােজা খুলে দিই

কুটুম কুটুম পরিযায়ী পাখি সব আসে

ডিম পাড়ে,তা দেয়, বাচ্চা ফোটায়, উড়ে যায়।

আমার সমস্ত হই চই ছড়িয়ে দিই জানালা খুলে

কুড়িয়ে নাও ওগাে কুড়িয়ে নাও।

যারা তৃষ্ণায় আছাে।

ঘর, যখন সবার, অর্গল তুলে দিই দরােজায়

ঘরময় ছড়িয়ে আছে সকলের তৃষ্ণা

ঘরময় ছড়িয়ে আছে প্রিয় তর্জমা।

চেটেপুটে খাবাে বলে এই ঘরে একা

কেউ তাে ডাকে না আমায়

দরােজায় কেউ দেয় না টোকা।

 

আসলে নিজের ঘরে কেউ প্রকাশ্য হতে চায় না

তাই আমার বুকে তারা সন্তর্পণে,

আমার বুকে তারা আড়াল হয় ।

 

না তমসা

অন্তরঙ্গ সমর্পণ চাই তবে

দুর্বিনীত অহংকারে যে মানুষ চলে গেছে প্রতিশ্রুতি মুছে

ফিরে আসবে সময়ানুগ

সঙ্গে আনবে নিসর্গ থেকে মেঘমল্লার বসন্ত বৈভব

এবং মানুষের অরণ্য থেকে জাগরী প্রজ্ঞা

 

ঘরের দরােজা খুলে আমি তাকে বসতে বলবাে

আয়নায় সে দেখবে নিজস্ব ক্ষত বিভাসিত আর্তনাদ

দহনে দাহ্য হবে।

যােগ্য সমীক্ষণেই একজন তার নিজস্বতা ফিরে পায়

 

গ্রন্থিত বলয় ভেঙে যে মানুষ নির্বাসনে অনিকেত

যদি ফিরে আসে

প্রিয়তম সুজন তার দোর-ঘর খুলে দেবে

আমি তার ক্লান্ত চিবুক ছুঁয়ে বলবাে ঃ

এবার যােগ্য হও।

 

উত্তীর্ণ

উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই মৃত্যু তার ঠোটে রেখেছে চুমু

শােকাশ্রুতে টলটল ফুলের স্তবক তার শিয়রে থাকে

অহংকারহীন বিন্যাসে

নতুন প্রহর তার পুরানাে পরিচ্ছদ বদলে দিচ্ছে

টান টান হয়ে শুয়ে আছে সে

ঝড়ের আকাশ থেকে চিনে নিচ্ছে

ঘরে ফেরা পাখির ব্যাকুলতা ।

এখন আমরা দেখে নিচ্ছি

কতখানি যন্ত্রণাতেও একজন সৌম্যতায় স্থির থাকে

কতখানি ত্যাগের কষ্ট পেরিয়েও একজন

হতে পারে শুচিস্মিত।

কে যেন বললাে—চলে যাওয়াটাই সত্যি।

শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ফিরে আসি আমরা

খেয়ার নৌকো তখন অন্য পারে

অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি

কেউ যদি বলে ফিরে আসাটাও সত্যি ।

 

রাখি

মাথার ওপর অনেক আকাশ

অজস্র তার পাখি

ডানার পালক কুড়িয়ে বানাই

পরম্পরা রাখি

গাইছে গান, যাচ্ছে নদী,

আমি স্বজন সখা

তার হাতে ভাই পরাই রাখি

লতায় পাতায় আঁকা।

বােন থাকে তাে বহু দূরে

নিষিদ্ধ এক কাতারে

বুকের কথা উথলে ওঠে

কষ্ট কথার প্রান্তরে।

 

আমার রাখি ছড়িয়ে দিলাম

তাের জন্যে বােন

তাের জন্যে জ্যোৎস্না দিলাম

প্রিয় কুসুম মন।

 

দাদা ছিলেন রাজনীতিতে

হয়ত কালাে ক্ষত

খুঁজল পুলিশ, ফেরার হল

নষ্ট ছেলের মত।

এখন ছবি আমার ঘরে

মায়ের বাছাধন

অগ্রজকে প্রণাম

করি রাখির আলিম্পন।

 

তােমার যারা সম্প্রীতিতে

এমন মূহূর্তে

আমার এহাত বাড়িয়ে দিলাম

নন্দিত শর্তে।

একখানা রাখি তাতেই ভাসুক

দাদাভাইটির স্মৃতি

একখানা রাখি তাতেই জাগুক

অভিমানী বােন-বীথি ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: