কবি ও আবৃত্তিকার – প্রমােদ বসু

sahityasmritiকবির সঙ্গে আবৃত্তিকারের সম্পর্কের বুনােট তৈরি করে কবিতাই। এ কথাটি একেবারেই নতুন নয়। নতুন যা, তা হলাে কবির সঙ্গে আবৃত্তিকারের সম্বন্ধের চেহারা পাল্টে দেয় একমাত্র কবিতাই । গীতিকার গান লেখেন, সুরকার সুর দেন তাতে, উভয়ের যুগ্ম-সৃষ্টিই হয়ে ওঠে শিল্পীর কণ্ঠের পরিবেশনা। সেখানে নতুন যেটি তা হল কেবল শিল্পীর কণ্ঠ লাবণ্য এবং অনুভবময় অবদান। সে পরিবেশনায় কথা ও সুর অপরিবর্তিত এবং অনিবার্য হয়ে থাকে। কবিতার আবৃত্তিরূপে এতখানি ধরাবাঁধা বন্ধনের তাগিদ নেই। যে কোনও সঙ্গীত শিল্পীর চেয়ে যে কোনও আবৃত্তিকার তাই সর্বদাই বেশি স্বাধীনতা ভােগী, এবং কবির মতােই প্রায় স্বতন্ত্র এক স্রষ্টা।

সম্পর্ক বা সম্বন্ধের প্রসঙ্গটি বিশদভাবে এখানে বলা প্রয়ােজন।

একটি কবিতার কবির আন্তচেতনা ও অনুভব যতখানি ক্রিয়াশীল, সেই কবিতাটির। আবৃত্তি পরিবেশনার সময়ে তা ততখানি ক্রিয়াশীল না হতেও পারে একজন আবৃত্তিকারের কণ্ঠে। এবং তা যদি হয় তবে তা একেবারেই দোষের নয় বলে আমি মনে করি। কবিতা নিয়ে কবি ও আবৃত্তিকারের পারস্পরিক চেহারা এইভাবেই পাল্টে যেতে পারে। অন্যদিকে একটি কবিতার ভাব ও রূপের মধ্যে যে মুহূর্তে একজন আবৃত্তিকার অবগাহন করেন, সেই মুহূর্তেই তৈরী হয় পরস্পরের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্কের ঠাস বন্ধন, যেখান থেকে রূপান্তরের যাত্রা সূচনা করে সেই কবিতার অন্যতর একটি মাত্রা।

কবিতার আবৃত্তিতে অনেক কবিই বিশ্বাসী নন। কেউ কেউ ‘স্রেফ গলার ব্যায়াম’বলে বিপকরতেও ছাড়েন না। আবৃত্তিকাররাও কোনও কবিতা আবৃত্তির অযােগ্য’ বলে পাশে ঠেলে ফেলেন। দু’ক্ষেত্রেই ভুল বােঝাবুঝিই প্রকৃত কারণ বলে আমার ধারণা। উভয়ের যথার্থও সম্পর্কের অভাবেই এমনতর মতামত প্রচারিত হয়, কারও কারও মান অভিমানের সূচনা করে।

আবৃত্তি যে গলার ব্যায়াম নয়, তার ব্যাখ্যা আজ অন্তত জরুরী নয়। কেননা, তা হলে খেয়াল ধ্রুপদ গায়ককেও তাে এই অপবাদে ছােট করতে হয়। তাছাড়া আবৃত্তি ভারতীয় বাচিক শিল্পের আদিকলা। যে বেদকে আমরা শ্রুতি’ বলে জেনে এসেছি এক থেকে বহুতে প্রচারিত হয়েছে আবৃত্তি রূপেই। ভারতীয় সেই আদি ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই আদিকলাটিকে যদি আজ ‘গলার ব্যায়াম’বলে গাল দেওয়া হয় তবে নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতিই থুতু ছেটানাে হবে। আর যেন এমন ভুল আর না করি।

আবৃত্তি যেহেতু এক স্বতন্ত্র শিল্পকলা তাই তার পরনির্ভরতা নেই। তার্কিকগণ প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাকে তাে কবিতার ওপর নির্ভর করতেই হয়? তা হলে?’ সাধু প্রশ্ন, সন্দেহ নেই কিন্তু গন্ধ’কে তাে ফুলের দিকে তাকাতেই হয়, ‘ফুল না ফুটলে তার যে অস্তিত্বই নেই। তবু ‘গন্ধ’সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক গুণ যা কখনই ‘ফুল’নয়। রূপ বা সৌন্দর্য যদি ফুলের শরীর হয় তবে গন্ধ তার প্রাণেরই প্রকাশ। সে কারও ওপরে নির্ভর করে নিজেকে লঘু করে না, সে তার ভাবরূপ প্রকাশ করে নিজেরই মহত্বের জয়গান গায়।

অক্ষরের দাসত্বের কবিতার সংসার কলরবহীন নিপকণ্ঠে এসেই কবিতার প্রাণের আলাপন। কবির কাছে সে সাদা পাতার ওপর নন্দনের কল্পনা। আবৃত্তিকারের কণ্ঠে এসে সে আর পাঁচ জনের কাছে আনন্দের জল্পনা। একজনের কাছে তার ভাবের রূপ, অন্যজনের গলায় তার রূপের ভাব। কলাশাস্ত্রে আবৃত্তির প্রয়ােজন ফুরিয়ে গেলে আমাদের কবিতা বাকরুদ্ধ হয়ে মাথা কুটবে, তার বুক ফাটবে তবুমুখ ফুটবে না।

তাই আবৃত্তির প্রয়ােজনীয়তা কবিতারই বেঁচে থাকার জন্য। সেখানে কোনও দ্বিমতের অপেক্ষা না থাকাই মঙ্গলের। তবে সব কবিতাই আবৃত্তির যােগ্য নয়’আবৃত্তিকারের এই বিশ্বাস বা ধারনার কোনওই কারণ নেই। প্রকৃতি বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, ফুল, তা যে রকমই হােক না কেন, তার গন্ধ বর্তমান।আমরা ফুলের গন্ধ মাপি আমাদেরই পছন্দ আর রুচি, ক্ষমতা আর প্রয়ােজন দিয়ে। কবিতাকে এই নিক্তিতে ফেলে আবৃত্তির সংজ্ঞা তৈরী হলে দশেরই অমঙ্গল হবে। কেননা আবৃত্তি কবিতারই কথ্য বা বাচক ভঙ্গি, তা উচ্চারণে ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু অসুবিধা না থাকাই শ্রেয়।

কবিতা রচিত হয় কবিরইপ্রাণেরতাগিদে। সেখানে যেনভক্তের ভগবান-চর্চা! জটিলতার সৃষ্টি তার উচ্চারণ-শিল্পে, অর্থাৎ আবৃত্তির সময়ে। সেখানেই ঘটে যায় এক বৃহৎ-ঝাড়াই-বাছাই। একজন আবৃত্তিকারের আপন অসামর্থ্যে কেন একটি কবিতা আবৃত্তির যােগ্যতা হারাবে? একজনের অমনােযােগ, অশিক্ষা, শুচিবায়ুগস্ততাও অনভিজ্ঞতার কারণে কেন কিছুকবিতা চিরদিন অনুচ্চারিত থাকবে? এইসব প্রশ্নের উত্তরসন্ধানের প্রয়ােজন আজ এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। এখন আমাদেরই এর জবাব দিতে হবে, জবাব খুঁজতেই হবে!

প্রকৃতপক্ষে সমস্যা সম্পর্কের খুঁটিনাটিতে; সম্বন্ধের ব্যবস্থায় বহুক্ষেত্রেই আমরা প্রকৃত অধ্যবসায় ব্যতিরেকে কবিতাকে কণ্ঠে তুলে আনি। ফলে তার প্রাণের প্রকাশের বদলে তার অসম্মানেরই প্রকাশ ঘটে যায়। ভাব দেখাতে গিয়ে আমরা রূপ চিড়ে ফেলি, কিংবা রূপের চেহারা দেখাতে গিয়ে ভাবের অপমান করি। আমাদেরই দোষে কবিতা ছােট হয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে ।

যেমন আমাদেরই কারও কারও সামর্থ্যে কোনও কোনও কবিতা হয়ে ওঠে উচ্চারিত সম্পদ। সম্পর্কের সােজা রাস্তায় হেঁটে এলে কবি ও কবিতার সঙ্গে আমাদের আঁট বন্ধনের অভাব থাকে না। বাঁকা জিনিসের ভুলভুলাইয়া সর্বদাই আমাদের বেঁধে রাখে আমাদের মধ্যে। প্রকাশের দায় তার নেই। সে কেন্দ্রীভূত কারই আত্মকেন্দ্রিকতায়। অথচ শিল্প, যে কোনও শিল্পই, প্রকাশের স্বর্গেই আপন প্রতিমার প্রতিষ্ঠা চায়। অপ্রকাশের নরক তার কাছে সংকীর্ণ এক অবস্থিতি।

জটিলতা কবিও সৃষ্টি করেন। তাদের কেউ কেউ ছুঁৎমার্গে বিশ্বাসী। তাদের কেউ কেউ মনে করেন কবিতা অনুভবের জিনিস, একবার মাত্র উচ্চারণে তার প্রতীতি শ্রোতার মনে জন্মাতে পারে না। কোনভাবেই। কিন্তু কে তাদের বােঝাবে, অজস্রবার ‘মরা’-র উচ্চারণের পরেই তাে নামের অনুভব অনুভূত হয়েছিল ঋষির মনে। কে তাদের বলবে, ‘মা’ বলে ডাকতে গেলে মাতৃভাবের স্পর্শ কি লাগে না মনে ?

সুতরাং প্রয়ােজন সহজ বােঝাবুঝির। সম্পর্ক, দরকার সম্বন্ধ জরুরি।নইলে এই দ্বন্দের সমাধান নেই। এই মুখ ফেরানাে অভিমানের অবশেষও নেই কোনওদিন!

আপনি আবৃত্তিকার। আপনি সর্বাগ্রে আপনার অন্তরটিকে কবি’করে তুলুন। আপনি কবি হলে, নিজেকে আবৃত্তিকারের সহকর্মী করে তুলুন। একে অপরের সমস্যা বুঝুন, সম্পর্ক বুঝুন। অকারণে গুমােরে নিজেকে সরিয়ে রাখলে আপনারা আমাদেরই যে বঞ্চিত করবেন নন্দনের রস থেকে।

কবিতা থেকে সরে এলে আমরা কোথায় ঠাঁই পাবাে? আবৃত্তিকার আয়ােজন থেকে, পরিবেশনা থেকে আমাদের ঠেলে পাঠালে আমরা পৌঁছাবাে কোথায়?

আমাদের কথা আপনারাদু’জনই ভাবুন। তারপর একদিন দুজনের দুটি হাত মিলিয়ে দিন অনাবিল এক বন্ধনে। সে বন্ধনের আমরা নাম দিয়েছি‘কবি ও আবৃত্তিকার’।

 

 

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী // যোগাযোগ : ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: