কান্না

তমালিকা চক্রবর্তী

 ঘুম থেকে ওঠে আয়েশ করে চা খাওয়ার সময় থাকে   না  পৌলমীর। অ্যালার্মের আওয়াজে ঘুম থেকে ওঠে ।  কোনদিনই ঘুমটা ঠিকঠাক হয় নারােজ চোখটা  করকর করতে থাকে । তবু উঠতে পৌলমাকেঅন্যান্য দিনের মতাে ফ্রেশ হয়ে  ব্রেকফাস্ট তৈরী করে রিকিকে স্কুলের  জন্য রেডি করে পাঠালনিজেও কিছু গেলপ্রিয়মের  অফিস যাওয়ার পােশাক রেডি করতে গিয়ে নে অনেক কাচা জামাকাপড় জমা হয়ে রয়েছে ।

সেগুলােও মেশিনে ঢােকালাে। অফিস যাওয়ার আগেও পৌলমী বুঝতে পারেনি , আজকের দিনটা তার মনকে বিধবস্ত করে দেবে, একা করে দেবেসারা দিন একটা ঘােরের মধ্যে কাটবেনা, সত্যি সে বুঝতে পারেনি

দৈনন্দিন জীবনের লড়াইটা একটু সামলে সে অফিসে বের আজ এতটাই দেরি হয়ে গিয়েছে অফিসের জন্য, যে সে ক্যাবের শরণাপন্ন হয়েছেপৌলনীর হেডাফোনে হালকা সুরে একটা গান বাজছেজ্যামের মধ্যেও একটা দখিনা শুদ্ধ বাতাস তার মুখের উপর হামলে পড়লএই হাওয়াটা পৌলমীর খুব চেনা চেনা হবে নাই বা কেন

সেই কোন ছােটবেলা থেকে এই হাওয়ার সঙ্গে তার পরিচয়সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তন হয়েছেআগের থেকে অনেক বেশি গরম পড়েএসি বটার প্রয়ােজনীয়তা তার কাছে কোনদিন জরুরি মনে হয়নিকিন্তু আজকাল এপ্রিলের শুরু থেকেই এসিটা চালাতে হয়

আবার আগের মতাে তেমন বৃষ্টি হয় না, বাড়ির সামনে জল জমে না, রেনিডে – কিছুই হয় না। আগের মতাে হাড়-কাপানাে ঠাণ্ডাও পড়ে না। তবে বেশ কয়েক বছর পর এবার ঠাণ্ডাটা জমিয়ে পড়েছে। মন ভালাে হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই আবহাওয়াটা এক রয়েছে। আগে এই দখিনা বাতাসটা বুঝতে পারত ঠিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর।

কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকেই এখন এই হাওয়াটা পাওয়া যায়। সেই একগন্ধ, একই রকম মন উদাস করে দেওয়া হাওয়া। যে হাওয়ায় সকাল বিকাল খেলার অনুমতি পেত। পরীক্ষা শেষ, তাই পড়তে বসতে হত না। অদ্ভুত সুন্দর দিনগুলাে ছিল। ভাবতে ভাবতেই পৌলমীর মুখটা তৃপ্তিতে ভরে উঠছিল।

অফিসে ঢুকতেই পৌলমী বুঝতে পেরেছিল, কিছু একটা ঘটেছে। সবাই বেশ ভাজত। কিছু একটা বিষয় নিয়ে আলােচনা করছে। নিজের ডেস্কে গিয়ে বসতে বলতেই পাশের ডেস্কের পর্বকে জিত্তজ্ঞাসা করতেই, সে-ও উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল।

 – তুই জানিস না কী হয়েছে? সুপারস্টার সাগ্নিক রায় মারা গেছে। 

খবরটা  শোনা মাত্রই পৌলমী উত্তেজিত হয়ে উঠল। চিৎকার করে বলে উঠল।

– কী বলছিস কী ? কালকেই  তো কোন একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। -হ্যা, রাতেই নাকি মারা গেছে।    এবার  পৌলমী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। চুপ করে ডেস্কে বসে পড়ল। চোখ-মুখে  এক রাশ শূন্যতা । পৌলমীর অবস্থা দেখে সবাই চুপ করে গেল । যে পৌলমীকে কেউ কোনো দিন টেনশেন করতে দেখেনি, ভেঙে পড়তে দেখেনি ,

 তার এই অবস্থা দেখে সবার অবাক হওয়ারই কথাসিনেমা নিয়ে সে কোনও আগ্রহ দেখায়নিবরং বরাবর সিনেমা দেখার প্রস্তাব সে   এড়িয়েই গেছে ।   আস্তে আস্তে পৌলমীর  সামনে  অফিসের অন্যান্যরা ভিড় করতে শুরু পারছেএতদিন ত্নে আগলে রাখা মুখােশটা সরে গেছেসেই  স্কুল জীবনের আবেগপ্রবন  মেয়েটা হয়ে পড়েছে সে,

যে কথায় কথায় চোখের জল ফেলতকিন্তু এটা কি কথায় চোখের জল ফেলা বলা যেতে পারে? চোখের জল সাগ্নিকএম নেইসারা বিশ্বে কোথাও নেইমনের মধ্যে কোনও আশা রইল না যে হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে যেতে পারে

পৌলমী ধীরে ধীরে বাথরুমে গেলচোখেমুখে জল দিয়েও কোনও স্বস্তি পাচ্ছেন চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়েই চলেছেআজ সে কঁদতে চাইছেচিৎকার করে কাঁদতে চাইছেকিন্তু পরিস্থিতিটা বড়ই বেমানান

নিজেকে কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তা সে ভালােভাবেই বুঝে পেরে গেছে পৌলমী। শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে সে বাড়ি চলে আসেদুই ছেলে স্কুলে, প্রিয়ম অফিসেবাড়িতে কেউ নেই। সােজা বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার চালিয়ে দেয়শাওয়ারের থেকে অনেক অনেক বেগে চোখের জল বেরােতে থাকেআজ কুড়ি বছরের জমানাে কান্না বেরিয়ে চলেছে

তার জীবন থেকে সাগ্নিকের চলে যাওয়া, পৃথিবী ছেড়ে তার বাবার চলে যাওয়া, তার প্রথম সন্তানের অকালপ্রয়াণের জন্য নিজেকে দায়ী করার কষ্ট সব বেরিয়ে চলেছেআজ সাগ্নিক নেইতাই তাকে দেওয়া কথা রাখারও দায় নেইআজ সে মুক্তআজ সে সারাদিন কাঁদবে

কোন ক্লাস আজ আর মনে নেইআসলে বােধহয় কোনও ক্লাস নয়, জ্ঞাহওয়ার পর থেকেই দেখেছে সাগ্নিক তার সব থেকে কাছের বন্ধুসব কথা তাকে বলা চাইনাহলে পেটের ভাত হজম হবে না। ছােটবেলায় এমন একটা দিনও পৌলমী কাটায়নি, যেদিন সে সাগ্নিকের সঙ্গে কথা বলেনি

 ছােট্ট পৌলমী বারবার সাগ্নিককে জিজ্ঞেস করে – কী রে সাগ্নিক, তাের কোনও ডাকনাম নেই কেন? আমার তাে একটা ডাকনাম আছে, মাম।

– কী করব বল? তাের মতাে আমার মা-বাবা ডাকনাম রাখেনি। তুই এক ডাকনাম দে।

– সানি, কেমন লাগবে বল।

– ঠিক আছে, সানি।

  সেই যে সানি  ডাকা শুরু হল, শেষ যেদিন কথা হয়েছিল, মুখ থেকে সানি না বের হয়েছিল। সানি আর মাম। পাড়ার সবাই সানি-মাম একসঙ্গে ডাকত। দুপুরে একসঙ্গে গল্প’র বই পড়া। কোনও বাড়িতে আচার রােদে দিলে এক সঙ্গে চুরি করে খাওয়া ।

কতবার হয়েছে, সানি, মামের সঙ্গে পতল খেলেছে। আবার এ র সঙ্গে মাম ক্রিকেট খেলেছে। কবে যে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম হল বুঝতেই পারেনি।

মাম  তখন  ক্লাস  এইটে, সানি মাধ্যমিক দেবেবাবার সঙ্গে দোকান থেকে ছিল । হঠাৎ নজরে , সানি ন্য একটা মেয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে অাসছে । বাড়িই ঢুকেই , সানিদের   বাড়িতে চলে গিয়েছিল মামসানির ঘরে ঢােকা মাত্র মাম  হামলা  চালায় তুই  পড়াশুনা করতে টিউশনে যাস, না মেয়েদের সঙ্গে গল্প করতে? সেই বোধহয়, ওদের প্রেমের প্রথম পজেসিভনেস

সানি মাধ্যমিকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করার পর সবাই এমনকী মামও বলেছিল, সায়েন্স কাপভতে। কিন্তু সানি রাজি হয়নি। সে র্টস নিল। একটানাটকেদলে যােগ লি! উচ্চমাধ্যমিকে যখন মানুষ পড়া শেষ করে উঠতে পারে না, সেই সানি নাটক করে বেড়াত। গান গাইত, কবিতা লিখত পৌলমী তখন ইলেভেনে পড়ে পুজোর সময়, কলকাতা থেকে পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসেছিল সানি।

মাম সারা রাতঠার দেখার জন্য বাড়ি থেকে পারমিশন পেয়েছিল। সেদিন তারা কিন্তু কোনও ঠাকুর দেখেনি। সারা রাত তাদের শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে বসেছিল। অনেক গান শুনিয়েছিল সানি। এসময় বলে উঠেছিল ক্ষ্যামা দে, আমার গলা আর চলছে না।

ধীরে ধীরে মাম বুঝতে পারছিল, সানি অন্যদিকে চলে যাচ্ছে! অভিনয়-গান নিয়েই সে সবসময় মেতে থাকে। এককালে পাড়ার সব থেকে ভালাে ছেলে হিসেবে পরিচিত সানিকে, এখন পাড়ার সবাই বখে যাওয়া ছেলে বলে অভিহিত করে। পৌলমী সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সে প্রতিবাদও করতে পারত না।

লােকে বলত ও অভিনয় করবে, সিনেমায় নামবে। খারাপ ছেলেরা ও-সবকরে। মামের বুকের ভিতরটা হু হুরতে থাকে। কিন্তু সে অনুভব করতে পারে যে সানি একদিন অনেক বড় অভিনেতা হবে।

অনেকক্ষণ শাওয়ারের নিচে বসে থাকার জন্য পৌলমী’র এবার কাঁপুনি লাগছে। বাথরুম থেকে ভেজা জামাকাপড়ে ঘরে এল। আয়নার সামনে দাঁড়াল। এত কেঁদেছে যে তার চোখমুখ ফুলে গেছে। পােশাক পরিবর্তন করে সে সােফায় বসে টিভি খুলল। টিভিতে সাগ্নিকের মৃত্যু, সাগ্নিকের সিনেমা, সাগ্নিকের চরিত্র বিশ্লেষণ – একই জিনিস বিভিন্ন চ্যানেল দেখিয়ে চলেছে। সহ্য করতে পারল না পৌলমী, টিভি বন্ধ করে দিল।

উচ্চমাধ্যমিকে দুর্ধর্ষ রেজাল্ট করেছিল পৌলমী। সাগ্নিক উপহার দেওয়ার নাম করে আবার সেই নদীর তীরে নিয়ে যায়। চাদের আলােয় নির্জন নদীর তীর আরও মায়াবী হয়ে পড়ে। সেদিন সাগ্নিকের উষ্ণ স্পর্শে ক্রমশ গলতে থাকে পৌলমী। বাড়ি ফিরে তুলে জ্বর। জ্বর থেকে ওঠার পরই পৌলমী জানতে পারে, সেদিনের রাতের কথা, নদীতীরে বা বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেছে।

তাকে মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখান কেই তাকে পড়াশােনা করতে হবে। এখানকার সঙ্গে তার আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না।  সাগ্নিক সম্বন্ধে তার বাড়ির মত – অন্য ছেলে হলেও কথা ছিল, কিন্তু বখাটে ছেলে, শিকাতায় গিয়ে কিনা কিকরছে, তার সঙ্গে কখনই মেয়ের সম্পর্ক মেনে নেওয়া যায় না।

অবশেষে পৌলমীর ঠাই হয় মাসির বাড়িতে। কলকাতা থেকে, তাদের মহল থেকে অনেক দূরে চলে গেল পৌলমী। দূর মুম্বাই। পড়াশােনা করতে করতে কখনও সখনও সাগ্নিক এর সঙ্গে দেখা হত পৌলমীর। কথা একেবারে বন্ধ করতে পারেনি বা লােক। মাসিবাড়ি’র কড়া শাসন এড়িয়ে দু’জনের প্রেম চলতে থাকে।

মাঝে মাঝে পৌলমীমনে তে থাকে, এই সম্পর্কর ভবিষ্যৎ  কি ? জানে না , জানতে চাইত নাকিন্তু কলেজের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই হঠাৎ করে বিয়ে ঠিক হয়ে যায় পৌলমীরপাতলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকেমাসিমেনসাকে কোন বুঝিয়ে একা বাড়ি ফিরে আসে পৌলমীতারা জানতেন না সাগ্নিক আগেই মঙ্গল এসেছিল। ট্রেনে পৌলমীর সঙ্গে থাকে সাগ্নিক

বুকের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট অন হয়েছিলসাগ্নিককে দেখে, তা বাড়তে থাকে। মুখে কিছু বলেনি সাগ্নিকতবে  পৌলমী নামার আগের স্টেশনেই নেমে গিয়েছিল সাগ্নিকনামার আগে সানি কথা নিয়েছিল মামের কাছ থেকে আজ যা কাদার মাম কেঁদেছে, কিন্তু ভবিষ্যতে কোনও পরিস্থিতিতেই যেন মাআর না কাদেসেদিন মাম তার সানিকে বােঝাতে পারেনি, নাকাদা মানেই ভালাে থাকা নয়বরং, কেঁদে অনেক ভালাে থাকা যায়। সে সানিকে ছাড়া ভালাে থাকতে চায়নি

বিয়ে হয়, সংসার হয়। আস্তে আস্তে সংসারে মন বসে। সাগ্নিককে নাভুলেই প্রিয়মকে ভালােবাসতে শুরু করে পৌলমী। ধীরে ধীরে ঘাের সংসারী হয়ে পড়ে সে। তবে খুব গােপনে একটা যােগাযােগ থেকে যায়। রয়ে যায় একটা চোরাটানসেই টানেই সাগ্নিকএর স্ট্রাগলের সময় মনে করে তার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে ভােলে না পৌলমীসাগ্নিক যখন অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সে টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পৌলমী বলে – ফেরত দিলে বুঝব, তাের ওপর আমার সমস্ত অধিকার শেষ হয়ে গেছে।

এরপর পৌলমীর সঙ্গে সাগ্নিকের আর কোনও কথা হয়নি। সিনেমা নিয়ে লােকের সামনে নিরুৎসাহ দেখালেও, গােপনে সাগ্নিকের খবর পড়তে থাকে। মনে আছে, সাগ্নিকের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল একবার। তার সঙ্গে কোনও মেয়ের সম্পর্ক নেই, মেয়ে সম্পর্কে সে নাকি একেবারেই আগ্রহী নয়। সিনেমার বাইরে হিরােইনদের সঙ্গে সে ভাব জমায়

তাহলে কী সাগ্নিক ‘গে’! পড়ে ভালাে লেগেছিল পৌলমীর। মনে মনে বলে উঠেছিল আমার সাগ্নিক। পরে তার মনে হয়েছিল, সাগ্নিক তাকে ভালােবেসেই নতুন কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল না। কিন্তু পৌলমী তাে আলাদা পথ বেছে নিয়েছে। এমনও নয় যে সে দায়সারা ভাবে সংসার করছে। ভালােভাবে, ভালােবেসে, মন করছে। কিন্তু শুধু যখন কান্না পায়, তখন তার সাগ্নিকের কথা খুব মনে পড়ে।

আজ মনে হচ্ছে সাগ্নিক জীবনকে টেনে নিয়ে গেছে, শুধু পৌলমীকে ভালাে আজ মৃত্যুর পর সে বেঁচে গেল, মুক্তি পেল। এবার পৌলমী উঠল। নিজেকে রেডি করল। টিফিন তৈরি করতে হবে। হে থেকে ফিরল বলে। তুমুল কষ্ট দিয়ে সাগ্নিক তাকে মুক্তি দিয়ে গেল। যে মুক্তি আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখা যায়, ছােটবেলার ভালােবাসার মানুষটাকে কাছে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা যায় না। তবে মন খুলে কাঁদা যায়।

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *