কালিশূন্য সেই কলমটা

তন্ময় সিংহ রায়     

                                      একটা আধবুড়ো বকুল গাছ, সামনেই তার হাত দশেক চওড়া নদী। সোনালী আলোর সাথে জলের নিবিড় সম্পর্ক, আশেপাশের বিভিন্ন গাছগাছালি, চাষের খেত, কয়েকটা কাঁচা ও আধকাঁচা বাড়ি-ঘর এবং পাখীর কলরবে মনে হত গ্রাম-টা তার অপরূপ সৌন্দর্যে কেমন যেন অহংবোধে জর্জরিত।

যাইহোক, ওই বকুল গাছের নিচেই ছিলো ২৬ ও ৩১-শের দুটো সতেজ হৃদয়ের প্রকৃত ভালোবাসার মনের ভাব আদান-প্রদানের আদর্শ জায়গা।  টুং-টাং, ঝুন-ঝুন শব্দেই অধীর আগ্রহে থাকা আমার এই মনটা নেচে উঠতো খুশির আনন্দে।

বুকে হাত না রেখেই অনুভব করতাম হৃদপিন্ডটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। মনে হত পৃথিবীর সব সুখ যেন কেউ চুড়ান্ত বিশ্বাসে কিছু সময়ের জন্যে আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গেছে।

ভোরের সদ্য ফোটা গোলাপ, গোধূলিতে ঝাঁক বেঁধে নানা জাতের পাখির স্বশব্দে ঘরে ফেরা অথবা ওই উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় নানা রঙের খেলা,

প্রকৃতির সব সৌন্দর্য-ই যেন একত্রে এসে আমার কাছে উপস্থিত হত… লাল, নীল, গোলাপি কাঁচের চুড়িসমেত তোমার  সম্পূর্ণ শরীরটা যখন আমার পাশে এসে অবস্থান করতো।

যত্ন করে কাজল আঁকা তোমার হাঁসি হাঁসি মুখের চোখদুটো যখন আমার দৃষ্টিকে কেড়ে নিতো মনে হত মৃত্যুকেও আমি তুচ্ছ করতে পারি,

কি অসম্ভব আকর্ষণ ছিলো তোমার ওই দৃষ্টিতে। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, বাবার দেওয়া হাত খরচের পয়সা জমিয়ে তুমি আমায় একটা কালির কলম কিনে দিয়েছিলে, বলেছিলে ‘তুমি খুব ভালো লেখো, আমার ভালোবাসার একটা ছোট্ট উপহার এটা তোমায় দিলাম, তুমি অনেক লিখবে কিন্তু।’

বলেছিলাম, ‘তোমার ভালোবেসে দেওয়া এই অমূল্য উপহারে আমি অনেক সৃষ্টি করবো, আর সেই সৃষ্টির প্রত্যেকটায় থাকবে শুধু তোমার-ই নাম। তবে একটা বিশেষ অনুরোধ তোমার কাছে, কালি শেষ হলে নতুন করে কালিটা আবার তুমি-ই আমাকে ভরে দিও।’

ভীষন খুশি হয়েছিলে তুমি। একবার তোমার হাত ধরে উঠতে গিয়ে আমি ধপাস করে পড়েই গেলাম, সে কি হাঁসিটাই না তুমি হেঁসেছিলে,

তোমাকে থামাতে গিয়ে শেষপর্যন্ত আমিও হয়েছিলাম তোমার হাঁসির একমাত্র সঙ্গী। অবশেষে তোমার দ্বিতীয়বারের সাহায্যের হাতটাকে আমি ধরে ছিলাম কিন্তু তোমার অপরুপ স্নিগ্ধ ও মায়াবী হাঁসির টুকরোগুলো মনে হচ্ছিল কেমন যেন আমার রক্তের প্রতিটা কণায় মুহুর্তের মধ্যে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে, কোনো হুঁশ ছিলো না আমার কিছু সময়ের জন্যে, অপলক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ডুবে গেছিলাম তোমাতে।

হুঁশ ফিরলো ওই সাদা-ছাই রঙা রাজ হাঁসটার ঝপাস করে জলে লাফ দেওয়ার শব্দে। জীবনের কতগুলো রাত, কতগুলো দিন শুধু তোমার এই অসহনীয় মধুর স্মৃতিগুলোকে রক্তাক্ত বুকে চেপে আজ ৪১ বছর পর আমি তোমাদের সেই গ্রামের সেই জায়গায়।

খসখসে পাতলা অমসৃণ চামড়ার নিচ থেকে ঘুমন্ত শিরার জেগে ওঠা ও চুলে ক্লোরোফিলের অভাব জানিয়ে দেয়, সত্যি বয়েস হয়েছে। ডাক্তার বলেছে… ‘হার্ট আপনার  কমজোরি হয়ে গেছে।’… চশমা ছাড়া চোখেও ভালো দেখতে পাইনা।

নিজের অগোছালো জীবনের অন্তিমলগ্নে আজ দাঁড়িয়ে বুকে বড় বেশি যন্ত্রনা করছে, কেন বারে বারেই মনে হচ্ছে আমি আবার পড়ে যাবো আর তুমি আসবে তোমার সাহায্যের চুড়িমাখা হাতদুখানা বাড়িয়ে দিয়ে ভালোবেসে আমায় তুলতে। অপরুপ তোমার সেই হাঁসিটায় আমি আবার ডুবে যাবো, তোমার যত্নে আঁকা কাজল চোখে নিজেকে আবার আমি হারাবো।

আজও ভাবি, তোমার আর একটা হাঁসিও কি আমি আর এ জীবনে দেখতে পাবো না? তোমার গন্ধে ভরা সেই জায়গায় আমার দুচোখ বেয়ে অবিশ্রান্ত ধারায় জল, শুধু একটা বার তুমি দেখে যাও।   অফিসের কয়েকমাসের গ্রীষ্মকালিন ছুটিতে মাকে নিয়ে মামার বাড়িতে এসেছিলাম। সম্মানের চাকরি হলেও মাইনে ছিলো খুব-ই কম,

তাই তোমার বড়লোক বাবা আমাদের কিছুতেই দুটো হৃদয়কে যোগ হতে দেয়নি, বোঝেনি প্রকৃত ভালোবাসার মর্যাদা….. এমনকি তোমাদের গ্রামের মোড়লকে ডেকে লোকবলে একপ্রকার জোর করেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল তোমার, কি কষ্টটাই না পেয়েছিলে তুমি!…….. জানোতো,সেই বকুল গাছটাও আজ আর নেই। কাকে জানাবো আমার এই নিদারুণ মর্মস্পর্শী করুণ কাহিনি?

আজ জীবনের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তোমার কি আমার কথা আমার-ই মতন মনে পড়ে? অন্তত মাঝে মাঝে? বহুদিন পরে হলেও একবার?  কত প্রশ্ন জন্মায় আজও নি:সঙ্গ এই মনে, উত্তরের আশায় ব্যর্থ হয়ে আবার মৃত্যুও হয় এই শীর্ণ বুকেই।

চোখের সামনে তুমি নেই, আছো হৃদয়ে। পড়ে আছে একবুক যন্ত্রনাময় স্মৃতি আর অতি যত্নে পড়ে আছে তোমার দেওয়া কালিশূন্য সেই কলমটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: