কালো মেয়ের ভালবাসা

সুরজিৎ গুপ্ত

মুখটা অনেক আগেই চোখে পড়েছিল অর্কর।বিয়ের অনুষ্ঠানের মাঝে , ছাতনাতলায়,তারপর বাসর ঘরে , অনেকের মাঝে।চোখ দুটো দারুন সুন্দর।দৃষ্টি এড়ায় নি অর্কর।এখন একদম সামনে পেল।

রাত বেশ গভীর, প্রায় তিনটে বাজতে চলেছে। বাসরঘর ভেঙে গিয়ে সবাই কেটে পড়েছে।আজকাল যা হয়। প্রথমে সবাই উৎসাহ নিয়ে শুরু করে। তারপর রাত বাড়লেই যে যার সরে পড়ে। অভীর বিয়েতেও তাই হল।সব বন্ধুদেরই বিয়ে হয়ে গেছে।তারা যে যার বৌ নিয়ে আগেই কেটে পড়েছে। অভী জানত কেউই থাকবে না তাই অর্ককে ধরেছিল।

ভাই তুই অন্তত থাকিস। একা একা খুব বোর হয়ে যাব।

অগতির গতি বন্ধুদের মধ্যে শেষ ব্যাচেলার সেই।পাত্রপক্ষের তরফে শুধু অভী আর অর্ক। বাসর শুরু হতে প্রথমে দু একটা চুটকি, হাসির রোল। তারপর গান। দু একজন শুরু করল। অভীও কিছু বলে নি অর্কের ব্যাপারে। শেষে ধরল অর্ককে।এসব ব্যাপারে অর্ক একটু লাজুক। তবু অভীর জোরাজুরিতে শুরু করল।গানের গলাটা অর্কর ছোটবেলা থেকেই ভাল। ও শুরু করার পর আর কেউ গাইবার সাহস পেলো না।

একা আর কতক্ষন গাওয়া যায়। বেশ কটা গাইবার পর অর্কও থেমে গেল।ঘুম ঘুম ভাব সবার চোখে।আস্তে আস্তে সবাই সরে পড়ছে।অভীর বৌ মৌ ওই মেয়েটাকে বলল

কলি , প্লীজ দেখ না কোথাও জায়গা আছে নাকি। আর পারছি না।

তোদের জন্য জায়গা ম্যানেজ করে রেখেছি চল দেখি ঢুকিয়ে দিতে পারি কি না।

অর্ক ততক্ষনে বাইরে চলে এসেছে। একটা সিগারেট খেতেই হবে।সামনের প্যান্ডেলে চেয়ারগুলো ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে।লোকজন কেউ নেই। দু একটা কুকুর খাবার জায়গায় চেঁচামেচি করছে।এতক্ষণ বদ্ধ জায়গায় থাকার পর বেরিয়ে এসে বেশ ঠান্ডা লাগছে।কোনমতে সিগারেটটা ধরিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল।

বিয়েবাড়ির কোলাহল থেমে গিয়ে এখন নৈশব্দের বিচরণ চরাচর জুড়ে।শুধু একটানা ঝিল্লির ডাক সেই নৈশব্দতাকে ভেদ করছে।একা বসে এই জায়গাটায় অর্কের বেশ ভাল লাগছে।একাকীত্ত্ব মাঝে মাঝে সুখকরও হয়।অভী আর মৌ ঘরে ঢুকে গেছে। শোয়ার জায়গার জন্য এত রাতে আর কাকেই বা বলা যায়। তার থেকে এই বেশ, ঘন্টা দুয়েক এখানে কাটিয়ে দিতে পারলে সকালে বাড়ীর পথ ধরা যাবে। কাল আবার অফিস আছে।

সামনের জোছনা ভেজা মাঠ আর গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হিমের গন্ধ পাচ্ছিল অর্ক আর ভাবছিল রাতেরও একটা আলাদা সৌন্দর্য্য আছে।মনের মধ্যে একটা গান গুনগুন করছে অর্কের

জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে…..

একি, আপনি এখানে একা একা বসে আছেন?

চমকে তাকিয়ে দেখে অর্ক সামনে সেই চোখ।কথাটা তার উদ্দেশ্যে ই বলা।তবু নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞেস করল

আমায় বলছেন?

তো আর কে আছে এখানে? আমি কখন থেকে খুঁজছি আপনাকে।চলুন অভীদা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আমায় বলল আপনাকে ডেকে আনতে।

সে কি? অভী তো মৌ এর সাথে ঘরে ঢুকে গেল, একা আমি কি করি?তাই ভাবলাম এখানটায়  একটু বসি।

আরে না না। অভীদার জন্য জায়গা রেখেছিলাম। অভীদা রাজি হল না। বলল আপনাকে একা ফেলে শোবে কি করে?এখন দুজনের একসাথে শোবার জায়গা পাই কোথায় ? শেষে দেখি ওই বরাসনটাই খালি পড়ে আছে। দুজনে মিলে ওখানেই গড়াগড়ি দিন একটু। নিন ,তাড়াতাড়ি সিগারেটটা শেষ করে চলুন দেখি।

তাহলে তো একটা বড়সড় ধন্যবাদ দিতে হয় তোমায় কৃষ্ণকলি।

কোনোরকম ভনিতা না করেই তুমিতে নেমে এল অর্ক।ভেতরে একটা আত্মবিশ্বাসও ফিরে পেয়েছে যেন। না হলে আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ের সঙ্গে এত সপ্রতিভ ভাবে কথা বলার সাহস অর্কের ছিল না।আসলে মেয়েটাকে খুব সাবলীল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন চেনা, অনেকদিনের চেনা। যদি নাও হয় তবে মনে হচ্ছে এর সাথে কথা চালিয়ে যেতে পারা যাবে।

বাঃ, আপনার তো বেশ বুদ্ধি । আমার পুরো নামটা জানলেন কি করে। না কি গায়ের রঙ দেখে অনুমান?

অবশ্যই না। সবাই কলি কলি করে ডাকছিল তোমায়।আমার মন কিন্তু বলছিল কলি নয়, কলি নয় কৃষ্ণকলিই নাম তোমার।

বাবাঃ,খুব ভাল কথা বলতে পারেন তো, আর গানের গলাটাও খুব ভাল। আমার তো খুব দারুন লাগছিল। আধুনিক রবীন্দ্রসংগীত দুটোতেই বেশ সাবলীল । আরো শুনতে ইচ্ছে করছিল।

তাই ! যাক তোমার প্রশংসায় রাত জাগার কষ্টটা দূর হল অন্তত।

নিন, এবার চলুন , আপনাকে শোবার জায়গা দেখিয়ে আমার ছুটি ।

আমার কিন্তু এখানেই বেশ ভাল লাগছে তোমার সাথে কথা বলতে।এখন শুতে গেলেই তো কথা শেষ। আর হয় তো দেখা হবে না তোমার সাথে।কাল ভোরেই বেরিয়ে পড়তে হবে। প্রথম যে ট্রেনটা পাব ওটাই ধরব। অফিস আছে কাল।

পারবেন? কষ্ট হবে না?

হবে হয় তো, সে ম্যানেজ করে নেব।

তাহলে আর দেরী করবেন না। বিছানা করে রেখেছি।চলুন।

ইচ্ছে ছিল আরো কিছুক্ষন কথা বলার তবু উঠে দাঁড়াল অর্ক। নিজের ভাল লাগার জন্য অন্যকে কষ্ট দেওয়ার পক্ষপাতী নয় সে। বাসরঘরে ঢুকে দেখল অভী ঘুমিয়েই পড়েছে। বেচারা ক্লান্ত। কৃষ্ণকলি ভালই ব্যাবস্থা করেছে। বরাসনের ওপর চাদর পেতে দিয়েছে। ঢাকা লাগান কম্বল দিয়েছে।গুডনাইট জেলে জলের ব্যাবস্থা করে বলল

দরজাটা ভেজিয়ে শুয়ে পড়ুন। কেউ আসবে না এ ঘরে।আমি আসি।

এসো। হয়ত ভোরবেলা আর দেখা হবে না। অভী যদি না ওঠে ওকে বলে দিও, যদিও আমি বলে রেখেছি।

ঠিক আছে।

আর হ্যাঁ, আমাদের শোবার জায়গা না হয় করে দিলে, তোমার নিজের শোবার জায়গা হল কি?

মাসীমার পাশে একটু জায়গা আছে, দেখে রেখেছি, ওখানেই শুয়ে পড়ব।আসি ?

হ্যাঁ, এসো।

লাইট নিভিয়ে অর্ক নিজেকে ঘুমের হাতে তুলে দিল।একটা মধুর আবেশ নিয়ে বাকী রাতটুকু স্বপ্নের মতন নরম সুখে গড়িয়ে যাচ্ছিল আধা ঘুম আর জাগরনে।কখন যেন ঘুমটা জড়িয়ে এসেছিল।তার মধ্যে একটানা ঠুকঠুক একটা আওয়াজ হয়ে যাচ্ছিল। ঘুমের শিকড় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে মনে হল আওয়াজটা এই ঘরের দরজায় হচ্ছে। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল কৃষ্ণকলি।

শাড়ী পালটে একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে।ঠান্ডা বাঁচাতে একটা শাল গায়ে দিয়েছে মাথা মুড়ি দিয়ে, হাতে চায়ের ট্রে।

চা নিয়ে এলাম। আপনি তো আবার এক্ষুনি বেরোবেন। অভীদাকেও ওঠাতে হবে। ওদের আবার বাসি বিয়ে আছে।

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসল অর্ক। এই ভোরবেলায় এমন এক কাপ গরম চা আশা করে নি সে।একটা অদ্ভুত ভাল লাগার পরশ মাখা গরম চায়ের কাপটা আলস্যে শেষ করতে চাইছে সে , কিন্তু সময় নেই বেরোতে হবে তাকে। অভীকে বিস্তর ডাকাডাকি করে ঘুম থেকে তুলল কৃষ্ণকলি।অভী ঘুম থেকে উঠে বলল

বেরোচ্ছিস। কাল কিন্তু সকাল থেকে আসবি ভাই। তুই না থাকলে আমি ঠিক সাহস পাই না।

জ্যাকেটটা গায়ে দিতে দিতে অর্ক বলল

আসব আসব কাল তো ছুটি নিয়েছি। কাল সকালেই তোর ঘরে চলে আসব। এখন চলি রে।

তুই যাবি কি করে স্টেশন? কলি এখান থেকে স্টেশন কত দুর?

একটু দূর আছে। আমি ছেড়ে দিয়ে আসব আপনাকে। আমার স্কুটি আছে। এত সকালে কিছু পাবেন না।

বিয়েবাড়ি আসতে আসতে জেগে উঠছে।মৃদু কোলাহল শুরু হয়েছে। বাসি বিয়ের তোড়জোড় চলছে বোধহয়।বাইরেটা কুয়াশায় ঢাকা। কলি গাড়ি বার করছে। অর্ক বলল

আমায় দাও, আমি চালাব।তুমি শুধু রাস্তাটা বলে দেবে।

কলি পেছনে বসল। কে যেন সানাইয়ের বড় বিষাদের সুর হাল্কা করে বাজিয়ে দিয়েছে এই ভোরে।অর্ক গাড়ি স্টার্ট দিল। কলি বলল

যদি আবার কখনো দেখা হয়, আপনার কাছে গান শুনতে চাইব। না করবেন না তো?

অবশ্যই, তুমি অনুরোধ করলে আমি গাইব না এটা হতে পারে?

স্টেশন আসতেই অর্ক দেখল ট্রেন আসার ঘোষনা হচ্ছে। নেমেই কলিকে চাবি দিয়ে থ্যাংকস বলে টিকিট কাউন্টারের দিকে ছুটল।টিকিট কেটে ওভারব্রীজে উঠতে উঠতে পিছনে একবার ফিরে দেখল গাড়ী নিয়ে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণকলি।

কাল মৌ ফোন করেছিল। আজ রোববার।ওদের অষ্টমঙ্গলা আজ। বারবার ওকে আসতে বলছে।কলির ইচ্ছে নেই যাবার।কি করবে গিয়ে।তার থেকে ঘরে থাকলে মাষ্টার্সের পেপারগুলো তৈরি করা যাবে। মনের মধ্যে একটা গানের কলি গুনগুন করছে

ওগো কাজল নয়না হরিণী

তুমি দাও না ও দুটি আঁখি………

গানটা অর্ক বাসরে গেয়েছিল। কেন গাইল অর্ক এই গানটা ? কাকে উদ্দেশ্য করে গাইল?

সাতদিন পেরিয়ে গেছে।অর্কর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। কেউ কারো ফোন নাম্বার নেয় নি। সবাই আগেই নেয়। কেন  যে নেয় নি কে জানে? হয়ত ভেবেছিল ক্ষণিকের ভাললাগা, মিলিয়ে যাবে। অনেকবারই এমন হয়েছে।

অভ্যেসমত সকালবেলা মোবাইলটা খুলল।

ফেসবুকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট  এসেছে।খুলতেই চমক। অর্ক পাঠিয়েছে।

একসেপ্ট করবে কি না ? কি হবে ?একটা নতুন অধ্যায় শুরু হবে , তার পরিণতি কি হবে জানা নেই।মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা শুরু  হয়েছে।দশ মিনিট সময় নিল কৃষ্ণকলি , তারপর টিপেই দিল একসেপ্ট বাটন টা।কিছুক্ষনের নিস্তব্ধতা ভেঙে মেসেঞ্জারে অর্কর মেসেজ এলো।

তোমার নাম্বার ছিল না। ফেসবুক থেকে খুঁজে বার করেছি।  প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারি না, তাই কাউকে সহজে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই না।সংশয় ছিল যদি না সাড়া দাও।

দিলাম তো সাড়া, এখনো কি?

যে টুকু সংশয় ছিল ভেঙে গেছে।অভীর বৌভাতে আসবে আশা করেছিলাম।অনেক খুঁজে তোমার দেখা পাই নি।

যাই নি তো, পাবেন কি করে?

কৃষ্ণকলি, একটা কথা বলেছিলে সেদিন গাড়িতে বসে মনে আছে? আবার যদি কোনোদিন দেখা হয়…

বলেছিলাম তো। মানুষ অনেক কিছুই ভাবে, চায়। সব কিছু কি পুর্ণ হয় ?

তাহলে তোমার সাথে কি আর দেখা হবে না? আমার তো আজ সকাল থেকে মন চাইছে তোমায় দেখতে।

বাব্বা , কি এমন দেখলেন এই কালো মেয়ের মধ্যে?

কৃষ্ণকলি, আমার ঘরের ছাদে টবে একটা গোলাপ লাগিয়েছিলাম জানো।রোজই জল দিতাম। কদিন আগে হঠাৎই খেয়াল করলাম কখন আমার অজান্তে সেটায় কুঁড়ি এসেছে।

সব কুঁড়ি থেকে ফুল হয় না মশাই।দেখুন ফুল ফোটে কি না?

ফুটেছে কৃষ্ণকলি , আমার সে কলি আজ গোলাপ হয়ে ফুটেছে।কালচে লাল গোলাপ। রূপ তার তেমন নয়, কিন্ত তার মিষ্টি গন্ধ আমায় পাগল করেছে।

কৃষ্ণকলির কাজল কালো চোখ কেন জলে ভরে এলো? অর্ক কি লিখছে সবই ঝাপসা।

কি উত্তর দেবে সে?

মেসেঞ্জারে পর পর লেখা আসছে।

অনেক কষ্টে কৃষ্ণকলি চোখের জল মুছে দেখল অর্ক লিখেছে

মেমসাহেব,আমি আসছি। আজ বিকেলে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থেকো স্টেশনে ওই পলাশ গাছটার নীচে।

মেমসাহেব, আজ ওই পলাশের নীচে বসে তোমায় গান শোনাব। কোন গানটা শুনবে মেমসাহেব?

কি হল মেমসাহেব, চুপ করে গেলে কেন?প্লীজ মেমসাহেব কিছু বল ?

আসবে না মেমসাহেব?

কৃষ্ণকলির আঙুল সরে না। কাঁপা কাঁপা হাতে কালো মেয়ে লিখছে

আসব আমি, আসব। শুধু এই গানটা আমায় শুনিয়ো

রাত্রি এসে যেথায় মেশে

দিনের পারাবারে…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: