ক্ষতিপূরণ

রণেশ রায়

বিপুল মাষ্টারের  মাথায় বাজ। পেঁচি দুদিন হল বাড়ি নেই। সে আজ অনাথ। একা। টিভি খুলে বসে। জোর খবর। মগরাহাটের সংগ্রামপুরে পাঁচদিন আগের চোলাই কীর্তন। সেদিনই  মারা যায় জনা ষাটেক। তারপর থেকে রোজ। আজও দুজন। মৃত্যু মিছিলটা দীর্ঘতর হয়েছে। একাত্তর ছাড়িয়ে গেছে। তার সঙ্গে চোলাই বাদশার উত্থানের লোমহর্ষক কাহিনী। গুরু মহারাজ।  পুলিশের সক্রিয়তায় দু`জন্যেই হাওয়া। অনুগ্রহের ডালি নিয়ে সরকার মহানুভব।

বিষ মদের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ অথচ চোলাই-এর কল্যাণে বাড়িতে বধূ নির্যাতন, সন্তানের উপবাস। নির্যাতন সহ্য করতে না পারায় বধূর আত্মহত্মা। জীবিত থাকতেই এদের ভারে ভারাক্রান্ত পরিবার। অথচ চোলাই কারবারের গঙ্গাযাত্রা না ঘটিয়ে তাদের লাইসেন্স দিয়ে জিয়িয়ে রাখা, ক্ষতিপূরণের অনুগ্রহে সরকারের মানবিক মুখ প্রদর্শন। অদ্ভুত স্ববিরোধিতা। ভাবায় বিপুলকে।

হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে। সঙ্গে গম্ভীর ডাক, “ বিপুলবাবু, দরজা খুলুন “।  কলিংবেল যে সেটাই আদেশ দেয় সেটা বোধহয় ভুলে গেছেন আগুন্তুক। বিপুল মাস্টার উঠে দরজা খোলেন। সামনে যমরাজ থানার মেজবাবু। সঙ্গে জনা চারেক কনষ্টেবল, পেছনে কয়েকটা কৌতূহলী মুখ। “বিপুলবাবু আপনার কাছে থাকে যে মেয়েটি, কি যেন নাম, হ্যাঁ পেঁচি, সে কোথায়?“ আদেশের ভঙ্গিতে প্রশ্ন। বিপুলবাবু বলেন, “নেই“

ধমকে ফের, “ বলুন বলছি কোথায়!“

“জানি না“ ছোট্ট উত্তর মাষ্টারের।

“ আর সেই গুণধর নেপা ? চোরের  সাক্ষী গাঁটকাটা। যাকে আপনি সেদিন থানা থেকে ছড়িয়ে আনেন“। মেজবাবুর গলায় আক্রমনের সুর। বিপুলবাবু বাবু বোঝেন আক্রমনের নিশানা সে। শান্তগলায় তিনি উত্তর দেন, “ আজ এখানে আসেনি। বোধহয় পেঁচির সঙ্গে গেছে।“  ধমকে ফের, ` এইতো জানেন। তবে কোথায় বলুন “?

“বলেছি, বোধ হয়। ঠিক  নেই । কোথায় কে যায় সেটা আমাকে বলে যেতে কেউ বাধ্য নয়“।

“তবেতো আপনাকে একবার আমাদের সঙ্গে আস্তে হবে। বড়বাবুর ইচ্ছা তাই “

সুর যেন একটু নরম।  বিপুল মাষ্টার অবিচল। যেন আগাম জানত এর`ম কিছু ঘটতে চলেছে। সামনে দাঁড়ানো পুলিশ ভ্যানটা বিপুলবাবুকে পোড়া পেট্রল ওড়াতে ওড়াতে নিয়ে যায়।

ইতিমধ্যে পথে ভিড় জমেছে। অঞ্চলে বিপুলবাবুর শুভানুধ্যায়ীরা যেমন আছে তেমনি আছে শত্রু না হলেও বন্ধু নয় এমন অনেকে। কেউ কেউ দু:খ পায়। বলে, “ নির্ঝঞ্ঝাট মানুষটাকে নিয়ে পুলিশের টানাটানি কেন ?“ আবার কারো মন্তব্য, “ দেখো ওপরে ওপরে ভেজা বেড়াল। কিন্তু ভেতরে হয়তো কালসাপ ! মেয়েটার সঙ্গে কেলো নয়তো ?“ আবার কেউ কেউ বলে,“নেপাকে প্রশ্রয় দেয়।  ফল ভোগ করতে হবে। “ সংশয়ী কিছু মানুষের ভয় অন্যত্র। তারা বলে, “ কি জানি, মাওবাদী নয়তো ! তাহলেতো কথাই নেই। সারাজীবন হাজতবাস“।

এরই মধ্যে সংবাদ মাধ্যমের উপস্থিতি। খবরের কাগজওয়ালারা হাতে গরম কালকের খবরের বাইট পেয়ে যায়। টিভি ব্যবসায়ীরা সংবাদ চিত্রে নাটক প্রদর্শন করে দেখাবার জন্য স্টুডিও বুক করে।

খালপাড়ের নেপা। ছিপি ছিপে, কালো মাঝারি গড়ন।  বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ। সেই কবে খুব ছোটবেলায় বাবা মারা গিয়েছেন মনে নেই। বোন বছর চারেকের ছোট।  মা এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে সংসার চালান। তবে এখন অসুস্থ। নেপার মাধ্যমিকের পর আর পড়া হয়নি। স্বভাবটা একটু বেপরোয়া। তবে ডানপিটে বলা যায় না।

কারো কাছে বাঁধা থাকতে চায় না। তাই দিনের কাজ দিনের পয়সা। খাই নেই।  তেমন দায়ও নেই। রোজের রোজগার মায়ের হাতে তুলে দায় শেষ। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। মায়ের দুশ্চিন্তা। ছেলেটার না হয় চলে যাবে। মেয়েটার কি হবে ! বয়সতো হয়েছে। বিয়েটা দিয়ে যেতে পারলে ভালো হতো। স্বস্তি পেতেন। ছেলের দায় ছাড়া  ভাব দেখে কখনো সখনো বকাবকি করেন।

কোথাও একটা বাঁধা চাকুরী নিলে দায়টা বুঝতো। মায়ের মনের কথা বুঝে নেপা বলে,“ দেখো মা, আমি অস্থায়ী —— কন্টাকচুয়াল। সকালের চুক্তি বিকেলে শেষ। তারপর আমি আমার। ও সব আমার হবে না। বোলো না। “ মা বলেন,“ বোনটার কি হবে ভেবেছিস !“  নেপা না শোনার ভান করে বেরিয়ে যায়।

নেপা আবার বিপুলের খুব প্রিয়। বিপুল মানে এ পাড়ার বিপুল মাষ্টার। পরিচিত নাম। নেপাল তাঁর কাছে কেন বাঁধা তা নিয়ে অনুমান করা চলে কিন্তু নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। কারণ ওর স্বভাব। পেঁচিকে নিয়েই বিপুলের সংসার। তৃতীয় ব্যক্তি নেপা। তৃতীয় হলেও অন্দরমহলে তার অবাধ যাতায়াত। পেঁচির মা মাষ্টারের স্ত্রী থাকতেই এ বাড়িতে কাজ করতেন। সঙ্গে ছোট পেঁচি। বেশ কিছুদিন আগে এক দুরারোগ্য রোগে পেঁচির  মা মারা গেছেন। সেই থেকেই পেঁচি বিপুলের সংসারে। নিজেদের সন্তান না থাকায় পেঁচিকে নিয়ে স্ত্রী বেশ থাকতেন। কিছুদিন হল স্ত্রীও গত হয়েছেন। সেই থেকে পেঁচিয়ে নিয়ে বিপুল মাস্টারের বাপ বেটির সংসার।

নেপা রোজই আসে।  যেদিন গাড়িতে বেশি সময়ের ডিউটি সেদিনও রাত করে  হলেও আসে। আসতে ভুল হয় না। তবে কার টানে ! সংশয় বিপুল মাষ্টারেরও। কিন্তু ভালোও লাগে। নেপার সঙ্গে অনেক কথা হয়। এপাড়া-ওপাড়ার খবর পাওয়া যায়। দু`জনে  দু`জনের সাহায্যে লাগে। টাকা পয়সার দরকার হলে নেপা বিপুলের সাহায্য নেয়।

ডাক্তার দোকানপাটের কাজে নেপা বিপুলের পাশে। যখন দরকার বিপুলবাবুর ঝরঝরে গাড়িটা নেপা চালিয়ে দেয়।  টাকা নিতে সঙ্কোচ করে। বিপুল মাষ্টার বলেন,“ এটা চুক্তি। কাজের বিনিময়ে তোমার প্রাপ্য।“ নেপা হেসে গ্রহণ করে। নেপা এসে বাড়িতে ভিড় বাড়ায়। ও এলেই পেঁচি ঘরে ভিড় কমায়। রান্নাঘরে আশ্রয় নেয়।

ঘর থেকেই নেপার মন্তব্য, ওর পেছনে লাগা, “ কি রে পেঁচা সুন্দরী পালালি কেন? ও ঘরে কেউ নাকি ! রূপ দেখাতে গেলি ?“ পেঁচা খেপে ওঠে। রান্নাঘর থেকে পাল্টা দেয়, “আমি পেঁচি তাই না! ও বাড়িতে বাবুর বাড়িতে যাও না ! দেখো সুন্দরী পাবে। এখানে ভিড়তে আসা কেন?“ নেপালের তাৎক্ষণিক জবাব, “আমি পেঁচাপেঁচি দেখতে আসিনি। এসেছি দাদার কাছে। গুরু আমায় ভালোবাসে তাই। “ পেঁচি বলে ওঠে, “ তবে এদিকে নজর কেন? গুরুদেব দাদার সঙ্গে বক না। “

বিপুলের বেশ লাগে। যেন একটা সুখ-বেদনার ছোঁয়া।  নিজের ছেলেমেয়ে নেই কিন্তু এরাতো আছে। সম্পর্কে যত দূরের  আত্মীয়তায় তত কাছের। তবে নেপার গুরু ডাকটা ভালো লাগে না। আবার খারাপও লাগে না। ওর ডাকে গুরুবাদের সুরটা বাজে না। একটা অধিকারের দাবি। আর আজ দাদা-দিদির ডাকে তো তোষামদের আর গোলামীর সুরটাইতো বেজে ওঠে। সেটা নেই নেপার ডাকে।

পাশের বাড়ির মেয়েটিতো সুন্দরী নয়ই। বরং প্রস্থে একটু মাত্রা ছাড়া, দৈর্ঘে মাত্রা ছুঁতে পারে নি। নাকটা একটু চ্যাপ্টা বলে মন্দ লাগে না। এর ওপর বেজায় ফর্সা। তবে বলতেই হয় আমাদের পেঁচি তেমন না হলেও সুন্দরী। আঠারো উনিশ বছর বয়েস। মিষ্টি মুখ, রঙটা  একটু চাপা। লম্বা বলে একটু রোগা লাগে। কিন্তু রুগ্ণ নয় একেবারে। সেটা ওর হাসি দেখলেই বোঝা যায়। সকাল আটটা নটার রোদ্দুর। আর তেজটা যখন দেখায়, ফুটে ওঠে। তবে ওকে পেঁচি বলে ডাকা কেন? ছোটবেলায় ওর বাবা ওকে এ নামে ডাকতেনে । বোধহয় ও নামে ডাকের সঙ্গে একটা অহংকার  জড়িয়ে থাকতো। তাঁর মেয়ে পেঁচি নয়, সুন্দরী। তাই এই ব্যাজস্তুতি।

পেঁচির নজরটা তুখোড়। বোধহয় বিপুলের মতই লক্ষ্য করেছে যে নেপা এলেই পাশের বাড়ির মেয়েটি বারান্দায় আসে।  একটা জিজ্ঞাসু চোখ। কি যেন জানতে চায়। দেখেনি যে তা নয়। তাও নেপা উদাসীন। বরং পেঁচিকে উত্তক্ত করেই ওর বেশি আনন্দ। পেঁচির দাবিতো অস্বীকার করা যায় না। সে তেমন না হলেও সুন্দরী। অন্তত  বাবুর বাড়ির মেয়েটির থেকে। নেপা পেঁচি বলে ডাকে কেন? ওরতো আরেকটা নাম আছে। সুস্মিতা। বছর পাঁচেক আগে প্রথম পরিচয়ে নাম জানতে চাইলে ও ওই নামটাই বলেছিলো। তবে কেন ? সুস্মিতা নামে সে পেঁচির চেহারাটার ছোঁয়া পায় না?  পেঁচির রাগ হয়।

বিপুল বেরিয়ে গিয়েছে। পেঁচি বাড়িতে একা। অঢেল সময়। সে ঘুমোতে চেষ্টা করে। ছোটবেলা থেকে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনা মাথায় ভিড় করে। ঘুম এতো ভিড় পছন্দ করে না। পালিয়ে যায়।  মনে পড়ে বাবা চোলাই খেয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফেরে। সারাদিন রিকশা টানার পরিশ্রম। পেঁচির বাবার জন্য কষ্ট হয়। কিন্তু বাবা যখন মাকে মালের ঘরে মারে তখন তার সহ্য হয় না। সহানুভূতি উবে যায়। মায়ের দোষ কোথায়। তার ওপর কেনা  অত্যাচার ? তার ঘুম ভেঙে যায়। সে প্রতিবাদ করে। কখনো কখনো বাবার সঙ্গে হাতাহাতি হয়। মা আটকায়। যত দিন যায়, পেঁচি একরোখা হয়ে ওঠে। মায়ের ওপর রাগ হয়। মাওতো কাজ সেরে আসে। তার বাইরে ঘরে কাজ। সংসারের খরচটাও চালায়। এরপর ঠেঙানি। এ কি মগের মুল্লুক! মা সহ্য করে কেন?

বাবার রাগ মা মেয়ের জন্ম দিয়েছে কেন? জোর করে এবার ছেলের জন্ম দেওয়ার জন্য। এটা যেন মায়ের ইচ্ছে হলেই ঘটবে। মা মা`র খায়। কিন্তু রাজি হয় না। একদিন শুধু ও মা`কে বলতে শোনে,“আগে চোলাই ছাড়ো তারপর ও`সব আবদার করতে আসবে। মা এটা বলায় বাবার সে কি রাগ !  জ্বলন্ত সাঁড়াশির আঘাত মায়ের পিঠে পড়ে। পিঠের দাগটা তার আর কোনোদিন শুখোয় না। সেটা সে বোধহয় সারাজীবন মনে বহন করে। তবে পেঁচি সেদিন বাবাকে বঁটি নিয়ে তাড়া করে। শুয়ে শুয়ে পেঁচি ভাবতে থাকে।

এখন পেঁচি বোঝে ওর বড় বয়সেও কেন মা তাকে নিয়ে রাতে ঘুমোতো। মায়ের বোধ হয় ভয় হতো বাবার আবদার রাখতে বাধ্য হলে যদি আবার মেয়ে হয় ! তবেতো কপালে দু:খ হাজারগুণ বেড়ে যাবে। আবার চাপ বাড়বে পুত্র সন্তানের জন্য। তাই প্রথম রাতেই বেড়াল মারা। সঙ্গ দিতে কৌশলে অস্বীকার করা। এই জেদের জন্য মায়ের ওপর পেঁচির শ্রদ্ধা বেড়ে যায়।

একদিন মাঝরাতে বাবা মত্ত  অবস্থায় মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এত অত্যাচার করে যে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে মা ফলিডোর খায়। পেঁচি পাশে শুয়ে ঘুমে। মায়ের গোঙানি শুনে উঠে পড়ে। মায়ের মুখে ফেনা দেখে ভয় পায়। বাবাকে সে প্রায় মেরে তোলে। মাকে দেখে বাবার নেশা ছুটে যায়। ধরাধরি করি হাসপাতালে দেওয়া হয়। বাবা দুদিন নাওয়া খাওয়া ছেড়ে হাসপাতালে পড়ে থাকে। পেঁচি সেই দুদিন বাবাকে মদ ছুঁতে দেখেনি। বাবার  .চোখে জল দেখেছে। তবে পেঁচি বোঝে না সেটা ভালোবাসায় না মাকে ছাড়া বাবার চলে না বলে। পেঁচি জানলো মা সঙ্গে ফলিডর রাখতো। পাশের ঘরের ফুলমাসিও ফলিডর খেয়ে আর বাঁচে নি। তবে মা এ যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলো। পেঁচি শুয়ে শুয়ে ভাবে আজও গরিবের ঘরে ঘরে এক কাহন।

সেদিন পেঁচি ঠিক করেছে সে নিজে পছন্দ করে এমন ছেলেকে বিয়ে করবে যে মদ ছোঁয়  না। তাতে যদি বিয়ে না হয় হবে না। বিয়ে না হলেই বা কি। স্বামী চোলাই খেয়ে ঘরে ঢুকলে সে ঘর ছাড়বে। পেঁচির মনে পড়ে মা মারা যাওয়ার পর বাবা কোথায় চলে যায়।  অনেকে বলে বাবা আবার বিয়ে করেছে। সেই থেকে পেঁচি এ বাড়িতে।

বিপুল মাষ্টারের বেশ চলে। নিজের সন্তান নেই। বউটাও চলে গেলো। তবে এরাই এখন সব। সুবিধায় অসুবিধায় সব সময় হাজির। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর অবসরটাই হারিয়ে গেছে। নিয়ম করে মর্নিং ওয়াক,  টিউশন, খবরের কাগজ, পাড়ায় আড্ডা , কফি হাউস। আর নেপা পেঁচি। কফি হাউসে বসলে মনটা উদাস হয়ে যায়। সে অতীতচারী হয়ে ওঠে। নিজেদের আড্ডার আড়ালেই লক্ষ্য করে অল্প বয়স্ক ছেলে মেয়েদের। তড়িৎ চোখে মৃদু মন্দ হাসি তামাশা ঠাট্টা ইঙ্গিত। নিজের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলি মনে পড়ে। বদলটাও চোখ এড়ায় না। তবে অন্যত্র যে বদল সেই তুলনায় এটাকে অ-বদলই  বলা চলে। যেন এক ধারাবাহিকতা, পরম্পরা। কফি হাউস নিয়ে তার নিজের লেখা কবিতাটা যেন ফিরে আসে :

কফি হাউসে বসে এককাপ কফি

আড্ডা গপ্প যার যেটা হবি

সময় কাটে, ইঞ্জিনের ঝিক্  ঝিক্

ছেলে ছোকরারা হাসে ফিক্  ফিক্।

 ফিরি পঞ্চাশ বছর আগে, খুঁজি তারে  

   পাশাপাশি বসে গঙ্গার  পাড়ে।

সঙ্গে নেই সুমিতা আজ

 থাক সে কথা তাতে নেই কাজ।  

আমার কথায় আসা যাক

জীবন নিয়েছে বাঁক

বিয়ে করেছি তাকে

আগে দেখিনি যাকে,

বাসর ঘরে প্রথম আলাপ

আলাপতো নয় প্রলাপ ,

বুঝেছি সংসারী মেয়ে

থাকব ভালো এটা ওটা খেয়ে,

শুনে চলবে কথা

অযথা দেবে না ব্যথা।

লজ্জা ভাঙ্গতে লেগেছে সময়

তখন ভোর হয় হয়

অসুবিধে থাকে না আর

করে যাই যেটা কাজ যার

অফিস আমার সংসার তার

রাতে দুজনের মোলাকাত।

গড়িয়ে গড়িয়ে চলে দিন রাত

গয়ং গচ্ছ দিনগত পাপক্ষয়

বাঁধা নিয়মে চলতে হয়।                             

                         

এখানে এলে আমি আমার  

কফির চুমুকে পরোয়া কার !

      

বিপুল মাস্টার নষ্টালজিক হয়ে ওঠে। মনে পড়ে অরুনের সঙ্গে পৃথা,  কৃষ্ণার স্বপন ছাড়া চলত না। সে নিজেও সুমির পেছনে ঘুর ঘুর করতো। রাজনীতির সঙ্গে এসব ব্যক্তিগত সমীকরণ। স্বপন বলত রাজনীতির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঐক্য ও বিরোধ। দ্বন্দ্ব তত্ব নিয়ে তর্ক বাঁধত। তবে এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক কটা আর টিকতো। বিপুল ভাবে। তাই বোধহয় আজকাল ছেলেমেয়েরা গড়ে তোলে বাস্তবধর্মী এক বন্ধুত্ব। প্রণয়ের মোহগ্রস্ততা এতে ছেদ আনতে পারে না। বন্ধুত্বে চড়াই-উৎরাই থাকে কিন্তু আত্মবঞ্চনা থাকে না। সেখানে বাধ্যবাধকতা নেই। কাউকে খুশি করার তাগিদ নেই। সে পারানি নৌকায় আপন খেয়ালে ভেসে চলে। কোনো তীরে ভেড়ার দায় নেই। সে নৌকোয় তৃতীয়ের অবাধ প্রবেশ। ডোবার সম্ভাবনা থাকলেও।

বিপুল মাষ্টার সারাদিন পর যথারীতি সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেছেনা । পেঁচি চা করার অনুমতি চায়। মাষ্টার  চা খাবেনা কি না। বিপুল বিরক্ত হয়। কোনদিন অনুমতি পায়নি তা হয় না। তবে কি কারণে এই অনুমতি চাওয়া। বোধয় প্রভু ভৃত্যের সম্পর্কটা বজায় রাখতে চায়। বিপুলের সম্বিৎ ফেরে। মেয়ের মত তবু মেয়ে নয়। কখনো বোধ হয় মেয়ে করে নিতে পারে নি। মেয়ে হলে সে স্কুলে যাবার সুযোগ পেত , ঘরের বাইরে পাড়ার অন্য মেয়েদের বন্ধু হ`ত, তাদের সঙ্গে খেলতো। বিপুল ঘরে এলে আবদার করতো। তাই মেয়ের মতো, মেয়ে নয়। তবে কি পিতৃত্বের অহংকারের আড়ালে প্রভুত্ব। বিপুল সঙ্কোচ বোধ করেন। চেষ্টা করেন  বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে। পরম স্নেহে ডাকেন, “পেঁচি।“

মুহূর্তের মধ্যে সশরীরে মূর্তিমান এসে হাজির। আর কে ! নেপা। দাবিতো তারই। বিপুল ভাবছিলেন পেঁচিকে আদর করে বিড়ম্বনা কাটাবেন । তা আর হল না। তিনি  আবার চমকে ওঠেন । সত্যিই কি পিতৃত্ব না অন্য কিছু। যথারীতি নেপার উপস্থিতিতে পেঁচি পিছে মুর। একেবারে রান্নাঘরে। তবে ওর মুখ থেমে থাকে না। বেশ গলা তুলে বলে,“ কিচাইন বাবু আবার বোধহয় কিচাইন করে এলেন।“

নেপা আজ অন্য মুডে।  কেন যেন খেপে ওঠে। বলে,“ গুরু ওকে বাওয়াল করতে বারণ কর। ভালো হবে না কিন্ত।“  মাষ্টার হাসেন। ওঁর কানে দরদের স্পন্দন।পেঁচি নেপাকে কখনো কখনো কিচাইনবাবু বলে সম্বোধন করে। বোঝা যায় নেপা যে মধ্যে মধ্যে কিচাইন করে আসে তাতে তার সায়  থাকে। কোথাও কেউ মাল খেয়ে বাওয়ালি করলে নেপা তাকে শাসন করে।

তাতে তার সঙ্গে কখনো কখনো যুদ্ধও বাধে। আবার ছিঁচকে চোর ধরা পড়ে বেধড়ক মার খেতে থাকলে ও তাকে বাঁচাতে যায়। কারো ঘরে আগুন লাগলে দমকল আসার আগেই ও দলবল নিয়ে নেমে পড়ে।  এসব করতে গিয়ে নিজেও কখনো কখনো দু`চার ঘা খায়। হাত পা পোড়ে। একবারতো থানায় নতুন আসা বড়বাবু ওকে ধরে নিয়ে যায়। ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও ছিঁচকে চোরের গাঁটকাটা সাক্ষী। বিপুল নেপার ধরা পড়ার খবর পেয়ে দৌড়ে থানায় যায়। সঙ্গে কয়েকজন। নেপাকে যারা চেনে যারা ভালোবাসে। সেটাকে পুঁজি করে বড়বাবুকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নেপাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। তবে কিছু প্রণামী না দিয়ে নয়। বিনিময়ে কেস খায় নি। উকিল কোর্টবাবুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে।

বিপুল বাবু বোঝেনা  কিছু একটা হয়েছে। জানতে চান আজ ওর ডিউটি হয়েছে কিনা। নেপা বলে,“না। ঝামেলায় পড়েছি। মা বোনের সম্বন্ধ করেছে। অল্প টাকা চাই। হাজার পঁচিশেক। ব্যবস্থা করতে পারবে?“ বিপুল ইতস্তত করতে থাকে। হঠাৎ ও বলে , চল  গুরু , চোলাই খেয়ে আসি। “বিপুল মাষ্টার ঘাবড়ে যান। একেবারে অকল্পনীয় পরিস্থিতি। বলেন, “ কি হল, পাগল হয়ে গেলি না কি !“

“না, সরকার চোলাই খেয়ে মরলে দু`লক্ষ টাকা দেবে। ক্ষতিপূরণ। যদি মরি পাবো। দেখতে  আপত্তি কোথায়। আর আমিতো টেম্পরারি, রোজের কন্টাক্টচুয়েল। আজ আছি, কাল নেই। মরলে বোনের বিয়েটাতো হবে।  মা শান্তি পাবে।“বিপুল বাবু ভেবে উঠতে পারেন না। ভাবছেন কি করে টাকাটা দেওয়া যায়। আবার সংশয় দেওয়াটা ঠিক হবে কিনা।  

রান্নাঘর থেকে পেঁচি দৌড়ে আসে। কানটা  এদিকে ছিল। চোখে মুখে ঝাঁঝ। চেঁচিয়ে ওঠে,চোলাইতো খেয়েই এসেছিস। ক্ষতিপূরণের চোলাই। তুই খেলে আমি ফলিডর খাবো। কাঙালের বাচ্চা,  টাকার গোলাম ! কোথায় চোলাইয়ের ঠেক ভাঙ্গবি না চোলাই খেয়ে মরবি। চমৎকার মরদ। “ নেপা এই ঝাঁঝের মুখে চিপসিয়ে যায়। ওকে পেঁচি আগে কখনো তুই বলে সম্বোধন করে নি। বলে,  “ তবে কি করব ? মা যে অসহায়।“

কি করবি মানে। বোনের বিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকায়  ! মেয়েদের ইজ্জ্ত নেই ! ওপাড়ার মেয়ে বৌয়েরা ঠিক করেছে আজ রাতে চোলাইয়ের ঠেক  ভাঙবে। চলো ঠেক ভাঙতে।“হুঙ্কার দিয়ে ওঠে পেঁচি। নেপা রাজি হয়। পেঁচি ঠান্ডা হয়।  সান্ত্বনা দিয়ে পেঁচি বলে,“আমি এতদিন কাজ করে টাকা জমিয়েছি। বোনের বিয়ের জন্য দরকার হলে নিও। চিন্তা কোরো  না। “

মাস্টার বোঝেন এ মোক্ষম দাওয়াই। চোলাইয়ের বিষ ঝাড়তে ফলিডরের বিষ। বিষে বিষক্ষয়। চোলাই- ফলিডরের সংঘাত। তবে তার মনে মনে চিন্তা হয়। মনে পড়ে  কলেজ জীবনে মদের প্রতিবাদে একবার রাস্তায় নামলে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পেঁচিকে আলাদা করে ডেকে ওর হাতে বারাসতের ছোট্ট বাড়িটার চাবি দিয়ে বলে, “ দরকার হলে ব্যবহার করিস।“  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: