ক্ষুধার্ত বালক – অাফফান ইয়াসিন

রাত দুইটা বাহিরে প্রচুর বৃষ্টি , এদিকে ক্ষুধা এবং মশার কামড়ের যন্ত্রণা । ঘুমহীন দুটি বালক অপেক্ষার প্রহর গুনছে কখন সকাল হবে। পরীক্ষার তাগিদে ঈদের তিনদিন পরই বাড়ির মায়া ত্যাগ করেছে তুহিন এবং রুবেল।

তাদের প্রতিষ্ঠানটা অজোপাড়া গ্রামে হওয়ার দরুন ; রাত দশটার পর দোকানগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। সেদিন বাড়ি থেকে অাসতে ট্রেন বিড়ম্বনার কারণে রাত এগারটার উপরে বেজে যায়। এসে দেখে পুরো হল নিস্তব্ধ।

চারদিকের প্রকৃতি ও গাছপালাগুলোও ছায়ামূর্তির ভূমিকা পালন করছে। অাশে-পাশে হলগার্ড ব্যতীত কাইকে চোখে পরছে না। পথে না নামলে পথ চেনা যায় না এই নীতিবাক্যকে অনুসরন করে তুহিন এবং রুবেল খাবারের জন্য এদিক-ওদিক হাঁটহাঁটি করলেও মরীচিকা ছাড়া কিছুই কপালে জুটেনি।

বাধ্য হয়ে পূর্বের থাকা হালকা কিছু খেয়েই রাত কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল রুবেল। উপায়ন্তর না দেখে তুহিনও রাজি হয়ে গেল।

.

কিন্তু রাত একটা না বাজতেই মশাদের সাথে যুদ্ধে ঝড়িয়ে পড়ল রুবেল এবং তুহিন। রাত দু’টো পর্যন্ত মশাদের সাথে যুদ্ধ করে এতক্ষণে তুহিন ও রুবেল প্রায় ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত। হঠাৎ বৃষ্টি দেখে তুহিন এবং রুবেল শান্তিতে ঘুমোতে পারবে এটা ভেবে কী খুশি টাইনা হয়েছিল! তুহিন মনে মনে ভেবেছিল এবার মশার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাবে।

যেই মাত্র ঘুমানোর জন্য দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নিতে যাবে তুহিন, তখনি তার মাথায় অাসল পেঠে তো প্রচুর খিদে। কি অার করবে দু’টি অাসহায় বালক। খিদের সাথে হেরে গিয়ে রাত দুইটায় বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোটা হাতে নিয়ে দুষ্টমিতে মেতে উঠল।

উদ্দেশ্য, খিদের ব্যাপারটা ভুলে যাওয়া। কিন্তু তাতে কোন কাজ হল না। এভাবে বসে,শুইয়ে,হাঁটা-হাঁটি করে,এখানে-সেখানে ফোন করে অন্যর ঘুম ভাঙ্গানোর পর তার বিরক্তিকর কথা শুনে মজা নেওয়া ছাড়া অার কোন কাজ হল না।

যখন রাত তিনটা, ততক্ষণে খিদে নেভাবার যাবতীয় কৌশল শেষ। বাধ্য হয়ে দু’জন বসল পড়ার টেবিলে। পড়াশুনাতো হলই না; মনে হয় খিদের যন্ত্রণায় পড়াশুনাও তাদের অভিশাপ দিচ্ছে। দু’জনেই হাত-মুখ ধুয়ে অাসল।

এবার সিদ্ধান্ত নিল রুম থেকে বের হয়ে নারকেল,অামরা,পেয়ারা যেখানে যে ফল গাছ অাছে চুরি করে হলেও খিদে কমাতে হবে। বের হল কিন্তু বৃষ্টির কারনে সামনে যেতে পারল না। তবে কাছে ছিল কেবল কতগুলো ডাব বা নারকেল গাছ । নারকেলও ছিল কিন্তু গাছ অনেক বড় এবং ব্যাপক মোটা।

.

যদিও তুহিন সাহসি এবং গাছে উঠার সামর্থ্য তার অাছে। কিন্তু সমস্যাটা করল ওই যে বৃষ্টি। অবশেষে রাত চারটায় খাবারের তাগিদে তুহিন এবং রুবেল অাবার বের হল। অনেক দোকানের সামনে গিয়ে ডাকা-ডাকির পরও কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে নিরাশ হয়ে কষ্ট বুকে নিয়েই ভোর পাঁচটায় ঘুমোতে গেল দুটি ক্ষুধার্ত বালক।

মজার ঘটনাটা হল দু’জনেই ঘুম থেকে উঠে দেখে বিকাল তিনটা বেজে গেছে। দু’জনেই অাশ্চর্য হয়ে গেল! যেখানে ক্ষুধার যন্ত্রণায় সারা রাত ঘুমোতে পারেনি, সেখানে বিকাল চারটায়ও তাদের ঘুম থেকে উঠতে মন চায় না !

তারপরও দু’জন ঘুম থেকে উঠে খাবারের জন্য বের হল। এসে তারা হতভম্ব হল এ জন্য যে, অাশে-পাশে কোন খাবারের দোকান খোলা নেই। হঠাৎ তুহিনের স্মরণ হল এই যে, এখনো তাদের প্রতিষ্ঠানটা খুলেনি। তাই, দোকানদার মামাদের ঈদের ছুটিও শেষ হয় নি।

অনেকটা পথ হেঁটে খাবার সংগ্রহ করা যে কতটা কষ্টের সে দিন তুহিন এবং রুবেল ঠিকি বুঝতে পেরেছিল। জীবনে অনেক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। তবে সবগুলো অভিজ্ঞতাতেই কিছু না কিছু নতুন করে শিখার থাকে

২ thoughts on “ক্ষুধার্ত বালক – অাফফান ইয়াসিন

    1. এটি একটি বাস্তব ঘটনা নিয়ে লিখা গল্প। যেটা অামার ছোট ভাই সম্মুখীন হয়েছিল। অামি সেটা পাঠকদের সামনে একটু রম্য অাকারে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: