কয়েক বসন্ত পেরিয়ে   //   নীলোৎপল মন্ডল

এক

সুখ, সে তো অনেক দামী জিনিস রে, আমার তো অতো টাকা পয়সা নেই। 

– এরকম করে বলার মানে! তোকে দেখে তো মনে হয়, দিব‍্যি আছিস।

দূরের মসজিদ থেকে তখন সন্ধ্যার আজানের সুর ভেসে আসছে। সুজ্জি মামা পশ্চিমাকাশে গত, লাল আভায় আকাশ ভরে উঠেছে, তার বুক চিরে শঙ্খচিল উড়ে চলেছে নিজ নিজ নীড়ে। 

শহরের কোলাহল থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা উঁচু টিলার মতো জায়গা, পা ছড়িয়ে পাথরের গায়ে খানিকটা এলিয়ে দিয়েছে নিজেদেরকে ওরা। 

অরিত্র একদৃষ্টে চেয়ে আছে আকাশের পানে। দুজনেই নিশ্চুপ। হঠাৎ করেই নীরা বলে উঠলো, 

( সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব প্রিয় অরিত্রর , তাই অনন্যাকে ও নীরা বলেই ডাকে)

– সে’সময় তুই একদিন বলেছিলি আমার বেশ মনে আছে জানিস। 

– নীরার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে, 

কী ‘রে , কী বলেছিলাম আমি সে’সময় ? 

– কবিদের রোদ চশমা পরতে নেই, খালি চোখে আকাশ দেখতে হয়। 

আসলে কী জানিস, রোদ চশমার ভেতর থেকে দুনিয়ার সব কিছুই বেশ রঙিন লাগে, অতো রঙ দিয়ে তো আর সাহিত্য রচনা করা যায় না। সাদা কালো আবছা ফ‍্যাকাশে এগুলোর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আসল রঙ যা দিয়েই সব কিছুকে রাঙাতে হয়। 

– হাতের ওপর মাথা রেখে নীরার দিকে তাকিয়ে অরিত্র বললো, প্রায় পাঁচ বছর আগে তোকে একথা বলেছিলাম, আজোও তোর খেয়াল রয়েছে এসব !!

– অবাক হলি বল ! 

– হওয়াটাই কী স্বাভাবিক নয় ! 

– তোর মনে আছে কী’না জানি না তবে শোন, 

ইউনিভার্সিটির এর শেষ সেমেস্টারে ওয়াস্ট ম‍্যেটেরিয়াল দিয়ে তুই যে আমাকে একজোড়া কানের দুল বানিয়ে দিয়েছিলি ওগুলো এখোনো আমার কাছে রাখা আছে খুব যত্নে। কোনোদিন ব‍্যবহার করিনি ওগুলো কেন জানিস, কারন ব‍্যবহার করলেই যে ওগুলো নষ্ট হয়ে যাবে সেই ভয়ে। 

– প্লিজ থাম তুই। আমার জাস্ট এগুলো শুনতে খুব খারাপ লাগে এখন। 

দুই

– হ্যালো 

– ইয়েস অরিত্র স্পিকিং। 

– গলাটাও চিনতে পারলি না বল? 

আর তোর সেই আদব কায়দা গুলো এখোনো গেলোনা, অরিত্র স্পিকিং, বাবুসাহেব যেন  কোনো নামকরা মাল্টিন‍্যাসনাল কোম্পানির সি.ই.ও । বলি তুই তো একজন স্কুল টিচার, তা বললেই হতো অরিত্র বলছি, সে না গড়গড় করে ইংরেজী, জানি তো তুই ইংরেজীর ছাত্র। কি ভাবলি নতুন কোনো মেয়ে ! ইংরেজী বললে যদি ইমপ্রেস হয় , মেয়ে পটানোর অভ‍্যেসটা এখোনো যায়নি বল !!

– নীরা তুই ? এতোদিন পর ? কোথায় আছিস ? কেমন আছিস ? কী খবর তোর ? 

– সব বলবো , দেখা কর আজ। 

– আজ !! আজ কি করে সম্ভব, স্কুলে আছি তো। 

– জানি রে বাবা জানি, তোর স্কুল কোথায়, কতো ছাত্র সংখ‍্যা , কতজন ফিমেল টিচার সব জানি আমি। 

শোন বিকেল ৫ টায় আমি ওমেন্স কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবো, ফেরার পথে পিক করছ নিস , সেই পুরোনো যায়গায় গিয়ে গল্প করবো, ওকে, রাখি এখন, যা মন দিয়ে পড়া গে আর শোন ফিমেল টিচার গুলোকে লাইন টাইন মারিস না যেন। 

– উফফফ, সত্যি তুই না একই রকম রয়ে গেলি। আচ্ছা রাখ , বিকেলে দেখা হচ্ছে। 

প্রায় বছর চারেক আগে অরিত্র আর নীরার আলাপ, ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়ার সুত্রে। বন্ধুত্ব থেকে ক্রমশ পূর্বরাগ। তারপর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দুজন আলাদা আলাদা শহরে , অগত্যা নীরার বিয়ে। স্বামী সংসার নিয়ে লাইফের সেকেন্ড ইনিংস নিয়ে ব‍্যস্ত ও, খুব একটা মনেও পড়তোনা তার কোনো এক সময়ের ভালো বন্ধু অরিত্রর কথা। 

ভাগ্যের কি অদ্ভুত পরিহাস, অনেক গুলো বসন্ত পেরিয়ে আজ তারা একই আকাশের নীচে। 

তিন

– তোর সেই কবিতাটা মনে আছে অরি, 

” ইন্দ্র প্রস্থের শৌধ শিখরে যখন আছড়ে পড়তো নববর্ষার জলধারা, 

আমার ব‍্যকুল বাহু যখন ছুঁতে চাইতো তোমাকে, 

তখন তোমাকে টেনে নিতো অন্য কোনও যুবতী। 

– হ‍্যাঁ, মনে আছে। শুভ দাসগপ্তের কবিতা। 

হঠাৎ তোর ওই কবিতাটা মনে পড়লো কেন ? 

– আমার অবস্থাও অনেকটাই সেরকম হয়ে গেছে জানিস। 

বিয়ের দু’বছরের মাথায় জানতে পারলাম, প্রিয়াংসুর অন্য কোনো প্রেমিকা রয়েছে। নামি কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার, দামি গাড়ি, স‍্যুটেড বুটেড হয়ে অফিস যেতো, ফিরতো রাত করে,  দামি স্কচের গন্ধে মম করতো ওর সারা শরীর।

অফিস থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে সোজা নিজের বিছানায়। আমার দিকে ফিরে তাকানোর সময় পর্যন্ত ওর ছিল না। প্রথম প্রথম এগুলো মেনে নিতে খুব কষ্ট হতো জানিস। তারপর ভাবতাম হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, ওর বাবা মা’কেও বলে কোনো লাভ হয়নি। 

দিন দিন আমি কেমন নিসঙ্গ হয়ে পড়ছিলাম। মা বারবার বুঝিয়ে বলতো, সয়ে থাক, ধৈর্য্য ধর। কিন্তু সবকিছুই একটা গন্ডিতে সীমাবদ্ধ, ওর বাইরে গেলেই সবশেষ। 

মন বসতো না কোনো কাজেই, উপন্যাসের পাতা কিমবা টিভি সিরিয়ালের গল্প কিছুই ভালো লাগতো না আমার। 

জ্বলে পুড়ে মরতাম কামনার আগুনে, নিজে নিজেই দগ্ধ হতাম আর নিজের ভাগ্য কে দোষারোপ করতাম। কতশতো যে বিনিদ্র রাত্রি আমি একা বসে কাটিয়েছি আর চোখের জল ফেলেছি তার ইয়ত্তা নেই। 

শেষ অব্দি ডিসিশনটা নিয়েই ফেললাম। বাঁচতে হবে আমাকে, এভাবে চলতে পারে না। অনেক পড়াশোনা করেছি, সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে আমায়। আর হ‍্যাঁ, জানিসতো ভাই নেই আমার, বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে তারাও খুব একা হয়ে পড়েছে।

তাই মা’ বাবাকেও দেখার কেউ নেই আমাকেই তাদের দেখতে হবে। উকিল ডেকে ডিভোর্স এর ফাইল রেডি করে চলে এসেছি আমি প্রিয়াংসুকে ছেড়ে, ওর বাড়ি ছেড়ে। 

সম্বন্ধ করেই বিয়ে হয়েছিল আমাদের, বড়ো মামা খুব গর্ব করে বাবাকে সেসময় বলেছিলেন , অনেক বড়ো ঘরে অনুর বিয়ে হচ্ছে, ছেলে মাসগেলে প্রায় একলক্ষ টাকা বেতন পায়। 

সেগুলো ভাবলে এখন শুধু কষ্ট হয় জানিস। 

নীড় হারা পাখির ন‍্যায় শুধু শূন্যতায় ভরে গেছে আমার জীবন। 

চার

– সবকিছু শুনে খুব কষ্ট পেলাম রে। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে আমি যেন নিজের হাতেই গলাটিপে খুন করেছিলাম আমার সেই ভালোবাসাকে। 

নীরা..,

– কষ্ট পাস’নারে , সবিই আমার ভাগ্য। 

তুই একবার বলেছিলিনা অরি, যে তুই নাকি আমার থেকে একটা বসন্তও বেশি দেখেছিস, আর তাই  তুই নাকি আমার থেকে একটু হলেও বেশি বুঝিস। 

সত্যি তাই, তুই জিতে গেছিস অরি, আমি এই জীবন যূদ্ধের একজন পরাজিত সৈনিক। শত্রু সৈনিকদের আক্রমণে আমার দেহ মন সবকিছুই আজ রক্তাক্ত। 

অথচ বল , আমি কী আদোও এরকম ছিলাম ? ইউনিভার্সিটির যেকোনো আন্দোলনের মুখ আমিই থাকতাম, দাতে দাত চেপে লড়াই করেছিলাম সেদিন স্টুডেন্ট ইউনিয়নের স্বার্থে, প্রতিবাদ করতাম সমস্ত রকম অপশাসনের বিরুদ্ধে , আর আজ দেখ সেই শক্ত গাছটাই কেমন নেতিয়ে পড়েছে। 

– এনিওয়ে কি করছিস তাহলে এখন ? কাকু কাকিমা কেমন আছেন ? 

– কি আর করবি, একটা প্রাইভেট স্কুলে ছয় হাজার মাইনের টিচার আমি। বি. এড করাও হয়নি তাই সরকারিতে এপ্লাই ও করতে পারছি না। আর বাবা মা ভালোই আছেন। আমাকে আবার বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু ওই বিয়ে নামক প্রোটোকলে আমার যে তিক্ত অভিঞ্জতা হয়েছে তাতে সেখানে আর যেতে চাই না কখোনোই। 

– গান ছেড়ে দিয়েছিস ? 

– না’রে , গানই তো বাঁচার প্রেরনা যোগায় নাহলে কবেই মরে ভুত হয়ে যেতাম। 

– ওরকম বলিসনা , চুপ কর। 

আর হ‍্যাঁ শোন না আমি একদিন আসছি তোর বাড়ি , কাকিমাকে বলিস লুচি আর আলুর দমটা সেরকম ভাবে বানাতে। 

– হ‍্যাঁ, এখানে আসার পর পরেই মা তোর কথা খুব জিঞ্জেস করতো আর বলতো, অরিত্র বলতো কাকিমা আমার বৌউ কেও এরকম আলুর দম বানাতে শিখিয়ে দেবেন, আর খুব হাসতো। আজ যদি মা জানে যে আমি তোর সাথে দেখা করতে এসেছি তাহলে খুব খুশিই হবে। 

এনিওয়ে আজ ওঠা যাক চল। আরেকদিন না হয় আসা যাবে, আজ সন্ধ্যা হয়ে গেল। 

– একটা রিকোয়েস্ট করবো নীরা ? 

– হ‍্যাঁ রে বাবা বল না, রিকোয়েস্ট কেন । 

– একটা গান শোনা না প্লিজ , কতো দিন তোর গান শুনিনি। 

অত:পর নীরা শুরু করলো , 

” সুখে আছে যারা , সুখে থাক তারা

  সুখের বসন্ত , সুখেই হোক সারা .. “

সূর্য অস্ত গেছে, আকাশ কালো হয়ে এসেছে , ক্লান্ত পাখির ডাকে ধ্বনিত হচ্ছে আকাশ, বসন্ত সন্ধ্যার শীতল বাতাস জুড়িয়ে দিচ্ছে দুজনের মন – প্রান। 

সুখেই হোক সারা এ বসন্তের নবীন প্রেম। 

 পুরুলিয়া। ১০ ই ফাল্গুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: