গল্প – আঘাত – বন্য মাধব

( ১ )

আজকে বিটে একটু কাজ কম ছিল।ছুটিছাটা চলছে, এডুকেশন বিটে এমনিই খবর টবর কম।বন্ধুরা এটা সেটা নিয়ে গুলতানি করছি আরকি।আমি একটু চিন্তায় আছি,কিছুটা চাপেও।এক সপ্তাহ হয়ে গেল একটাও স্ক্রুপ মারতে পারিনি।এমন সময় ফোনটা এল।ওপাশে আকাশসীমা।
উঠতেই হল।আজ মনে হচ্ছে দাঁও মারা যাবে।সবার আগে।একমাত্র কিনা কাল জানা যাবে।ই-মিডিয়া জানলে সর্বনাশ।মুখের ভাব লুকিয়ে সবাইকে টা টা দিয়ে একরকম ছিটকেই বেরিয়ে এলাম।শৈবাল মালটা হেব্বি সেয়ানা।কালকেই একটা বাই লাইন মেরেছে।মারার কথা ছিল আমার। বস রাজি হল না। নিজেদের লোকের কাদা ঘাঁটা পছন্দ নয় বসের।আমি যে খবরটা জেনেও নামাইনি ও ব্যাটা কি আর জানে না?
ঠিক গন্ধ পেয়েছে।
কি রে স্ক্রুপ?
তোকে বলতে যাব কেন রে?মনে মনে গর্জে উঠি।বাইরে আধখ্যাঁচড়া একটা হাসি ছাড়ি।
কিরে পুঁটিরামের দই খাবি না?
সানন্দাদি চ্যাঁচালো।
অন্যদিন হবে’খন বলে উঠে পড়ি।
ওর ইয়ে বোধহয় ডেকেছে রে।যাব নাকি?
কাজলদি আমার ফোন এলেই ‘অনিবার্য কারণবশতঃ’ এটা বলবেই।

                                          ( ২ )

দ্বারভাঙা হল থেকে বেরিয়ে কলেজ স্কোয়ারে ঢুকলাম।আকাশসীমাকে ফোন লাগালাম।
কি কেস সংক্ষেপে বল তো।
শ্লীলতাহানি।
কার?তোর?
লাথি ঝাড়ব না।
বল।
তোকে মৃন্ময়ীর কথা বলেছিলাম মনে আছে?
আছে।
সে আর বলতে।
ওর?
হ রে হাঁদা।
কখন?
দুপুরে মৃন্ময়ী সুশান্তির কাছে ফিজিক্স পড়তে গিয়েছিল।
তো!
সুশান্তিই কান্ডটা ঘটিয়েছে।
একা ছিল?
না না ভরা গোয়ালে।
বলিস কি, এত সাহস!
মৃন্ময়ী বলছিল ক’দিন ধরে সুশান্তি ছোঁকছোঁক করছিল।নানা অছিলায় শরীর টাচ করছিল।আজ একবারে ব্রেস্টে।
তারপর?
মৃন্ময়ী সপাটে একটা চড় কষিয়েছে।
আর কিছু ঘটেছে?
‘তুই আমাকে মারলি বলে’ বলে সুশান্তি ওখান থেকে পালিয়েছে।
পরে কিছু ঘটেছে?
ঘন্টাখানেক পরে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছে।
অন্য টোপ?
হ্যাঁ,বিয়ে করতে চেয়েছে।
ফোন কল রেকর্ড হয়েছে?
না।
অ!বাড়িতে খবর গেছে?
ওর বাবা,দাদা আসছে।
থানা পুলিস হয়েছে?
না।ওরা আগে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।
কেন? আমি কোন হরিদাস?
আমি কি জানি!

                                            ( ৩ )

ফোন রেখে ট্যাক্সি ধরলাম।আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এই কেসগুলো বেশি এগোয় না।মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে চেপে যাওয়া হয়।স্কুল কলেজ ভার্সিটি কোচিং সেন্টার সব জায়গায় একই ঘটনা।অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে।
আকাশসীমার ফ্ল্যাটের দুটি ঘরে মৃন্ময়ীর মত আরও পাঁচজন থাকে।খাওয়াটা একসঙ্গে।আমিও অবসরে ওখানকার বোর্ডার।এবার জয়মা বলে আকাশসীমাকে নিয়ে সংসারে ঝাঁপিয়ে পড়লেই হয়।চারদিক থেকে একটা চাপও আসছে।ঐ করি করি করবোক্ষণ করে কাটিয়ে যাচ্ছি দু’জনেই।
চিফ্কে এইফাঁকে একটা ফোন লাগাই।ওপার থেকে নির্দেশ – মাভৈ বলে ঝাঁপিয়ে পড় ব্যাটা।
উড়ে যেতে চাইলাম, হল না।কলেজ স্কোয়ার থেকে বাঘাযতীন আসতে একটু যেন বেশি সময় নিয়ে নিল ট্যাক্সিটা।

                                          ( ৪ )

ঐ যা হয় আরকি,  ঘরে থমথমে গুমোট একটা ভাব।একটু জলে গলা ভিজিয়ে নিলাম।
আর কে কে জানে?
কেউ না
অন্য বর্ডাররা?
না, কেউ জানে না।
খবরটা তাহলে স্ক্রুপ? মাথা চনমন করে।বাকিটা তোমার কাজ হে।ঘুঁটি সাজাও।লিক প্রুফ করো।
ঠিক আছে কাউকে না জানানোই ভাল।মৃন্ময়ী তুমি ভেবে নাও কি করবে।আলাদাভাবে বাবাদের সঙ্গে কথা বলে নাও।
বলেছি,আর কিছু বলার নেই।
কি চাও তোমরা?
বিচার,ন্যায্য বিচার।
মানে থানা পুলিস কোর্ট কাছারি?
আপনি যা বলবেন।
তাই কখনও হয়।এটা নিজেদের ঠিক করতে হবে।আমি বড়জোর পরামর্শ দিতে পারি।
মৃন্ময়ী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আবার জানাল ও থানা পুলিসই করবে।
আজকেই? সব্বোনাশ, আটকাও।যা হবার কাল।বললাম সে কথা। বললাম, রাতটুকু ভাব মৃন্ময়ী।
মেধাবী মৃন্ময়ী রাজি হল।তবে ওরা আমাকে লেখার অনুমতি দিল।

                                         (৫)

মৃন্ময়ীর ফোনে বাবার পরিচয় দিয়ে সুশান্তিকে ধরলাম।অনেক অনুনয় বিনয়, বিয়ের প্রস্তাব আর মোটা টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও এল।বারবার স্কুলের চাকুরী, বিধবা মা আর বাচ্চা মেয়েটার কথা বলতে লাগল।
সব শোনার পর নিজের পরিচয় দিলাম।মৃন্ময়ীও নিজের সিদ্ধান্ত জানাল।সমস্তটাই রেকর্ড করা থাকল।এবার আমার কাজ।ওর বেশ ক’টি বন্ধুর নম্বর আর ঠিকানা নিলাম।যেতে যেতে ফোনের কাজগুলো সারতে হবে।
তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়লাম।একেই বলে ছপ্পড় ফুঁড়ে সৌভাগ্য ঢোকা।
গাড়িতে বসেই মৃন্ময়ীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একে একে তুলতে লাগলাম।নাম প্রকাশ করব না – এই শর্তে দরকারী বক্তব্য উঠে এল।
খুব পরিচিত পুলিশ ও প্রশাসনের মাথাদের জানিয়ে রাখলাম,যাতে ব্যাটা গা ঢাকা দিতে না পারে।
এবার লিখে ফেললেই জ্বর ছাড়বে। সক্কালে ফার্স্ট পেজে বেরোলেই পুরোপুরি সুস্থ।তরপর তো মৃন্ময়ীকে নিয়ে সোজা থানায়।আর সুশান্তির এ্যারেস্ট। আপততঃ এটাই ওদের চাওয়া।

 ( ৬ )

খসখস……খসখস…….খসখস…..….  নামিয়েই ফেলি কাঙ্খিত স্ক্রুপ।চিফ খুশি খুব।
ভাবছি এবার আকাশসীমাকে ফোন মারবো।ওদের মত বদলও তো হতে পারে।
ভাবতে না ভাবতেই ফোন এল।আকাশসীমা।কতদিন বলেছে ডাক নামে ডাকতে, আমি রাজি হইনি।ওর দাদুর দেওয়া নামটা আমার ভারি পছন্দ।
কি হল? ওদের কি মত বদল হল?
একরকম তাই।দাদা আর বাবা মনেহয় একটা রফা করেছে।মুখে বলছে মেয়ের ভবিষ্যৎ এর কথা।ধর ওদের সঙ্গে কথা বল।
মোদ্দা কথাটা এই -আমি চলে আসার পর বাবা,দাদা মৃন্ময়ীকে থ্রেড করেছে।সুশান্তির সঙ্গেও কিসব কথাবার্তা বলেছে।মোটকথা একটা আর্থিক ডিল হয়েছে।কত টাকায় সেটা মৃন্ময়ী জানে না।টাকাটা ঘুষ দিয়ে মাষ্টারির চাকুরিতে ঢুকবে।কিন্তু মৃন্ময়ী অনড়।ও লড়বে।
আমি ওর বাবা দাদার সঙ্গে কথা বললাম।ওরাও আমতা আমতা করলেও অনড় থাকার কথা জানাল।আমি বোঝালাম মেয়ের পাশে থাকার জন্যে।বললাম মেয়ে যেহেতু অনড় আপনারাও ফাঁসবেন।গাঁই গুঁই করতে লাগল।এবার চিফকে দিয়ে বলালাম।কোনরকম রাখঢাক না করে চিফ ওদেরকে ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে আজই গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে দিলেন।
কপি প্রেসে গেল।স্ক্রুপ মাধব স্ক্রুপ।কিন্তু আমার একটুকুও আনন্দ হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *