গল্প – দত্তক

রনেশ রায় ১১.০৯.২০১৩

শিবুর বাবা স্ত্রী এসে ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে গেলো. শিবুর এখন বছর  বারো বয়েস। চার পাঁচ বছর বয়েস থেকে সে দেবেনবাবুর কাছে থাকে. তবে আর নয়. হরিও  অনেকদিন ধরে ওকে নিয়ে যেতে চাইছিলো।

মিনাদেবী রান্নাঘরে বাসন মাজছেন এমন সময় দেবেনবাবু পেছনে এসে দাঁড়ান। কাজের লোক আসেনি। মাত্র কাপড় কেঁচে উঠেছেন। তাই মিনাদেবীর মেজাজ একটু চড়া। তার ওপর  দেবেনবাবু বলেন

—— মিতা আসেনি? কি জ্বালা দেখো। দাও  কয়েকটা বাসন আমি মেজে দিই।

——  থাক আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। সারাজীবন করে এলাম আর  এখন দরদ দেখাতে এসেছেন। সর এখান থেকে। মিনাদেবী যেন খেঁকিয়ে ওঠেন।

—– সারাজীবন আর এখন এক হোল? এখন আমার অবসর, কাজ নেই। তোমায় একটু সাহায্য করতে পারি না!

—– বলছিতো  যাও এখান থেকে।

—— এটাই তোমাদের দোষ, সাহায্য করতে এলেও দেবে না। আজ শিবুটা থাকলে তোমাকে করতে হত না! ওটাও   বিদেয় হল! দীর্ঘশ্বাস দেবেনবাবুর।

——- বিদেয়তো  করলে তুমি। থাকলেও ওকে  করতে দিতাম নাকি! বলেছিলামততো ওকে রেখে দিই। এখানে পড়াশুনো  করবে। ছেলে হয়ে থাকবে। সেটা করতে পারলে না। ওকে পাঠালে মেয়ের সাহায্য হবে বলে. আর এখন এই সামান্য বাসন মাজতে সাহায্য করতে  এসেছ।

——- মেয়ের কাছ থেকে এনে নিজেদের কাছেই তো রাখতে চেষ্টা  করেছিলাম। ওর বাবা রাজি হল না। আমি কি করতে পারি। জানতো ওদের ঘরে ছেলে সম্পদ। একটু বড় হলেই কোথাও  কাজে লাগিয়ে দেয়। ওদের সংসারে কাজে লাগে। আর মেয়েরাতো দায়। তাই তাদের দিতে আপত্তি করে না। তোমারতো মেয়ের দরকার নেই। মেয়ে চাইলে হরি এক মেয়েকে দিয়ে  দিতে আপত্তি করত না। যদি বলত চেষ্টা করি।

——- থাক আর করতে হবে না। বুঝেছি মেয়েরা ফেলনা।

——- তাইতো । সেইজন্য তুমিও হরির মেয়েকে চাও না। শুধু শিবু শিবু কর। আর দেখ না দত্তক সন্তান বেশিরভাগ মেয়েই হয়। কারণ সহজে পাওয়া যায়। রসিকতার ছলে বলেন দেবেনবাবু।

——– তুমি ভালই জান আমি প্রথমটা মেয়েই পছন্দ করেছি।

দেবেনবাবু বোঝেন স্ত্রীর কষ্টটা।। উনার খুব সখ ছিল  মেয়ের পর একত ছেলে দত্তক নেবেন। কিন্তু সেটা আর হয়নি। শিবু তাঁর অফিসের পিয়নের ছেলে। গরিবের ঘরে মা ষষ্ঠীর কৃপা।সন্তানের অভাব নেই।কিন্তু ঘরে ভাত বাড়ন্ত। অভাবের তাড়নায় তিন চার   বছর বয়েসেই শিবুকে তাঁর কাছে রাখতে দেন।

মেয়ে রিয়ার বয়স তখন বছর ষোল । শিবু মিনা দেবীর কাছে যত্নে বড় হতে থাকে। একটু বড় হলে স্কুলে ভর্তি করে দেন।শিবু ঘরের ফাইফরমাস খাটত। মেয়ে রিয়াকে সে দিদি বলেই জানে। ঘরের কাজে দিদিকে কিছু করতে দিত না।  মিনাদেবী ঘর গোছানো বা অন্য কোন কাজ মেয়েকে করতে বললে শিবুই সেটা করে দিত।

মা সেটা পছন্দ করতেন না। পড়াশুনোর অজুহাত দেখিয়ে রিয়া কাজ এড়িয়ে যেত। হাসিমুখে শিবু সেটা করে দিত। অবশ্য ভারী কাজ মেয়ের জন্য কখনই বরাদ্দ থাকত না। তিনি সংসারের যাবতীয় কাজ নিজেই করতেন। সাহায্যের জন্য একটি আংশিক সময়ের কাজের মেয়ে থাকে।  মেয়ে যে কর্ম বিমুখ হয়ে উঠছে সেটা মিনাদেবী লক্ষ্য করেছেন। দেবেনবাবুকে সেটা বলেনও। দেবেনবাবুর কাছে মেয়ে চোখের মণি।

মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি গুরুত্ব দেননি। মেয়ের তো সামনে পড়াশুনোর চাপ। তবে হ্যা, শিবুকে ছেলে হিসেবে পাবার জন্য তিনি চেষ্টা করেছিলেন । এটা রিয়ার একেবারে পছন্দের ছিল না। তাছাড়া শিবুর বাবা রাজি হয়নি।

পাঁচ বছর বয়স থেকে শিবু মিনাদেবীর কাছে। সেখানে শিবু কয়েকবছর ধরে আছে। শিবুর বাবা অনেক দিন ধরে শিবুকে নিতে চায় তবে মিনাদেবীর একেবারেই ইচ্ছে ছিল না। শিবুর বাবাও আর শিবুকে নিয়ে যেতে পারেননি।এর পেছনে দেবেনবাবুর প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা বোধ কাজ করেছে শিবুর বাবার।

শিবুর পরাশুনয় খুব একটা মন ছিল না। রিয়ার বাড়ি গিয়ে সেটা একেবারেই বন্ধ হয়ে  যায়। সেটা রিয়াও যেমন চেয়েছিল তেমনি পড়াশুনোর হাত থেকে রেহাই পেয়ে শিবুও যেন বেঁচেছে।.

খাওয়াদাওয়া আগেই শেষ হয়েছে। দেবেনবাবু অভ্যেসমত ঘরে গল্পের বই নিয়ে বসেছেন । বাসন মেজে টুকটাক কাজ সেরে মিনাদেবীও ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়েন। দুপুরে বিছানায় পরলেই উনি ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু আজ চোখে ঘুম নেই। দেবেনবাবু জানেন এটা স্ত্রীর শিবু অসুখ।

শিবুর কথা উঠলেই উনি যেন উতলা হয়ে ওঠেন। মেয়ের প্রতি অপত্য স্নেহে তিনি যে শিবুর প্রতি অন্যায় করেছেন সেটা স্ত্রী এখনই মনে করিয়ে দেবেন।আজ শুধু মনে করিয়ে দেওয়া নয়. মেয়ের প্রতি অভিযোগ আনেন। বলেন :

——- তোমায় বলিনি তুমি কষ্ট পাবে বলে। ও বাড়িতে রিয়া আর তোমার জামাই শিবুকে দিয়ে সব রকম কাজতো  করিয়ে নেয়ই এমনকি ওকে মারধরও করে।

——- তুমি জানলে কি করে? প্রশ্ন দেবেনবাবুর

——- দেখো এসব জানতে মেয়েদের অসুবিধে হয় না। কিছুটা মেয়ের কথায় আর কিছুটা শিবুর কথায় বুঝেছি। তবে শিবুততো  সব বলে না। আর তোমাকেও বলতে বারণ করে।দেবেনবাবু শুনে মনে মনে মেয়ের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেও হাসতে হাসতে বলেন

——-   তোমায় আবার শিবুরোগ  ধরেছে মীনা। মিনাদেবী চটে উঠে বলেন .

——- তোমার এই অপত্য স্নেহ,  মেয়ের কোন দোষ-ই দেখো না। বিয়ের আগে থেকেই শিবুকে দিয়ে খাটিয়ে নেওয়া, ওর সম্বন্ধে  মিথ্যে নালিশ করা ওর স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তুমিততো কিছুটা জান। সেইজন্যই রিয়ার কাছে ওকে রাখার ব্যাপারে আমার আপত্তি ছিল।

দেবেনবাবুও যে ব্যাপারটা আন্দাজ করেন না তা নয়। উনি বোঝেন মেয়ের সংকীর্ণ মানসিকতার সঙ্গে  জামাইয়ের উশৃঙ্খল জীবনযাপন ওদের ক্রমশ খারাপ দিকে নিয়ে যাচ্ছে । রিয়া শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেনি। তাছাড়া  জামাইয়ের জীবনযাপন ওদের শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসার যে কারণ সেটা তিনি জানেন।রিয়ার সাহায্যের জন্য শিবুকে ও বাড়ীতে পাঠানোর কাজটা যে ঠিক করেননি তাও  উনি এখন বোঝেন। তিনি বলেন

——- ঠিক আছে ওদের বাড়ীর  কাজটা মিটে যাক তারপর আমি রিয়ার সঙ্গে কথা বলব।  শিবুর বাবাও চায় শিবু ওর কাছে ফিরে যাক। তবে শিবু চাইলে আমার এখানে থাকবে। তুমি পিসিমাতো  আছ।

——- ব্যাপারটা আমার কাছে এখন আর সহজ নয়। ওকে এখানে কাজের লোক হিসেবে রাখতে পারব না। রিয়ার ওখান থেকে এখানে নিয়ে  আসা ঠিক হবে না। আমি চাইনা এ নিয়ে তোমার মেয়ের সঙ্গে কোন ভুল বোঝাবুঝি হোক। তাছাড়া সত্যিইতো ওর বাবার ইচ্ছে অনিচ্ছার ব্যাপারটা  অস্বীকার করা আর ঠিক নয় ।

——– ঠিক আছে পরে এ নিয়ে আলোচনা করে একটা কিছু ঠিক করা যাবে।

মেয়ে রিয়া পাঁচ ছ কিলোমিটার দূরে  একটা ফ্লাট নিয়ে থাকে।ওরা বছর চারেক  হলো টালিগঞ্জে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে এখানে এসেছে। জামাই পরিমল একটা বহুজাতিক সংস্থায় ভালই কাজ করে। মোটা  টাকা মাইনে পায়।সে ঘরে তেমন সময় দেয় না। যতটুকু সময় পায় বন্ধুবান্ধব নিয়েই কাটায়।

রিয়ার সঙ্গে এখন নানা ব্যাপারে বিরোধ লেগেই থাকে। রিয়ার অভিযোগের শেষ নেই। দেবেনবাবু চিন্তায় থাকেন।কবে শুনবেন ওরা বিবাহ  বিচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছে ।তবে বাড়িতে আনুষ্ঠানিকতার শেষ নেই। আজ নিজেদের কারও জন্মদিন তো কাল বিয়ের জন্মদিন। মিনাদেবী বিবাহবার্ষিকীকে বিয়ের জন্মদিন বলে ব্যঙ্গ করেন। উনি একটু কাঠ কাঠ মানুষ। সেদিন দেবেনবাবুকে বলছিলেন

——–   অন্তরে গোজামিল আর বাইরে মিল। এগুলো সব লোক দেখানো মজা।  বলেই একটা সিনেমার ডায়লগ বলেন

——- সে মজা,   ভীষণ মজা। দেবেনবাবু টিপ্পনি কাটেন ।

তোমরা এই মজা পাওনিতো  তাই ওদের হিংসে কর। .

——- ঐরকম মজার দরকার নেই।  ওদিকে বিচ্ছেদের তাগিদ আর এদিকে মজা।বলেন  মিনাদেবী

——- কাল নাতনীর জন্মদিনটাকে  কি বলবে? প্রশ্ন দেবেনবাবুর

——– কালকেরটা ঠিক আছে. ও ছোট। ওর জন্মদিনতো আমাদেরও আনন্দের দিন। মিনাদেবীর উত্তর ।

——-  তবে কি মেয়ের বিয়ের দিন  আমাদের দু:খের দিন ? বলেন দেবেনবাবু

——- বাজে কথা বল না আমি কি তাই বললাম?  তবে নিজেদের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক রেখে এসব আনন্দ করুক ক্ষতি নেই। কিন্তু সবটাইত ওপরে ওপরে। অন্ত:সারশূন্য।

——– তা  ঠিক বলেছ। দেবেনবাবু বোঝেন স্ত্রী মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত।

আজ রিয়ার মেয়ের জন্মদিন। দেবেনবাবু স্ত্রীকে নিয়ে সকাল থেকেই মেয়ের বাড়িতে।  দুপুরে মেয়ের বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া। সন্ধ্যেবেলায় অনুষ্ঠান। বেয়াই বেয়াইন মানে রিয়ার শ্বশুর শাশুড়ি বিকেলে আসবেন। ওদের সঙ্গে  দেবেনবাবুর সম্পর্ক খুব ভালো। বন্ধুর মত। দেবেনবাবু ভেবেছিলেন ওদের সঙ্গে দিনটা ভালই কাটবে।

সেটা আর হলো না। তবে উনি গেলে নাতনী শ্রেয়া খুব খুশি হয়। দাদুর সঙ্গে লুডো খেলতে বসে, দিদা গল্প বলে. পরিবেশটাই  যেন বদলে যায়। ওদিকে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয়ে যায়। রিয়াদের ঘর থেকে দুজনের গলা ভেসে আসে। প্রথমে চাপা গলায় একজন আরেকজনকে যেন দোষারোপ করতে থাকে।আস্তে আস্তে দুজনেরই গলা চড়ে। নাতনি বলে

——- এই শুরু হলো।  সে দাদুর কাছে নালিশ জানায়

——– দাদু তুমি ওদের বকে দেওতো যেন ঝগড়া  না করে। রোজ রোজ দুজনের ঝগড়া। আমার ভালো লাগে না।

দাদু বোঝেন মেয়ে জামাইয়ের সম্পর্ক মেয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তিনি বিষয়টা  লাঘব করার জন্য বলেন

——– ও সেটা কিছু না।দেখিস না দিদার সঙ্গে আমার কেমন ঝগড়া হয়। শ্রেয়া বলে

——- সেটা অন্য রকম ঝগড়া।

 দিদা বা দাদু বকবেন কি, ওদিকে গলা চড়ছে। শোনা যাচ্ছে রিয়া বলছে:

——— বাবা মাকে এত করে সকাল সকাল আসতে বললাম এলেন না। সন্ধ্যেবেলায় নিমন্ত্রিত অতিথির মত আসবেন। আমার বাবা মা জিজ্ঞাসা করলে আমি উত্তর দিতে পারিনা। জামাই পরিমল বলছে :

——– তোমাকে উত্তর দিতে হবে না। উনারাও  বোঝেন এ বাড়িতে আমার বাবামায়েরা নিমন্ত্রিত ছাড়া কেউ নয়।

——– সেটা কেন হবে? আমার বাবামাকে  কি আলাদা করে বলতে হয়েছে। আমাদের প্রতি না হলেও নাতনীর ওপরত একটা টান থাকবে। আমার বাবামাততো নাতনীর  টানেই সকাল সকাল চলে এসছেন।

——- দেখো তুলনা কোর না, তুমি জান বাবা মা এ বাড়িতে তেমন কাঙ্খিত নয়। বলে পরিমল।

——- সেটা আমার জন্য  ? যেন চিৎকার রিয়ার।

——- আলবাত তোমার জন্য। চেঁচিয়ে ওঠে পরিমল।

—— বা: বেশ আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছ। উনারা সুপুত্রকে  চেনেন। এখানে যে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ফুর্তি হবে সেটা উনারা জানেন। সেই জন্যই এড়িয়ে যান। তবে আজ  ওসব চলবে না। রিয়া বলে.

——– কি চলবে না ? আমার বন্ধুবান্ধব আসবে তাদের মদত করা আমার কর্তব্য। জামাইয়ের উত্তর।

পাশের ঘর থেকে এসব শুনে দেবেনবাবু আর থাকতে পারেন না। স্ত্রীকে বলেন

——– এখানে বসে থেকে না শুনে যাও না ওদের চুপ করতে বল।

——– আমি বলেছিলাম না সবটাই ওপরে ওপরে। মেয়ের জন্মদিন  কোথায় দুজনের কাছে সেটা সুখের দিন হবে তা না । মিনাদেবী বলেন।

——- এখানে লেকচার না দিয়ে যাও না ওদের থামাও। যেন দেবেনবাবুর কাকুতি।

শ্রেয়া তার দিদাকে আঁকড়ে ধরে আছে। ওদিকে দুজনের বাকযুদ্ধ চলছে। কোন লাগাম নেই।  মিনুদেবী বলেন

—— দেখছতো  মেয়েটার কি অবস্থা। ও আমাকে ছাড়বে না। তুমি যাও।  অগত্যা দেবেন বাবু পা বাড়ান।

এগিয়ে গিয়ে দরজার সামনে থেকে দেবেনবাবু একটু চড়া সুরেই বলেন:

——- তোরা  কি শুরু করেছিস, চুপ করবি! ঘর থেকেই রিয়া বলে ওঠে

——- তোমরা আবার আমাদের ব্যাপারে কেন? দেবেনবাবু অসন্মান বোধ করলেও শান্ত গলায় বলেন:

—— ঠিক আছে. তোরা যা খুশি কর, আমরা যাচ্ছি। শ্রেযাও আমাদের সঙ্গে যাবে।

বোধ হয় দুজনের বোধোদয় হল, চেঁচামেচি কমল। রিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খাবার ঘরে সোজা শিবুকে পাকড়াও করে। ওর ওপর চড়াও হয়ে বলে

—– এই কি করছিস? শিবু সব কাজকর্ম সেরে তখন মাত্র  খেতে বসেছে। কিছুটা বিরক্তির সুরেই বলে

—— দেখছনা খাচ্ছি।

—— মুখের ওপর কথা! সারাদিন আন্দেপিন্ডে  গেলা ছাড়াত কোন কাজ নেই। শোন দাদাবাবুর ঘরটা সাজিয়ে দে। ওর  বন্ধুবান্ধব আসবে।

বেচারা শিবু! সক্কাল থেকে সবদিক সামলাচ্ছে। সকালের প্রাত:রাশ, বারে বারে চায়ের ব্যবস্থা, লোকজন এলে তাদের বসার ব্যবস্থা করা, ওদিকে ডেকরেটরকে দিয়ে কাজ করানো, কিছু জামাকাপড় কাঁচা সব।  পিসিমা এসেছেন। তাঁর সঙ্গে একদন্ড কথা বলারও সুযোগ হয়নি। দাদাবাবুর বন্ধুরা এলে কি ধরনের ব্যবস্থা করতে হবে তা সে জানে।করে করে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। সেটা আর বলে দেওয়ার দরকার নেই।

পানিও থেকে গরম পাকোড়া  সব কিছুর ব্যবস্থা রাখা। নিজেকে তৈরী রাখা, কার জন্য কি দরকার। কেউ বমি করলে তা তৎক্ষনাত পরিস্কার করার দাযিত্বও শিবুর। ওই সময়ে অন্য কারও কোন দরকারে লাগা চলবে না। শিবু তখন ওদের বিনা মজুরিতে কেনা গোলাম। ওর ওপর এই অত্যাচারের কথা ও কখনো দেবেনবাবুকে বলেনি।

তবে পিসিমাকে আন্দাজ .দিয়েছে কিছুটা।কতদিন এভাবে চলবে জানে না শিবু। কখনো কখনো মনে হয় পালিয়ে গিয়ে বাঁচি। ওর বাবাও চায় ও এখন  কোথাও কাজে যোগ দিয়ে পরিবারকে সাহায্য করুক।

  সন্ধ্যে থেকে নিমন্ত্রিতরা আসছে। শ্রেয়ার বন্ধুরা হাজির।রিয়ার শ্বশুর শাশুরিরাও এসেছেন। ওদিকে জামাইয়ের বন্ধুদের এক এক করে আগমন। বাড়িটা গমগম করছে। শ্রেয়া সেজেগুজে তৈরী। রিয়াও যেন কেক কাটার জন্য একটু তাড়াহুড়ো করছে। বোধহয় বাচ্চাদের তাড়াতাড়ি ফেরত পাঠাতে চাইছে।সেত  জানে স্বামীর বন্ধুদের নিয়ে মজলিস শুরু হলে অবস্থাটা কি দাড়ায়।যাই হোক কেক কাটা হলো।

সেখানে দূরে দাঁড়িয়ে শিবুও। ওর ভাগ্নির জন্মদিন।কি আনন্দের। ওর নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে। বাড়িতে ছোট বোনেরা বোধহয় শুকনো মুখে এককোনে মায়ের বিছানা ঘেষে বসে। মা অসুস্থ। ও বড় হয়েও ওদের কোন সাহায্যে লাগে না। আর ওখানে কারও  জন্মদিনের কথাতো ভাবাই যায় না। ওর মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। একথা ভাবতে ভাবতে ও মনে মনে লজ্জা পায়।এসব ওর মনে কি আসছে। আজ না ওর প্রিয় ভাগনির জন্মদিন!

নিমন্ত্রিতদের খাওয়া দাওয়া শেষ।বাচ্চারা চলে গেছে। রিয়ার শ্বশুরশাশুড়িও বিদায় নিয়েছেন।  ও ঘর থেকে বন্ধুদের হাসি তামাসার আওয়াজ আসছে।সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে দেবেনবুদেরও চলে যাবার সময় হয়েছে।এখন সেটা অন্তত রিয়ার কাম্য। শিবু ওখানেই পোস্টিং। ঘন ঘন পাকোড়ার  অর্ডার।

একআধজন বন্ধু এরমধ্যেই বেসামাল। হঠাৎ ঝনঝন করে শব্দ। শিবুর হাত থেকে পাকোড়ার থালা নিতে গিয়ে জামাইয়ের এক বন্ধুর হাত থেকে মদ শুদ্ধ গ্লাস পড়ে যায়। শিবুও এগিয়ে দেওয়া হাতের থালা ধরে রাখতে পারে না, সেটাও পড়ে । বাস সব দোষ  শিবুর। রিয়া দৌড়ে যায়। জামাই উঠে এসে শিবুকে এক চড়। রিয়া গিয়ে কি যেন বলে। ওর সঙ্গে জামাই-এর তর্ক শুরু হয়ে যায়। মিনাদেবী সহ্য করতে না পেরে এ ঘরে এসে বলেন

——- কি হচ্ছে! একটা অনুষ্ঠানকে নরক বানিয়ে তুলেছ! মায়ের এই কথায় রিয়া বলে

——- তুমি এরমধ্যে কেন? শিবু একটা কান্ড করেছে তাই তাকে শাসন করা হয়েছে। শিবু বলে :

——- আমি কি করলাম! গ্লাসতো  উনার হাত থেকে পড়ে গেছে। মার খেলাম আমি। আমি এভাবে আর এখানে কাজ করতে পারব না। রিয়া বলে :

——– তোমাদের প্রশ্রয়ে ও এত বেড়েছে। অন্যায় করবে আবার মুখে মুখে তর্ক।

——– দেখ রিয়া, গরিব মানুষদের ওপর  তোদের এই জুলুম ঠিক না।

——– দেখো  মা, তোমাদের ওই গরিব মানুষ আর গরিব মানুষ! কতগুলো  নিচ জাতের মানুষ তাদের আস্কারা দিয়ে মাথায় তুলো না। রিয়া ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

শিবু এবার ক্ষেপে যায়। সে বলে

——–  আমি এখানে আর থাকব না। আমরা গরিব বলে মানুষ না নাকি! হ্যা নিচু জাত। আমাদের ছাড়াতো  চলে না।

—— দেখছতো  কি উদ্ধত! অন্যায় করেছে  আবার মুখের ওপর কথা ! থাকতে না চাইলে থাকবি না অত কথা কিসের! ভাত জুটত না, বাবা দয়া করে থাকতে দিয়েছিল তাই।  রিয়া গর্জে ওঠে। এতক্ষন দেবেন বাবু কিছু বলেননি। এবার বিরক্ত হয়ে বলেন:

—— অনেক হয়েছে রিয়া। মায়ের ইচ্ছে ছিল না,  সুবিধে হবে বলে আমি এখানে ওকে পাঠিয়েছি। ওর বাবাও  চাইছে ও এবার বাড়ি গিয়ে একটা কাজ জুটিয়ে নিক। বাড়িতে সাহায্য করতে পারবে। ওকে এবার মুক্তি দে। শ্রেয়া এসে শিবুকে জড়িয়ে  ধরে বলে

—— না তুমি যাবে না মামা । শিবু ওকে আদর করে বলে

—— না আমি যাব না। দাদুদের এগিয়ে দিয়ে আসি।

শিবু মামা যে আর ফিরবে না  তা ছোট্ট শ্রেয়া বোঝে না।

বেরোবার আগে মিনাদেবী রিয়াকে একদিকে ডেকে বলেন

——– জাত ধর্ম নিয়ে তুই শিবুকে একি  বলছিস! তুই কি জানিস তুই কে ?

——– তার মানে! রিয়া মায়ের প্রশ্নে অবাক।

——- মানেটা তোর  জানা দরকার এখন। তাতে যদি মতি ফেরে।

——- কি বলতে চাইছ তুমি? রিয়া অধৈর্য হয়ে ওঠে

——– তোকে কোনদিন আমরা বুঝতে দিইনি যে তুই আমাদের দত্তক নেওয়া সন্তান। তোকে তোর পাঁচ ছমাস বয়েসে ফুটপাথ থেকে তুলে এনেছি। তুই কোন এক অভাগীর সন্তান।তোর ধর্ম বর্ণ আমাদের জানা নেই। তোর পিতৃ পরিচয় আমরা জানিনা।আমরা সেটা মানিও না। আমরা জানি তুই এখন আমাদের সন্তান।  খাওয়া পড়া যোগাতে পারবে না বলে তোর মা তোকে ফেলে যায়। তাতে লজ্জা পাবার কিছু নেই। ধর্ম বর্ণ দিয়ে কারও পরিচয় হয় না।

সব শুনে রিয়ার  মনে হয় তার আর শিবুর চিতাভস্ম একসঙ্গে কুন্ডুলি পাকিয়ে আকাশে উড়ছে। তার এও মনে হতে  যে তার দেহের প্রতিটি ধমনীতে শিবুর রক্ত প্রবাহিত হয়ে চলেছে। কিন্তু সে কি বোঝে যে দুজনেই গরিব ঘরের সন্তান যাদের বর্ণ নেই ধর্ম নেই! আমাদের জানা নেই  এরপর রিয়ার মতি ফিরলো কিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *