চিঠি

হে বন্ধুবর—

   উদ্ধৃতি টেনে নিজেকে শান্ত করা যায় কিছুক্ষণ মাত্র।তারপর প্রকৃতি গুনে বা স্বভাব গুণেই সে আবার নিজ স্বভাবেই এগিয়ে চলে।” হয়তো পর্বত নিশ্চিহ্ন হবে, অগ্নি ও শীতল হবে কিন্তু মহতের হৃদয় কখনো মহত্ত্ব হারাবে না।”

    আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। তবু “যাঁরা মহৎ তাঁদের মহত্ত্বে আমার আস্থা আছে।”

    আমি জীবনে নানান ঝুঁকি ও প্রতারণার মধ্যে পড়েও দুর্বিনীত মিথ্যাচারী হতে পারছিনা।

       এসম্পর্কিত স্বামীজির ১ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৫ তারিখের একখানি চিঠির কিছু অংশ লিপিবদ্ধ করলামঃ- ‘”সাংসারিক উন্নতির জন্য মধুরভাষী হোওয়া যে কত ভালো, তা আমি বিলক্ষণ জানি। আমি মিষ্টভাষী হতে যথেষ্ট চেষ্টা করি, যখন তা করতে গিয়ে আমার অন্তরের সত্যের সঙ্গে একটা উৎকট রকমের আপোস করতে হয় তখনই আমি থেমে যাই। আমি বিনম্র দীনতায় বিশ্বাসী নই–সমদর্শিতার ভক্ত। সাধারণ মানুষের কর্তব্য তার ‘ঈশ্বর’-সমাজের সকল আদেশ পালন করা ;

কিন্তু জ্যোতির তনয়গণ কখনোও তা করেন না।— সমাজের সঙ্গে যে নিজেকে মানিয়ে চলে, তার পথ কুসুমাস্তীর্ণ, আর যে তা করে না, তার পথ হয় কণ্টাকাকীর্ণ: কিন্তু লোকমতের উপাসকেরা পলকেই বিনাশ প্রাপ্ত হয়। আর সত্যের তনয়গণ চিরজীবী।”

   তদ্রুপ, অন্যায় দেখলে আমিও মেজাজ হারিয়ে ফেলি। আমার চাহিদা তবু অসীম। আমি সকলের জন্য সকলের কাছে প্রার্থনা করতে রাজি; ভিক্ষাতেও আমার

দৈন্যতা নেই। আমার অনন্ত দাবি— মানুষ সত্য পথে, ন্যায় পথে, সমদর্শিতার পথে এগিয়ে চলুক।

     হীনতা,নীচতা, ভোগাকাঙ্খা আর অলসতা, অসাধুতা কিংবা মিথ্যাচার বন্ধ হোক্ ।

      আমার সামনের সমাজ, পরিবেশ, পরিবার এমনকি আমার পরিবারের সকল সদস্য আমার ওপর বিরক্ত। তবু নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছি না।

      আমি এমন কোনো মহাপুরুষ নই। তবু আমার জন্য যখন এত দুঃসহ জ্বালা- যন্ত্রনা, দুঃখ- কষ্ট, অপমান- লাঞ্ছনা, প্রতারণা আছড়ে পড়ছে তখন নিজেকে সান্ত্বনা দিই এই বলে যে, ঈশ্বর আমাকে পরীক্ষাগারে নিয়ত পরীক্ষা করে চলেছেন; খাঁটি করার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন।

      চোখের সামনে অন্যজনকে দেখে নিজেকে আরোও নিরীহ, শান্ত করতে চেষ্টা করি যদিও সফল হতে পারিনি। জানিনা এজন্মে পারব কিনা।

      বিদ্রোহ করতে আমার ভালো লাগে। জেহাদ ঘোষণায় আত্মা তৃপ্তি লাভ করে।

     খুব শীঘ্রই হয়ত আমার এ দেহ বদলাতে হবে। আমার মধ্যে এখনও অনেক গরুছাগল কুকুর ভেড়া বিচরণ করছে। তাই এই দেহ সুখী হতে পারছেনা—- আমার জন্য ভেবে ভেবে ভয় পেয়ো না। তোমার কর্মস্থলেই তুমি থাক।

      মাঝেমধ্যেই এমন চিঠি পাঠাবো। পোষ্টম্যানকে বিমুখ কোরোনা, পড়া শেষে নয়তো নষ্ট করে দিও। যদি পার কিছু জ্ঞানের কথা জানিও, অভিজ্ঞতার আলোকে আরো সুস্বাদু করে তাকে গ্রহণ করব।

    চিঠির শেষ না হলেও ধৈর্যের পরিসমাপ্তি। তাই বাধ্য হয়েই ইতি টানলাম—

       তোমরা পৃথিবীতে কর্ম করছ কর।অর্থ উপার্জন করছ- কর। সময় করে একবার বিবেক পূজা করো। তোমাদের সকলের শুভ কামনা রইলো।

                 ইতি  

     শুভার্থী    ৩২আষাঢ়১৪১০  সত্যেন্দ্রনাথ পাইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: