চোর

সঞ্জীব রাহা

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে ভালাে ফল করে সটান চলে এলাম জেলা সদর কৃষ্ণনগরে। নার চেয়ে তিন বছরের বড় জামিরভাই বিদেশে লেবারের কাজ করে, টাকা পাঠ আঙ্কে অনার্স নিয়ে দেড়শ’ বছরের পুরানাে কৃষ্ণনগর গভঃ কলেজে ভর্তি হয়েছি। থাকি

সড়কে ছাত্রদের মেসে। বন্ধু-বান্ধবদের আন্তরিক সহায়তায় কয়েকটা টিউশানি কর । এই অল্প টাকায় টিফিন ও বই-খাতার খরচ কোনরকমে চালিয়ে নিচ্ছি আল্লাহতালার দোয়ায়।

টিউশানি পিছু তিন-চারশাে টাকার বেশি পাই না। সপ্তাহে তিন-চারদিন পড়াতে হয়। এভাবেই টানাটানির মধ্যে পড়াশােনা ও গ্রাসাচ্ছাদন চলছে কোনক্রমে ! তাও মাসের শেষটা খুবই টানাটানি চলে। শুধু ভাবি কবে একটা চাকরি পাবাে?

ভােরবেলায় উঠে স্নান করে ছুটতে হয় ছাত্র-ছাত্রীর বাড়ি। কোনও কোনও বাড়িতে গরম চা’র সঙ্গে ‘টা’ হিসেবে কিছু মিললে সকালের টিফিন খরচ বাঁচানাে যেত! তখন পেটে আমার রাক্ষুসে খিদে অথচ মেসে বেলা দু’টোর আগে দু’মুঠো ভাত ছাড়া আর কিছু মেলে না।

আমার আবার গানের গলা খুব ভালাে। মহঃরফি হওয়ারশখে ভর্তি হলাম মাষ্টারদার গানের স্কুলে, মাস গেলে দু’শাে টাকা ফীজ। বোেঝার উপর শাকের আঁটি হলে আরক করব? শখ যে বড় বালাই।

আমার সকল টিউশানি যােগাড় করে দেন গ্রামতুতাে দাদা মােজাম্মেল। তিনি কাজ করেন এল.আই. সি.-র কৃষ্ণনগর মেন ব্রাঞ্চে। অকৃতদার, সুস্বাস্থ্যর অধিকারী মােজাম্মেল মালিতার মাথা জোড়া ছিল বিশাল চকচকে টাক। মােজাম্মেলদা ছিলেন আমার থেকে দশ-বারাে বছরের বড়। ভীষণ স্নেহ করতেন আমাকে। একদিন বড় মুখ করে বলেছিলাম

– মােজাম্মেলদা সরকারি চাকরি যখন আছে তখন বিয়েটা করেই ফেল।

মােজাম্মেলদা হেসে বলেছিল –এমন টাকলুকে কেউ মেয়ে দেবে নাকি?

এহেন মােজাম্মেলদার ছিল ভীষণ পার্সোনালিটি। আমার ফ্রেণ্ড-ফিলােসফার-গাইড মােজাম্মেলদার সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করলেও আমার দুঃখ,দারিদ্র টাকা-পয়সার অভাবের কথা কিছুই বলতে পারতাম না। যদিও তিনি জানতেন আমার বড় ভাই কত কষ্ট করে বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়; আর সেই টাকা প্রতি মাসে না এসে কখনও কখনও ৩/৪ মাস

পরেও আসে।

মােজাম্মেলদা নতুনপল্লীর অন্য একটা মেসের সিঙ্গল রুমে থাকতেন। বাউল-ফকিরের ‘ন ভাওয়াইয়া দরাজ গলায় সুন্দর করে গাইতে পারতেন। স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় তাঁর ‘প-প্রবন্ধ, কবিতা নিয়মিত ছাপা হত। তার পাশের রুমের হেকমত আলী ছিলেন গভঃ

লজের লাইব্রেরিয়ান। গান না জানলেও হেকমতদা খুব গানের ভক্ত ও শিক্ষানুরাগী হলেন। আর আমাকে প্রবল স্নেহ করতেন। কিছু হলেই দিল খােলা হাসিতে ভরিয়ে আমাকে বলতেন – বল আক্কাস, কী খবর? বলেই হা-হা করে হেসে উঠতেন।

বছরের শেষদিকে একে-একে টিউশানিগুলাে সব চলে গেল। জামিরভাই পাঁচ মাস হ’ল টাকা পাঠাতে পারছে না, ব্যাঙ্কের কী একটা নতুন নিয়মের খপ্পরে পড়ে। মা একটা বড় ছাগল ও হাঁস-মুরগি বেচে আমাকে টাকা দেওয়ায়, কোনরকমে চলছে। ভাবছি হেকমতদা’র কাছে গিয়ে ক’টা টাকা ধার হিসাবে চেয়ে নেব, নয় তাে উপােস করে মরতে হবে। আবার ভাবি, এটা জানলে মােজাম্মেলদা’ই বা কী ভাববেন?

হাজার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংকোচের মধ্যে সেদিন বিকেলে গুটিগুটি পায় মােজাম্মেলদা’র মেসে গিয়ে হাজির হলাম। দেখি অফিস ফেরত মােজাম্মেলদা জামাটা খুলে হ্যাঙারে টাঙাচ্ছে। আমি গিয়ে তার বিছানায় বসলাম। পিছন ফিরে আমাকে দেখে মােজাম্মেলদা, পানসেমুখে হাসতে লাগল, আর আমিও হাসতে-হাসতে আমার অভাবের কথাটা বলতে পারলাম না।

রবিবার চার্চের সামনে রাস্তায় ঘুরছি আর সাত-পাঁচ ভাবছি। ভাবছি কোথায় পাব টাকা-কড়ি? কী করব? ভাবছি প্রাইমারির টেটে তাে পাশ করে গিয়েছি, এবার ভাইভাতে উতরে গিয়ে যদি রাতারাতি পােস্টিংটা পেয়ে যাই!

হঠাৎ হেকমতদা দৌড়ে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে – আক্কাস ভাই এটা তুমি কী করলে? গতকাল তুমি মােজাম্মেল-এর বালিশের নীচ থেকে দু’ হাজার টাকার নােটটা নিয়ে চলে এসেছ? ছিঃ! আমি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যালে চোখে হেকমতদার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেলাম। হেকমতদা কোনরকমে আমায় ধরে নিয়ে চার্চের রেলিং-এ বসিয়ে বলে জানি, আক্কাস তুমি ওই টাকা নাওনি।

কিন্তু মােজাম্মেল অফিস থেকে ফিরে জামা ছাড়ার সময় পকেট থেকে দু’হাজার টাকার নােটটা বার করে বালিশের তলায় রেখেছিল। ওখানে তাে তারপর তুমি ছাড়া আর কেউ যায়নি বা বসেনি। তাই মােজাম্মেল বলছে – টাকার তাে আর পাখা গজাবে না? আক্কাসই চোর। হেকমতদা বলে – সব শুনেও আমার বিশ্বাস হয় না। এসব বাজে কথা। অথচ মেসের সবাই তােমাকে‘চোর’ বলছে।

রাগে-দুঃখে-অপমানে মনে হ’ল আত্মহত্যা করি। আবার মনে হ’ল সব ছেড়ে-ছুঁড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। লেখপড়ায় মন নেই। শুয়ে শুয়ে সাত-পাঁচ ভাবছি কী করা যায়? * একবার ভাবছি কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে আমার একটা কিডনি বেচে টাকা যােগাড় করি এমন সময় মেস-ম্যানেজার সমরদা এসে একটা লম্বা খাকি রঙের সরকারি অশােক স্তম্ভ মার্কা খাম আমার হাতে দিয়ে বলল – আক্কাস, এই খামটা গতকাল দুপুরে পিওন নিয়ে এসেছে। তােমার ইস্কুলের চাকরিটা বােধহয় হয়ে গেছে। পিওন দিচ্ছিল না, পরে সমর শেখ, মেস ম্যানেজার হিসেবে পুরাে নাম সই করে তবে নিয়েছি।

কৃষ্ণনগরে পাশেই তেতিয়া গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে জয়েন করে প্রথম মাসের মাইনের টাকা হাতে পেয়েইসটান চলে এলাম নতুন পল্লীতে মােজাম্মেলদা’র মেসে। আমায় দেখে। তাচ্ছিল্য’র সুরে মােজাম্মেলদা বলেন – শুনলাম তুমি নাকি চাকরি পেয়েছ? আমি বল -হ্যা, মােজাম্মেলদা তাই তাে তােমায় প্রণাম করতে এলাম।

তিনি পিছন ফিরে তাকের দিকে যেতেই আমি আমার পকেট থেকে একটা চকচকেদু’হাজার টাকার নােট বালিশের তলায় গুজে দিয়ে সন্তর্পণে চলে এলাম। মেসে ফিরে এক বাক্স মিষ্টি এনে সবাইকে টালেও চোর অপবাদ থেকে নিজেকে যেন মুক্ত করতে পারছিলাম না। |

ওদিকে মােজাম্মেলদা আমাকে দেখে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আর কিছু না পেয়ে তাকের বাংলা অভিধানের পাতা উলটোতে থাকেন রাগের বশবর্তী হয়ে। হঠাৎ সেই অভিধানের ভিতর থেকে একটা দু’হাজার টাকার নােট মাটিতে খসে পড়ে। ঠিক তখনি মােজাম্মেলদা’র মনে পড়ে যায় যে তিনি সেদিন টাকাটা তাড়াহুড়ােয় একবার বালিশের তলায় রেখেও আবার কেউ ঘরে ঢুকবে ভেবে বাংলা অভিধানের ভিতরে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন।

হতাশায় দুঃখে এক মুহূর্তে বালিশটা উল্টেই দেখে সেখানে একটা দু’হাজার টাকার নােট। মােজাম্মেলদা’র কাছে সবটা দিনের আলাের মতাে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি সেই দু’হাজার টাকার নোেটটা পকেটে পুরে পাশের ঘর থেকে হেকমতদাকে ডেকে নিয়ে এক লহমায় বড় রাস্তা পেরিয়ে চাঁদ সড়কে ছাত্রদের মেসে এসে হাজির হন।

দুজনে হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকেই দেখে আমি বিছানার উপর মাথায় হাত দিয়ে বসে আছি। মােজাম্মেলদা এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় স্বরে বলেন – আক্কাস ভাই, তুমি চোর নও । আমিই ভুল করে অন্যত্র টাকাটা রেখেছিলাম। এই নাও তােমার টাকা। এই বলে তিনি নীচু হয়ে আমার পা ধরতে গেলেন। আমিও আর থাকতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে মােজাম্মেলদাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

মােজাম্মেলদা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন – আক্কাস নয়, আমি-ই আসল ‘চোর’।

 

 

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *