টুকিটাকি // ছোটবেলা – ১৭ // বন্য মাধব

এবার ভয় জোড়া পুকুরে। রামপুর হাটে যাবার পথে আমাদের পাড়া থেকে বুনো পাড়ার মাঝে কোন বাড়ি ঘরদোর ছিল না। দু’পাশে ধান জমি আর পুকুর। এই রাস্তার মাঝামাঝি ছিল দু’টো পুকুর গায় গায়, মাঝের আলটা বর্ষায় ডুবে যেত। মেঠেপুকুরের মত এটাও আমাদের সাজার পুকুর।

বিলসে মাছের পুকুর এটা। ধান কাটা হয়ে গেলে ছেঁচা হত, প্রচুর কই, সিঙি, মাগুর, শোল, ল্যাঠা, উলকো, ন্যাদস, পুঁটি, ট্যাংরা, তেলো কাঁকড়া মায় কচ্ছপও মিলতো। বর্ষায় আমরা শামলা ও ঢ্যাঁপও এখান থেকে তুলতাম। তাহলে ভয় কেন? আমরা শুনেছিলাম এই পাড়ে আমাদের এক জ্যাঠতুতো দাদার মৃত জমজ সন্তানকে মাটি দেওয়া হয়েছিলো। এমনিতে জনশূন্য জায়গা তার উপর আবার এই কাহিনী।

একা একা কি করে যাই। তবুও তো যেতে হত! বারবার পিছন ফিরে দেখতাম, কেউ বা কিছু আসছে কিনা, রাম নাম জপ তো ছিলোই। আর ছিল কোমরের ঘুনসিতে জালের কাঠি বাঁধা। দীঘির পাড়ের গল্পটাও এদের কাছাকাছি। পার্থক্যটা এই ওটা আমাদের চলাচলের রাস্তার পথে পড়ে না। প্রয়োজন ছাড়া ওদিকে যেতে হত না। তাও প্রয়োজনটা দিনের বেলা পড়তো। পাড়ে রাখালে কড়াই, বরবটি, পুঁইশাক ইত্যাদি সব্জি চাষ হতো।

আমাদের কাজ ছিল সকাল বা বিকালে দীঘি থেকে জল নিয়ে গাছে দেওয়া। ছোটদের যা কাজ আর কি! রামপুর যাবার পথটার সমান্তরাল পথ ছিল দীঘির পাড়ে যাবার পথ। তবে পাণিখালের এই পাড় সদর রাস্তা ছিল না। পাকা ধান বয়ে আনার জন্যে এই পথটা ব্যবহার হতো। যাইহোক, এখানে ভয় কোত্থেকে আসে! আসে।

খালের পাড়েও মড়া পোড়ানো হত। আর দীঘিটার উল্টোপারে ছিল তাল আর অশ্বত্থগাছের ঝোপ। ক’পা গেলেই বিদ্যাধরীর উঁচু পাড়। পাড়ে সুইস গেট বসানো, জোয়ারের জল পাণিখালে ঢোকানো হয়, আবার ভাঁটির সময় খাল থেকে জল নদীতে আসে। পাড়ে উঠলে বুক কাঁপত, গেট খোলা থাকলে পাড়ও কাঁপত। এখানে নদীর চরেও মড়া পোড়ানো হত। দীঘির উল্টোপাড়ের কাছ বরাবর মাঠে একটা ক্যাওড়া গাছও ছিল। তাকে ঘিরে নানা ভৌতিক গল্পও ছিল।

এই গল্পটা এখনও মনে আছে। আমাদের গ্রামের জমিদার, আমরা যাদের বাবু বলে জানতাম, যাদের এক শরিকের জমিদারি দেখভাল করতেন আমার বাবা, একবার ঐ গাছে বসা পানকৌড়ি মেরে খেয়েছিলেন এবং ভূতরূপী পানকৌড়ির মাংস খেয়েই মারা যান। গল্পটা আমাদের কাছে একটুকুও মিথ্যে মনে হয় নি। ঐ গাছটাকে আমরা খুব ভয় করতাম।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: