টুকিটাকি // ছোটবেলা – ১৯ // বন্য মাধব

এবার আসি সুতিখালের কথায়। এর কোন পাড় ছিল না। পাণিখালকে আমাদের পাড়ায় আটক করা হয়েছিল। ১১ নং কুমড়োখালির লোকের বিশেষকরে মিদ্দেপাড়ার লোকের রামপুর যাবার এটা সদর রাস্তা ছিল। আমাদের বাড়ির দু’দিক দিয়ে ঢোকা ও বেরোনো যেত।

বাঁহাতের দিকে বেরিয়েই পড়ত বনবিবি তলা। বর্ষার সময় এখানে সবাই গরু মোষ বেঁধে রাখত, তাদের তো তখন চরবার মাঠ বন্ধ, আমাদের গরু বাঁধা থাকত উল্টোদিকে বড় পুকুরপাড়ে। তাদের সময়মতো খড়, ঘাস বা জল খেতে না দিলে খুব হাম্বা হাম্বা করতো। রাখাল ছাড়াও আমরা তাদের খেতে দিতে যেতাম। ঘুঁতোনো গরুকে আমরা খুব ভয় পেতাম ষেমন তেমনি মোষ যতই শান্ত হোক ওদের চাহনি দেখলে খুব ভয় পেতাম।

বনবিবি মন্দির পেরিয়ে একটা পুকুর। এপাশে মোড়ল বংশের জ্ঞাতিগুষ্টির ভিটে। এরপরেই শুরু সুতিখাল। সরু খালটা দীর্ঘ দিন কাটানো হয়নি। মিষ্টি জলের খাল, পাণিখালের নোনা জল এখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। প্রচুর শামলা ফুটে থাকত, আর ছিল চুঁচকোর বন। সাপের আর জোঁকের ভয় ছিল।

তা’ থাকুক, সুতিখালের শামলাগুলো ছিল বেশ বড়, লালচে আর মিষ্টি। আর পাকা পাকা ঢ্যাঁপ? অন্য জায়গার ঢ্যাঁপ তার ধারে কাছেই আসে না! সুতরাং ভয়কে মেরে তুড়ি আমরা সবাই সুতিখালে ঘুরি।

পাণিখালের সঙ্গে ছিল আমাদের একটা অন্যরকম সম্পর্ক। সকাল সন্ধ্যের, যখন তখনের সম্পর্ক। বনবিবি তলা পেরিয়ে খালপুকুর পেরিয়ে, খাস খামার পাশে রেখে, দুষ্টুদের টাটকা হাগা ডিঙিয়ে খাল পাড়ে দল হাজির।

দল মনে করলে পায়খানাকারীদের ধরার জন্যে হাগায় শুকনো লঙ্কা আর কাঠকুঠো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিত। তাদের বিশ্বাস ছিল এরফলে পায়খানাকারীর পোঁদ জ্বলবে, আর তারা সহজেই তাকে ধরে ফেলে উত্তম মধ্যম দেবে। কিন্তু সেটা আর হতো কই? যেটা হতো সেটা হলো লঙ্কা পোড়ার ধোঁয়ায় দলেরই সব কাশতে লাগতো।

পাণিখালের এপারে দু’ঘর তাঁতী। তাদের বাড়ির পর সেই দূরে বাবুদের আরেক শরিকের কাছারি। আমাদের বাবুদের কাছারির মতো এটিও মাটির, খড়ের চাল। কাছারির দীঘিতে বড় বড় লাল শামলা ফুটে থাকতো। আমাদের সাহসে কুলাতো না সেসব তুলে খাই। জোঁকোবুড়ির ভয় যে! ঐ দেখাই সার হতো। মাঝে মাঝে তর্ক করে জলে নামলেও ভয়ে উঠে আসতাম।

একই ভয় ছিলো পাণিখাল এপার ওপার হওয়াতে। অনেকে পারলেও মাঝখানে গিয়ে আমার দম হয়ে যেত, পড়িমড়ি করে ফিরে আসতাম। বাপরে! তবে দল বেঁধে পাড়ের কাছাকাছি হাঁচা করে বেলে আর বাগদা ধরতে পাহারাদারের ভয় ছাড়া কোনো ভয় লাগত না।

( চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: