টুকিটাকি  //  ছোটবেলা – ২  // বন্য মাধব

তখন আমাদের আবাদী জমিতে ধান হত বর্ষায়,আমন ধান।বেশি নাবাল জমিতে মোটা ধানের চাষ হত। তার চালের ভাতে গায়ে বেশি বল মেলে বলে একটা সাধারন ধারণা ছিল। পান্তাভাতটা বিশেষ করে। আর চাষ হত পাটনাই ধান, সরু বড় বড় দানা। এটা ছিল দামী ধান। কিন্তু এর ভাত খেয়ে যেন মন ভরতো না। আর একটা দামী ধান, হামাই সবার শেষে পাকতো। কেউ কেউ চাষ করতো। এর মুড়ি খেতে খুব সুস্বাদু লাগত। একটু উঁচু জমিতে বাবারা পঙকোজ ধান চাষ করত। এতে পোকার উপদ্রব বেশি হত।

আমরাও চাষের কাজে সাহায্য করতাম। হালের গরু ছাড়লে তাদের পাহারা দিতাম, নইলে তো পরের বীজতলার চারাধান খেয়ে নষ্ট করে ফেলবে। আলের ঘাস খেত তারা। কোন কোনদিন মানদেরদের জন্যে পান্তা নিয়ে যেতে হত। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এরা ভয়ঙ্কর সব আদি রসাত্মক গল্প বলত। গাঁ গঞ্জে জন মানদের মধ্যে এসব গল্পর খুব কদর ছিল। কেউ কেউ গানও করত, একেবারে খাঁটি দেশজ সুরের গান।

আমাদের গরু ছিল ঐ পাঁচ ছটা। এরমধ্যে দু’টি হালের গরু। একটি দুটি গাই আর বাছুর। বাছুরগুলো এতো সুন্দর! ওরা আআমাদের খেলার সাথীও। বড় গরুদের গল কম্বলে, পিঠে, পেটে হাত বুলিয়ে দিলে ওরা কী আরাম পেত। রাখাল বা বড়দের সঙ্গে গরুর গা, কান থেকে এঁটুলি তুলে ঘুঁটের আগুনে মারতাম। সব রক্ত খেয়ে ডুমো ডুমো হয়ে থাকত। গা ঘিনঘিন যে করত না তা নয়।

আবার ডাঁশ ধরে তাদের ডানা কেটে খ্যাঁংরা কাঠি পুঁতে তারপর কম্পিটিশন করে উপরে তুলতাম। এটাও আমাদের জব্বর একটা খেলা ছিল। যাইহোক গরুর সংখ্যা বেশি হলে ঠিক কোন একটা রোগে একটা না একটা মরে যেত। হঠাৎ কোথাও কিছু নেই গরুর খাওয়া বন্ধ, ধ্যালকানো পায়খানা। কোন ওষুধে কাজ হতো না। এঁশো না কী একটা রোগ বলত বড়রা।

গরু মরা মানে বাড়িতে শোক নামা। লালন পালনে একটা মায়া তো পড়েই। তার উপর ধর্মীয় ব্যাপার তো আছেই। নতুন গরু কিনে আনলে তাদের পায়ে হলুদ বাটা, মাথায় সিঁদুর দিয়ে বরণ করে গোয়ালে তোলা হত। পয়লা বৈশাখে গোয়ালে পুজো দেওয়া হত। গরুকে সরষের তেল, হলুদ আর নিমপাতা বাটা মাখিয়ে চান করানো হত। গাইগরুকে কপালে সিঁদুর দেওয়া হত। বড় জ্যাঠামশাইদের মোষ ছিল।তাদেরও একই কদর ছিল। আমরা কিন্তু পিঠে চড়া তো দূরস্থান মোষকে খুব ভয় পেতাম। রাখালরা, জন মানদেররা বেশ চড়ত, এখানে ওখানে যেত।

খোরোর ধান এখানে খুব কম হত। জলের যোগান যেখানে থাকত, পুকুরের পাশে এই ধান চাষ হত। ধান পাকলে বাবুই আর চড়ুই পাখি খুব উপাত করত। ক্ষেতের মাঝ বরাবর কেনেস্তারা বেঁধে আওয়াজ করে তাদের তাড়াতে আমরা ছোটরা ব্যস্ত থাকতাম। আর কালো মাথার কাকতাড়ুয়ারা তো ছিলই। তখন লাঙল চষেই চাষ হত, গরু বা মোষকে একাজে ব্যবহার করা হত।

তবে গাই গরুকে একাজে লাগানো হত না। তাদের কাজ ছিল বাছুর আর দুধ উৎপাদন। তবে ট্যাক্টরেরও আনাগোনা শুরু হয়েছিল। খোরোর জমি চষতে এদের ডাকা হত। আর হত বাগান। চাষ হত লঙ্কা, কুমড়ো, উচ্ছে, ঝিঙে, কাঁকুড়, ফুটি, তরমুজ, খরমুজ। বাগানের চারদিকে অস্থায়ী মাটির পাঁচিল, কাঁথি দেওয়া হত। নইলে ছেড়ে রাখা গবাদি পশু সব নষ্ট করে দেবে। তবুও এরা কাঁথি ভেঙে ঢুকে পড়ত ক্ষেতে, গাছ নষ্ট করত। আবার ভাঙা সারাতে হত, নইলে ভাঙা অংশে বাবলার পালা দিত।

বর্ষায় সময় সবাই ব্যস্ত। চাষ নির্ভর জীবন। বাবাকে আমি কোনদিন জমিতে কাজ করতে দেখিনি। ছানি কাটানো চোখে মোটা কাঁচের ভারী চশমা, তিনি দেখতেনও কম। কিন্তু সবকিছু তদারকি করতেন দাপটে ও দক্ষতায়। তবে পুকুরে হুইল ফেলে মাছ ধরতেন, আমি চার গেঁথে দিয়ে, বড়শি থেকে মাছ ছাড়িয়ে সাহায্য করতাম। আবার মাছ ছোট হলে ছেড়েও দিতাম।

.

(চলবে)

.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *