টুকিটাকি // প্রস্তুতিবেলা // বন্য মাধব

231

আমার জীবনে হঠাৎ হঠাৎ এক একটা খুব খারাপ সময় এসেছে, আবার চলেও গেছে। টিবি হওয়া, লিভারে সমস্যা হওয়া, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, প্যারাটাইফয়েড, ফ্রোজেন সোলজার, দাঁতের সমস্যা, বাইক দুর্ঘটনা…..চালু আছে প্রক্রিয়া, চালু আছে…..।

তখন আমি টুয়েলভ, কিন্তু মনে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ থাকায় পড়াশুনোটা ক্রমশঃ বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, ভাঙনের ক্যানেস্তারা বাজছে। পড়া বোঝা আর মনে রাখার ক্ষমতাও কমছে। ঠিক এই সময় আমার টিবি ধরা পড়ল। প্রথমে ঘুসঘুসে, হালকা হালকা জ্বর আসতো, একটু কাশিও হতো শেষে হলো কিনা টিবি, ডাক্তারদার স্যার সব রিপোর্ট খতিয়ে দেখে পোষাকি নামে বললেন, ক্রকস….., তখন কাশির সাথে সামান্য রক্ত আসতো। একেই বলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

বছরে দু’বার প্যারাটাইফয়েড বাঁধা থাকতো। প্রথমে গা হাত পা ব্যথা ব্যথা করতো, মাথা ভার ভার, আর গাঁটে গাঁটে ব্যথা। শীত শীত ভাব বাড়তে বাড়তে জ্বর আসতো হু হু করে, একসময় মনে হতো বিছানার উপর ভেসে আছি। এই সব দিনগুলোতে সেজদা আর ডাক্তারদার ভূমিকাই আমাকে আবার সুস্থ করে তুলতো।

এর কয়েক বছর পর আবার লো গ্রেডের জ্বরে ভুগতে শুরু করলাম। দাদা দেখছে, দাদার সিনিয়ররা, স্যারেরা দেখছেন, কিছুই ধরা পড়ছে না।

.

.

এভাবেই দিন যাচ্ছিল, খাই দাই, গায়ে জ্বর মাখি। মাখতে মাখতে জ্বরের কারণ জানা গেল। আরে এর অ্যাপেনডিক্স কেটে ফেলো। ফ্যালো তো ফ্যালো ! দাদা তখন চিত্তরঞ্জন থেকে বাঙ্গুরে। ভর্তি হলাম ওখানে। কাটা হলো। কিন্তু অ্যাটেন্ডেন্টরা কর্মবিরতিতে। ফলে সব চাপ দাদার ঘাড়ে। অপারেশনের দিন দু’য়েক পর একদিন মাঝরাতে বেড থেকে নামলাম, বেড ধরে ধরে ভারি পেট খালি করলাম। বাব্বা! কত ইউরিন জমা ছিল পেটে। খালি করে শান্তি।

এরপর বেশ ক’বছর টুকটাক করে কেটে গেল। আবার বড় অসুখে পড়লাম আমার পীঠোপীঠি দাদার অকাল মৃত্যুতে। দাদা বাঁকুড়ার বিষ্ঞুপুরের কাছাকাছি একটা স্কুলে পড়াতো। গরমের ছুটিতে বাড়ি ফেরার দিন দু’য়েক আগে ব্রেনস্ট্রোক হয়ে মারা গেল, একা হাতে হাসপাতাল, শ্মশান, শ্রাদ্ধ শান্তি সেরে বাড়ি ফেরার আগের রাতে আমি স্মৃতির তাড়নায় হাইপার টেনশনে আক্রান্ত হলাম। বুকভাঙা কান্না ঠেলে আসতে লাগলো। বেশ কয়েকমাস দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে কাটার পর আমি ধাতস্থ হয়েছিলাম।

এর বেশ কয়েক বছর পর আমার বাঁ কাঁধ পুরোপুরি লক হয়ে গেল। অফিসের কাছে সল্টলেক হাসপাতাল। ওখানে ছুটলাম। বেশ কিছুদিন ভোগার পর আবার কাজের উপযোগী হলো বাঁ হাত। ফ্রোজেন সোলজারের যে এতো কষ্ট সেই প্রথম জানলাম। আপাততঃ শেষবারের মতো জেনেছি বাইক দুর্ঘটনায়। মৃত্যুকেও খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম ঐ সময়। জীবনের মতো তারও পরতে পরতে রহস্য আর ওঠানামা।

.

.

বছর তিনেকের প্রস্তুতি সেরে,অবশ্য প্রকৃত অর্থে প্রস্তুতিটা ছিল আরও আগে, ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে।আনন্দমেলা, শুকতারা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের পক্ষীরাজ, স্বপনবুড়োর ঝলমল পত্রিকা তখন আমাদের, ছোট দু’ভায়ের জন্যে বাড়িতে আসত নিয়মিত। আর শরৎচন্দ্র,বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, বিভূতি, মানিক,তারাশঙ্কর, সুকান্ত,সুকুমার, এবং বছর বছর একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসগুলো, আর ছিল তন্ত্রাভিলাষীর সাধুসঙ্গ বড়দের সংগ্রহ থেকে নিয়ে পড়তাম।

শরৎ চ্যাটুজ্যের বেশ কিছু চরিত্রের ছাপ আমার উপর পড়ে। এমনকি বঙ্কিমেরও চরিত্ররা প্রবলভাবে ছাপ ফেলে।একটা নরম মন, খুব সহজেই যার চোখ ফেটে জল আসে।আর চিরস্থায়ী সম্পর্ক ও প্রেম বিলাসী।কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।আমার নীতিটা ভুল ছিল।খুব ঘনিষ্ঠ সামাজিক মেলামেশা ছাড়া এ ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয় না।কিন্তু ততদিন অনেকটা মানসিক শক্তির ক্ষয় হয়ে গেছে।

সেই ১৯৮৮ সাল, আমি তখন কবিতার খাতা নিয়ে নানান জনকে পড়াচ্ছি। তাঁরা মতামত দিচ্ছেন।শিখছি শব্দ প্রয়োগ,নরম নরম শব্দের বদলে কঠিন শব্দের, গদ্য শব্দের প্রয়োগ। নিজস্ব শব্দ সৃষ্টির চেষ্টাও করছি।জনবহুল জায়গায় নতুন শব্দ শোনার আশায় কান পেতে থাকছি।

এই সময় থেকেই মৌলালির যুবকেন্দ্রের লাইব্রেরিতে যাতায়াত শুরু।হরিচরণ, রাজশেখর ও সংসদ বাংলা অভিধান ঘাঁটাঘাঁটি।আর তাক থেকে ইচ্ছেমত কবিতা সংগ্রহ বা কবিতার বই পেড়ে পড়া।কোন রকম বাছবিচার ছাড়াই এবং গোগ্রাসে।লাইব্রেরিটা সত্যিই ভাল।কিন্তু কোনদিনও খোলার সময় খুলত না।

মৌলানা আজাদ সেরে সুরেন্দ্রনাথে বি এস সি পড়তে এসে লাইব্রেরিতে আরো যাতায়াত বাড়ল।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *