টুকিটাকি

    ছোটবেলা // মাধব মন্ডল

ভাবনার ভারে আক্রান্ত হলেই চারপাশের জগৎ ধীরে ধীরে দূরে আরো দূরে সরে সরে যায়।তখন শুধু একলা একলা খেলা, যদিও কোলাহল চারপাশে। আমি শামুকের মত ঢুকে যেতাম, আজও যাই নিজের অদৃশ্য খোলসে।

শুরু হত স্বপ্নের আসা যাওয়া।পরের পর গল্প তৈরি হত।কবিতার লাইন ধরা দেব দেব করে। কিন্তু তাদের ধরা বড়ই কষ্টসাধ্য কাজ।আশপাশের লোকজনের ভুল বোঝাবুঝি। ক্ষেত্রবিশেষে পাগল, হাফ পাগল, ছিটেল প্রভৃতি আখ্যা লাভ।কখনও বা সামনা সামনি।আমার কখনও হাসি কখনও কান্না কখনওবা রাগ হয় এসব শুনলে।

আমি জন্মেছি সুন্দরবনে, বাসন্তী থানার চড়াবিদ্যা অঞ্চলের ১০ নং কুমড়াখালি গ্রামে, বিদ্যাধরীর গায়ে।আমার ঠাকুরদারা ছিলেন দু’ভাই।আদি বাস ভাঙড়(ভাঙ্গড়) থানার শাঁকশহর ( শাঁকশর ) অঞ্চলের  ডিঙ্গাভাঙ্গায় ( ডিঙেভাঙা) । ধানচালের ব্যবসা ছিল দু’ভায়ের। মুচিরাম আর কাওরেচরণ।এই নামকরণ নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ হাসাহাসি চলত।

মার মুখে শুনেছি এরকম নামকরণের কারণ।সমাজে একটা চালু ধারণা ছিল, এখনও আছে গ্রাম সমাজে, মুচি, কাওরাদের ঘরের ছেলে মেয়েরা নাকি অকালে মরে না।তাই সন্তানের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে তাদের নামে নামকরণ করা হয়।ঠাকুরদাদের নামকরণ এ পথেই হয়েছিল।

আমাদের বংশ বিশাল।চাষ নির্ভর ফ্যামিলি যেমন হয় আরকি! অংশ বংশ ধ্বংস।ভাগ হতে হতে ভাগের জমি কমতেই থাকে।ঠাকুরদাদেরও তাই হতো যদি না তাঁরা ব্যবসায় নামতেন।আর লাভটা বিলাসে না উড়িয়ে যদি না জমি কেনাতে ব্যয় করতেন।একের পর এক আবাদে তাঁরা জমি কিনে সে আমলের সিলিং ছুঁয়েছিলেন বলে জ্ঞান হওয়া থেকে শুনে আসছি।

সিলিং এড়াতে দু’ভায়ের পাঁচ পাঁচ দশ ছেলের দশ বড় ছেলে অর্থাৎ দশ বড় নাতির নামে দশ কাটা করে জমি দানপত্রও করে দিয়েছিলেন। বাড়িতে বাসন্তী পুজোও শুরু করেছিলেন। স্কুলের জন্যে জমি দান করেছিলেন। শেষ বয়সে ঠাকুরদা সদ্য জঙ্গল হাসিল করা বাসন্তীর চড়াবিদ্যার ১০ নং কুমড়াখালিতে চলে আসেন, বাবাও। আমাদের গুষ্টির অন্যান্যরা।সেও একটি পাড়ায় দাঁড়িয়ে গেল। আটিপাড়া।

কিন্তু আমি পড়ন্ত অবস্থায় জন্ম নিই।যৌথ সংসার আর নেই।সেও রমরমাও নেই।শেষ বয়সের বাচ্চা বলে দাদু দিদা ঠাকুর্দা ঠাকুমার আদর অধরা থেকে গেছে।জ্ঞানগম্যি হবার আগেই তারা গত হয়েছেন। শুধু আবছা আবছা মনে পড়ে দাদুকে।

ঠাকুমাকেও। আর মনে পড়ে ক্ষণজীবী পরের ভাইটিকে। একটু জ্ঞানগম্যি হবার পর এক দাদার মৃত্যু আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর দিন আমাদের খেলার সঙ্গী সুবলদা কলেরায় মারা যায়। এই ঘটনার পর থেকে আমাদের বাড়ির আনুষ্ঠানিক সব পুজো বন্ধ হয়ে যায়। আমরা ছিলাম সাকুল্যে দশ ভাইবোন। সবার উপরের দুই দিদিও ছিল ক্ষণজন্মা, মার মুখে তাদের গল্প শুনেছি। মা তাদের নাম ধরতেন না, বলতেন ‘ কাল ‘।

ছোটবেলার অনেক ঘটনার কিছু কিছু লিখেছি ছোটবেলা বইয়ে, ছড়াকারে, যেটি এখন ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছে বি বি সি আনন্দ সংবাদে। অবাধ, উন্মুক্ত গ্রামের প্রকৃতি আমাকে অনেক দিয়েছে। আমাদের বিদ্যাধরী, দুরুদুরু বুকে তার উপর দিয়ে সাঁকো পেরিয়ে রামপুর হাটে যাওয়া আসা, নদীর পাড়ে মড়া পোড়ানো দেখলেই ভয়ে ভয়ে দ্রুতপায়ে জায়গাটা হাঁটা,পাণিখাল, মেঠেপুকুরের ভূতের জ্বলন্ত চোখ,

জোড়াপুকুরের পাশ দিয়ে একা একা পারতপক্ষে না যাওয়া, দলে গেলে দলের মাঝে থাকার চেষ্টা, দিঘীর পাড়ে ভয়, দিঘীর কাছেই থাকা গেঁও গাছের ভূতের ভয়, বনবিবির থান, বাগদী পাড়ার রাতের কালীপুজো দেখতে যাওয়া, স্বরসতী পুজোর তিনরাত স্কুল বাড়িতে থাকা আর এক দাদার কাছে মোহনলাল, ক্ষীরের পুতুল আর ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শোনা, দুর্গা পুজোর মাস দেড়েক আগে থেকে অধীর অপেক্ষা কবে বড়দা জামার পিস পাঠাবে, দর্জির দোকানে কাল বিলম্ব না করে ছোটা, পুজোর ৫ দিন প্রতিদিনের বরাদ্দ একটাকা নিয়ে রামপুরে ঠাকুর দেখতে ছোটা, তখন একা বড়দা ব্যাঙ্কে চাকুরি করতেন, পুজোর ছুটিটা বাড়িতে আনন্দের হাট বসে যেত, আমরা ছ’ভাই তখন জীবিত। কত কী খাবার বাড়িতে বানানো হত।

ঘুড়ি ওড়ানো, নাড়ার গোড়ার চিতি কাঁকড়া ধরা, হাঁটুজলে বাদায় চাকনি জালে কই, ট্যাংরা, বেলে, খলসে, চাঁদা, ন্যাদস, শোল, ল্যাঠার পোনা ধরা, আমন ধানে ক্ষেত ভরে গেলে ছিপ ফেলে নানা মাছধরা, রাতে জাওলা দিয়ে সিঙি, মাগুর, শোল মাছ ধরা, ঘেরের মোন কাটিয়ে ঘুনিতে চুনোপুঁটি, কড়ে চিংড়ি ধরা, বুনো আর পোষা হাঁসের পালক কুড়িয়ে বেচা, পাঁচ আর দশ পয়সার বরফ খাওয়া, খামার বাড়িতে লুকোচুরি, গোজি, বউ বসানো, কউ,

পাঁচনমারি, গুলি খেলা, চামগুলতিতে মাটির গুলি নিয়ে পাখির পিছন পিছন তাড়া, বাবুদের ধানের গাদা থেকে গোটা দু’য়েক গোল্লা সরিয়ে মুলতে গিয়ে দাদার হাতের বিরাশি সিক্কার চড় খাওয়া, এমনকি পুজোর প্রসাদ এনে দেওয়ার বায়না করায় বড়দার হাতের চড়, গোয়াল ঘরে গিয়ে গরুর গাড়ির চাকা ধরে অঝোরে কান্না, কারো সমব্যথী না হওয়া, খালের জলে সুতি ফেলে সমুদ্র কাঁকড়া ধরা – শেষ নেই, শেষ নেই সেই সোনালি দিনের স্মৃতির। আমি যে তখন বাবার আদরের ছোটবাবু, মাধু।

( ……চলবে )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: