ড. রমা চৌধুরী

শব্দব্রহ্ম

sahityasmriti.com

পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের পুণ্যশ্লোক, সত্যদ্রষ্টা, ব্রহ্মবাদী ঋষিরা মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্ব, সর্বশেষ তত্ত্ব, সর্বশেষ তথ্য, সর্বোচ্চ সত্যকে একটি অতি সুন্দর সুমিষ্ট সুললিত নাম দিয়েছিলেন। সেই সর্বজনবিদিত, সর্বজনবন্দিত, সর্বজন সমাদৃত নাম, যা উচ্চারণ মাত্রেই প্রত্যেক ভারতবাসীরই সর্ব শরীর হয়ে ওঠে রােমাঞ্চিত, সর্ব মন হয়ে ওঠে আনন্দোৎফুল্ল, সর্বআত্মা হয়ে ওঠে শান্তিপূর্ণ অর্থাৎ ব্রহ্ম। এই নিগূঢ় অর্থবহ ‘ব্রহ্ম’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলাে ‘বৃহত্তম বস্তু’ (বৃহ+ মন)।

 আমাদের সমন্বয়বাদী প্রজ্ঞাদৃষ্টিধন্য ঋষিরা এই দিক থেকে সগৌরবে ঘােষণা করেছেন ‘শব্দব্রহ্ম’-র কথা। কারণ অর্থ ও শব্দ, ভাব ও ভাষা, চিন্তা ও বাক্য অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধে আবদ্ধ এবং অর্থকে যদি শব্দে বিকশিত করা না যায়, ভাবকে যদি ভাষায় বিকশিত করা না যায়, চিন্তাকে যদি বাক্যে বিঘােষিত করা না যায়, তাহলে কোথায় থাকবে তাদের সার্থকতা, কোথায় থাকবে প্রয়ােজনীয়তা, কোথায় থাকবে তাদের মঙ্গলময়তা ? সেজন্য, প্রাচীন যুগে ‘শব্দ’-কেও সসম্মানে ব্রহ্মরূপে অভিহিত করতে, কোনাে জ্ঞানী গুণিজনই মুহূর্ত মাত্রও দ্বিধা বােধ করেননি ।

এই শব্দব্রহ্ম’-র উপাসনা প্রাচীন ভারতের জ্ঞানী-গুণি-ভক্ত-সাধকগণ করে। গিয়েছেন সুগভীর নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। ফলে জগতে আমরা পেয়ে ধন্যতিধন্য হয়েছি একটি অতুলনীয়, অতি যুক্তিসঙ্গত, অতি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত ‘শব্দশাস্ত্র’কে। এই সুবিশাল, সুনিগূঢ়, সুবিন্যস্ত শব্দশাস্ত্রের বহুলাংশ অধিকার করে রয়েছে, সমুজ্জ্বল করে। রয়েছে, সমুন্নত করে রয়েছে, ‘পাঠবিধি। কারণ প্রাচীনতম গ্রন্থ ‘বেদের আরেকটি সার্থকতম নাম হলাে‘শ্রুতি’, অথবা, যা শ্রবণ করা হয়।

এরূপে এ স্থলে সত্যদ্রষ্টা ঋষি বা গুরু তার আর্যদৃষ্টি দ্বারা যে পরম সত্যকে সাক্ষাৎভাবে উপলব্ধি করতেন, তা তিনি তার বিদ্যার্থী শিষ্যদের নিকট ব্যক্ত করতেন; কেবল ‘মুখের কথায় এবং শিষ্যগণও সেই ‘মুখের কথা’-কে সযত্নে, সশ্রদ্ধায়, সাগ্রহে, সাদরে শ্রবণ করে, হৃদয়ে অঙ্কিত করে নিতেন, এবং নিজেরা যখন গুরু হতেন, তখন সেই ‘পূর্বত’ সত্যকে পুনরায় ঠিক সেই পূর্বের প্রণালীতেই মুখের কথায়’তাঁদের শিষ্যদের নিকট হস্তান্তরিত করতেন এবং এইভাবেই চলতে শিক্ষাদান সগৌরবে, সুষ্ঠু সুন্দরভাবে যুগযুগান্তর ধরে গুরুশিষ্য পরম্পরায়, নিরবচ্ছিন্নভাবে।

অতএব, সহজেই বােঝা যাবে যে, কেন প্রাচীন ভারতে পাঠ ও আবৃত্তির ওপর এরূপ অধিক ও বিশেষ জোর দেওয়া হত। কারণ, ‘মুখের কথা’ এবং কানে শােনা’-ই যখন সব, তখন এই ‘মুখের কথা’ যাতে ঠিক ভাবে উচ্চারিত হয়, কানে শােনা যাতে ঠিক ভাবে গৃহীত হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হত সর্বদাই।

বেদের পাঠ-প্রণালী : দু-একটি দৃষ্টান্ত ধরা যাক, জগতের প্রাচীনতম গ্রন্থ, বিশ্বব্য, সর্বজ্ঞানাধার ঋগ্বেদ থেকে। এ বিষয়ে প্রাচীন যুগের মহামনীষীরা যে কত গভীর ভাবে চিন্তা করেছিলেন, কত নিগৃঢ় ভাবে আলােচনা করেছিলেন, কত বিশদ ভাবে প্রপঞ্চনা করেছিলেন, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ আমরা পাই, যখন দেখি ঋগ্বেদে সর্বসমেত একাদশ প্রকারের পাঠ আছে— সংহিতা পাঠ, পদপাঠ, ক্রমপাঠ, জটাপাঠ, মালাপাঠ, লেখাপাঠ, শিখাপাঠ, ধ্বজপাঠ, দণ্ডপাঠ, রথপাঠ ও ঘনপাঠ। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ঋগ্বেদের প্রথম সুপ্রসিদ্ধ ঋটিকে ধরা যাক। এটি হল এই।

“অগ্নিমীড়ে পুরােহিত। যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজ৷৷

হােতারং রত্নতমম্।।” (ঋগ্বেদ মণ্ডল, ১/১/১)।

অর্থাৎ, পুরােহিতস্বরূপ, যজ্ঞদেবতাস্বরূপ, হােতৃস্বরূপ, শ্রেষ্ঠরত্নদাতৃস্বরূপ অগ্নিকে বন্দনা করি।”

সংহিতাপাঠ : বেদের সংহিতাভাগে মন্ত্রটি যেরূপ লিপিবদ্ধ আছে, অবিকল সেইভাবে পাঠ করাকে বলে সংহিতাপাঠ। | পদপাঠ : একটি ঋকের প্রত্যেকটি পদ বা শব্দ স্বতন্ত্ররূপে সন্ধিবিচ্ছেদ করে এবং সমাজবদ্ধ পদকে বিভক্ত করে পাঠ করাকেই বলে ‘পদপাঠ’। যথা

অগ্রিম ঈড়ে পুরঃ হিত। যজ্ঞস্য দেবম্ ঋত্বিজ৷৷

হােতর রত্ন-ধাতম৷৷ স্থানাভাবে অন্যান্য পাঠগুলির উদাহরণ দেওয়া সম্ভবপর হলাে না এস্থলে।

বেদের স্বর (Accent) : বৈদিক সংস্কৃতে ‘স্বর’ও একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। কারণ ‘স্বরের যথাযথ জ্ঞান ও প্রয়ােজন না থাকলে, কেবল যে বেদপাঠ অশুদ্ধ হয় তাই নয়, বেদের অর্থবােধেও ঘটে বিশেষ ব্যাঘাত।

সাধারণতঃ বেদে তিনটি ‘স্বরের প্রয়ােগ দৃষ্ট হয় – উদাত্ত (“উচ্চৈরুদাত্তঃ – Accute or Raised Accent), অনুদাত্ত (“নীচেরনুদাত্তঃ – Grave Accent), স্বরিত (“সমাহরঃ স্বরিতঃ’ – circumflex Accent)।

এরূপে, ‘উদাত্ত’ হলাে স্বরের উত্থান, তার বিপরীত হলাে ‘অনুদাত্ত’, বা যে স্বরের উত্থান নেই। উদাত্ত’ ও ‘অনুদাত্তে’র মাঝমাঝি হলাে ‘স্বরিত’। উদাত্ত’ স্বর থেকেও সামান্য উঠে, (উদাত্তদপি উদাত্তাতরা’) ক্রমশ ‘অনুদাত্তের দিকে তার গতি।

আবৃত্তি উৎসব ২০১৭| বেদমন্ত্রে কয়েকটি চিহ্নের দ্বারা এই তিনটি স্বর প্রদর্শিত হয়েছে— যথা :

অগ্নিমীড়ে                        পুরােহিতং।

            যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম

হােতারং                             রত্নধাতম।।

এস্থলে দুই প্রকারের স্বরচিহ্ন আছে। বর্ণের নিম্ন চিহ্নগুলি অনুদাত্ত স্বরের জ্ঞাপক, যথাং অ পু য। বর্ণের উপরের দণ্ডবৎ চিহ্নগুলি ‘স্বরিত’ স্বরের।

জ্ঞাপক, যথা—মী হিস। যে বর্ণের কোনও চিহ্ন নেই, সেগুলির স্বর ‘উদাত্ত’ বলে বুঝতে হবে। শারীরিক বিকলতাজনিত বেদপাঠের অনধিকার :

“ন করালাে ন লম্বােষ্ঠো ন ব্যাক্তো আনুনাসিকঃ

গগদো বদ্ধজিহশ্চ ন বর্ণান্ বক্তৃমহতি।।”

                                                              (যাজ্ঞবল্ক্য শিক্ষা)

অর্থাৎ, যার বদন করাল, ওষ্ঠ লম্বা, স্বর আনুনাসিক, কণ্ঠস্বর গদ গদ (অস্পষ্ট) ও জিহ্বা জড় (তােতলা), তার বর্ণোচ্চারণ কখনও শুদ্ধ হতে পারে না বলে, তিনি বেদপাঠের অনধিকারী।

বেদপাঠে অধিকারী :

“প্রকৃতির্যস্য কল্যাণী জন্তোষ্ঠৌ যস্য শােভনৌ।

অপ্রগভশ্চ বিনীতশ্চ স বর্ণান বক্তৃমহতি।।”

                                                                (যাজ্ঞবল্ক্য শিক্ষা)

অর্থাৎ, যার প্রকৃতি শান্ত, দন্ত ও ওষ্ঠ সুগঠিত, উচ্চারণে সুস্পষ্ট এবং যিনি বিনীত ও সংযমী তিনিই বেদপাঠের অধিকারী।

পাঠের গুণাগুণ : শিক্ষাগ্রন্থে পাঠের চতুর্দশ প্রকারের দোষ এবং ছয় প্রকারের। গুণ উল্লেখ আছে। | চোদ্দটি দোষ – অক্ষর সম্বন্ধে শঙ্কা, সাধারণ ভীতি, উচ্চস্বর, অব্যক্ত বা অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর, আনুনাসিক স্বর, কর্কশকণ্ঠ, অত্যন্ত উচ্চস্বর, স্থানভ্রষ্ট উচারণ (যথা— কণ্ঠস্বর জিহ্বা দ্বারা, তালব্য স্বরদন্ত দ্বারা উচ্চারণ), কুস্বর, বিরসকণ্ঠ, বিশ্লিষ্ট (এক অক্ষরে অনেক অক্ষরের উচ্চারণ), বিষমরূপে অক্ষরকে আঘাতপূর্ব উচ্চারণ, ব্যাকুল হয়ে পাঠ, তানলয়হীনভাবে পাঠ।

ছটি গুণ : ‘মাধুর্যমক্ষরব্যক্তিঃ পদচ্ছেদস্তু সুস্বরঃ।

ধৈর্যং লয়সমর্থঞ্চ ষড়ৈতে পাঠকাঃ গুণীঃ।।

(পাণিনিয় শিক্ষা)

অর্থাৎ মধুর কণ্ঠে পাঠ প্রত্যেকটি অক্ষরের সুস্পষ্ট উচ্চারণ, পদচ্ছেদ করে

পাঠ, সুস্বর, ধৈর্যের সঙ্গে পাঠ এবং তানলয়যুক্ত পাঠ— এই ছ’টি পাঠকের গুণ। . উপরের সামান্য সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকেও স্পষ্ট হবে যে, প্রাচীন ভারতে পাঠ ও আবৃত্তির জন্যও কত নিষ্ঠা সহকারে কত পরিশ্রম করা হত, এবং যারা এরূপ সুষ্ঠ ‍ু   সুন্দরভাবে আবৃত্তিও পাঠ করতেন, তাঁরা কতাে সমাদৃত হতেন সমাজে । বর্তমান যুগেও সেই আদর্শ সর্বথা অনুসরণীয় নিঃসন্দেহে।

                                                                                            সৌজন্য : বাল্মীকি

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা  //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: