দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সুস্বাদু ছড়াক্কা

সতীশ বিশ্বাস

দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ছড়াকার ঝুলিতে আমরা যে-সব চরিত্র পাই, তারা প্রায় সবাই অদ্ভুত ও বিদঘুটে। আবার সেইসব চরিত্র আমাদের পরিচিত বলে মজাদারও বটে। তাদের কৌতুককর কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে আমাদের হাসি মাঝপথে হঠাৎ সংকীর্ণ হয়ে যায়, কারণ তাদের সঙ্গে আমরা নিজেদের তালগােল পাকিয়ে ফেলি।

অবশ্য, তা না করে আমাদের উপায়ও নেই, কারণ চরিত্রগুলি দেবীপ্রসাদ সংগ্রহ করেছেন আমাদের চারপাশ থেকেই। তবে, কবির ছড়াক্কায় শুধুমাত্র হাসি-মজা ছড়িয়ে নেই। আছে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, দুঃখ, হতাশা, আফশােস এবং বেদনাও। এবার একে একে ছড়াক্কা-র এই বিরল চরিত্র’র মানুষগুলির কয়েকজনের দিকে তাকানাে যাক।

বেলানগরের বেলাদেবী হেঁটে চলেছেন। তিনি তাঁর সব ভক্তিটুকু সঁপেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ’র পায়। আচার আচরণে তিনি বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেন না। স্নান করে গরদের শাড়ি পরে, সঙ্গে পুজোর ডালি নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি বেলুড় যেতে গিয়ে হঠাৎ কাদায় পা পিছলে পড়ে যান। কিন্তু ‘আহা’‘আহা’করে কেউ তার হাত ধরতে গেলেই তিনি সর সর বাসি কাপড়ে ছুঁয়ে দিস না’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।

আন্দুল-এর পুণ্যবতী মহিলা বিন্দিপিসি। তিনি বাহিরপানে চোখ’ না মেলে, ভিতরপানে চেয়েছেন। তবে, অন্তরের ভিতরে নয়, ঘরের ভিতরে – যেখানে তার রাধা আর কেষ্ট’র পিতিষ্ঠে। সঙ্গে পুজোর জন্য শিশিতে গঙ্গাজলও জমা আছে। তাহলে তিনি আর দূরে ‘তিথি’ করতে যাবেন কেন?

ওদিকে করালী নাকি বদলি হয়েছে কেরলে। কিন্তু কেরল সম্পর্কে সে কিছুই জানে । বন্ধুরা বলছে, করালী, /জায়গাতাে ভালই, খালি / কথা কিছু বুঝবিনা। আর/ খাদ্য  বটে মুখে দেওয়া ভার। নেগেটিভ ভােজটা একটু বেশি হয়ে গেল দেখে, তারা করালীকে সান্ত্বনা দিল, ‘তা, ওটুকু সইতেই হয়, বেরলে।

আমড়াগাছির রাম’রা জামতাড়া যাবে বলে আগের রাত থেকেই গােছগাছ শুরু করে। শুধু জিনিষপত্রকে নয়, মানুষজনকেও। কী নেবে ও কী নেবেনা, কাকেই বা নেবে আর কাকেই বা বাদ দেবে – এই নিয়ে তাদের ঘাের বিবাদ বাঁধে। বিবাদের ফলে মারপিট হয়। আর মারপিটের ফলে সবার গায় হ’ল দরদ।

হেলেদুলে রাস্তা দিয়ে চলেছেন বেচা পাল। বেশ সেজেগুজে। কিন্তু যাচ্ছেন কোথায়? যেতে যেতে বেচা ভাবছেন – কীসে যাবেন? -‘বাস। নাকি সােজা ট্রেন/ভাবছেন ভাবছেন।তারপর ‘দুচ্ছাই। অটোতেই/যাই -বলে উঠতেই/অটোওলা তেড়ে ওঠে। সে যাবে না বলে বেচাকে তার অটো থেকে নামিয়ে দেয়। অগত্যা বেচা পাল আবার রাস্তায়।

চট্টগ্রামে বাস করে যে চাপরাশি, তার নাম চিত্তচকোর  বলা হচ্ছে বটে চাপরাশি, কিন্তু তার পদবি পাকড়াশিও হতে পারে। অবশ্য অফিসঘরে তার কাজ চাপরাশির -ই । সে জল গড়িয়ে দেয়, ফাইল এনে দেয়। লােক না এলে পাংখাও টেনে দেয়।

আর সন্ধে হলেই  সে গিয়ে টুপ করে  পাশা বা তাসের আসরে বসে পড়ে।.  এবার লেখক তার আলােকবৃত্তে ধরেছেন একজন বুদ্ধিজীবীকে। উনি লে -ম্যান নন ।  রীতিমত ভাষণ দেন। সে ভাষণ শুনতে ঠাসা শ্রোতার ভিড় হয়।

মন, মাঝে মাঝে ফিচার লেখেন। তাতেও আগুনের ছটা। আর কী করতে হয় আকাশবাণী নয়তাে দূরদর্শনের ডাকে সেজেগুঁজে সাড়া দিতে হয়।

হন্নে হয়ে সঙ্গী খুঁজতে দেখা যাচ্ছে চন্দনকে। সে ডায়মণ্ডহারবার যাবে। সেখানে তার বিপল খাওয়াদাওয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু তার পকেটটি ঠনঠন। তাইতেনব্যাকুলভাবে তার সঙ্গী খোঁজা।

কোনও কিছু ঘটলেই আমরা সবসময় কারণ দেখাতে ভালােবাসি। আসলে তাতে একটু পাণ্ডিত্য দেখাবার সুযোেগ পাওয়া যায়। সে সুযােগটুকু আর হাতছাড়া করা কেন। কিন্তু সবসময় তাে আর সব কিছুর পিছনে কারণ থাকে না। তা কে শােনে কার কথা।

(দুই)

যেই দেখা গেল – ‘অনুতােষ আর মনােতােষ ভাল লােক দুজনেই’। ব্যস্, অমনি শুরু হয়ে গেল কারণ খোঁজা। নিশ্চয় ওরা দু’জন বন্ধু?

না, তা নয়। তাহলে নিশ্চয়ই ওরা এক পাড়ার ? না, তা-ও নয়। “অনু থাকে টালা/মনু থাকে টালিনালা। তাহলে? আর কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।… আসলে, কারণ ছাড়াও যে দু’জন মানুষ একরকম হতে পারে এই সহজ সত্যটা আমরা সবসময় মানতে চাই না। দু’চার ক্ষেত্রে কারণ পাওয়া যায় বলে, আমরা ধরে নিই সবক্ষেত্রেই কারণ থাকবে।

ওই যে যাচ্ছে রামদীন। পুরানাে গােয়ালা। কেউ বলতে পারবে না তার দুধে খুঁত আছে। শরীরে যদি যুৎ না থাকে, তাহলে এ দুধ ‘চো করে মেরে দিন এক গ্লাস।এবার শুয়ে যান। ব্যস্, সুস্থ হয়ে যান। দিন, এবার দামটা দিয়ে দিন – দুধেরই, তবে ওষুধ হিসেবে যা হয়, তাই।

ছড়াক্কাটি elimination-এর চমৎকার দৃষ্টান্ত।  বেচারা নরেন্দ্রবাবুর বাস্তুহ’ল নসীপুরে। তার শ্বশুরালয় আঁদুলে/গিনিটিও বাদুলে; গিয়ে থেকেই বর্ষা। ভরসা দেওয়ার জন্য শালারাও নেই। এই প্রতিকূলতার মধ্যে ব্যাপারটা কতদূর গড়াবে তা কেউ জানে না।

সেই যে আমাদের চেনা গন্ধমাদনবাহী হনুমান, সে এখন ‘হনুমন্ত সিং’ হয়ে গন্ধতে বেচে। তার লেজ খসে মাথায় সিং গজিয়েছে। আর তকদির কা খেল’-এর প্রভাবে, এখন যে কী পরিমাণ টাকা তা ভাবা যায় না।

ওদিকে অদৃষ্ট’র পরিহাসে আর এক বাবু, শুধু নামেই বিজিৎবাবু। তাঁর সারা জীবনে শুধু হার আর হার। ধূর্ত নিন্দুকরা তাকে লটারি কিংবা ফুটবল খেলায় জিতে দেখাতে বলে। কিন্তু বিজিৎবাবু জানেন, সব কথা কানে নিলে চলে না।

তাই তিনি হাসতে হাসতে -কী না বলে কূজনে। ভেবে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেন।রহারল ঘটনাক্রমে আর্মির মস্তবড়হাবিলদার হতেই’,তৎক্ষণাৎকাবুল যাওয়ার = পেল। সেই সঙ্গে ‘তখনই বিয়ে এবং বেতনবৃদ্ধি’ হাবুলদার : ‘লাক বলে কী লাক।

কী অদ্ভুত লাইফস্টাইল কসবার কাশীদাসের ! সে ঘুম থেকে উঠেই ডাবের সরবত আয়। মাঝে মাঝে আমিও খায়। আর আফিমের ফাঁকফোঁকোরে বিড়িও টানে। আর সন্ধে হলেই…বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেয়।

এবার শিবু সাঁপুই-এর আস্ফালনের কথা। সে যে-কোনও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, যদি তার বন্ধুটি সঙ্গে থাকে। তাই ‘শিবু সাঁপুই/একাই দুই। ফটাফট বােমাবাজি’ হল। আলাে অ হল। হতেই তার হম্বিতম্বি, থাকতাে দোস্ত/চিকেন রােস্ট/বানিয়ে ছাড়তুম।।

ফুলিয়ার ফুলু মুখুজ্জে খুব শৌখিন মানুষ। তাঁর ‘ফুল আর ফুলবড়ির’শখ। কিন্তু অভাব শুধু কড়ির। তাই চাকরির ধান্দায় তিনি গাইবান্দা গেলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ায় তার হিতে বিপরীত হল। কারণ বিদেশে যে খরচা গুচ্ছের।

মুম্বাইয়ের হীরাে বাম্বা খান ভিলেনকে জ্ঞান দেন, ‘হীরাে হতে চাও না জী?/দমসে খাও পাওভাজি। তিনি নিজেও রােজ তাই-ইখান। এবং এইভাবেই তিনি হীরো হয়েছেন।

দার্জিলিঙের চন্দ্রাই দরজে শিলিগুড়ি আসছেন। তার মালদা যাওয়ারও পরিকল্পনা। কিন্তু ট্রেন ফেল করছেন। প্লাটফর্মে রাত কাটাতে হচ্ছে বলে, নিজের দোষ অন্য’র ঘাড়ে চাপিয়ে মাঝে মাঝেই গর্জে উঠছেন।।

টুকরাে কাঁচেও তাে প্রতিফলন ঘটে। এক ছবি-আঁকিয়ে তাঁর চ্যালাগণকে নিয়ে চাইবাসা গেছেন। চতুর্দিকে তাকিয়ে তারা বলে ওঠেন –“উঃকসীন।/তুলনাবিহীন। বলেই তারা ক্যামেরায় ছবি তুলতে শুরু করে দেন।  তারপাশার শ্রীমতী জয়কালী/ সেদিন স্টীমারে চেপে চারপাশের জল দেখে ক্ষেপে ওঠেন। তার পা দুটো টলমল করে উঠল। যাত্রীরা কেউ তাঁকে ধরছে না দেখে তিনি রেগে উঠলেন।

এক বক্তা ‘গিয়েছিলুম কামাসকটিকায়’বলতে এক শ্রোতা বলে উঠলেন, বলেন কী মশায়,/সে যে মশায় মশায়/একেবারে আচ্ছন্ন এক দেশ। ওই মকিটোর দেশে তিনি কেন যেতে গেলেন তা ভেবেই শ্রোতা অবাক।

শান্তবাবু অত্যন্ত প্রাগম্যাটিক মানুষ। তার বাস্তব উপদেশ – লেখাপড়ায় মন দাও, শান্তশিষ্ট থেকো’ আর ‘দুগ্ধ কর সেবন। এবং তারপর পরীক্ষা পাশ দিয়ে/চাকরি কর গিয়ে। এ সবের পর, সাহিত্য বা ধম্মেকম্মাে’ যে যা করে করুক, তার কোনও আপত্তি নেই।

তিন

আমজনতা মােটের উপর গড়পড়তা একইরকম হয়ে থাকে। রাম, শ্যাম, যদু, মধু আম আহার – সবার বাডিই গাঁ’এর দিকে। সবার গায়ই চাদর। একই রকমের চুল। অহরকমের পােশাক।

সব একরকম। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে বৈচিত্র্য’র বড়ই অভাব। ইচ্ছেময় এবং ইচ্ছেময়ী’ – বাবা আর মা। দুই দেব দেবী’। একজন দেন খাবার/আর একজনে ভাবার সময় দেন না, ধরিয়ে দেন খাতা আর বই।দু’জনের মধ্যে এটাইতফাৎ।

এবার এক উদাসীন বাবা। তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। কিন্তু তারা থাকে কোথাও কোন ক্লাস ফোর না ফাইভ পাশ? কী খায় দুপুরে? রাতে? মাদুরে শােয়? না খাটে?’ বাবাকে এসব প্রশ্ন করা বৃথা। কারণ, কেউ জিগ্যেস করলে, তিনি বলেন, “নিজেই কি জানি ছাই ?’

কবির কণ্ঠ থেকে বিদ্রুপ ঝরে পড়ে, যখন তিনি বলেন, শরৎকুমার চৌধুরী , লেখিকা’হলে কী হবে, তার লেখা পড়ার কোনও পাঠক নেই। কেননা ‘সামনেই/বি মডেলগণের বাণী।

আজকাল মানুষের চোখ সব থেকে বেশি টানে বিজ্ঞাপন। কবি যে কথা বলেছিলেনশঙ্খ ঘােষ ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, সেই কথাটাই এভাবে বলছেন দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ছড়াক্কাতে।

কোনও কোনও ছড়াক্কায় আবার বিরক্তি ঢেলে দিয়েছেন কবি। প্রকাশের ভঙ্গিটা অবশ্য সােজাসুজি নয়। ধাঁধার আকারে। প্রকাণ্ড এক – বল তাে কী ?/পুজোর ঢাক? পাঞ্জাব ট্রাক?/শপিংমল ?/টকিং ডল?/কিংবা এই যে ফালতু বকাবকি? একে তাে এই বকাবকি ফালতু, তায় আবার এর কোনও শেষ নেই। ঠেকে, পথের মােড়ে, বেতারে, চ্যানেলে-চ্যানেলে –এ বকাবকি চলছে তাে চলছেই।

আবার কোনও কোনও ছড়াক্কায় প্রকাশ পেয়েছে কবির বেদনাও। তেমন একটি ছড়াক্কা -বামপার্টির হরেকৃষ্ণ কোনার।/বড় দরের নেতা।/সমস্ত ভােট জেতা/যাঁরা তাঁর পুত্রবৎ/সব্বার নাকে খৎ/ হারা এবং হারা, দেখ নাম ডােবালেন ওনার। কতটা আঘাত পেলে এমন লেখা বেরিয়ে আসে তা সহজেই অনুমেয়।

কবির ছড়াক্কাতেও ভােলাবাজের থাবা। পাঁশনে গ্রামের সর্বদমন সাউ/সবার সন্ত্রাস/কেউ ঘেঁষে না পাশ/ দূর দিয়ে গেলেও/সেলাম ঠুকে যেও/ভেট যদি না পায়, তাহলেই হাঁউ-মাউ-খাউ। এভাবেই তার সব কিছু দমন। চলুন, আমরা তাড়াতাড়ি দূরে সরে পড়ি।

আমরা জানি মজার ছলে কোনও সত্যি কথা বললে, তার গ্রহণযােগ্যতা বেড়ে যায়। ‘মস্ত মানুষ গান্ধী বা সুভাষ বােস/ফুচকা খাননি; খেলে/ঢুকতেনই না জেলে। রাস্তার মােড়ে দাঁড়িয়ে যারা জটলা করে মহা আনন্দে তেঁতুলজল খান, তাদের ঝুঁকিহীন সহজ ও উপভােগসর্বস্ব জীবনে জেলখানা ঢােকার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

এবার কলকাতা সাহিত্য-উৎসবের একটু কথা…। সেখানে শ্রোতার সংখ্যা কেমন হয়? শােনা যাক স্বয়ং কবির মুখেই – ‘সরগরম শিশু-কিশাের মহােৎসব।/ ছড়া গান  গল্পপাঠ । শিল্পী-সংখ্যা একশাে আট। নাট্য নাচআর পাপেট-শাে / শিল্পী-সংখ্যা কম” । এক ‘হল’ চেয়ার – দেখছে এবং গিলছে সব। হল’ ভর্তি ঠিকই তবে মাগু। চেয়ারে।

সমস্তিপুরের সমস্তই ভাল লাগে মানিকের। গাছে কেমন ভঁাশা পাকা পেন লােকগুলাে বেজায় বেয়াড়া। কারণ দুটো পেয়ারা পাড়লেই অমনিপিতে গালমন্দও শুনতে হয় – অতিশয় খাণ্ডার গলায়। সেই সঙ্গে ওখানকার ” তৎপর। এমন জায়গা মানিকের কেমন লাগবে – তা সহজেই অনুমেয়।

পঠে ডাণ্ডা পড়ে। ওখানকার পুলিশও অত্যন্ত কবি মহা সমারােহে পাটনা যাচ্ছেন সঙ্গে পিসি,তার বোঁচকা-কুঁচকি, সেলাইমেশিন, লটবহর – তাও হল বাঁধাঘঁদা i/ এবার দোরে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সিকে সাধা। স্টেশনে ছেই তিনি কুলি জোগাড় করলেন। সবই হল, কিন্তু ট্রেন ফেল, আর মালসমেত  কুলিও ‘missing’!

ছন্দে কেউ কথা বললে, দু-একবার হয়তাে শুনতে ভালাে লাগে, কিন্তু কতক্ষণ কে ৯তে পারে। তাই বৃন্দাবনের বৃন্দা দূতীকে রাই থামতে বলে। বৃদা সে নিষেধ তে

নেনই না, উল্টে মাইক ভাড়া করে মস্ত পালা পড়তে শুরু করেন। কে এই বৃন্দাদূত – ভাববার।

মহেশতলার সুবল মাহাতাের টাকা দেদার/ধারেন না ধার। চাষ-জমিরও কোনও কমতি নেই। তবু তার চলায় বাধা। কারণ তার পা ভাঙা। আহারে!

চার

অন্নদাশংকর রায় একবার তার ছড়ায় মশার উপদ্রবে দেশান্তরী হওয়ার কথা আমাদের জানিয়েছিলেন। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ও আমাদের কাছে ছড়াক্কায় বলেছেন মশার দৌরাত্ম্যর কথা। গ্রামের নাম গজা/ছায়ানিবিড় তার পুকুরের পাড়/…উফ্! মশাদের মজা !

এমন হাড়-কাঁপানাে ঠাণ্ডা পড়েছে যে লেপ-কাড়াকাড়ি অবস্থা। তেমন একটা সময়, ‘ভাবছেন নিমাই আশ/যাবেন ভিসুভিয়াস। কিন্তু Volcano তে পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, তিনি হােটেল পেলে, অগত্যা কালাহারি যেতেই প্রস্তুত।

ট্রেন-ফেল করা হাবড়ার হরেরাম সরখেলের একটি নিত্য-নৈমিত্তিক প্রিয় অভ্যাস। তাই বলে, ট্রেন ধরতে তিনি চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেন না। আজও ‘দাড়ি কামিয়ে/হাঁড়ি নামিয়ে/ভাত আনাজ/টু পিস মাছ / গলায় গলিয়ে দৌড়।/ আজও ট্রেন ফেল।

এইসব হরেরাম সরখেলের মতাে অম্লমধুর মানুষদেরই আমরা বেশি দেখতে পাই দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছড়াক্কায়। দেখতে পাই – যাজপুরের উৎকলিয়া পাণ্ডা শ্রীগদাধর, আমুগার দামুদার ছুতাের, পাটনার শিউনন্দন গােয়ালা, হরিরামপুরের হরেরাম, রহমতপুরের শেখ রহমত, বাসবাড়ির রাজেন বর্মা, তেঘরিয়ার তিনকড়ি ত্রিবেদী, মদন, হরিহর আর নরহরি (দুই ভাই), নটবর ভূঁই(যার কাজ টিকিট কাটা), গুপেদা আরও অজস্র বিঘুটে চরিত্র’র মানুষজনকে।

খেতে কে না ভালােবাসে। আমরাও বাসি। তাই ছড়াক্কায় খাদ্যরসিক চরিত্র পেলে আমাদের একটু বেশি ভালাে লাগে। ওই তাে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। প্রথমে ভােজপুরের উজু।

ভজুর ভােজন যে ঈষৎ গুরু, তা তার ওজন দেখলেই বােঝা যায়। শুধু ওজনই নয়, তার আকারেও সেটা অতিশয় স্পষ্ট। কেবল ‘ঘরটা বড় হলে’আর ‘কটি মজুর’লাগালে, সে অনায়াসেই ভিতরে গলে যেতে পারে।

ভজুর সঙ্গে ছাতিনাবাদের পহলবান সন্তুসিং’কেও পাঠক এসে একদিন দেখে যেতে পারেন। তিনি ছাতু মেখে খান। আর টপাটপ ‘মিরচি দাঁতে কেটে/ গলিয়ে দিচ্ছেন পেটে।

খিদে মেটে  চার প্লেট কাটলেটে। সঙ্গে শালকের শিবশংকর। তার বিকেলের খিদে মেটে । চার পেট আরও চাই/ পাঁচ ছ’টা চিকেন ফ্রাই / শেষে ছ”কাপ চা পরপর।’ নামের বলেই কি এই ডবল পরিমাণ খাওয়া ? কে জানে!

ভজগােবিন্দ, ভজুয়া আর ভােজরাজা তিন ভাই। তিনজনই বোন।সকালে ডবল ডিমের পােচ’, ‘দুপুরে এলাহি এক ভােজ’এবং বিকেলে নই, সবই, বলাবাহুল্য, ফাদার্স কেবিন’-এ।

যেতে যেতে কবির চোখে পড়ল ‘হাইওয়ের পাশেই বাবা। সাইনবোর্ডেকে। – ‘চাইনীজ মােগলাই / লস্যি, কফি, চা-য় | লেখা তাে নয়, ডাকা।  যায় কি স্থির থাকা ?/ তার উপর ভুরভুর রান্নার হাবা। লেখা তাে নয়, ডাকা’ – এই একটি ছােট লাইনই কবির ভােজনপ্রিয়তাকে বুঝতে আমাদের প্রভূত সাহায্য করে।

সব শেষে বলি, বিখ্যাত ছােট বকুলপুর গাঁ-এর কথা। ওখানে ‘ডাঙায় পাঁঠা, পুকুরে হাঁস,/গােয়ালে গরু, উঠোনে ঘাস’। সেইসঙ্গে হাটে ভর্তি সবজি তরতাজা,/হেঁসেলেও হচ্ছে মাছভাজা। এরপরেও কি কোনও ভােজনরসিকের পক্ষে আর স্থির থাকা সম্ভব ?

হ্যাঁ, প্রিয় কবিও আমাদের কাছে প্রস্তাব রেখেছেন, ‘চলুন না যাই একবার পায়ে পায়ে। | বেশ তাে পাঠক, চলুন আমরাও যাই। ওখানে গেলে পাঁঠা, হাঁস, গােরু ও তরতা সবজির সঙ্গে আমরা কবির হাতের তৈরি সুস্বাদু আরও কিছু ছড়াকাও পেয়ে যেতে পারি।

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *