নামহীন প্রিয় // অভ্র ঘোষাল

1250

ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনিটা তুলে দেয় তুলিকা । ঘরে স্রেফ একটা হলুদ বাতি জ্বলছে টিমটিম করে। তুলিকার গা থেকে ভেসে আসে দামী সুগন্ধীর সৌরভ, চোখে কাজলের গাঢ় রেখা, ঠোঁটে লাল lipstick আর পড়নে শরীরের ভাঁজ প্রদর্শনকারী প্রায় অদৃশ‌্য সুতোর আচ্ছাদন।

এই ধরনে সাজগোজে অভ‌্যস্ত হয়ে উঠেছে ও এখন। ঘরের এক কোণায় থাকা খাটে বসে আছে T-shirt আর jeans পরিহিত একটি ছেলে। তার বয়স আন্দাজ কুড়ি কিংবা বাইশ। এখন আর অসুবিধা হয় না তুলিকার এই “খদ্দের”দের বয়স পড়ে ফেলতে। বছর একত্রিশ বয়স হবে ওর। তেরোটা বছর এই লাইনে আছে ও; শরীরের ভাঁজ দেখিয়ে এক হাতে ইজ্জতের গলা টিপে আরেক হাতে টাকা গুণতে শিখতে হয়েছে ওকে।

ছেলেটি ওকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো আর নিমেষের মধ‌্যে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো তুলিকা-কে। তার জড়িয়ে ধরা ইস্তক তুলিকা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ওর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসত লাগলো। এরকম কোনও কিছু তো আগে কোনও দিন অনুভূত করেনি ও। ছেলেটি এবার ওর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে থাকলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে;তুলিকার পা আর নড়লো না সেখান থেকে।

রাতের সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে বাইরে কয়েকটা রাতপাখি ডেকে উঠলো। এমন কেন হচ্ছে তুলিকার মনের মধ‌্যে? আগে তো এরকম কিছু কেউ করেনি ওর সাথে! এই আলিঙ্গনটা যেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ এক ধরনের আলিঙ্গন। এই আলিঙ্গনে নেই যৌনতৃষ্ণা, নেই লোভ, নেই লালসা। ছেলেটিকে ধরে সামনে দাঁড় করালো তুলিকা। এবার যেন চিনতে পারলো আরও ভালো ভাবে।

একে তো ও প্রায়ই ঘুরতে দেখেছে এই কয়েক সপ্তাহ যাবৎ এই পল্লীতে। নীচে দাঁড়িয়ে ওরই দিকে তাকিয়ে থাকতো প্রায়ই। নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তুলিকা। ছেলেটির চোখ দুটো সাঙ্ঘাতিক মায়াবী মনে হলো ওর। এই চাহনিতে কোনও লোভ খুঁজে পেলো না তুলিকা। চোখ দুটো যেন কতো কথা বলতে চাইছে তুলিকা-কে! তুলিকা বুঝলো ও কিছু বলার ভাষা পাচ্ছে না।

ছেলেটার পাতলা দাড়িময় গালে হাত রাখে তুলিকা।ছেলেটা ধরা গলায় বললো, “প্রত‌্যেকটা দিন চেষ্টায় থাকতাম কখন তোমার দেখা পাবো! মাসি-কে বলে অনেক কষ্টে তোমার সাথে দেখা করতে পেরেছি আজ। নিজের গিটারটা বিক্রি করে দিয়েছি টাকা জোগাড় করার জন‌্যে। আজ আমি খুব খুশি তুলিকা! তোমাকে কাছে পেয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে ! আমি তোমাকে ভালোবাসি তুলিকা… “

আবার কেঁদে ওঠে ছেলেটা,গলা ধরে আসে ওর। তুলিকা ততোক্ষণে হারিয়ে গিয়েছে অন‌্য এক দুনিয়ায় ! এই সমস্ত কী শুনছে সে! এই সব স্বপ্ন নাকি সত‌্যি! চোখে জল আসে ওর, এতো বছরের এতো লোলুপ দৃষ্টি শিকার হয়ে শক্ত হয়ে ওঠা ওর মন নিমেষেই যেন বিগলিত হয়ে যায় এই আগন্তুকের ভালোবাসার স্পর্শে !

এও কি সম্ভব! রাতের মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে দুটো প্রাণ, দু-জোড়া চোখ এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে পরস্পরের দিকে। সব কিছু ভুলে গিয়ে অদ্ভুত এক মোহে এবার ছেলেটিকে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরে তুলিকা। তখনও ও ছেলেটার নাম জানে না, পরিচয় জানে না ! অথচ, এই কয়েক মুহূর্তেই এই নামহীন ছেলেটাই যেন হয়ে উঠলো ওর পরমাত্মা।

সমস্ত “সামাজিকতা”-র ঊর্ধ্বে ভালোবাসার সাম‌্যবাদই প্রকট হয়ে উঠলো সেই শহুরে যৌনপল্লীর অন্ধকারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: