পরিহাস

রঞ্জিত বণিক

গত কয়েকদিন ধরে অবিনাশ কলেজে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বেরােচ্ছে, কিন্তু কলেজে যাচ্ছেনা। সারাদিন এই অফিস সেই অফিসঘুরে ঘুরে একটা চাকরির খোঁজ করছে। তার একটা চাকরির খুব প্রয়ােজন।

বাবা যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন, রাজনীতির কারণে সেই কোম্পানি এই রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে গেল। যাওয়ার সময় স্থানীয় কর্মচারীদের এককালীন কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় সারল।  অবিনাশ এখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র।

আর মাস ছয়েক পরেই তার ফাইনাল পরীক্ষা।  বাবা বলেছিলেন, যা টাকা হাতে পেয়েছি, তাের পরীক্ষা পর্যন্ত চালিয়ে নিতে পারব। চিন্তা করিস না।

কিন্তু অবিনাশ মুখে কিছু না বললেও মনে মনে স্থির করে ফেলেছে, তাকে যেমন করেই হােক, একটা চাকরি পেতেই হবে। বাবার উপর সম্পূর্ণ ভরসা করা উচিত হবে না।

বাজারের এখন সবকিছুই অগ্নিমূল্য। দিন দিন সংসারের খরচ বেড়েই চলেছে। বাবার হাতে যেটুকু সম্বল, তাতে মাস-তিনেকও চলবে কিনা সন্দেহ।

সকাল থেকে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল অবিনাশ। এখন বিকেল। সারাদিন কিছু * খাওয়া হয়নি। ফুটপাথে একটা চা’র দোকান দেখতে পেয়ে এক ভড় চা দিয়ে গলাটা ..ভিজিয়ে নিল। 

নিজের হাত-খরচ চালাবার জন্য সন্ধেবেলা পাড়ার দুটো বাড়িতে টিউশন পড়ায় সে। সন্ধে হতে এখনও দেরি আছে। দেখল কাছেই একটা ছােট পার্ক। বসার জন্য কাঠের বেঞ্চি।

তাই পার্কে ঢুকে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ল। আশেপাশে কেউ নেই দেখে পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরাল।। . ভাবছিল আজকের দিনটাও বৃথা গেল।

কোনও কাজ হল না। একটা যেমন-তেমন | চাকরি তাকে পেতেই হবে। যদি একটা পিওন-টিওনের চাকরিও পেয়ে যায়, সে করতে রাজি।  -আরে, অবিনাশদা, তুমি এখানে ?

হঠাৎ চমক ভেঙে সে দেখল, সামনে সুজাতা। তাদের কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। তার মুখে একটা মৃদু হাসি। ভ্র-দুটো ঈষৎকুঞ্চিত করে জিজ্ঞাসা করল – তােমার কি শরীর খারাপ ? কয়েক দিন হ’ল তুমি কলেজে আসছ না যে!

অবিনাশ -না, আসলে আমার কিছু জরুরি কাজ ছিল। তাই যেতে পারিনি। কিন্তু তুমি এখানে?  -ওই যে লাল দোতলা বাড়িটা দেখছ, ওটাই আমাদের বাড়ি। চলাে না।

তােমাকে দেখলে আমার বাবা খুব খুশি হবে।  অবিনাশ একটু ইতস্তত করছিল। কিন্তু সুজাতা এমন করে ধরে বসল, সে আপত্তি করতে পারল না।

বাড়িতে ঢুকতেই একটা বিশাল ড্রয়িং রুম। সােফায় বসে মধ্যবয়স্ক সৌম্য চেহারার এক ভদ্রলােক নিবিষ্ট মনে বই পড়ছিলেন।

সুজাতা আলাপ করিয়ে দিল – বাবা, আমাদের কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক অবিনাশদা।

-আরে বােসাে, দাঁড়িয়ে আছাে কেন? সুজাতা বলছিল তােমার কথা। সে একটা গল্প লিখেছে। তােমাদের কলেজ ম্যাগাজিনে দিতে চায়। তার বিশ্বাস, তুমি একবার দেখলেই নাকি সিলেক্ট করে ফেলবে।

সুজাতা বলল – বাবা, আমি অবিনাশদাকে উপরে আমার ঘরে নিয়ে যাই। গল্পটা পড়ে শােনাব।

-আচ্ছা ঠিক আছে।  

গল্পটা শুনে অবিনাশ বলল – লেখাটার একটা কপি আমাকে দিও। বেশ ভালাে হয়েছে। তবে দু-এক জায়গায় সামান্য এডিট করার প্রয়ােজন আছে। সে আমি করে নেব।

সুজাতার মুখ-চোখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল –বাবা শুনলে খুব খুশি হবে। চলাে, নীচে যাই।

ইতিমধ্যে সুজাতার মা লুচি আর আলুর দম টেবিলে সাজিয়ে দিয়েছেন। বললেন – তােমরা সবাই এসাে। গরম গরম খেয়ে নাও।

অবিনাশদু’খানা লুচি খেয়ে উঠব উঠবকরছে, সুজাতার মা বললেন – আরও দুটো লুচি নাওঁ।

– না মাসিমা। আর পারব না।

সুজাতার বাবা বললেন – অবিনাশ, তুমি তাে এখন থার্ড ইয়ার। কলেজ থেকে বেরিয়ে তারপর কি করবে ভেবেছাে?

–আমার ইচ্ছে পােস্ট-গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করে কোনও কলেজে প্রফেসারি করব। | বাঃ! আজকাল সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু, তুমি দেখছি

ব্যতিক্রম। ভালাে লাগল।

– আচ্ছা মেসোমশাই, আমি আজ আসি।

-ও হ্যা, ভালাে কথা। আমাদের অফিসে একজন ক্লারিকাল স্টাফ চাই। কিন্তু বিশ্বস্ত কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি যদি এ ব্যাপারে একটু সাহায্য করাে, ভালাে হয়।

– আচ্ছা মেলােমশাই। . রাস্তায় বেরিয়ে পকেটে হাত দিল অবিনাশ। সিগারেট নেই। ফুরিয়ে গেছে।

 

 

 

 

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *