প্রত্যাবর্তন – সুরজিৎ গুপ্ত

 

স্ট্রেইট করা চুল। রোদ চশমাটা মাথায় গুঁজে রাখা।পরনে পোলকা ডটের সাদা স্লীভলেস টপ।গলার কাছে টপের লাগাতে ভুলে যাওয়া দুটি বোতাম।তৃতীয়টি আলগোছে  বিভাজিকার প্রান্তদেশে লাগান, যে কোনো সময়ে স্বাধীনতা লাভের অপেক্ষায় ।

ডেনিম ব্লু কালারের থ্রী কোয়ার্টার জিন্স।এক পায়ের গোড়ালির ওপর এক টুকরো কালো কার জড়ান।কপালের এক কোনে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বর্ষাকালের সুর্য্যের মতন একটুখানি সিঁদুরের ছোঁয়া, সহজে দৃশ্যমান নয়।

কানে কাঁধ অব্ধি নেমে আসা লম্বা চেন।গায়ের ত্বক আমুল বাটারকেও লজ্জা দেবে।সুতনু দেহবল্লরী, কোথাও বিশেষ অধিক মেদ নেই। ওষ্ঠ দুটিতে ন্যাচারাল লিপস্টিকের প্রয়োগ ঔজ্জ্বল্যতা বাড়িয়েছে। গায়ে হালকা ফুরফুরে ফরাসি কোলোনের গন্ধ।

 

নাম মল্লিকা মিত্র। বয়েস অননুমেয় । মল্লিকা এখন গড়িয়াহাট বাজারে একটা ব্লাউজের দোকানে শপিংএ ব্যাস্ত।

একটা বোটনেক ব্লাউজ নেবেন।দোকানদার ছেলেটি অল্প বয়স্ক।সব খদ্দের ছেড়ে মল্লিকাকে এটা সেটা দেখাচ্ছে উৎসাহের সঙ্গে। মল্লিকার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। স্টকে আছে কিন্তু ছেলেটা বার করতে চাইছে না।

অন্য কিছু নিয়ে আসছে।ম্যাডামের গা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে, ওর খুব ভাল লাগছে সেটা তার ওপর ম্যাডামের দাক্ষিণ্যে চোখের শান্তিটাও তো হচ্ছে। আর তা ছাড়া এইরকম একজন গ্ল্যামারাস খদ্দের দোকানে থাকলে খদ্দের বৃদ্ধির সম্ভাবনা। হ্যাঁ, তা নেই নেই করে দোকানটা এবার ভরে গেছে খদ্দেরে।

আশেপাশের দু একজন নতুন লোক এবার মল্লিকার দিকে আড়চোখে চেয়ে নিচ্ছে। মল্লিকা খুব এনজয় করছেন ব্যাপারটা ।এবার বললেন ” ভাই এসিটা একটু বাড়িয়ে দিন তো, বেশ গরম লাগছে।”

 

মল্লিকা ব্যাগ থেকে একটা ওয়েট টিস্যু পেপার বার করে মুখটা আর গলার কাছটা একটু মুছে নিলেন। দু একটা কৌতুহলী চোখ নজর রাখছে, মল্লিকার সেটা দৃষ্টি এড়াল না।বেশ ভাল লাগছে।অবশেষে ব্লাউজটা পাওয়া গেল। প্যাকেট আর বিলটা নিয়ে দাম মিটিয়ে দিতে ছেলেটা বলল ” আবার আসবেন দিদি”।

মল্লিকা হেসে আশ্বাস দিয়ে বেরোলেন। এই গড়িয়াহাট মার্কেটটা এখন মল্লিকার হন্টিং প্লেস। ঘরে বসে বসে বোর হওয়ার চেয়ে এই ভাল। কত কি যে জিনিস পাওয়া যায় এখানকার দোকানগুলোতে। ঘরে বসে বসে হোয়াটসএ্যাপ ঘাঁটা আর ফেসবুকের যত ট্র‍্যাশ লেখা  পড়া।

আগে তবু ভাল লাগত এখন এত একঘেয়ে হয়ে গেছে যে আর হাত দিতেই ইচ্ছে করে না। তার থেকে এ ভাল, দোকান দোকান ঘোরো, কেনো না কেনো, কেউ জিজ্ঞেসও করবে না।

 

এবার একটা পালাজো কিনতে হবে। দু একটা দোকান ঘুরে পেয়ে গেলেন। কালো রঙের। অফ হোয়াইট টপটার সঙ্গে দারুন যাবে। সামনের ফুট থেকে একটা ম্যাচিং দুল কিনলেন। রাতে মাদু’র অফিসে ডিনার পার্টি আছে। আজকের মত শপিং সেরে ফিরলেন মল্লিকা। মাদু’র ফিরতে দেরি আছে।

ততক্ষনে একটা ব্ল্যাক কফি বানিয়ে বসলেন।অনিচ্ছায় ফেসবুকটা একবার খুলতেই হাজির হল মল্লিকার দুবছর আগের  এই দিনে পোষ্ট করা একটা ছবি। মল্লিকা ভাল করে দেখলেন নিজের ছবিটা ।নিপাট আটপৌরে এক গৃহবধুর ছবি।

নিজেকে গত কয়েক মাসে আমুল পালটে ফেলেছেন তিনি। দুবছর আগের সেই ছবির সঙ্গে এখনকার মল্লিকার কোন মিল নেই। বিনুনি বাঁধা চুল এখন সপাট সোজা। গায়ে যে হাল্কা মেদ জমে ছিল সেটা ঝরিয়ে ফেলেছেন।শাড়ি ছেড়ে এখন টপ, পালাজো, জিন্সে ভর করেছেন।সব মিলিয়ে এক চুড়ান্ত মেকওভার করে ফেলেছেন বলা যায়।

 

অথচ এই মল্লিকা কি এরকম ছিলেন ? সুন্দরী ছিলেন বটে। এক রক্ষনশীল ঘর থেকে এসে কলেজে ভর্তি হয়ে কলেজ লাইফটা একরকম গুটিয়েই কাটিয়েছিলেন। বহু রূপমুগ্ধকারীর দল পিছনে ঘুরঘুর করেছে। সে সব বাঁচিয়ে পাশ করার পর ভাল মেয়ের মত অভিভাবকদের ঠিক করা বিয়েতে সম্মত হয়েছিলেন।

তথাকথিত ভাল ছেলে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে উচ্চপদে কর্মরত , হ্যান্ডসাম মধুকর মিত্রের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলেন।আর বিয়ের এক বছরের মধ্যেই বাবাইয়ের মা হলেন।তারপর বাবাইকে কোলেপিঠে করে বড় করা, ওর পড়াশোনা, স্কুল, টিউশন, কম্পিটিটিভ এক্সাম, কলেজে ভর্তি  এইসব নিয়ে পুরো নিটোল একজন গৃহবধুর বৃত্ত থেকে বেরোতে পারেন নি কোনদিনই ।

 

এখন মল্লিকার অখন্ড অবসর। মাদু সকালে ব্রেকফাস্ট করে অফিসে বেরিয়ে যায়। অফিসে ভাল সাবসিডাইজড ক্যান্টিন আছে।এর পর নিজের জন্য যৎসামান্য রান্না করতে যে টুকু সময় লাগে। বাবাইয়ের সঙ্গে সকাল সন্ধ্যে দু একবার কথা হয়৷ বাবাইয়ের এটা ফোর্থ ইয়ার। ক্যাম্পাসিং হয়ে গেছে।

পরীক্ষা শেষ হলে চাকরিতে জয়েন করার আগে এখানে ঘুরে যাবার কথা আছে। গত সাত আট মাস মা বাবার সঙ্গে দেখা হয় নি ছেলের। দুপুরের পর থেকে মল্লিকার সময় কাটে না। মল্লিকা ভাবলেন যদি এই বৃত্তের বাইরে বেরোন যায়, কেমন হবে?  দুপুরবেলাটা ঘরে বসে ভাত ঘুম দেওয়ার চাইতে ঘুরে বেড়ালে সময় কাটবে সঙ্গে শরীরটাও ঠিক রাখা যাবে।

সেই গড়িয়াহাটে কিছু দরকারী জিনিষ কিনতে গিয়ে একদিন সাহ্স করে কিনে ফেললেন একটা টপ আর জিন্স। আশেপাশের অনেককে পরতে দেখে খুব শখ হয়েছিল। আজকাল অনেকেই পরছে।আগে ঘরেই পরে দেখবেন।কিন্ত মাদু কি ভাবে নেবে ভেবে ইতস্তত করছিলেন।

পরে একবার ট্রায়াল দিতে গিয়ে মাদু’র সামনে হাজির হলেন। মধুকর মিত্র, নিজের বয়সটা ধরে রাখতে পারেন নি। ইদানীং অফিসে বেশ চর্বিতচরন করে একটু ভুঁড়ি গজিয়েছে। টাকও পড়ছে ধীরে ধীরে।ওই রূপে মল্লিকাকে দেখে সোফা থেকে সোজা দাঁড়িয়ে পড়লেন

 

” আহা করেছো কি মলি ! দিস ইস হোয়াট আই ওয়ান্ট। ওহঃ,দারুন লাগছে কিন্তু। ইউ আর লুকিং লাইক আ কলেজ গার্ল ।আহা, আমি যদি এভাবে যৌবন ফিরে পেতাম!”

 

মল্লিকা বললেন

 

” ফ্লার্টারি কোর না মাদু প্লীজ। সত্যি করে বলো না কেমন লাগছে। কোনদিনও পরি নি এসব।”

 

মধুকর ততক্ষনে গুনগুন করে গান ধরেছেন

 

” আমার মল্লিকা বনে

যখন প্রথম ধরেছে কলি…”

 

” মাদু, প্লীজ বলো না, সবসময় ইয়ার্কি ভালো লাগে না। তাহলে আমি আর এই ড্রেস কখনো পরবো না”

 

” এইইই, মলি প্লীজ , ঠাট্টা করছিলাম। দাঁড়াও দাঁড়াও কটা ছবি তুলে নিই।”

 

মধুকর ফটাফট মোবাইলে ছবি তুলছেন।

 

” ওহঃ, মলি, ইউ আর লুকিং সো গ্রেট, এবার আমার অফিসের পার্টিতে কিন্ত এইরকম ড্রেস পরে যেতে হবে।”

 

সেই শুরু, তারপর মধুকরের প্রচ্ছন্ন মদতে মল্লিকা পাল্টাতে শুরু করলেন। আরো কয়েক প্রস্থ ড্রেস কেনা হল। চুলটা স্ট্রেইট করালেন। মাদুর অফিসের পার্টিতে প্রথমে চেনা পরিচিতরা প্রথমে একটু অবাক হলেও  পরক্ষনেই বলতে লাগল

 

” মল্লিকা সো নাইস, ড্রেসটা তোমায় যা মানাচ্ছে না, লুকিং ভেরি ব্রাইট! “

 

” লুকিং সো ইয়াংগ মল্লিকা , ইউ জাস্ট গান এগেন্সট দ্য এজ ! “

 

” মল্লিকা! সো গ্রেট, বয়সকে হার মানিয়েছ, খুব ভালো লাগছে ! “

 

এইসব কমেন্টস উড়ে এলো।মল্লিকার ভালো লাগতে লাগল। হয়ত মনের কোনো কোনে ইচ্ছেটা লুকিয়ে ছিল। আজকালকার মেয়েরা কি সুন্দর টপ, কুর্তি, জিন্স, ক্যাপ্রি ক্যাজুয়ালি পরে , খুব খারাপ তো লাগে না।

অনেক বয়স্করাও পরছে। চোখে সয়ে এসেছে। বেমানান কিছু লাগে না। মল্লিকার কলেজ লাইফে শুধ সালোয়ার কামিজের চল ছিল তাও সবাই পরত না।এখন মল্লিকার বাধো বাধো ভাবটাও গেছে। বেশ ভালভাবেই ক্যারি করলেন।যেটা সব চেয়ে ভয় ছিল আত্মীয় স্বজনদের মন্তব্য, সেটা কিন্ত বিশেষ কিছু ভয়াবহ হয় নি।

 

ফেসবুকের ছবিটার দিকে তাকিয়ে এইসব ভাবতে ভাবতে মল্লিকার হঠাৎ মনে হল, তার প্রোফাইল পিকচারটা পাল্টালে কেমন হয়৷ ? খুঁজে পেতে একটা সদ্য তোলা ছবি লাগাতে গিয়ে ভাবলেন  আগে একটা নতুন হোয়াটসএ্যপ একাউন্ট খুলে তাতে ছবিটা দিয়ে সবাইকে একটা চমক দেবেন। ভেবে ভেবে নতু্নত্ব আনার জন্য নাম দিলেন একাউন্টটার “চন্দ্রমল্লিকা–বন্ধু আমি”!

শীতকালে বাগানভরা চন্দমল্লিকা ফোটার দিনে জন্মেছিলেন বলে ছোটবেলায় দাদু নাম রেখেছিলেন চন্দ্রমল্লিকা । পরে স্কুলে ভর্তির সময় বানান বিভ্রাট হবে ভেবে বাবা নামটা ছোট করে দিয়েছিলেন। কি রিএকশন হয় দেখা যাক।

নতুন একটা মোবাইল নাম্বার দিয়ে খুলে প্রোফাইলে ছবিটা দিলেন। দু চারজন বন্ধুকে জুড়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে জবাব চলে এলো। এইবার বাবাইকে জুড়ে দিলেন। শুধু লিখলেন

 

” কি করছিস”

 

এবার অপেক্ষা। অনেকক্ষন কোনো সাড়াশব্দ নেই। ছেলেটা ঘুমোচ্ছে নাকি? যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ে বাবাই। ওর হোয়াটসএ্যপে দেখাচ্ছে  সাড়ে চারটের পরে আর দেখে নি।ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। মল্লিকা মোবাইলটা চার্জ্জে দিয়ে ফ্রেশ হতে গেলেন। মাদু এসে পড়বে এইবার। কফি খেয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরোতে বেরোতে সাতটা সাড়ে সাতটা হবে।বাথরুম থেকে বেরোবার পর মাদু এসে পড়ল। কফি খেতে খেতে মাদু বলল

 

” আর য়্যু রেডি মলি? আমরা কিন্ত সাড়ে সাতটার মধ্যে বেরোব।”

 

মল্লিকা বললেন আমার হয়ে এসেছে প্রায়, তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও।

 

” বাই দ্য ওয়ে, আজ কোন ড্রেসটা পরছো মলি?”

 

আয়নার সামনে মেক আপ করতে করতে মল্লিকা বললেন

 

” সোফার ওপরে রাখা আছে। “

 

অফ হোয়াইট  টপের সঙ্গে ব্ল্যাক পালোজা, সোফার ওপর রাখা ছিল ,দারুন ম্যাচিং, মল্লিকাকে দারুন মানাবে ।দেখে, মধুকর ফ্রেশ হতে গেলেন। মল্লিকার হঠাৎ মনে পড়ল দেখি তো বাবাইটা উঠেছে কি না? হ্যাঁ, জবাব দিয়েছে তো।তাড়াতাড়ি মল্লিকা হোয়াটসএ্যাপ খুলে দেখেন বাবাই লিখেছে

 

” কে? ঠিক চিনতে পারছি না।”

 

মল্লিকার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছেলে কিনা মাকে চিনতে পারছে না। মল্লিকা তাড়াতাড়ি লিখলেন

 

” ওরে , আমি তোর মা। আমাকে চিনতে পারছিস না?”

 

জবাব এল

 

” ওঃ, মা ? ডিপি তে কার ছবি দিয়েছ ? বুঝতে পারছি না। “

 

” কেন ? আমার ছবি”

 

” তোমার ছবি? চিনতেই পারছি না। কি করেছো তুমি মা? নিজেকে পুরো পালটে ফেলেছ। “

 

” ভালো লাগছে ?  “

 

” ভালো লাগছে। বাট….”

 

বাবাই চুপ করে গেল। মল্লিকা ফোনটা রেখে একমিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ওয়ার্ড্রোবটা খুলে নতুন কেনা জরিপাড় ঢাকাই জামদানিটা খুঁজে বার করলেন। কেনা থেকে পরাই হয় নি ওটা। মাদু ততক্ষণে বাথরুম থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। মল্লিকাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন

 

” এ কি তুমি শাড়ী পরলে ? কি হল , ডিসিশন চেঞ্জড?”

 

মল্লিকা হেসে বললেন

 

” হ্যাঁ, আজ এটাই পরি। অনেকদিন জামদানিটা পরা হয় নি , তাই ভাবলাম আজ এটা ট্রাই করি। ওগুলো কিরকম একঘেয়ে হয়ে গেছে।”

 

তারপর কুঁচিটা ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন

 

“এই শাড়িটায় কেমন লাগছে আমায় ?”

 

মধুকর মল্লিকার দিকে অনেকক্ষন চুপ করে তাকিয়ে রইলেন তারপর বললেন

 

” জানো মলি, তোমার জামদানিটা দেখে মনে পড়ে গেল, মায়ের ঠিক এইরকম একটা পিওর বাংলাদেশের মসলিন ঢাকাই জামদানি ছিল। তোমাকে দেখে মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। “

 

“কেমন লাগছে তা তো বললে না ?”

 

” ফ্যান্টাস্টিক মলি, ফ্যান্টাস্টিক । আফটার অল শাড়ি ইস শাড়িই, আর সেটা যখন তোমার মত সুন্দরীর গায়ে, তখন নাথিং বেটার দেন ইট।”

 

মল্লিকা একটু ভেবে মৃদু হেসে বললেন

 

” আমি রেডি। চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

 

(  এটি একটি সম্পুর্ন কাল্পনিক গল্প, বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল নেই )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: