প্রথম বাঙালি বিপ্লবী শহিদ  

 প্রিয়নীল পাল.

আঠেরো বছর বয়স আমরা আধুনিক স্বাধীন সময়ে আজ কে এই বয়সে কেউ প্রেম করতে ব্যাস্ত, কেউ প্রেমে আঘাত খেয়ে কষ্টে লিপ্ত, আবার কেউ শুধু নিজের নিজের করে ক্লান্ত।

কতই আধুনিক কতই আমরা স্বাধীন!

আজ আমাদের পাশে কেউ অসুস্থ থাকলে আমরা তাদের দিকে ঘুরে চায় না, কেউ ভিক্ষা চাইতে এলে সামর্থ্য থাকলেও তাদের দি না, আজ অন্যের জন্য চিন্তা করার মানুষ আছে হয়তো, কিন্তু সেই সংখ্যা আজ কে স্বাধীন সময়ে বড়ই দৃষ্টিকটু।

কিন্তু যখন চারিদিকে পরাধীনতার শিকল, কথা বলা থেকে নিজের মতন করে বেঁচে থাকার অধিকার নেই কোটি কোটি মানুষের, চারিদিকে দুর্দশা আর অশিক্ষা দিন দিন বেড়ে চলেছে। তখন স্বাধীনতার চরম খিদে বুকে নিয়ে, মনের মধ্যে দেশের জন্য দেশের প্রতিটা মানুষের জন্য ভালোবাসার চরম উৎসাহ নিয়ে যে বালক এগিয়ে এসেছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে লিপ্ত হতে, এক বারও ভাবে নি তার ভবিষ্যত এর কথা সেই ক্ষুদিরাম বসু আজ ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে এই দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

খুদার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া লক্ষীপ্রিয় দেবীর চতুর্থ সন্তান, অভাবে কষ্টে বড় হয়েও যে দেশের ভালোবাসার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে সেটা ক্ষুদিরাম কে জানলে ভালোই বোঝা যায়। দেশের প্রেমের সাথে সাথে শিক্ষার একটা খিদে ক্ষুদিরাম এর ছিল বরাবর।

এক বেলা খেয়ে, কষ্ট করেও ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন।শহরে তখন বিপ্লবের আগুন জ্বালানোর চেষ্টা চলছে, ভয়ে ভয়ে সংগঠন করার চেষ্টা চলছে,

ইংরেজ শাসনে চারিদিক তখন শুধুই অন্ধকার।

জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল চরম চেষ্টার পরে, সেই বিপ্লবী দলের সব থেকে ছোট বিপ্লবী ছিলেন ক্ষুদিরাম।

ক্ষুদিরাম এর না ছিল ভয়, না ছিল দেশের কোনো কাজে না, এত ছোট বয়সে এত তেজ,যেনো সাক্ষাত স্বাধীনতার পরম দূত এসেছে এই ভারত ভূমিতে।

ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশ পান যে তাকে “সোনার বাংলা” শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হতে হবে, সেই কথা শুনে এক বারের জন্য না করেন নি ক্ষুদিরাম। এরকমি ছিল তার দেশ প্রেম।

ক্ষুদিরাম শ্রীমদ্ভগবদগীতা পড়তে ভালোবাসতেন এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে এখান থেকেই অনুপ্রাণিত হন বলে শোনা যায়।

পরিবর্তিত সময়ে তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যুগান্তরে যোগ দেন।

ইংরেজরা তখন শাসন নয় শোষণ করছে, গরিব মানুষ দের রক্ত যেনো তাদের দৈনন্দিন বিনোদন এর খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই তখন এই শোষণের আবাসন ঘটানোর একটাই উপায় সশস্ত্র বিপ্লব।

আর এই বিপ্লবের সব থেকে কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।

১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতে রাখেন এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে একের পর এক বোমা হামলা করেন। এই অপরাধের দায়ে ৩ বছর পর তাকে আটক করা হয়।

৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাতে সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুঁড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়।

ইংরেজ শাসক এই ছোটো ছেলের এরকম সাহস এরকম দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, স্বাধীনতার খিদে দেখে চিন্তিত।

আর এই মামলায় ছিল তাদের চক্রান্তের স্থান, এটাই সুযোগ এই তীব্র তেজ কে নিভিয়ে দেওয়ার।

তারা তিন বিচারক এর মধ্যে এক বিচারক নির্বাচন করেন বৃটিশ মি. কর্নডফ কে।

মামলায় ক্ষুদিরাম কে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়।

শাস্তি শুনে ক্ষুদিরাম হেসে ছিলেন, সকাল ছয় টা যখন তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে তখনো ওনার মুখে ছিল সেই তেজ সেই হাসি সেই গর্ব, এত অল্প বয়সে এত তেজ হয়তো সারা পৃথিবীতে বিরল।

আঠারো বছর আঠ মাস আঠ দিন বয়স এ তিনি দেশের জন্য শহীদ হোন।

ক্ষুদিরাম দেশের জন্য এত অল্প বয়সে প্রাণ দেন আর আমরা কি করলাম ওনার জন্য!

আজ হয়তো শুধু নাম ছাড়া মনে রাখিনি কিছুই।

এটাই স্বাধীনতার পরবর্তী আমাদের কর্তব্য  ?

লেখাটা শেষ করি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুদিরাম এর জন্য লেখা গান দিয়ে –

‘’ একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।

হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: