প্রাক্ কথন :আবৃত্তির পরম্পরা – স্বপন নন্দী

১.jpg
লেখক স্বপন নন্দী এবং আবৃত্তি শিল্পী ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়

উৎস অন্বেষণ 

একেবারে প্রাচীনতম সভ্যতায় যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে এসে দাঁড়াল, তাদের সামর্থ অনুযায়ী ভাষা বিনিময়ের মাধ্যমে পরস্পরকে চিনল, সেই চেনা থেকে তারা প্রত্যেকে দাঁড়াবার মতাে একটা মাটি খুঁজে পেল, পেল টুকরাে আশ্রয়। সেই আশ্রয় সমাজবদ্ধতার স্তরে এল। প্রাচীন মানুষ পাথরের সঙ্গে পাথরের ঘর্ষণ থেকে আগুনকে খুঁজে পেল। আগুনের আলােয় অন্ধকার সভ্যতাকে সে এবং তারা খোঁজার চেষ্টা করল।

একজন থেকে দু’জন, দু’জন থেকে বহুজন যে আশ্রয়ের নিচে এসে দাঁড়াল, সেই ভূমি তাদের শেখাল সমষ্টিচেতনা। এর ফলে তৈরি হল এক সামাজিক অবস্থান। আপনা থেকে জন্ম নিল এক সৃজন। তা তার কৃতি। এই কৃতির পরিমার্জনা ইহল সংস্কৃতি। সংস্কৃতির যে অংশটা শুধুশ্রাব্য,শ্রুতিযােগ্য, উচ্চারণ শুদ্ধতায় তার বা মূর্তি সূচনা লগ্নের আবৃত্তি।

এ সত্য সর্বজনবিদিত যে প্রথম কবিতার জন্ম বাল্মীকিরকণ্ঠ থেকে।শরাহত ক্রৌঞ্চের জন্য ক্রৌঞ্চির শােকার্তি অনুভবভেদ্য হয়েছিল আদি কবির হৃদয়ে। সেই হৃদয় তখনই জেগে উঠেছিল অনবদ্য বেদনাভাষ জ্ঞাপনে। সেই প্রথম শ্লোকঃ  

“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ।

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনা একধীঃ কামমােহিতম।।”

প্রথম শ্লোক। প্রথম কবিতা। সেই কবিতার উচ্চারণ থেকে প্রথম আবৃত্তি।

‘মিথ’ ছাড়িয়ে আমাদের আবৃত্তির উৎস লৌকিক জীবনচর্যা থেকে। শ্রমজীবী মানুষেরা রােদে পুড়ে, জলে ভিজে, অন্ধকার খনি গহ্বরে জলন্ত লােহার সামনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে । এই পরিশ্রমের মধ্যেও সে স্বস্তি খোঁজে, ছন্দ খোঁজে ।

কুঠার চালাতে চালাতে কাঠুরিয়ার কণ্ঠ থেকে আপনা হতে বেরিয়ে যায় যে ধুয়া বা বোল, তাই তাদের কাজের প্রেরণা। ধােপা কাপড় কাচার সময় একটা ‘শিসধ্বনি ব্যবহার করে। টিউবওয়েল তৈরি করার সময় শ্রমজীবী তাদের কঠিন শ্রমকে ভুলতে চায় ছন্দোবদ্ধ গানে। কর্ম তখন কৃষ্টি হয়। কৃষ্টির সংস্কৃতি। এইভাবেই  শ্রমসংগীত।

“আদিম, পাহাড়ে প্রান্তরে পশু পালকের সম্ভাষণেরও-ও- হাে-ই-ই’ ডাক যা পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ভিন পাহাড়ের কোনাে একটি মনকে হয়ত দোলা দিয়ে যেত, চমকে উঠে কান খাড়া করে দিয়ে তাকাত হরিণের পাল, সেই ডাক সভ্য ও সংক্ষিপ্ত হয়ে দেখা দিল এই-ওই বা ঐ ডাকে। প্রথম বিস্ময়ের বা আনন্দেরআ-কার ববিক্রম পাথরের এবড়াে থেবড়াে চাই থেকে সুষমরূপ নিল ভদ্র রুচির ভাস্কর্যের ঘায়ে। সেই প্রথম সম্ভাষণের উচ্চারণ থেকে সম্ভাষণ-আপ্যায়নের মসৃণ রূপায়ন পর্যন্ত এই পথ প্রসারিত।”

(বাংলা আবৃত্তি সমীক্ষা তত্ত্বতথ্য ও প্রয়ােগ / ড:প্রমােদ মুখােপাধ্যায়)

জর্জটমসন ‘Human Essence’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেছেন যেখানে মানবিক অনুভূতির নানা পর্যায়ে শ্রমসঙ্গীতের কথা এসেছে। মানুষের শারীরিক এবং মানসিক শ্রমকে লাঘব করে দিতে পারে কোন না কোনাে শিল্প। শ্রমসংগীত এরকম এক শিল্প। এই জাতীয় সংগীত, আনন্দ প্রকাশক এবং উদ্দীপনা সম্ভূত উচ্চারণ থেকে আবৃত্তির আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত রয়ে গেছে। সৌরেন বসুর বঙ্গানুবাদে এই গ্রন্থ থেকে সামান্য উদ্ধৃতি:

“শ্রমসংগীত বা কর্মসংগীত কোন ধরণের সমষ্টিগত বা ব্যক্তিগত দৈহিক শ্রমের নির্দেশজ্ঞাপক অনুসঙ্গ, যেমন নৌকা বাওয়া, ভারী জিনিস তােলা, জাল টানা, ফসল কাটা, তাঁতবােনা প্রভৃতি। এর দুটি ভাগ আছে -(সকলে মিলে) ধুয়া ধরা এবং (তৎক্ষণাৎ) মুখে মুখে রচনা করা। … নৌকার মাঝি-মাল্লারা আওয়াজ দেয় – ‘ও – আপ !

প্রথম অক্ষরটি প্রস্তুতির সঙ্কেত, দ্বিতীয় শব্দটি দাঁড়ে জোর দেওয়ার মুহূর্তের।…মুখে মুখে বাঁধা শ্রমচিৎকারের মাঝখানে গাওয়া হয়ে থাকে সুসংবদ্ধ এবং পরিবর্তনমূলক নিজেদের কাজ সম্পর্কে শ্রমিকদের মনােভাব। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার পাথরভাঙার গানে :ওরা অত্যাচারী—এ-হে/ওরা নিষ্ঠুর-এ-হে। ওরা নিজেরাই কফি খায়—এ-হে,/দেয়না আমাদের একুটও ——হে।”

রবীন্দ্রনাথও বলেছেন; পৃথিবীর আদিম অবস্থায় যেমন কেবল জল ছিল, তেমনই। সর্বত্র সাহিত্যের আদিম অবস্থায় কেবল ছন্দতরঙ্গিত প্রভাবশালিনী কবিতা ছিল। কবিতা ছিল বলে সেকালের শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে প্রাণের আরাম মূর্ত হত।

পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন গ্রিক নাটকে-কোরাস’-এর ভূমিকা সমবেত আবৃত্তির প্রাচীনতম নিদর্শন।ইস্কাইলাস, সােফোক্লেস,ইউরিপিডিস, অ্যারস্টোফেনিসের নাটকে কোরাস উত্তরকালের লােকনাট্যের বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়েছে। এছাড়া কবিগান, যাত্রাগান এবং লােকনাট্যের নানা ধারায় আবৃত্তিশিল্পের বীজটি রােপিত ছিল।

বেদ থেকে আবৃত্তি :.

চার হাজার বছরেরও সুপ্রাচীন ঋকবেদের এবং পরবর্তী সাম; যজু ও অথর্ব বেদের শ্লোকগুলি সুরসংযােগে আবৃত্তি করা হত গুরু শিষ্যের পরম্পরায়। প্রাচীন কালের সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস জানাচ্ছে প্রাচীন চিন দেশে লাউজে ও তার শিষ্য কনফুসিয়ার দর্শনশাস্ত্র সমকালের লােকপরম্পরায় ধরে রাখা হত শ্রুতির সাহায্যে স্মৃতি সহযােগে।মিশর ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় কাব্য থেকে আবৃত্তি হত বলে জানা যায়।

ঋকবেদে আবৃত্তি চর্চার বিষয়টি অনেক প্রসারিত ছিল। ঋকবেদে এগারাে রকমের পাঠের উল্লেখ রয়েছে সংহিতা পাঠ, পদপাঠ, ক্রমপাঠ, জটাপাঠ, মালাপাঠ, লেখাপাঠ, শিখাপাঠ, ধ্বজপাঠ, দন্ডপাঠ, রথপাঠ এবং ঘনপাঠ। শ্রুতিসাহিত্য বেদপাঠ সম্পর্কে বলা হয় যথাযথ উচ্চারণ শুদ্ধিতা একান্ত ভাবেই প্রয়ােজন, নতুবা এই পাঠ অমঙ্গলের কারণ হয়।

সেকালে বেদপাঠে স্তরের সঠিক প্রয়োেগ বিষয়ে সচেতন করে দেওয়া হয়েছে আবৃত্তিকারদের। বলা হয়েছে উদাত্ত, অনুদাত্তও স্বরিত -এই তিন প্রকারের সেই সময়ের প্রচলিতস্বর যেন অভ্যাস করেন বেদ-পাঠক। এইযুগে আবৃত্তির উচ্চারণযােগ্য মর্যাদার দুটি রীতি সংপাঠ্য’ ও ‘মানসী কাব্যক্রিয়া।সম্যভাবে। পাঠ হল ‘সংপাঠ্য’ আর উত্তম রূপে পাঠ ‘মানসী কাব্য ক্রিয়া।

তারপর লেখার পদ্ধতি জানা গেল । তবু ঋকবেদ  বেদলিপিবদ্ধ করা হয়নি দু’হাজার বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত। মনে হয়  লিপিবদ্ধতার চেয়ে অধিক উৎকর্ষতা অর্জন করেছিলেন বেদ আবৃত্তিশিল্পী । কালের স্রোতে কণ্ঠে কণ্ঠে বেদের কবিতা আবহমান রসিকচিত্তকে আন্দোলিত করেছিল। ভারতীয় অলংকার শাস্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা ‘উদ্ভট’-এর মতে বােদ্ধাজনেরা মনে করতেন ‘আবৃত্তি সর্বশাস্ত্রানাং বােধায়নি গরীয়সী।

‘সর্বশাস্ত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শাস্ত্রের প্রয়ােগশিল্প হল আবৃত্তি। কবিতার উচ্চারণ থেকে পরম ব্রহ্মের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।কণ্ঠমাধুর্য, উচ্চারণের স্পষ্টতা, পাঠে যতিপাতের বিন্যাস, তাল-লয়-রসের সমীকরণ থেকে যে উচ্চারণ শিল্প সেই শিল্পের প্রতি সর্বশ্রেণির মানুষের বিনম্র আনুগত্য। শুধু শিল্পচর্চার তৃষা থেকে আবৃত্তি নয়, প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগ থেকে যাগ-যজ্ঞে, সামাজিক উৎসবে, পূজা-অর্চনায় আবৃত্তি যেন প্রাত্যহিকী। ভরতেরনাট্যশাস্ত্র :

প্রাচীন ভারতের অলংকার শাস্ত্রে মহামুনিভরত-এর নাট্যশাস্ত্র’আবৃত্তিশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণঅধ্যায়। ভরতনাট্যশাস্ত্র’ লিখেছেন। এই শাস্ত্রে নাট্যপ্রয়ােগশিল্পের ব্যাকরণিক আলােচনা মুখ্যতা পেয়েছে। এটা স্বাভাবিক। তবে আমাদের বুঝে নিতে হবে নাটকও আবৃত্তির প্রকাশধর্মির্তাকে সমতুল্যতায় বিচার করার মানসিকতা সে সময় ছিল।

নাটকও কাব্যকে সেকালে সমার্থক শিল্পের নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ভরত তার শাস্ত্রে বাচিক অভিনয়ের কথা বলতে গিয়ে যেসব নির্দেশ জ্ঞাপন করেছেন তার সবটাই আবৃত্তির বাচিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। তিনি এই গ্রন্থে আবৃত্তি কলার ওপরও আলােকপাত করেছেন। কণ্ঠ ভঙ্গির কথা বলতে গিয়ে আকাঙ্ক্ষা ও নিরাকাঙ্ক্ষা নামের দুইভঙ্গির আলােচনা করেছেন।

কবিতায় অর্থও ভাবের স্পষ্টতা রক্ষায় তিনি যতির কথা বলেছেন। তাছাড়া চার রকমের স্তর, যেমন উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত,কম্পিত-র কথা এসেছে ভরতের শাস্ত্রে। উচ্চ,দীপ্ত, মন্ত্র, নাচ,দ্রুত, বিলম্বিত এই ষড়অলংকার; ষড়শ, ঋষভ, গান্ধার,মধ্যম, ধৈবত, নিষাদ-এইসপ্তসুর যেমন নাট্যগীতে, তেমনইকবিতার আবৃত্তির ক্ষেত্রে তাৎপর্য পূর্ণ অনুষঙ্গ। উত্তর বৈদিক যুগ :স্বরচর্চা থেকে আবৃত্তি :

মহাভারত ও রামায়ণ কাব্যের অন্তর্দ্রকৃতিতে মহাকাব্যিক আবৃত্তির সুর বহতা। ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।’ অর্থাৎকাশীরাম দাস যে মহাভারত আখ্যান পরিবেশন করেছেন পুথিনিবন্ধলিখিত সাহিত্য অপেক্ষাক্রতিনিও স্মৃতিনির্ভর পাঠইঅধিকসম্মান অর্জন করে নেয়।

রামায়ণমহাকাব্যটিও কাহিনীকাব্য হিসেবে পরিচিত লাভের চেয়ে শ্রীরাম পাঁচালী’ চিহ্নিত হিসেবে মুখ্যতা পেয়েছে। অমৃত সমান মহাভারত এবং রামায়ণ গীতিকার সম্যকপরিচয় আবৃত্তি ধর্মিতার গুণেও। এছাড়া বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরে যে বাণীগুলি উৎকীর্ণ হয়ে আছে, তা উচ্চারণকালে আবৃত্তির তুল্যতা লাভ করে।

এ বিষয়ে বৌদ্ধ ও জৈন নমস্কার’মন্ত্রের অন্যতমনাম‘আবৃত্তি’দিতেই পারি। পালিভাষায় লেখা বুদ্ধদেবের স্তোত্রগুলিসুরকরে পঠিতহয়; ক্রমশ তা স্মৃতিতে অবস্থান করে আবৃত্তিযােগ্যতায় দাঁড়িয়ে যায়। পতঞ্জলির ‘মহাভাব,কালিদাসের ‘তবােধ’, গঙ্গাদাসের ছন্দমঞ্জরী’প্রভৃতিরচনায় আবৃত্তির স্বরচিন্তা, ছন্দবােধ এবং উচ্চারণরীতি আলােচনা থেকে সমকালের আবৃত্তি ভাবনার বীজটির সন্ধান পাওয়া যায়।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে অন্ত্যমধ্যযুগের দরবারীসাহিত্যে রাজসভাকবিদের ভূমিকায় আবৃত্তির উল্লেখযােগ্য ধারাটিকে স্বীকৃতি দিতে হয়। রাজসভাকবিরা রাজসভার সূচনাকরতেন নান্দী, মঙ্গলাচরণ, আশীর্বচন দ্বারা। তার প্রকাশমাধ্যম হল আবৃত্তি। সভাকবিরা স্বরচিত লেখা পাঠ, আবৃত্তি ও গীতের মাধ্যমে রাজার সন্তুষ্টি বিধানে সচেষ্ট হতেন এবং জীবিকার প্রশ্নে অর্থানুকূল্যের প্রত্যাশায় থাকতেন।

আবৃত্তির গ্রহণযােগ্যতায় চর্যাপদ ও মধ্যযুগের কাব্যসাহিত্য :

কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল

চঞ্চল চীএ পইঠা কাল।।

দিঢ় করিঅ মহাসুহপরিমাণ।

লুইভণই গুরু পুচ্ছিঅ জান।।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন :

চন্ডীদাস বিদ্যাপতি রায়ের নাটকগীতি

কর্ণামৃতশ্রীগীতগােবিন্দ।।

স্বরূপরামানন্দ সনে মহাপ্রভুরাত্রিদিনে।

গান শুনে পরম আনন্দ।।

চার পঙক্তির ওই উদ্ধৃতিটিতে জয়দেবের গীতগােবিন্দ এবং চন্ডীদাস বিদ্যাপতির রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক কাব্যের রস গীতিযােগ্যতার কারণে মহাপ্রভু নিয়মিত আস্বাদন করতেন। আমাদের তাে মনেই হয় যা গেয়, তা আবৃত্তেয়। গীতগােবিন্দে জয়দেব উচ্চারণ করেন:‘স্মরগরল খন্ডনংমম শিরসিমন দেহিপদ পল্লব মুদার। এইউচ্চারণে আমাদের প্রতিটি কাব্যরসিকহৃদয়, প্রতিটি সংবেদি চিত্ত গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে আবৃত্তিপ্রাণতায়। চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতির প্রতিটি পদেই আবৃত্তিপ্রবণতার স্বাচ্ছন্দ্য। কৃষ্ণের পায়ে আত্মসমর্পিতা রাধার আবৃত্তি চন্ডীদাসের কলমে:

বঁধু কি আর বলিব আমি

জীবনে মরণে জনমে জনমে ।

 প্রাণনাথহইও তুমি।। শাক্তগীতিকাতেও রামপ্রসাদকমলাকান্তের কণ্ঠে যে আগমনী-বিজয়ার গান, ভক্তের যে আকৃতির শব্দবিন্যাস তা আবৃত্তির শর্তেও সর্বজনের কাছেও আদরনীয়।

মধুসূদন পর্ব:

নব্যবঙ্গ আন্দোলনের পুরােধা তরুণকবিঅধ্যাপকডিরােজিও উনিশ শতকের মধ্যভাগে। নবজাগরণ দিনের একজন আবৃত্তিকার।তাঁর উদাত্ত কণ্ঠস্বরে ইংরেজি কবিতার আবৃত্তি সেকালে সর্বজনের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পেরেছিল। আবৃত্তির শ্রুতিমাধুর্য, ছন্দপ্রকরণ ও অভিব্যক্তির প্রকাশে ডিরােজিও ছিলেন একেবারে সঠিক বাচিকশিল্পী। ডিরােজিওর জীবনটা ছিল অতিসীমিত। ইচ্ছা থাকলেও তিনি আরাে কিছুদিতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর ক্যাপ্টেন রিচার্ডসন ডিরােজিওর

আবৃত্তি উৎসব ২০১৭আকাঙ্ক্ষা কিছুটা পূরণ করতে পেরেছিলেন। কবিতাপাঠে নয়, আবৃত্তির মধ্য দিয়ে কবিতার প্রকৃত রসাস্বাদন করা সম্ভব বলে মনে করেন রিচার্ডসন।

ডিরােজিও ও রিচার্ডসনের আবৃত্তি ভাবনার প্রভাব পড়েছিল মধুসূদন দত্তের আবৃত্তি-হৃদ্যতায়। মাত্র দশ বারাে বছরের অতিসীমিত সাহিত্য জীবনে অসাধারণ কাব্যকৃতিতে আমরা বিস্ময়বােধ করি। আবৃত্তির আধুনিক রীতির সূত্রও তিনি নির্দেশ করে গেছেন। উদাত্ত আবৃত্তির পক্ষে অমিত্রাক্ষর ছন্দের মুক্তপ্রবাহকে তিনি স্বীকার করে নেন। অনেকে জানেন যে, কাব্য রচনার সময় মধুসূদন প্রতিশব্দ, বাক্য এবং পঙক্তিবারবার আবৃত্তি করতেন এবং পরিপূর্ণ শােনার তৃপ্তি লাভ করা পর্যন্ত রচনার পরিবর্তনও সংশােধন কাজকরে চলতেন। আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও গুণগ্রাহীদের সঙ্গে আলােচনা করতেন।

অনেকেএরকম মন্তব্য করেছেন যে, তিলােত্তমাসম্ভব কাব্য সর্বপ্রথম বাংলা আবৃত্তিযােগ্য কাব্য।তিলােত্তমাসম্ভবকাব্য প্রকাশের সময়মধুসূদন যে আবৃত্তি বিষয়ে অত্যন্তমনস্কছিলেন তার সপক্ষে যুক্তি হিসাবে একটি চিঠিরউল্লেখ করা যায়।রাজনারায়ণ বসুও কেশবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে তিনি লিখেছেন :

“Let your friends guide their voices by the pause (as in English Blank Verse) … My advice is Read, Read, Read. Teach your ears the same tune”, ……The Form of Verse in which this drama is written if well-recited, sounds as much like prose as English Blank Verse sounds like English prosr-retaining at the same time a sweet musical impression.”

– বাংলা রঙ্গমঞ্চেও নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে গিরিশচন্দ্র ঘােষ এক কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব। অভিনয়কলার সঙ্গে বাচিকশিল্পের অনিবার্য অন্বয়টিকে তিনি খুঁজেছিলেন। তাঁর নাটকেচরিত্রের মুখ দিয়ে যেসংলাপ উচ্চারিত হত তা পরিমার্জিত এবং শিল্পিত।তার নিজস্বছন্দকলা যা গৈরিশ ছন্দনামে বিদিততারমধ্যে বাকপ্রতিম এবং চিত্রকল্প প্রকাশ করতে গেলে অভিনেতার বাচিকগুণকে তৎপর হতে হবে।

গিরিশসমকালীন বঙ্গরঙ্গমঞ্চেঅভিনয়কলানবায়মান সৃজন নৈপুণ্যে যেভাবে চিহ্নিততাতেনাট্যশিক্ষকনটগুরুগিরিশচন্দ্রের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। যেহেতু সেসময় কোনাে রেকডিং প্রযুক্তি ছিল না তাই গিরিশচন্দ্রের কণ্ঠস্বরটি কেমন ছিল তা জানা যায়নি।

আবৃত্তি চর্চায় রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন আবৃত্তি ভাবনা:

জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির বীন্দ্র সমকালীন আবৃত্তিচর্চায়একঅগ্রণীনাম।এইঠাকুরবাড়িতে একককবিতাপাঠ ও আবৃত্তির চর্চা নিয়মিত হত।মূল নেতৃত্ব রবীন্দ্রনাথই। রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে গান,ভাষণ ও আবৃত্তির রেকর্ডঅনেকেই শুনেছেন আকাশবাণী কলকাতার সৌজন্যে। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষও রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের প্রায় তিরিশটি কবিতার আবৃত্তি রেকর্ডে ধরে রেখেছেন।

তাঁর রেকর্ড করা যে কণ্ঠ আমরা শুনে থাকি তা নাকি গলার আনুনাসিক উচ্চারণ যা শ্রোতাদের মনঃপুত হয়নি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠটি ছিল উদাত্ত, সুস্পষ্টও শুদ্ধ উচ্চারণ সমৃদ্ধ। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি রচনায় উল্লেখ রয়েছে যে রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের যে ভাঙা গলাটি বাজায় সবাই সেটা আদৌ রবীন্দ্রনাথের আসল কণ্ঠস্বর নয়। তিনি যখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তার স্বরভঙ্গ ঘটেছে এটি সেই সময়ের গলা।

আসলে রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তির প্রয়ােগ প্রক্রিয়া ছিল সংযত আবেগ, আত্মগতরীতিও বৌদ্ধিক পরিবেশন-কৃতি।আবৃত্তি শিল্পের তত্ত্বগত দিকেতার মনস্কতা-পরিচায়ক দুটি মন্তব্য এখানে হল : |

“আমি কিন্তু কবিতা রচনার সময় আবৃত্তি করতে করতেই লিখি; এমনকি কোনও গদ্য রচনাও যখন ভালাে করে লিখব মনে করি তখন গদ্য লিখতে লিখতেও আবৃত্তি করি। কারণ রচনার ধ্বনি সংগতি ঠিক কিনা তার একমাত্র প্রমাণ হচ্ছে কান।”

“ছন্দ হচ্ছে কানের জিনিস, একেকজনের কান একেক রকম ধ্বনি পছন্দ করে। তাই আবৃত্তির মধ্যে এতটা পার্থক্য ঘটে, আমি দেখেছি কেউ কেউ খুব বেশি টেনে টেনে আবৃত্তি করে। আবার কেউ কেউ আবৃত্তিকরে খুব তাড়াতাড়ি, কানেরও একটা শিক্ষার প্রয়ােজন আছে।”

রবীন্দ্রনাথের সমকালে এক শ্রেষ্ঠ শিল্পী শিশিরকুমার ভাদুড়ী। শিশিরকুমার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দু’তিন বছর পরে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক শুধুঅভিনেতা রূপেনয় খ্যাতনামা বাচিকশিল্পী হিসাবে পরিচিত হন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শিশিরকুমারের বাচিক নৈপুণ্যে মুগ্ধপ্লুত হয়ে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। পেশাদারী মঞ্চে অভিনয়ের সময় নাটকে সংলাপের স্বরক্ষেপনের প্রয়ােজনেতাকেনিয়মিত কণ্ঠচর্চাকরতে হত।এইভাবেতার আবৃত্তিতে আসা।

সে সময় দীর্ঘ নাট্য সংলাপ আবৃত্তির মত উচ্চারণ করতে হয়। সুতরাং চর্চার ক্ষেত্রে তিনি অভিনয়ও আবৃত্তিকে এক গ্ৰন্থনে সংযুক্ত করেছিলেন। বাংলা আবৃত্তির ছাড়াও তিনি ইংরেজি এবং সংস্কৃত কবিতার আবৃত্তিতে ব্যুৎপত্তিঅর্জন করেছিলেন। সেসময়কলকাতারইউনিভারসিটি ইনসটিটিউট হলেআন্তঃকলেজ আবৃত্তি প্রতিযােগিতায়তিনতিনবার শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান অর্জন করেন।মধুসূদনের বহু কবিতা তিনি স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করতে পারতেন।

রবীন্দ্রনাথের চার পাঁচশাে কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থছিল। মনেহয় শিশিরকুমারের জীবনে আবৃত্তির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভাবনাটি প্রতিফলিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি এবং তা ছিল সুদূরপ্রসারী।শিশিরকুমারের বন্ধু হেমেন্দ্রকুমারের একটি বক্তব্যসূত্রে (যুগান্তর ২৭ আষাঢ় ১৩৬৬) আমরা জানতে পারিসত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুতেরামমােহন লাইব্রেরীতে অনুষ্ঠিত এক শােকসভায় রবীন্দ্রনাথ একটি শােককবিতা পাঠ করে। তা শুনে বিস্ময়বিমুগ্ধশিশিরকুমার।এইভাবে রবীন্দ্রনাথশিশিরকুমারের নিবিড়সান্নিধ্যের বহুস্মৃতি আমাদের। কাছে অমলিন থেকে গেছে।

রবীন্দ্র-উত্তর পর্বের আবৃত্তি :বহুমুখ বহু মাত্রা :

রবীন্দ্র-উত্তরকল্লোল পর্বের কবিদের মধ্যে অনেকেরই কবিতাপাঠেও যােগ্য অভিনিবেশ লক্ষ্য করার বিষয়।নজরুল ইসলামের স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি সমকালের নজরুল অনুগামীবৃন্দ শুনে থাকবেন। নারী, আমার কৈফিয়ৎ, কান্ডারী হুঁশিয়ার প্রভৃতি কবিতা তিনি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন।নজরুল ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের এক সুনিবিড় সান্নিধ্য থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কথায় উঠে এসেছে নজরুলের আবৃত্তি অনুরাগের কয়েক টুকরাে দৃষ্টান্ত। দাদাঠাকুর, নলিনীকান্ত সরকার এবংনজরুলের এক আড্ডায় বীরন্দ্রেকৃষ্ণ আছেন। তিনি বলেছেন –

“পরিশেষে কাজী সাহেবের নতুন সুর দেওয়া কতকগুলি গান বা কবিতা আবৃত্তির পর আড্ডায় পরিসমাপ্তি ঘটত। সে এক অভিনব অভিজ্ঞতা যার স্মৃতি আজও আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। তাছাড়া কাজী সাহেবকে আমি বাইরে বহুবার দেখেছি।

একসময় কলকাতার বড়াে বড়াে রাজনৈতিক মঞ্চেতার স্বরচিতবীরত্বব্যঞ্জক কবিতার আবৃত্তি ও গান জনসাধারণকে যে কীরকম মাতিয়ে তুলত, তার প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করে বিমুগ্ধ হয়ে যেতাম। এই সময়ের মােহিতলাল মজুমদার, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, প্রবােধকুমার সান্যাল, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের কণ্ঠস্বরটি ছিল কবিতা আবৃত্তির উপযােগী।

স্বরচিত কবিতাপাঠ কবিদের অনায়াস চর্চা। যাঁদের কণ্ঠভালাে এবং আবৃত্তিপ্রেমীর্তারা তাদের কবিতাকে স্মৃতিতে ধরে রেখে আবৃত্তি করতেন। একটু পরবর্তী সময়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, সুকান্ত ভট্টাচার্য, অরুণাচল বসু প্রমুখ ভালাে আবৃত্তি করতে পারতেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র :

বাংলার আবৃত্তির আকাশে যে শুকতারাটির আলাে সম্রমের সাথে মেখে নিতে হয় তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বলতে বাঙালির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় লগ্ন হয়ে থাকা আকাশবাণী কলকাতার মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র ভাষ্যকর। পাড়ার মাস্টারমশাই রাজেন্দ্রনাথ দে-রঅনুপ্রাণনায় বেলুড় মঠ স্তোত্রপাঠ শােনা থেকে চন্ডীপাঠের প্রতি আগ্রহ সঞ্চার।

ছাত্রজীবন থেকে সঙ্গীত ও অভিনয় চর্চার সঙ্গে আবৃত্তির অনুশীলনও চলত। অজিত বসুর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র:এক কিংবদন্তী,একনস্ট্যালজিয়া’গ্রন্থসূত্রে পাওয়াবীরেন্দ্রকৃষ্ণের নিজের কথা :

“আবৃত্তি ভাল করতে পারতাম। চন্ডী তাে আমার দশ বছর বয়স থেকেই মুখস্থ। এছাড়া স্মৃতিশক্তি এত চমৎকার ছিল যে যাদু-একবার পড়তাম, মুখস্থ হয়ে যেত। একবার অতি উৎসাহী আমরা মাস্টারমশাইরাজেনবাবু কোথায় আমার দিয়ে এলেন আবৃত্তি প্রতিযােগিতায়। প্রতিযােগিতায় বীরঙ্গনা কাব্য ছিল আবৃত্তির বিষয়।….. আমার মনে আছে, দু’চার পৃষ্ঠা পড়তেই আমাকে বলা হল থামতে। যা মার্ক দেওয়ার বিচারকরা দিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু একজন বিচারক আমার উচ্চারণ ভালাে বলেই হােক কিংবা মুখস্থ কারর ক্ষমতা পরখ করার জন্যই হােক, আমাকে আরও আবৃত্তিকরতে বললেন।একটাও ভুল হয়নি আমার আবৃত্তি -সমস্তটাই আমি আবৃত্তি করেছিলুম স্বচ্ছন্দে।”

এই উদ্ধৃতিটি চয়ন করার দুটো উদ্দেশ্য প্রথমত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের স্মৃতিশক্তির পরিচয় যা আবৃত্তির ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য বিষয়, সেটাকে দেখানাে; দ্বিতীয়ত সে সময় দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তিরই চলছিল। এই প্রসঙ্গে এটাও বলা প্রয়ােজন ইদানিং পেশাদারী আবৃত্তিকাররা বই দেখে আবৃত্তি করেন যেটাকে আবৃত্তি না বলে পাঠ বলাই ভালাে। স্মৃতি থেকে না বললে আবৃত্তি হয়

বয়সােচিত কারণে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় শেষের দিকে বই খুলেই আবৃত্তি করতেন। কলকাতার আকাশবাণীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সরযূবালা দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘বিদায় অভিশাপ করেছিলেন। বিভিন্ন কোম্পানিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের অনেকগুলি আবৃত্তির রেকর্ড বেরিয়েছিল। শ্রদ্ধেয় অজিত বসুর গ্রন্থ সূত্রে জ্ঞাত কয়েকটি উল্লেখযােগ্য রেকর্ডের পরিচয় :রবীন্দ্র-মহাপ্রয়াণ

নিয়ে শৈলেন রায় রচিত রবীন্দ্রনাথ’শীর্ষক শােকগাথা (ভারত); মেগাফোনে ১৯৪৭-৪৯-এর মধ্যে বেরােয় স্বাধীন ভারত’, শহীদক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী’, ‘বাঘা যতীন’, নেতাজী সুভাষ’, ‘জয়তু কংগ্রেস’, ‘দেশবন্ধু ও দেশপ্রিয়’, ‘গান্ধীজির বাণী’, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ’। এগুলির বেশিরভাগ অধ্যাপক নরেশ চক্রবর্তীর লেখা। এইচ.এম.ভি. থেকে ১৯৫১-তে বেরিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘শ্রী অরবিন্দ। ১৯৭৮-তে ইনরেকা প্রকাশ করেছিল রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস ও ‘অভিসার’ কবিতার আবৃত্তি।‘দেবতার গ্রাস’ পরিবেশিত হয়।

আবৃত্তিটি সে সময় এতটাই আলােড়িত হয়েছিল যে নিউ এম্পায়ারে বহুবার ভি বালসারার আবহ এবং তাপস সেনের আলােয় ছায়ানাটিকা দেবতার গ্রাস’। আমরা জানি এইচ.এম.ভি. ১৯৭৮-তে এল.পি.রেকর্ডে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রকাশ করে যার গ্রন্থনা ও শ্লোকপাঠ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। শুধু আবৃত্তি নয়, ধারাভাষ্য, নাট্যপাঠ, কথিকা প্রভৃতির মাধ্যমে আবৃত্তির বিভিন্ন ধারার ওপর তিনি আলােকপাত করেছেন। নির্মলেন্দু লাহিড়ী :

 শিশির যুগের আর এক খ্যাতনামা বাচিক শিল্পী নির্মলেন্দু লাহিড়ী। রেকর্ডে তার রবীন্দ্রনাথের দেবতার গ্রাস’আবৃত্তি সে সময় আশ্চর্যরকম দাগ সৃওিকরেছেন।তার আবৃত্তিতে নাটকীয় প্রাবল্য,শব্দকে টেনে টেনে উচ্চারণ করার সমালােচনাটি অনেকের কাছেঅনেকরকম।

শম্ভু মিত্র এক স্মৃতিচারণে নির্মলেন্দুর সিরাজদৌল্লা’নাটকে সিরাজের ভূমিকায় অভিনয় সম্পর্কে বলেছেন :“এ বাংলা হিন্দুর না, এ বাংলা মুসলমানের না, মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি এই বাংলা। একথা খুব বােঝানাের মতাে করে, খুব যুক্তির মতাে করে। …… আমি অনুভব করলুম যে দর্শকদের মধ্যে যেন একটা বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল।…এরপরে অনেকদিন এইটাকে পরীক্ষা করার জন্য আমি আমার অনেক বুদ্ধি-অভিমানী বন্ধুদের কাছে নির্মলবাবুর নকলে আবৃত্তি করে দেখেছি তাদেরও গায়ে কাঁটা দেয়। কেন দেয়? কোনাে গুঢ় অবচেতন অনুভবে কি ঘা দেয়?

 আমাদের মনে হয়, নির্মলেন্দুঅভিনয়কলার উপস্থাপনরীতিকে সমর্থন করেছেন শম্ভু মিত্র। এই মন্তব্য নির্মলেন্দুর পক্ষে উপরি পাওনা।’

রাধামােহন ভট্টাচার্যের অভিজাত গম্ভীর কণ্ঠস্বর আমাদের বিশেষ প্রাপ্তি। এই সময় নরেশচন্দ্র মিত্রও নিয়মিত আবৃত্তি করতেন। নাটকের স্বার্থেই তাদের আবৃত্তি অনুশীলন এবং এরজন্য কণ্ঠচর্চা।

শম্ভু মিত্র :আবৃত্তির ভিন্ন ঘরানা :

১. চল্লিশের দশক। বাংলা নাটকের বন্ধন মুক্তির আরও একটি অধ্যায়। এ সময়ে শম্ভু মিত্রের আত্মপ্রকাশ।নাট্য শিল্পের স্বয়ম্ভুশম্ভুমিত্রের অনুধ্যান,অন্বেষণ, চর্চাও চর্যা নাট্যভাবনার এক দীপ্ত অধ্যায়। ১৯৪৪-এতিনি ভারতীয়গণনাট্য সঙ্গে যােগ দেন নবান্ন নাটক নিয়ে।আন্দোলনের শরিক হয়ে শহর থেকে দূরে দূরান্তে হাটে মাঠে তিনি ছুটে গেছেন। ছুটে গেছেন যেমন নাটক নিযে, তেমনই কবিতার আবৃত্তি নিয়েও। কবিতাকে, আবৃত্তিকে মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে। দিয়েছেন। আবৃত্তিকে করেছেন গণসংযােগের মাধ্যমে। সমকালের তীব্র যন্ত্রণা  তাঁর কণ্ঠস্বরে গাঢ়

আবৃত্তি উৎসব ২০১৭হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজ চৈতন্যে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্রের ‘মধুবংশীর গলি’ কবিতায় শম্ভ ‍ু  মিত্রের কণ্ঠে আবৃত্তি এক কিংবদন্তী বিশেষ। মধ্যবিত্তের যন্ত্রণা, নৈরাশ্য, ক্লান্তি অথচ সংকল্পের দৃঢ়তা প্রকাশ ভঙ্গির চারুত্বে অন্যমাত্রা দিয়েছেন শম্ভ ‍ু মিত্র।

জীবনানন্দের আটবছর আগের একদিন’-এসময়ের অস্থিরতা সাধারণ মানুষকে যেভাবে বিচলিত করেছিল তার সবটুকু ধরতে পেরেছিল শম্ভ ‍ু মিত্রের কণ্ঠ। জীবনানন্দের কবিতার  চিত্রকল্পে ঐশ্বর্য, মননশীলতা এবং প্রগাঢ় অনুভূতি পরিমার্জিত নাটকীয়তার কণ্ঠস্বরে আপ্লুত। সানন্দিত জীবনবােধ নিয়ে তাঁর জীবনানন্দ অনুধ্যান,কালের মাত্রায় প্রদ্যোতময়।রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ ‘দিনান্তের প্রণাম’ ক্যাসেটে যুগলবন্দি।‘

হে রাজেন্দ্র, তব হাতে কাল অন্তহীন’ থেকে ‘আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করাে পৃথিবী’ পর্যন্ত দীর্ঘ আবৃত্তিচারণায় সংযমী প্রশান্ত মেজাজটি লক্ষণীয়। উদাত্ত নিটোল কণ্ঠ নিঃসারিত হয়েছে কখনাে ক্ষোভে, কখনােমমতায়, কখনােব্যাঙ্গ, কখনােবা পরম শ্রদ্ধায়।

 শম্ভ ‍ু  মিত্রের কাছেকবিতা আবৃত্তি একেবারে নিজস্ব সংসার যেন। যেন মৌলিক সৃজন। এমনইনিজস্বতায় তিনি শিল্পটিকেমূর্ত করতে চান কবিকখনাে কখনাে সেখানে গৌণ হয়ে যান। তিনি বলতে চান, যে যার মতাে করে কবিতা বুঝুক, আবৃত্তি করুক। তার পরিবেশিত আবৃত্তির একটি নিজস্বতা হলাে তার কবিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রটি।তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক আবৃত্তিকারদের কাছে যে কবিতাগুলি আড়ালে থেকে গেছে, তিনি আমাদের অপরিচিত অন্ধকার থেকে তাদের আলােকিত বারান্দায় জায়গা করে দিয়েছেন।

শিল্পের ক্ষেত্রে যে অহংকার তার আত্মজ, সেই অহংকার নিয়েই তিনি চলে গেলেন। কবিরা বেঁচেরইলেন তাঁদের কবিতার অনাস্বাদিত আবৃত্তিলােকে। আবৃত্তিশিল্পের গতানুগতিক আঙ্গিকের অন্যমুখতার শুদ্ধসত্ব ভূমিকা।তাই পূর্বসূরিদের প্রতি আনত শ্রদ্ধা সত্ত্বেও তিনি একক, কোনাে প্রাজ্ঞ ছায়া তাঁর চৈতন্যে প্রতিফলিত হয়নি। মনে হয় কোনাে উত্তরসূরীর একনিষ্ঠস্পর্ধা তাকে ছুঁতে চাইলেও তেমন করে পাবে না।

৮, স্বাধীনতা-উত্তরকালের আবৃত্তির চর্চা :

গণনাট্য ও নবনাট্য আন্দোলনের দিনে শম্ভ ‍ু  মিত্র, উৎপল দত্ত, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র প্রমুখের নতুন রীতির নাট্য প্রযােজনার সঙ্গে আবৃত্তির প্রাসঙ্গিকতাটাও এসে যায়। উৎপল দত্তের নাটকের গণ মুখিনতার সঙ্গে দায়বদ্ধ কবিতার আবৃত্তিও একসূত্রে গ্রন্থিত হয়ে যায়। বাংলা আবৃত্তিকে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক সার্থকতা দেয় কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠ। নজরুল পুত্র কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তি প্রাণতার উৎস যে নজরুলই তা নজরুল-জীবনের অন্তরঙ্গ পাঠ থেকে জানা যায়।

বহু ক্যাসেট, সি.ডি.তে তার কবিতা ধরা আছে। কয়েকটি উল্লেখযােগ্য পরিবেশন ‘বিদ্রোহী’,‘হে রুদ্র আদেশ দাও’, ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘জাতের নামে বজ্জাতি ইত্যাদি। তৃপ্তি মিত্র অসামান্য। আবৃত্তি শিল্পী। ঠিক শম্ভু মিত্রের মতােইতার পরিবেশনে নাটকীয়তা ছিল। আর এইনাটকীয়তাই হয়তাে বাংলা আবৃত্তির অন্য ঘরানা।কুমার রায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, বিকাশ রায়, বনানী চৌধুরী, অনুভা গুপ্ত, নির্মল কুমার, বসন্ত চৌধুরী, সবিতাব্রত দত্ত, সত্য

বন্দ্যোপাধ্যায়, এন.বিশ্বনাথন প্রমুখের আবৃত্তি চর্চাক সূত্র হিসেবেমঞ্চও চলচ্চিত্রে তাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে হয়। তবে তারা যখন কোনাে মঞ্চে আবৃত্তি করেন তখন কিন্তু তাদের মনে চিত্রাভিনেতার বা পেশাদারী থিয়েটার মঞ্চের অহংকার নিয়ে করেন না, শিল্পটাকে ভালােবেসেই করেন।

প্রবীন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তির সঙ্গে আমাদের যােগাযােগ আছে। আমরা তার আবৃত্তির নিয়মিত সমৰ্দার। কোনাে রীতি, কোনাে বিশেষ আঙ্গিক, কোনাে ছায়াতে তিনি আচ্ছন্ন নন। নিজের মতাে করেই নিজের শিল্প-ভাষায় তিনি আবৃত্তি করেন। তার অধিক পছন্দ রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দের কবিতা।

শম্ভ ‍ু মিত্র ও কাজী সব্যসাচীর অসামান্য জনপ্রিয়তার এবং বাণিজ্যিক সাফল্যে উৎসাহ পেলেন পরবর্তী আবুল কাশেম রহিমুদ্দিন, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেয়া চক্রবর্ত্তী, পার্থ ঘােষ, গৌরী ঘােষ, প্রদীপ ঘােষ, নীলাদ্রিশেখর বসু প্রমুখ। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আকাশবাণীতে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় সংবাদপাঠের জন্য বা সংবাদ বিচিত্রার জন্য।

অমিয় চট্টোপাধ্যায়ের গম্ভীর গলায় জীবনানন্দ মানাতাে ভালাে। প্রদীপ ঘোষও পার্থ ঘােষ এখনাে আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। তবে বয়সোচিত কারণে স্বাভাবিকভাবেই তারা একটু যেন থেমে গেছেন। গৌরী ঘােষ অনেক উন্নত মানের আবৃত্তিশিল্পী। খুব মার্জিত এবং উচ্চমানের প্রােগ্রামই তিনি করেন। একসময় পার্থ-গৌরীর কর্ণকুন্তী সংবাদ সমকালের আবৃত্তি শিল্পিদের শ্লাঘার কারণ হয়েছিল।

তেমনই প্রদীপ ঘােষের কামালপাশা’ বাংলা আবৃত্তিকে এক শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। পরবর্তীকালে উৎপল কুন্ড ‍ু, শাঁওলি মিত্র, বিজয়লক্ষ্মী বর্মন, জগন্নাথ বসু, উর্মিমালা বসু, ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুময় বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজল চৌধুরী, মিনতি দে, শুভ্রা বসু,  শোভনসুন্দর বসু, তরুণ চক্রবর্তী, দেবরাজ রায়, দেবাশিস বসু, কুমকুম দে, রজত বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণতি ঠাকুর, নূপুর বসু, প্রবীর ব্রহ্মচারী, অমিতাভ বাগচী, সুকুমার ঘােষ, শর্মিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়, সুমন্ত্র সেনগুপ্ত পরিচয় বসু, সােমনাথ নাথ, অলক রায়ঘটক, বিজন ঘােষাল, চিন্ময় নদী, দীনেশ মান্না, কৃষ্ণকলি বসু, কাজল সুর, কৃষ্ণপদ দে, পূজন ঘােষ, শ্যাম বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত্র মিত্র, ঈশিতা দাস অধিকারী প্রমুখ নিয়মিত কমবেশি আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। মনে হয়, বাংলা আবৃত্তিতে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছেন। আবৃত্তি সংগঠনের ভূমিকা :

 আবৃত্তি চর্চার পরম্পরায় আবৃত্তি শিল্পিদের আবৃত্তি সংগঠনের একটা ভূমিকা থেকে যায়। গণনাট্য, নবনাট্য, বহুরূপী, নান্দীমুখ, নান্দীকার, পি.এল.টি, প্রভৃতি সংস্থা মূলত নাটকের দল বা গুরুপ থিয়েটার হলেও এইসব সংগঠন নাট্য প্রযােজনার সঙ্গে আবৃত্তির অনুশীলন করেছেন এবং করছেন যদিও এইঅনুশীলন মুখ্যতনাট্য প্রযােজনার স্বার্থে।মূলত ষাটের দশকে আবহমান নামক এক সংগঠন কবি পঙ্কজ সাহার (প্রাক্তন দূরদর্শন অধিকর্তা) নেতৃত্বে বড়াে মাপের আবৃত্তি সন্ধ্যার আয়ােজন করে ম্যাক্সমুলার ভবনে।

১৯৭২-তে এই সংস্থা প্রথম চারদিন ব্যাপী এক আবৃত্তি উৎসব করেন শিশির মঞ্চে, ম্যাক্সমুলার ভবনে এবং আকাদেমি অব ফাইন আর্টস প্রেক্ষাগৃহে। আবৃত্তি উৎসব এবং আবৃত্তি বিষয়ক সেমিনার সম্ভবত রাজ্যে এটাই প্রথম। বিদেশ থেকেও  আবৃত্তি উৎসব ২০১৭ কবিরা এসেছিলেন। সেমিনারটি পরিচালনা করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একটি সন্ধ্যা নির্দিষ্ট ছিল শুধু শম্ভ ‍ু  মিত্রের জন্য। আকাশবাণীতেও আবৃত্তি শিক্ষার আসর শুরু করেছিলেন পঙ্কজ সাহা।

এরপর থেকে শহর কলকাতা, শহরতলির নানা প্রান্তে আবৃত্তি সংগঠনের ঢল নামে। নীলাদ্রি শেখর বসুর সুদক্ষ সম্পাদনায় ‘আবৃত্তি আকাদেমি’প্রতিষ্ঠিত হয়। আবৃত্তি শিক্ষার সুনির্দিষ্ট পাঠক্রমভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান জন্ম দিয়েছে আবৃত্তিশিল্পের তরুণ প্রজন্মকে। এরকমই আর এক সংগঠন আবৃত্তি ফেডারেশন যারা একটু বড় আকারে আবৃত্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে।

এছাড়া সারা রাজ্যের বাচিক শিল্পীদের ঘর সংসার বাচিক শিল্পী সংসদ’যার অধুনাতম নাম বাচিকশিল্পী সংস্থা। উৎপল কুন্ড ‍ু, চিন্ময় নন্দী, দীনেশ মান্না নেতৃত্বে একসময়ের ছন্দনীড় এই চর্চার অগ্রণী পথিকৃৎ ছিল। অনেক সংগঠনের নামইএইমুহূর্তে আমাদের মনে জাগে – প্রিয়লাল রায়চৌধুরীর আবৃত্তিতীর্থ, অমিতাভ বাগচির অপরাজিতা, রজত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাক, রবীন মজুমদারের।

আবৃত্তিক, সুমন্ত্র সেনগুপ্তের শঙ্খমালা, অরুময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের শৈলুষ, সৌমিত্র মিত্রের আবৃত্তিলােক, সুবীর চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তিপরিষদ, পরিমল চক্রবর্তীর আবৃত্তি বলয়, মহিম ঘােষের আবৃত্তি সংসদ, মলয় পােদ্দারের আলাপন, রামচন্দ্র পালের উচ্চারণ, জগন্নাথ বসুর উন্মেষ, সুকুমার ঘােষের কবি ও কবিকণ্ঠ, রবীন ভট্টাচার্যের কথাসরিৎ ।

প্রমোেদ বসুর উপলব্ধি, ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় কাব্যায়ন, পূজন ঘােষের কালধ্বনি, দেবব্রত দত্তের ছায়ন,জাতীয় আবৃত্তিশিল্পী সমন্বয় মঞ্চ, পরিচয় বসুর বর্ণমালা, নন্দন সিংহের বহুবচন, প্রবীর ব্রহ্মচারীর বলা কওয়া, রত্না মিত্রের বাক, প্রদীপ আচার্যের বাচনিক, শ্যাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভাব, মিনতি দে-র বাণীদীপা,

অমিতাভ ভট্টাচার্যের অন্যমন, পার্থ ঘােষেরউপমা, সােমনাথ দে-রশ্রুতিমঞ্জিল, কৃষ্ণপদ দাসের চারুকৃতি, বহরমপুরের ছান্দিক, পীতম ভট্টাচার্যের নাট্যম, স্বপন গাঙ্গুলির নৈবেদ্য, ভাস্কর দেবের সমান্তরাল দেবাশিস ঘােষের নন্দনকথা ইত্যাদি।

বড়াে মাপের আবৃত্তি উৎসব করছে শঙ্খমালা, শম্পা আবৃত্তি উৎসব ইত্যাদি সংস্থা। অনেক সংগঠনের নাম অনুল্লেখ থেকে গেল। উল্লেখ করা হল না অনেক অনেক আবৃত্তিশিল্পীর নাম। এক্ষেত্রে লেখকের সামর্থের দীনতা এবং নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি আশংকা – দুটোই কাজ করেছে। তথ্য ঋণ : সন্মার্গসপর্যা/ শম্ভু মিত্র

বাংলা আবৃত্তিতত্ত্বতথ্য প্রয়ােগ / ড. প্রমােদ মুখােপাধ্যায় আবৃত্তি শিল্প এবং তার প্রয়ােগ/অরুময় বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্পা আবৃত্তি উৎসবের ধারাবাহিক স্মারকগ্রন্থ অজিত বসুর বিভিন্ন প্রবন্ধ

– স্বপন   নন্দী  আবৃত্তির নিবিড় পাঠ। স্বপন নন্দী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *