প্রাবন্ধিক অজিত বসু

কবিতার  অপরূপ  কণ্ঠশিল্পী  শম্ভু  মিত্র

sahityasmriti.com

আবৃত্তির উৎস খুঁজতে পিছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, খুব প্রাচীনকালে, আজ থেকে তিন-সাড়ে তিন হাজার বছর আগে বৈদিক সাহিত্য-রচনার যুগে লেখবার পদ্ধতি জানানা-থাকার দরুন এইসব কবিতা বৈদিক ঋষিরা রচনা করতেন মুখে মুখে, আবৃত্তির সাহায্যে, এবং মুখে মুখেই তা কাল থেকে কালান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।

এর কারণ হিসেবে বলা যায়, লেখার যে ভাষা, তাতে সবটুকু ধরা পড়ে না –না কণ্ঠস্বর,না সুরের টান (Pitch), না  ঝোঁক (Accent)। কিন্তু আবৃত্তিতে এ সবই যথাযথ বজায় থাকে। এজন্য লেখার পদ্ধতি চালু হবার পরেও ঋগ্বেদের কবিতা লেখা হয়নি। এবং আবৃত্তির এই সামগ্রিক আবেদনের জন্য দু-হাজার বছর পর্যন্ত বেদের কবিতা আবৃত্তির মধ্যেই জীবিত থেকেছে ।

আবৃত্তির ব্যাপক আবেদনের জন্য ‘আবৃত্তি’ বৈদিক শিক্ষার এক বিশিষ্ট অঙ্গ বলে। স্বীকৃতিলাভ করেছিল। তাছাড়া যথাযথ ব্যাকরণসম্মতভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে বেদের কবিতা নানান ছন্দে আবৃত্তি করা হত। এইসব ছাঁদের নাম ছিল ‘পাঠ’। সবচেয়ে সহজ আবৃত্তিকে বলা হত ‘জটাপাঠ’। বেদের স্তোত্রপাঠের জন্য স্বরের উত্থান-পতন নির্দিষ্ট ছিল। উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত—তিনটি স্তরে ওঠা-নামা হ’ত।এইসব ছাঁদের নাম ছিল পাঠ’।সবচেয়ে সহজ আবৃত্তিকে বলা হত ‘পদপাঠ’ – এছাড়াও আর দু-তিন রকম পাঠ বা আবৃত্তির রীতি ছিল – যেমন ‘ক্রমপাঠ’ ও ‘জটাপাঠ।

বেদের স্তোত্রপাঠের জন্য স্বরের উত্থান-পতন নির্দিষ্ট ছিল। উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত—তিনটি স্তরে ওঠা-নামাহত এবং স্বরের এই চিহ্নগুলি স্বরলিপির কাজকরত। বেদের সময়ে সাম’ব’লে যে-ভাগ ছিল, তা গানই। আর ঋক্, যজু পাঠ হত। পরবর্তীকালে কাব্য ও সংগীত আলাদা হয়ে গেল।সংগীততাল, মান, রাগ,লয় –এইসবের মধ্যেই বিকশিত হতে লাগল।কাব্য ও সংস্কৃতে রচনার সময়ে মন্দাক্রান্ত, আবৃত্তি মােটামুটি মিলেমিশেই ছিল। জয়দেবের গীতগােবিন্দম’- এ যেমন কিছু অংশ পাঠকরার (যেমন মেঘমেদুরম্বরম…), আবার কিছুঅংশ তাল সহযােগে গান করার।

মধ্যযুগে পদাবলী-রচয়িতারা সংস্কৃত ও প্রাকৃত রীতির, বিশেষত জয়দেবের রীতির অনুবর্তন করে বাংলা ছন্দেও দীর্ঘস্বরের দীর্ঘবজায় রাখতে প্রাণপনে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাংলার স্বাভাবিক উচ্চারণের বিরুদ্ধতা ক’রে কৃত্রিমভাবে দীর্ঘস্বরের গুরুত্ব রক্ষার প্রয়াস সফল হয়নি। প্রাচীন কবিদের মধ্যে ভারতচন্দ্রই এ বিষয়ে অনেকটা সফল বলা যায় । উনবিংশ শতকেও এ প্রয়াসের বিরাম ঘটেনি।

দীর্ঘকালই বাংলা কবিতা পয়ার ছন্দে লেখা হয়েছে। এই ছন্দের দুর্বলতাই এই যে,ঐ ছন্দেপ্রতি পংক্তির শেষে পূর্ণতি দিতেই হবে এবং দুটি মাত্র পংক্তির মধ্যে একটি ভাবকে শেষ করতে হবে। মধুসুদনের বিদ্রোহী মন পয়ারের এই সংকীর্ণ গণ্ডির বিরুদ্ধে উদ্যত হয়ে ভাবকে পংক্তির পর পংক্তিতে ছড়িয়ে দিল। ভাব ও ছন্দের এই প্রবহমানতাই মধুসূদনের বিশেষ দান।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : আমি কিন্ত কবিতা রচনার সময়ে আবৃত্তি করতে করতেই লিখি। এমন কি গদ্য রচনাও যখন ভাল করে লিখব বলে মনে করি, তখনও গদ্য লিখতে লিখতে আবৃত্তি করি। কারণ রচনার ধ্বনি-সংগতি ঠিক হল কি না তার একমাত্র প্রমাণ হচ্ছে কান।

সকলেই জানেন, প্রত্যেক কবিইকবিতা লেখার সময়ে কানের ওপর খুব বেশি নির্ভর করেন। আবৃত্তিকারও কবিতাটি আবৃত্তি করার সময়ে কানে শুনে পারফরমেন্সের গ্রহণ-বর্জনের কাটাকুটির মধ্য দিয়ে সঠিক রাস্তাটি খুঁজে নিতে চেষ্টা করেন।

বস্তুত ছন্দ একটি ধ্বনি শিল্প এবং ছন্দের গােড়ার কথাই হচ্ছে ধ্বনিতত্ত্ব। লিখিত ভাষাকে যা ছাপিয়ে যায় এবং অন্যতর দ্যোতনায় ঝকমক করে।

চিত্রশিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, আবৃত্তি আর কিছুনয়, আমি মনে করি অন্তরের গভীরতম অনুভূতির ছন্দ-সংগীত।চাক্ষুষ দেখার সঙ্গেঅ-দেখার অনুভব করার অনুভূতিটাই আবৃত্তির প্রথম পাওয়া। কবিকৃতিকে যেমন দেখছি, তাই নয়, বাহ্যদৃষ্টি দিয়ে অন্তদৃষ্টির ভিতর দিয়ে আর একটি দৃষ্টি-জীবন উন্মােচনইহ’ল শিল্প-আবৃত্তি।শ্ৰীবন্দ্যোপাধ্যায় আরাে বলেছেন : ‘আবৃত্তির আর এক নাম ধ্যান। নির্জনে অনুধ্যানের মধ্য দিয়েই পূর্ণতার পথ তৈরি করতে হবে।.. আবৃত্তি হচ্ছে মনের প্রথম প্রকাশের শুদ্ধ স্ফুটন এবং তা আবহমানকালের।’..

শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:.আবৃত্তিশখ নয়, শৌখিন তার নিবিড় হাকা আচরণে তার জন্ম নয়।এ হচ্ছে সত্যের কঠিন সাধনা। তার প্রতিষ্ঠা সত্যে। এখানে সত্যকে অনুভব করার মন্ত্রগুলি সে শিখিয়ে দিচ্ছে।

শুধু আবৃত্তি কেন, সমস্তশিল্পের মূল কথা এই ধ্যান। বাংলার মেয়ে’নাটকে যােগেশচন্দ্র চৌধুরীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ শম্ভু মিত্রকে যােগেশবাবুএইকথাই বলেছিলেন :কিজানাে, ধ্যান করতে হয়, ধ্যান করলে মন দিয়ে ধ্যান করলে—তারপর পাওয়া যায়।

শম্ভু মিত্র তার সন্মার্গ সপর্যা’ গ্রন্থের ‘কিছুসূত্র মাত্র’ নিবন্ধে লিখেছেন : এই রকম বীজবাক্যগুলােকে সন্ধান করে বের করতে হয়।

সুতরাং ধ্যানে সূত্র ধরে চলে অনুসন্ধান এবং অনুসন্ধানের পরতে পরতে লুকিয়ে বীজবাক্য—যার আলােকেই শিল্প সার্থক হয়ে ওঠে।

সঙ্গীতজ্ঞরাজ্যেশ্বর মিত্রের মতে :আবৃত্তিকারকে সার্থকতা লাভকরতে গেলে অবশ্যই intellectual হতে হবে, তার স্থান কবির পাশে এবং তিনিও স্রষ্টা।

কবি অরুণ মিত্র মনে করেন : সত্যিকার সমস্যার ক্ষেত্র হ’ল লিরিক কবিতা। এ কবিতায় রূপ নেয় জীবন ও জগতের সংস্পর্শে কবির অব্যবহিত একান্ত প্রতিক্রিয়া। এই কারণে লিরিক কবিতা বিভিন্ন কবির প্রস্তুতিগত বৈশিষ্ট্য এবং স্বাতন্ত্রের পরিচয় বহন করে। ঘটনার বিবরণনয়, কাহিনী নয়, নাট্যভাষণ নয়। যে কবিতায় কবির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়, তার সংবেদনা ও অনুভূতির রূপায়ণ থাকে, তার মানবীয় উপলব্ধি উন্মােচিত হয়, এ সেই কবিতা। আধুনিক কবিতা বলতে আমরা এখন একেই বুঝি। এই কবিতার জন্যেই সমস্যার উদ্ভব। অন্য কোনাে

কবিতাপাঠের ধরণ এর উপর চাপানাে চলে না। শ্রীমিত্রের মতে :আবৃত্তিতে স্বরলিপির কোনাে প্রশ্ন নেই। সেখানে পাঠক বা আবৃত্তিকার নিরঙ্কুশভাবে স্বাধীন। অতএব তিনি স্বেচ্ছাচারীও হতে পারেন।কবিতাকে জনপ্রিয় করার জন্যে আলাে, সংগীত, নাটকীয় কলাকৌশল ইত্যাদিও ব্যবহার করা যেতে পারে। সেজন্যে বেছে নেওয়া উচিত হবে বিশেষ ধরনের কবিতা; যেসব কবিতা উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও কোনাে কাব্যিক ক্ষতি হয় না। কিন্তু সাধারণভাবে লিরিক কবিতা ঐ উপায়ে জনপ্রিয় করতে গেলে ফল উল্টো হবে; কবিতাই মারা পড়বে।

কবি শঙ্খ ঘােষের সমস্যাটাহ’ল আবৃত্তিকারদের নাটুকে আবেগ। তিনি মনে করেন, এই নাটকই হ’ল আমাদের কবিতা আবৃত্তির পথে মস্ত এক বাধা। কবিতা পড়ার সঙ্গে নাটক করার স্পষ্ট কোনাে ভিন্নতা ধরতে পারেন, এমন আবৃত্তিকার আজকের দিনে দুর্লভ। প্রায়ই বরং দেখা যায়, গলা উঠিয়ে-নামিয়ে-কাপিয়ে-বাঁকিয়েএমন একটা উত্তেজনা তৈরি হয়, যার আক্রমণে সমস্ত কবিতাটি এক লঘু শিথিলতায় ছড়িয়ে যায়।

শ্রীঘােষ শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি সম্পর্কেও এই একই অভিযােগ ক’রতে দ্বিধাবােধ করেন না বলেন, এমনকি শম্ভু মিত্র তার এমন আশ্চর্য সুঠাম স্বর নিয়েও কখনাে কখনাে কবিতা থেকে স্খলিত হয়ে পড়েন কবিতার বাইরে।… অন্তত রবীন্দ্রনাথের যে সব কবিতা আবৃত্তি করতে শম্ভুবাবু পছন্দ করেন, সেখানে শব্দাবলি কতটাই স্বরতরঙ্গ সইতে পারে তা ভাবতে হবে, দেখতে হবে কতটা কাপিয়ে বলা বা টেনেটুনে বলা সেখানে সংগত। প্রসঙ্গত তিনি রবীন্দ্র প্রসঙ্গ এনে বলেন : নাটক না এনেও শব্দগুলিকে কীভাবে তার ধ্বনি এবং অর্থের মর্যাদার তুলে নেওয়ারযায়, তার দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রনাথই আমাদের দেখান।

শঙ্খবাবু মনে করিয়ে দেন,রবীন্দ্র-আবৃত্তিতে ‘কৃষ্ণকলি’ কবিতায় একা’ শব্দের শূন্যতাময় উচ্চারণ অথবা ঝুলন’ কবিতায় ‘ঝঞ্জা’ শব্দের ঈষৎ সেই ঝনৎকার। এসবই ধরা আছে খুবই সূক্ষ্ম স্বরে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার বহু শব্দের অকারণ অকারান্ত ধ্বনিতে অথবা পংক্তি মাত্রিক মৃদু টানে কিংবা সমস্তটা মিলিয়ে একটা লাবণ্যময় তরঙ্গসৃষ্টিতে যতখানি মন দেন, তার থেকেই ধরতে পারি তাঁর কবিতার সুরের আকাক্ষাটুকু। এজরা পাউণ্ড ‘গীতাঞ্জলি’র বাংলা কবিতাই শুনে নিয়েছিলেন কবির মুখে এবং মুগ্ধ হয়েছিলেন তার সুর প্রবাহে।

তিনি যে আচ্ছন্নবােধ করেছিলেন তার একটা কারণ হয়তাে এই যে, এজরা পাউণ্ড নিজেও চেয়েছিলেন তাঁর কবিতা পড়ার একটা সুর তৈরী করতে, অন্তত তার নিজের আবৃত্তিতে বারেবারেই ধরা পড়ে, এই আবেশ সঞ্চারী উচ্চারণের অভ্যাস ।শ্ৰীঘােষ ঠিক কোথায় পৌঁছতে চাইছেন, তা তার লেখা থেকে বুঝে নিতে খুবই অসুবিধে হয়। বিশেষত শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি সম্পর্কে  তাঁর মন্তব্য গভীর কোনাে যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে হয় না।

শ্রী শঙ্খ ঘােষ মহাশয় রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে আবৃত্তির মধ্যে একধরণের ‘সুর’ লক্ষ্য করেছেন, ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, প্রকাশ্য আবেগ জাগানাে সুর’—আবার একটু পরেই বলছেন –‘প্রচ্ছন্ন সুর।তাহলে অবস্থানটা কোথায় হ’ল পাঠক কি বুঝতে পারছেন ? আমাদের । কাছে তাে বেশ গােলমাল লাগছে।

– প্রবন্ধটার আরাে গােলমালের জায়গা হ’ল ৯১ পৃষ্ঠায় (বিষয় : আবৃত্তি) সেখানে শ্রীঘােষ লিখেছেন : জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন যে, মধুসূদন তাঁর কবিতা পড়তেন ভাঙা ভাঙা গলায় প্রতিটি শব্দে থেমে থেমে। এরপরেই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ তৈরী করতে চেয়েছিল প্রবহমানতা, তার পাঠ কেন হ’ল এরকম বাধাময়, প্রবহমানতার অভাব  ? মেনে নেওয়া যায়না। অনেকেই বলেছেন :মধুসূদনের ঐকণ্ঠ, অপেক্ষাকন পরিণত বয়সের এবং অমিতাচারের জন্য ঈষৎ কর্কশ। অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবাহমানতা কি ঐ আবৃত্তির বাধাময়তার ওপরে নির্ভরশীল? বােধহয়, না।

শঙ্খবাবু ভালেরির প্রসঙ্গ এনেছেন যে ভালেরি মনে করেছিলেন, ছাপা কবিতা ছাপা গানের মতাে অসম্পূর্ণ, দুটোই প্রতীক্ষা করছে কোনাে স্বরলিপির সেই ভালেরি গানকেই ভেবেছিলেন আবৃত্তির উৎস। গানে শব্দ তার অর্থ হারিয়ে একেবারে সরে যায় ধ্বনির দিকে প্রাত্যহিক বাচনে শব্দ তার ধ্বনি হারিয়ে একেবারেই সরে আসে অর্থের দিকে। আবৃত্তিতে ভালেরি খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন এ দুইয়ের কোনাে মধ্যপথ। জানিনা, সেরকম পথকতটা তিনি পেয়েছিলেন তার নিজের গলায়, কিন্তু এই বর্ণনা থেকে বােঝা যায় যে, আবৃত্তিতে সুর-ভঙ্গিমার প্রতিই তার পক্ষপাত, তারও নেই সামঞ্জস্যের ঝোক।-এ বক্তব্যও আমাদের নির্দিষ্ট কোনাে সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে পারে বলে মনে হয় না।

এরপর শ্রীঘঘাষ বলেছেন, বাক্ স্পন্দের প্রতি একেবারে অনুগত থেকে স্বরে অনেকখানি নৈর্ব্যক্তিকতা রেখেও কিভাবে সংযমিত সুর এবং নাটককে ধরা যায় গলায়, তার সুন্দর উদাহরণ পাই এলিয়টের প্রগাঢ় কবিতাপাঠে । এইসব দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি কি প্রমাণ করতে চাইছেন শম্ভু মিত্রর আবৃত্তির অসফলতা ? কিন্তু সে অসাফল্য প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে হয় না।

পুরাতন বাংলা কাব্যের ধারায় ভারতচন্দ্র হয়ত আবৃত্তিবিদ্যার চর্চায় কিছুটা দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু নতুনকালে ইংরেজি কবিতার আবৃত্তিই বাংলা কবিতার জন্মান্তর ঘটাল।

উনিশ শতকের তরুণ প্রতিভাশালী ছাত্রদের সামনে ইংরেজি কবিতার আবৃত্তির উচ্চ শিল্পসম্মত আদর্শ তুলে ধরেছিলেন যেসব শিক্ষকতাদের মধ্যে ডিরােজিওর নাম উল্লেখযােগ্য। তার এই কবিত্বের আভাকবিতা-আবৃত্তির উৎকণ্ঠতার মাধ্যমে অন্তত একজন বাঙালি কবিকে প্রােজ্জ্বল করেছিল। যার নাম মধুসূদন দত্ত। অবশ্য মধুসূদন হিন্দু কলেজে ডিরােজিওর ছাত্র ছিলেন না। তিনি যে সময়ে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন, ডিরােজিওকে  তাঁর আগেই ঐ কলেজ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।

মধুসূদন হিন্দু কলেজে পেয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ডি.এল.রিচার্ডসনের সাক্ষাৎ সান্নিধ্য এবং এই অধ্যাপক রিচার্ডসনই সেকালে অসাধারণ আবৃত্তির আদর্শস্থাপন করেছিলেন, বিশেষত শেক্সপীয়র-এরনাট্যকাব্যাংশের।নানা প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে,তার শেক্সপীয়র পাঠছিল অতুলনীয়। শােনা যায়, স্বয়ং মেকলে সাহেব তার আবৃত্তি শুনে বলেছিলেন, “আমি ভারতবর্ষের সব কিছু ভুলিতে পারি, কিন্তু আপনার শেক্সপীয়র আবৃত্তি ভুলিতে পারি না।এসব কথা তার আত্মচরিতে লিখেছেন রাজনারায়ণ বসু। রিচার্ডসন শুধু পড়াতেন না, ছাত্রদের আবৃত্তি শেখাতেন, ভাল আবৃত্তি শােনা ও শেখার জন্য নাট্যশালায় যেতে উৎসাহিত করতেন।

রাজনারায়ণ বসু লিখছেন : তাহার এই বিশ্বাস ছিল যে, কবিতা  আবৃত্তি  বিদ্যা শিখিবার প্রধান স্থলনাট্যালয় । তিনি নিজে তথায় গিয়া অভিনেতা ও অভিনেত্রীদিগকে। আবত্তি করিতে শিক্ষা দিতেন, তাহারা সম্মানের সহিত তাহার উপদেশ গ্রহণ করিত। মধুসূদনের জীবনীকার যােগীন্দ্রনাথ বসুও জানাচ্ছেন, যে গ্রন্থ তিনি অধ্যপনা করিতেন,তাহার দুরূহ অংশ সমূহ  তিনি এরূপ নৈপুণ্যের সহিত পাঠ করিতে পারিতেন যে,তাহার একবার আবৃত্তিমাত্র ছাত্রদিগের অনেকস্থলে অর্থগ্রহ হইত। সে সময়কার অনেক প্রসিদ্ধ রঙ্গশালার অভিনেতা ও অভিনেত্রিগণ তার নিকট শেক্সপীয়র আবৃত্তি সম্বন্ধে উপদেশ গ্রহণ করিতেন। |

কবিতা সম্পর্কে রিচার্ডসনের মনােভাব ছিল খুবই আধুনিক, আর কবিতা আবৃত্তি করলেই কাব্যের তাৎপর্য শ্রোতার চিত্তে সঞ্চারিত হতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। আবৃত্তিশিল্পী ছিলেন বলেই রিচার্ডসন বলতেন, কবিতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছতার উর্ধ্বে তুলে দিতে পারে।

জগতের পরিচিত সাধ-আহ্লাদের অতীত এক চিরন্তন আনন্দস্বর্গে উন্নীত করতে পারে। এ যেন একধরনের ধর্মই—কবিরাই প্রকৃত পুরােহিত। শুধু কাব্যপাঠের দ্বারা যে তা সম্ভব নয়, কবিতাকে মন্ত্রের মতাে যথাযথভাবে আবৃত্তি করলেই তবে কবিতা দিব্যশক্তি লাভ করতে পারে, এই ছিল রিচার্ডসনের বিশ্বাস ও সাধনা। তাই তাহার সুললিত কবিতায়ও হৃদয়গ্রাহিণী আবৃত্তিতে তাহার ছাত্রগণের হৃদয় সহজেইমুগ্ধ হইত। সেই একটিমুগ্ধ ছাত্রের হাতেই বাংলা কবিতার নবজন্ম ঘটল। আবৃত্তিযােগ্য বাংলা কবিতার প্রথম কবি সেই মধুসূদন।

, এতে কোনাে সন্দেহ নেই যে, আবৃত্তি করার উৎকণ্ঠিত আকাঙ্ক্ষা থেকেই মধুসূদন অমিত্রাক্ষর ছন্দের আবিষ্কার, প্রবর্তন, প্রয়ােগও প্রচলন ঘটাতে পেরেছিলেন। কারণ অমিত্রাক্ষর নীরব পাঠের ছন্দ নয়, বাংলায় প্রথম আবৃত্তির ছন্দ।

ঈশ্বর গুপ্ত, মদনমােহন, মনােমােহন পাঠ-কবিতার পদ্যকার ছিলেন। ইংরেজী কবিতার আবৃত্তির আদর্শের্তারা বাংলা কবিতা লিখতে শেখেননি। তাদের কাব্যের যমক – পান-অনুপ্রাস, শ্লেষ, শব্দালংকার, কুরুচি-গ্রাম্যতা-কুৎসা-উত্তেজনা-রসিকতা সবই ছিল প্রধানত দৃষ্টিসুখের, অংশত শ্রুতিসুখের। দ্বারকানাথ, দীনবন্ধু এমন কি বঙ্কিমচন্দ্রও বাংলা কবিতার সেই মধ্যযুগীয় পাঠরীতির স্টাইলই অনুসরণ করেছিলেন। তাদের কবিতায় কণ্ঠস্বর ছিল না, রঙ্গলালও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

. মধুসুদনই একালের কবিদের মধ্যে প্রথম আবৃত্তিকার। আবৃত্তির আদর্শেই তিনি নাটকে প্রথম আবৃত্তির ছন্দ ব্যবহার করে অমিত্রাক্ষর ছন্দ উদ্ভাবন করেছিলেন। অর্থাৎএমন ছন্দ যা অভিনেতারা শ্রোতাদের সম্মুখে উদাত্তকণ্ঠে আবৃত্তি করবেন, যে ছন্দের উচ্চারিত ধ্বনিপ্রবাহের উচ্চাবচতায়, মনােভাবের বিচিত্র তরণীগুলি দোল খাবে। এখানেই রিচার্ডসনের আবৃত্তি এবং নাট্য অভিনেতাদের আবৃত্তি শেখানাের অভিপ্রায় সার্থক হল। অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রথম পরীক্ষা হয়েছিল ‘পদ্মাবতী’ নাটকে এবং তারই আবৃত্তি-কবিতার চেহারায় এল ‘তিলােত্তমা। তিলােত্তমা সম্ভবই বাংলায় প্রথম আবৃত্তিযােগ্য কাব্য।

মধুসূদনের সমকালে ইংরেজী কবিতা – আবৃত্তিতে খ্যাতি ছিল ভূদেব মুখোপাধ্যায়  রাজনারায়ণ বসু, মিঃ মেটকাফ এবং আরাে অনেকের।

তার পরবর্তীকালে বাংলা কবিতা আবৃত্তিতে বিশেষ ভাবেই মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু কবির বৃদ্ধবয়সে রেকর্ড করার দরুণ এবং রেকর্ডিং-ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার জন্য এতে কবির। কণ্ঠের পুরাে চেহারাটা ধরা পড়েনি। তবু কবিকণ্ঠ এই আবৃত্তির দলিল হিসেবে এর মূল্য অনেক। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পর আবৃত্তিকার হিসেবে আমরা আংশিকভাবে পাই নাট্যচার্য শিশিরকুমার, নরেশচন্দ্র মিত্র এবং নির্মলেন্দু লাহিড়ীকে। নাট্যচার্য শিশিরকুমার ও নরেশ মিত্র ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটুটে শেক্সপীয়রেরনাটকে অভিনয়ের সুবাদে ইংরেজী কবিতা সংলাপ-আবৃত্তির এক প্রশংসনীয় ধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শােনা যায়, অধ্যাপনা করার সময়ে শিশিরকুমারের শেক্সপীয়র-আবৃত্তির আকর্ষণে দলে দলে বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা বিদ্যাসাগর কলেজে শিশিরকুমারের ক্লাসে এসে জড়াে হ’তেন। তাছাড়া ইউনিভারর্সিটি ইন্সটিট্যুটে শেক্সপীয়রের ‘জুলিয়াস সীজার’এবং মার্চেন্টঅফ ভেনিস ’নাটকে নাট্যাচার্য  ওনরেশ মিত্রর অভিনয় সেকালের বুদ্ধিজীবী, নাট্যমােদী, এমন কি সাহেবদের বিপুল প্রশংসা অর্জন করে।

শম্ভু মিত্রও বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে পড়ার সময়ে একটুআধটু ইংরেজী কবিতা আবৃত্তি করেছেন। উৎপল দত্ত তাে ইংরেজী কবিতা আবৃত্তিতে রীতিমতাে চোস্ত ছিলেন। কাব্যময় সংলাপ-আবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনি পাশ্চাত্য ঘরানাকেই অঙ্গাঙ্গি করে নিয়েছিলেন।

শিশিরকুমার নিজেই বলেছিলেন, রবীন্দ্র কবিতা-আবৃত্তিতে তিনি সকল স্নায়ুর আনন্দ’ অনুভব করতেন। তার রবীন্দ্র-কবিতা আবৃত্তির যে রেকর্ড পাওয়া যায় তাকে বিচারের কোনাে মাপকাঠি হিসেবে ধরলে ভুল হবে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :তখন রেকর্ডিং তত ভাল হত না — মানে তার গলার ব্যাপ্তিকে ধরার মতাে হত না।

তাছাড়া নাট্যচার্য ব্যক্তিগতভাবে মাইক্রোফোন ব্যবহারটাকে খুব একটা সুনজরে দেখতেন না, বুঝতেনও না। শ্রীচট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে লিখেছেন :মঞ্চের ওপর মঞ্চের উপযােগী মাপে যখন উনি রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, বৈষ্ণবকাব্য, সংস্কৃত কাব্য,কী শেক্সপীয়র আবৃত্তি করতেন, তখন শ্রোতার কাছে সেটা অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়াত। শিশিরকুমারের আবৃত্তিতে তার অসামান্য কণ্ঠ ও সুন্দর উচ্চারণ তাে কাজ করতই, তার উপর যে ব্যাপারটা শ্রোতাকে উদ্বেল করত, সেটা হ’ল তার আবৃত্তির মধ্যে একধরনের নাটকীয়তা।

রােমান্টিসিজমকে যে অর্থেবিস্ময় বােধের নবজাগরণ বলা হয়েছে, খানিকটা সেইরকম বিস্ময়বােধ তার আবৃত্তিকে ক্ষণে ক্ষণে অভাবনীয়ের অপ্রত্যাশিতের চমকে উজ্জ্বল করে তুলত। তার প্রখর মননশীলতা ও সুগভীর সাহিত্যবােধ আবৃত্তির সময় কবিতাটির যেন নতুন সব অর্থ, অভিনব কিছু কিছু ব্যঞ্জনা করতে থাকত। এর মধ্যে নাটকীয়তার যে উদ্ভাস ছিল তা কিন্তু কখনােই খেলাে সস্তা নাটুকেপনার চাতুরী নয়।

প্রসঙ্গত বলা যায়, নাট্যাচার্যের এইসব পারফরমেন্সের প্রতি মুগ্ধতা পরবর্তীকালে শম্ভু মিত্রকেতার নিজস্ব রাস্তা তৈরী করার ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুপ্রেরণার কাজ করেছিল। যদিও শম্ভ মিত্রের আবৃত্তিতে তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা, নতুন নতুন আবিষ্কার, ভিন্নখাতের নিষ্ঠ শিল্পনৈপুণ্য অনেকাংশেই দর্শক-শ্রোতার কাছে তাঁকে অনেক বেশি গ্রহণীয় করেতলেছিল – একথা বলা বােধ হয় অন্যায় হবে না। ঋণ ছিল, ভিত গড়ে উঠেছিল বিশেষত নাট্যাচার্যের 

আবৃত্তি, উচ্চারণ ও বােধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে – একথা স্বয়ং শম্ভ ‍ু  মিত্রও মনে মনে অনুভব করতেন।এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত নট কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি উক্তি স্মরণযােগ্য। শিশিরকুমার সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৮৯ সালে আমাকে বলেছিলেন :আপাতভাবে আমাদের অভিনয় দেখে মনে হবে না যে নাট্যাচার্যের কোনাে প্রভাব আছে। কিন্তু প্রভাবটা কেমন জানেন, প্রতিটি নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে।

এই নিঃশ্বাসের শক্তিতেই কাব্যময় সংলাপ এবং কবিতা আবৃত্তির ক্ষেত্রে শিশিরকুমার প্রবর্তিত ধারা থেকেই শম্ভ ‍ু  মিত্র এক মৌলিক বিশিষ্ট ধারার সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তার নিজস্ব প্রতিভার জোরেই – যার মধ্যে ছিল তার দীর্ঘকালের অধ্যবসায়, আবিষ্কার এবং গভীর অনুভূতির রসে জারিত কাব্যবােধ। এই হিসেবে শম্ভ ‍ু মিত্রের মধুবংশীর গলি’ আবৃত্তি থেকেই সত্যিকারের এক প্রাণময় আবৃত্তির ধারার সূত্রপাত,

যা নাট্যাচার্যের উত্তরাধিকারকে আরও ব্যাপকভাবে প্রসারিত করে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেবলে আমার মনে হয়। যাই হােক, এ বিষয়ে পরে আরও বিশদ আলােচনা করা যাবে। এখন ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য আমরা শিশিরকুমারের কালের আরাে দুজন অভিনেতা-আবৃত্তিকার সম্পর্কে কিছু কথা বলার চেষ্টা করি।

ইউনিভার্সিটি ইন্সস্টিট্যুটে ইংরেজী নাট্যাভিনয়ে শিশিরকুমারের প্রতিস্পর্ধী প্রতিভার পরিচয় রেখেছিলেন তারই সহপাঠী অভিনেতা নরেশচন্দ্র মিত্র। কিন্তু রেকর্ডে বা চলচ্চিত্রে বা অন্য কোনাে জায়গায়  তাঁর আবৃত্তির কোনাে নমুনা আমরা পাইনা—পাইনা এ সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর কোনাে প্রতিবেদন। সুতরাং এ বিষয়ে আলােচনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিশিরকুমারের সমকালে রঙ্গমঞ্চের সুকণ্ঠী আর এক অভিনেতার কথা এ প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। তিনি হলেন নির্মলেন্দু লাহিড়ী। সেকালে সিরাজদৌল্লা’ নাটকের নাম ভূমিকায় তার অভিনয় অনেকের মনেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

রেকর্ডে শুনেছি তার রবীন্দ্র কবিতা দেবতার গ্রাস’এর আবৃত্তি।এ আবৃত্তিতে নাটকীয়তার প্রাবল্য,একধরনের শ্রুতিকটু সুরের ব্যবহার এবং শব্দ-উচ্চারণে একধরণের টেনে টেনে স্টাইলাইজড প্রয়ােগরীতি লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য রেকর্ড-এর সীমাবদ্ধতার জন্যে এমন মনে হয়েছে কিনা-তাও বােধ হয় ভেবে দেখা দরকার। প্রখ্যাত নট ও নাট্য-পরিচালক উৎপল দত্ত একজায়গায় লিখেছেন :আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি নির্মলেন্দু লাহিড়ী মহাশয়ের অভিনয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব তার (শম্ভ ‍ু  মিত্রর) অভিনয়ে রয়েছে।

এক্ষেত্রে অবশ্য অভিনয়ের কথা বলা হয়েছে – আবৃত্তির কথা বলা হয়নি। তবু আমরা দেখি,অভিনেতা নির্মলেন্দু লাহিড়ীর অভিনয় সম্পর্কে শম্ভু মিত্রের আংশিক হলেওমুগ্ধতা ছিল। সম্মার্গ সপর্যা’ গ্রন্থে ‘কিছু পুরনাে কথা’ শীর্ষক স্মৃতিচারণে শম্ভ ‍ু মিত্র লিখেছেন : আর একটা অভিনয়ের কথা মনে পড়ে। নির্মলেন্দু লাহিড়ী মহাশয়ের সিরাজের ভূমিকা।

সিরাজ তার অমাত্যদের কাতর ভাবে বােঝাবার চেষ্টা ক’রছে, আবেদন করছে মাতৃভূমির সম্মান রক্ষার জন্যে। বলতে বলতে সে বলে :এ বাংলা হিন্দুর না,এবাংলা মুসলমানের না, মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি এই বাংলা। একথা খুব বােঝানাের মতাে ক’রে, খুব যুক্তির মতাে করে বলা যেত, কিন্তু নির্মলবাবু বললেন দোলা দিয়ে আবৃত্তির মতাে করে। এ-বাংলা হিন্দুর না —দমনা নিয়ে গলাটা  আর এক পর্দা তুলে বললেন –এ-বাংলা মুসলমানের না – তারপর তেমনি দম না আরাে তুলে বললেন, মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি তখনাে দম না নিয়ে চিৎকার করে বললেন – গুলবাগ এই বাংলা।

আমি অনুভব করলুম যে দর্শকদের মধ্যে যেন একটা বিদ্যুতের শিহরণ খেরে গেল। আমার নিজের বুদ্ধি-এই অভিনয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ক’রল,কিন্তু আমার মাংসপেশী, আমার স্নায়ুতন্ত্রী যেন মােহগ্রন্থ হ’ল। এরপরে অনেকদিন এইটাকে পরীক্ষা করবার জন্য আমি আমার অনেক বুদ্ধি-অভিমানী বন্ধুদের কাছে নির্মলবাবুর নকলে অভিনয় করে দেখেছি, তাদেরও গায়ে কাটা দেয়। কেন দেয়? কোনাে গূঢ় অবচেতন অনুভবে কি ঘা দেয় ? সে অনুভব কোথা থেকে লব্ধ? কৌমের অবচেতনা থেকে ? মীথজাতীয় অবচেতন উপলব্ধি থেকে ? শারীরিক গ্রন্থি নিঃস্রাবের সঙ্গে এর যোগটা কিভাবে হয়?

দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছে যে, অভিনয়ে একটা শারীরিক দিক আছে।আমার শরীরে একটা রাসায়নিক দ্রব্য বাড়িয়ে দিলে মনেরও পরতার একটা প্রভাব ঘটে, যেমন ইনজেকশনে আমাকে নাকি অকারণ সন্ত্রস্ত ও অক্রমণােন্মুখ করে তােলা যায়। মেনি কোনাে একটা প্রক্রিয়া হয়। এইসব অভিনেতাদের সৃষ্টিতে। এবং সেটা বােধ হয় ঘটে এক-একটা ঘটনা সম্পর্কে তাঁদের বিশ্বাস তাদের সত্তার মূল পর্যন্ত প্রােথিত থেকে তাদের প্রকাশের ভঙ্গিকে অনুপ্রাণিত করে বলে।

শম্ভু মিত্র তার মুগ্ধতা সত্ত্বেও এইধরণের অভিনয়কে ‘দর্শক মাতানাের এক একটি বিশিষ্ট নিদর্শন’বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এই ধরনের অভিনয় পদ্ধতিকে তিনি অন্তর থেকে গ্রহণ করেননি। বরং তাঁকে বেশি মুগ্ধ করেছিল শিশিরকুমারের যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণী যুক্তিনিষ্ঠ নান্দনিক পরিমিতি বােধ ব্যাপকভাবেই বজায় ছিল। কবির কবিতাকে অন্তর দিয়ে অনুভব করতেন তিনি। আত্যন্তিক চেষ্টা করতেন কবিতার মর্মে পৌঁছবার।

এক্ষেত্রে কবিতার ভাব, ছন্দ, মাত্রা, উচ্চারণ, আবৃত্তির গতি, চলন, আরােহণ, অবরােহণ, প্রবাহমানতা এবং আবেদন সৃষ্টির জন্য তিনি নানা অনুশীলন করেছেন দীর্ঘকাল। জনৈক আবৃত্তিকারের কাছে শুনেছি, তিনি নাকি হারমােনিয়ামের রিড টিপে গলাটাকে ঠিক স্কেলে বেঁধে রাখবার চেষ্টা করতেন। তার লেখা থেকেই একটি অংশ এখানে উল্লেখ করা যায়  ।

শ্রুতি মাপবার কোনাে উপায় আজ পর্যন্ত ভাল করে হয়নি বােধ হয়। তবে বিদেশে ভাষা শেখবার ইস্কুলে উচ্চারণ দেখিয়ে আমাদের কানের ওপরেই নির্ভর করতে হবে। এবং সেটা খুব একটা লােকসানের কথাও নয়, কারণ কে শিল্পী হবে আর কেহবে না সেটা অনেকটাই তাে তাদের নিজেদের কানেরও বােধের উপরেই নির্ভর করে।

এইবারে প্রশ্ন হল, ঐ শ্রুতিগুলাে কণ্ঠে স্পষ্ট করে আনবার জন্যে কী ব্যায়াম করা উচিত।

বহুবৎসরআগেআমি বােধহয় কোথাও লিখেছিলুম যে, হারমােনিয়ামে যাকে ক্রোম্যাটিক স্কেল বলে অর্থাৎ সা ঋ রে জ্ঞা গা, অর্থাৎ প্রত্যেকটা পর পর পর্দার ওপর গলাটা চালিয়ে ব্যায়াম করা। এবং মীড়। ধরা যাক, সা থেকে গা-য়ে গলাটা, কিন্তু অন্তবর্তী সমস্ত পর্দাগুলােকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এইভাবে ব্যায়াম করতে করতে বােধহয় অন্তর্বতী শ্রুতিগুলাে সাবলীল হয়।

দ্বিতীয় হ’ল উচ্চারণ স্পষ্টতা। সংস্কৃত থেকে আমরা ব্যঞ্জনবর্ণ সাজানাের যে ছক পেয়েছি, সেটা উচ্চারণ স্পষ্টতার পক্ষে অতুলনীয়।

শম্ভ ‍ু মিত্র লিখেছেন : ভাষাটাই স্বরগ্রামের সঙ্গে জড়ানাে, ভাষার প্রত্যেকটি শব্দের এক বা একাধিক বিশিষ্ট উচ্চারণ পদ্ধতি আছে। তেমনি বাক্যেরও। সেই স্বরগ্রাম ব্যবহার হলেই শ্রোতার কাছে কথার রূপও অর্থ সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়। সেই শব্দ লিপ্ত ভাষারই এক সর্বজনীন ভাড়ার আছে আমাদের চেতনায়।…এবং এ-কথা তাে নিশ্চিত যে, ভাষাটা জন্মায় আওয়াজে ।

তাই সেই আওয়াজেরও একটা সমবেত সর্বজনীন ভাড়ার থাকে। আর সেই ভাড়ারের ছক অনুযায়ী আমরা বুঝি কে অভিমানে বলল, আর কে ব্যঙ্গ করে বলল।এবং এই যে কথােপকথনের ছক সেটা আবার দশ বছর কি বারাে বছর নাগাদ আবার বদলে যায়। পুরােনাে কিছুছক হারিয়ে যায়, আর নতুন কিছু ছক তৈরী হয়। শম্ভু মিত্র আরাে বলেছেন : যারা শব্দের কারবারী তাদের এটা বােঝাবার খুব দরকার।

কারণ প্রত্যেক যুগে কল্পনা আর বাস্তব একটা খুব সূক্ষ্ম জায়গায়। পরস্পরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। সেই মিলটা যে-শিল্পী জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ধরতে পারে সে। সেই যুগটাকে নিজের বেরিয়েও যায়। কেবল সেই শিল্পী হয়তাে নিজেকে সহজ করে, মুক্ত করে পরবর্তী সময়টারও অন্তরে প্রবেশ করতে পারে। এরজন্য যে প্রচণ্ড লড়াই আর প্রচণ্ড ক্ষমতার দরকার হয় তার একমাত্র আশ্চর্য উদাহরণ হ’লরবীন্দ্রনাথ।

দেখা যায়, আমাদের দু-প্রকারের কণ্ঠ আছে। এক সাধারণ কথাবার্তার। আর এক গভীর উপলব্ধির কথা বলার। সেটা সবযুগের পক্ষেই বােধহয় সত্যি। শেক্সপীয়র পড়েও তাই তােমনে হয়।

শম্ভু মিত্রের মতে :সুকণ্ঠ মানে বােধহয় দুটো জিনিস। অন্তত লােকের কথাবার্তায় আমার তাই মনে হয়েছে। এক উচ্চারণ স্পষ্টতা আর কণ্ঠে ধ্বনিবৈচিত্র্য ।

আমার যতদূর স্মরণহয়,‘অভিনয় নাটক মঞ্চ ’গ্রন্থে তিনি লিখেছেন :প্রত্যেককণ্ঠকে তার স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা থেকেই নতুন উত্তরণের রাস্তায় নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে গলা অনাবশ্যকভাবে ভারী ও গম্ভীর করার জন্য আরােপিতভাবে খাদে নামিয়ে এনে বলার চেষ্টা কষ্ঠের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে – কেননা এতে ল্যারিংসের ওপর অতিরিক্ত চাপের ফলে ভবিষ্যতে কণ্ঠ কর্কশ ও শ্রুতিকটু হয়ে পড়ে।

ঐ গ্রন্থে শম্ভ ‍ুবাবু বলেছিলেন, গলার রেঞ্জ বাড়াবার কথা। এই রেঞ্জ বাড়ানাে মানে চিৎকার করা নয়, কণ্ঠের সুষম বিস্তার, দমের পরিধি বাড়ানাে,কণ্ঠের স্বাভাবিক উপাদানের সৌন্দর্যকেই আরাে বাড়িয়ে তােলা।এবং এই অনুশীলনের পর্বে পর্বে থাকে নতুন নতুন সক্ষমতার আবিষ্কার, আর বােধহয় এরই কোনাে এক পর্যায়ে আছে অচেতনভাবে চার্জ হয়ে যাওয়ার অবস্থা।

এই অবস্থায় এমন মডুলেশন না-চেনা আলােকে বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠে। শম্ভ ‍ু মিত্র একে বলেছেন, ‘ভেতরের কোনাে এক অজ্ঞাত কার্যকারণের যােগে আচমকা একটা প্রকাশ। এই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারিত কথাগুলাে যেন একটা নতুন রঙ পায়, আবেগের তীব্রতায় যেন একটা মন্ত্রের মতাে গভীর হয়ে ওঠে।

শম্ভু মিত্রের নিজের লেখা থেকেই জানতে পারা যায় যে ১৫ বছর বয়স থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি নিয়মিত দৈনিক দু’ঘন্টা, বেশিরভাগ সময়েই তিন-চার ঘন্টা গলা তৈরীর জন্য খাটতেন। গলা তৈরী করতে গিয়ে তার মনে হয়েছিল, কবিতার সাহায্য নেওয়া দরকার।

কবিতা আবৃত্তি করতে গিয়ে মনে হ’ল অনেক বিচিত্র অনুভূতিকে স্পষ্ট করবার দরকার। এবং এই অনুভবগুলােকে প্রকাশ করতে দিয়ে তার গলা, প্রকাশভঙ্গি একটা নিজস্ব সত্ত্বা পেতে লাগল। এখানে তার ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব তৈরী হয়েছিল যে, এই সত্ত্বাটা কি তার মধ্যে সুপ্ত ছিল, নাকি অন্য শিল্পীদের মানসতার ওপর আরােপিত হচ্ছে ? অর্থাৎ এখানে তিনি নিজের পরিচয় সন্ধানের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।

এবং এখান থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, শিল্পের সমস্ত প্রকাশভঙ্গিই আসল মানুষটার থেকে একটা পিণ্ড, যার কোনাে আদি অন্ত দেখতে পাওয়া যায় না। এবং যেটুকু দেখা যায়, সেটুকুও প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। ফলে যে-মুহূর্তে মানুষ একটা প্রকাশভঙ্গিকে আশ্রয় করে সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রকাশভঙ্গিই মানুষটার পরিচয়কে সংকীর্ণ করে । শুধু তাই নয়, সেই প্রকাশ ভঙ্গিই তার নিজস্ব ফর্মের লজিক-এ ছােট জমির ওপরে একটা বিরাট -এর মতাে উঁচু হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ বস্তুর সীমায় মধ্যে থেকে যায় শুধু বস্তুর অতীত এক অসীমে বিলীয়মান অসূর্যম্পশ্যার মতাে ছোঁয়ার বাইরে শূন্যের দখলহীন প্রান্তের মতাে শিল্পীকে অসহায়ক’রে তােলে। কবি নিজেও এই অভিজ্ঞতার শরিক। যা তিনি অনুভব করেন, সেই span- এ  কবিতাকে সম্পূর্ণ আঁট করে ধরা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

কিছু কিছু রশ্মি, কিছু রং, কিছু সংকেত, কল্পনার ব্যাপক হাতছানির ক্ষীণ কিছু অংশ ভাষায় ধরা পড়ে — অনেকটাই থাকে অধরা। এবং সেই অধরার প্রান্তটি ধরার সীমানা থেকে অনেক হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে ঝলমলেভাবে ছড়ানাে।

শিল্পী-জীবনের নানা পর্বেনানা পরাজয়, অসফলতা সত্ত্বেও শিল্পের প্রতি শম্ভ ‍ু মিত্রের আত্যন্তিক টান তাকে প্রতিদিন গভীর থেকে গভীরতমের দিকে নিয়ে গেছে। এবং এই গভীরতায় তিনি পৌঁছতে চেয়েছিলেন নিজস্ব আঙ্গিকেই, পরের কাছে ধার-করা আঙ্গিকে নয়।

প্রসঙ্গত বলা যায় শম্ভ ‍ু  মিত্র যখন শিল্পচর্চা শুরু করেন অর্থাৎ ১৯৩০ সাল—তখন। নাট্যাচার্যশিশিরকুমারের খ্যাতিও প্রতিষ্ঠা ছিল তুঙ্গে। ১৯৪০ সালে তিনি শিশিরকুমারের সংস্পর্শে এসে নানান নতুন বিস্ময়কর প্রয়ােগরীতির অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে থাকেন।

শিশিরকুমারের কাব্যময় নাট্যসংলাপ আবৃত্তির বিশিষ্ট ধারাটি তার চিন্তার মধ্যে ছায়া ফেলতে শুরু করে। এছাড়া সমকালীন অভিনেতাদের মধ্যে নট নির্মলেন্দুলাহিড়ীর আবেগপূর্ণ অভিনয় ওঠার মনােজগতে আলােড়ন সৃষ্টি করতে থাকে।

শম্ভ ‍ু মিত্র এই দুই পূর্বসূরির সৃষ্ট পথ ধরে চলতে চলতেই তৃতীয় এক মৌলিকবলিষ্ট ধারার সংযােজন করেছিলেন বাংলা কবিতা-আবৃত্তিতে যার ভিত্তিতে ছিল তার প্রখর কাব্যবােধ এবং নাট্যাচার্য শিশিরকুমারের বিশ্লেষণী কাব্যপাঠের ধারার অভিজ্ঞতা – তাছাড়া তাঁর সমকালীন কবি-বন্ধুদের নতুন ধারার কাব্য মানসিকতাও এক্ষেত্রে অনেকখানি প্রেরণার কাজ করেছিল—এ-কথা নিৰ্দ্ধিধায়ই বলা চলে।

  • টোনাল ভয়েস-কোয়ালিটিতে নির্মলেন্দু লাহিড়ীর সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও শম্ভ ‍ু তাঁর নিজস্ব বাচনভঙ্গি, উচ্চারণ এবং প্রয়ােগ-বিন্যাসের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন তার নিজেরই প্রতিভার জোরে।
  • শব্দের জোর এবং মডুলেশন-এর ক্ষেত্রেতার পারঙ্গমতা এক বিস্ময়কর জায়গায় পৌঁছেছিল —যা নাট্যাচার্যও নির্মলেন্দু লাহিড়ীর প্রয়ােগরীতি থেকে সম্পূর্ণভাবেই ভিন্ন স্বাদের এবং যার মধ্যে দিয়ে রচিত হয়েছিল প্রচলিত ঘরানার ব্যাপক সংশােধনের মাধ্যমে  আবৃত্তির সার্থক শিল্পায়নের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। বস্তুত আবৃত্তি যে পারফর্মিং আর্ট হিসেবে দর্শক-শ্রোতার নান্দনিক আকাঙ্ক্ষাকে তৃপ্ত ক’রতে সক্ষম, তা বােধহয় শম্ভ ‍ু মিত্রের সময় থেকেই আমরা অনুভব করতে শুরু করি।
  • প্রথমদিকে গণনাট্য সঘের পতাকাতলে এর সূচনা হলেও শম্ভ ‍ু  মিত্র তার নৈপুণ্যকে জন জাগরণের অঙ্গন থেকে ক্রমশই কাব্যবােধের জাগরণের দিকে প্রসারিত করেছেন। পরবর্তীকালে বহুরূপী’ প্রযােজিত নাটকের ক্ষেত্রেও তিনি এইভাবে ক্রমশই জনজাগরণকে রাজনৈতিক-আবর্ত থেকে সরিয়ে এনে বৃহত্তর গভীর সত্যানুসন্ধানের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন। এবং এক্ষেত্রে কাব্যময় নাটকের দিকে তার টান যে খুব বেশি পরিমাণেই ছিল, তা বলা বােধহয় অন্যায় হবেনা।
  • কবি গােলাম কুদুসের ইলা মিত্র’কবিতা দিয়ে শুরুক’রে শম্ভ ‍ু  মিত্র জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর মধুবংশীর গলি’আবৃত্তির মাধ্যমে আবৃত্তিজগতে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং এই জনপ্রিয়তা আজ এতকাল পরেও অম্লান।

এই ‘মধুবংশী গলি’ সম্পর্কে শম্ভু মিত্র তাঁর ‘সন্মার্গ সপর্যা’ গ্রন্থের মাহেশে’ শীর্ষক রচনায় লিখেছেন : মধুবংশীর গলি’মধ্যবিত্তের কবিতা। ক্ষুব্ধহতাশা আর একটা চোখ-জ্বালাকরা বিশ্বাস,ক্লান্তিআর একটা ঠোট টেপা প্রতিজ্ঞা,এরই প্রকাশ এই কবিতায়। এই ছকটা এমননি গৃঢ়ভাবে মধ্যবিত্তমনের কাছে জানা যে, সে মধ্যবয়সী ডেলিপ্যাসেঞ্জার  কেরানিই হােক, মণিহারী দোকানিই হােক বা খুব নাক- উচুঁ ইনটেলেকচ্যুয়ালই হােক—

একক কবিতার আবৃত্তি তাঁর ভাল লাগতে বাধ্য, এটা যেন নিয়মের মতাে চালু হয়ে গিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। এই কবিতা সম্পর্কে এক স্মৃতিচারণে শম্ভ ‍ু মিত্র লিখেছেন, (বটুকদা,বিজনও আমি’ সন্মার্গসপর্যা/পৃ: ২০৭-২০৮) মনে আছে প্রথম যেদিন ‘মধুবংশীর গলি’আবৃত্তি করি। বােধহয় বাগবাজারে কোনাে বাড়িতে। কি যেন একটা সভা-গােছের ছিল সেখানে।এই সভায় এক রাজনীতির ভদ্রলােক ছিলেন যিনি বােন্ধা ব’লে খ্যাতিমান ছিলেন সেই সময়ে ।

পড়ে গেলুম পুরাে কবিতাটা । কিন্তু তিনি বা তার সাঙ্গপাঙ্গদের মুখ দেখে আমাদের মাথা যেন হেঁট হয়ে গেল। নিজেদের বােকার মতাে লাগল। সৌভাগ্যক্রমে সেই গৃহস্বামী তার নাম যতদূর মনে পড়ে, জগদ্ধাত্রীবাবু—তিনি উঠে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন।..এ কবিতা নিয়ে (পরে) অনেক হই-হই হল। আর তখন একদিন সেই বােদ্ধা ব্যক্তি কি ভূয়সী প্রশংসাই না করলেন আমাদের দু’জনের  (অর্থাৎ শম্ভ ‍ু মিত্র ও জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের)।

উমা সেহানবিশ শম্ভ ‍ু  মিত্রর ‘মধুবংশীর গলি’আবৃত্তি সম্পর্কে লিখেছেন :আমার মনে আছে প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হ’ত (নবান্ন’নাটকের মতো) শম্ভ ‍ু বাবুর কণ্ঠে মধুবংশীর গলি’র আবৃত্তিশুনে। বটুকদার এই কবিতা সফিসটিকেটে ভাষায় লেখা। শম্ভ ‍ু বাবুর কণ্ঠে উচ্চারণে হাজার হাজার মানুষের সামনে প্রতিটি শব্দ জীবন্ত হয়ে উঠত।

সেই সময়কে (যখন পি.সি.যােশি, বিষ্ণু দে,সুশােভন সরকার, বিজন ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রভৃতি বিশাল ব্যক্তিত্ব চারপাশে) যাঁরা জানেন না, চেনেন না, তাদের পক্ষে বােঝা সম্ভব নয়, কী গভীর প্রতিক্রিয়া হত আমাদের মধ্যে ওই আবৃত্তি শুনে। নাটকের মতােই আবৃত্তির ক্ষেত্রেও শম্ভ ‍ু বাবু নতুন একটা স্বাদ নিয়ে এসেছিলেন।

শম্ভ ‍ু মিত্রের আবৃত্তি সম্পর্কে আরাে একটি স্মৃতিচারণে উমা দেবী লিখেছেন :সম্ভবত চার-এর দশকের শেষ নাগাদ ২৫শে বৈশাখ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ 

আবৃত্তি করলেন। রবীন্দ্র কণ্ঠের আবৃত্তির বিশেষ ভঙ্গির অনেকটাই ধরা ছিল প্রশান্তচন্দ্রের কণ্ঠে। আমাদের বেশ ভাল লাগল। তারপর শম্ভুবাবুর  কণ্ঠের আবৃত্তি ভিন্ন এক তৃপ্তি এনে দিল প্রেক্ষাগৃহে । মনে আছে, প্রশান্তবাবুও সেকথা বলেছিলেন। আমার যতদূর মনে হয় বাংলায় রবীন্দ্র-কবিতার সম্মিলিত আবৃত্তির অনুষ্ঠান উনিই প্রথম করেন। শান্তিনিকেতনেও তার আগে শুনিনি।

কবি সুভাষ মুখােপাধ্যায় তার দায়বদ্ধ শিল্পী ’নিবন্ধে লিখেছেন :৪৬ নম্বরে, তাছাড়া নানা অনুষ্ঠানে শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি শােনার সুযােগ ঘটেছিল, রবীন্দ্রনাথ বলেতেন, তবে অসাধারণ বলতেন জ্যোতিরিন্দ্রর মধুবংশীর গলি’। শম্ভু মিত্রের রবীন্দ্র-কবিতা ‘উদাসীন’আবৃত্তি সম্পর্কে শিবনাথ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :বহুবার পড়া চেনাজানা কোনাে কবিতা শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে শুনে নতুন দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হয়েছি কতবার ।‘তােমারে ডাকিনু যবে কুঞ্জবনে,তখনও আমের বনে গন্ধ ছিল..’।

শম্ভু মিত্রর হিরন্ময় কণ্ঠের সেই পাঠে ধরা পড়ত এমন এক অনুভব যা এত তীব্রভাবে আগে কখনও টের পাইনি।… আরাে কত অসংখ্যবার তারকাব্যপাঠ আমাদের শিক্ষিত করেছে, সংবেদনশীল করেছে তার কোনাে লেখা-জোখা নেই। সত্তার গভীরতম তলদেশ থেকে উচ্চারিত হ’ত প্রতিটি শব্দ, তাতে লেগে থাকত উজ্জ্বল আন্তরিকতার ছোঁয়া। এককালে তার আবৃত্তি ‘মধুবংশীর গলি’ জনগণমনে তুমুল আলােড়ন তুলেছিল।

পরবর্তীকালে হাজারাে অনুরােধেও সেকবিতা পড়েননি অনুষ্ঠানে। আলাপচারিতায় জানিয়েছেন :ওই কবিতার বাণীতে আজ তাঁর আস্থা নিরঙ্কুশ নয়। শিল্পের প্রতি এতটাই অনুগত ছিলেন তিনি।

১৯৯৩-এর ১৪ই মে শুক্রবার আকাদেমি মঞ্চে‘পঞ্চম বৈদিক’আয়ােজিতশম্ভু মিত্রর আবৃত্তির অনুষ্ঠানের এক প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদন দেশ’ পত্রিকার ১৯শে জুন ১৯৯৩ সংখ্যায় লিখেছেন পার্থ বসু। তিনি লিখেছেন :সেদিন শম্ভু মিত্র শুরু করলেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার আবৃত্তি শিরােনাম জানালেন না। কোন গ্রন্থে রয়েছে, তাও জানালেন না ।…কোনাে দরকার ছিল না ।

আমরা শুনেছি এক-একটি শব্দ যেন কোন গহন থেকে উঠে  আসছে ।কী ভীষণ সংবেদনশীল সেইসব শব্দ, যাকে বুঝি আলতাে ভাবে ধরতে হয় বা ব’লতে হয়। মাঝে মাঝে জোর লাগে মুছে গেছে কবে, আবার স্বরকে মন্দ্রসপ্তকে নিয়ে, ‘ঘুম পায় তার পুনরায় জাগায় আবার জাগায় আবার ঘুম পায় তার । কোথাও শ্বাসাঘাতের প্রাবল্য নেই। কোথাও জবরদস্তি নেই। মাঝে কিছু মাত্রা ভাগের সামান্য সতর্কতা চোখ পড়ল, যেটি না করলেও নিরুপায়, যেমন ‘বাতি জ্বেলে জ্বেলে জ্বেলে’ আবার এক অস্ফুট নাটকীয় প্রকাশ মাত্রা ভাগে অনিবার্যতা নিয়ে আসে, তখন আবার যদি হঠাৎ দেখা হয় তােমার-আমার’।

এই যে নাট্যের বিভা এনে শব্দের ওপর অল্পক্ষণে ফেলে রাখা, মনে হয় এর একচুল এদিক-ওদিক হলে জীবনানন্দের কাব্যজগতে প্রলয় ঘটে যাবে। কুয়াশার থেকে দূর কুয়াশার আরও’ তেমনি এক পংক্তি ছিল।…তারপর যখন শুনছি। ‘হাঁসের নীড়ের থেকে খড় পাখির নীড়ের থেকে খড় ছড়াতেছে’, সে তাে শুধু‘র’আরড়’-এর পার্থক্য জিহ্বাগ্রে এসে যায়, তার কোনাে হদিস মেলে না। আবার মাঝে মাঝে পুনরাবৃত্ত হ’তে থাকে জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার তখন আবার যদি দেখা হয় তােমার আমার’। একটিও যুক্ত বর্ণের ব্যঞ্জনা নেই, তাই বুঝি এমন সরল একটি-দুটি পংক্তিতে আবার মনে পড়ে যায়, …এর অব্যক্ত মাধুর্যের মধ্যে কত গভীর বিষাদ।

আর সেই ‘আট বছর আগের একদিন’। সে তাে কবে থেকে শুনছি। বাংলা কবিতা নামের লং-প্লে রেকর্ডেএকপিঠে শেষ আবৃত্তিকার শম্ভু মিত্র, প্রথমে সুধীন্দ্রনাথের (দত্ত)‘উটপাখি’, তারপর জীবনানন্দের সেই ভীষণ দুর্মর কাব্যটি। তখন পর্যন্ত আমরা অভ্যস্ত ছিলাম শম্ভু মিত্রর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ শুনে বিল হতে বহুদূর তীরে কারা ডাকে বাঁধি অঞ্জলি এসাে এসাে সুরে করুণ মিনতি মাখা !’কিংবা যখন বহু বর্ণের ঝংকার শুনে বুকের মধ্যে চমক লাগত, ‘উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডােড্রেনড্রন গুচ্ছ ’অথবা  বিশালাকায় সেই গদ্যকাব্যের মাঝে,‘শােননা তমি কোনাে বরযাত্রার মিছিলে কখনও’–এই সবেই তাে শ্রবণ আ-কৈশাের লালিত হয়েছে।

হঠাৎ সেখানে এল ‘রক্ত ফেনা মাখা মুখে মড়কের ইদুরের মতাে ঘাড় গুজি’ – আমাদের চমক লাগলেও মনে হত, প্রতিটি শব্দ যে ঘৃণিত বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছে, সেখানে কবি শুধু নির্মমনন এই শিল্পীরাও তাকে নির্বিকারভাবে মেলে দিয়েছেন। এত বছর পরে আবার সেই কথাই মনে ফিরে এল।

এক-একটি পংক্তিতে সামান্যতম বিরতি দিয়েই বিষাদঘন প্রতিবেশ এই কবিতায় শম্ভু মিত্র রচনা করে চলেন :‘জানিবার গাঢ় বেদনার’ কিংবা ‘মধু আর মননের মধু অথবা যখন মহাপ্রাণ বর্ণযুক্ত অশ্রুতপূর্ব বিশেষণ করতলে পান শম্ভু মিত্র :প্রধান আঁধারে বা প্রগাঢ় পিতামহী বা অদ্ভুত আঁধারে, এমনকি ঘন শিহরণ, যেগুলােকেতিনি যেন আলাদা আসন বা মর্যাদা দিয়ে থাকেন, আর আমরা দেখতে পাই সেই তমসা।

কখনাে তার কম্পনকে।…আর যেখানে তার আবৃত্তি চরম চূড়ায় পৌঁছয় ? আরাে এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত ক্লান্ত করে’তখন আমরাও অমন কণ্ঠ উচ্চারণ প্রকাশ শুনে যে এই কবির কথাতেই, গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে… জেগে উঠলাম আবার কিংবা হৃদয় ভরে গিয়েছে…বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে।…

শম্ভু মিত্র রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের ‘অপূর্ণ’কাব্যটি দিয়ে।…

যে কথাটি বলবার সেটি হল এই যে, জীবনানন্দ দাশ যখন শােনাচ্ছেন শম্ভু মিত্র, তখন যে-কণ্ঠ যে-উচ্চারণ, যে-শিল্প—তারই তাে অনুবৃত্তি রবীন্দ্রনাথে। কিন্তু মনে হয়নি পুনরাবৃত্তি। জীবনানন্দ তখন মনে হয়েছিল বড় গভীর সরল এবং অবশ্যই সেনসিটিভ; এক গাঢ় অনুভবের স্বর সেখানে শম্ভু মিত্র নিয়ে এসেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ অধিক অলংকৃত, মনে হয় স্বচ্ছতার এবং বৈচিত্র্যবান! রবীন্দ্রনাথ নির্বাচনে শম্ভু মিত্র একটি গানও রেখেছিলেন, এই কথাটা ধরে রাখিস মুক্তি তােরে পেতেই হবে’ দ্বিতীয় একটি ‘চাই গাে আমি তােমারে চাই’ গীতাঞ্জলির গানের আঙ্গিকেই রচিত, কিন্তু সুরহীন।…সেদিন শম্ভু মিত্রর রবীন্দ্রনাথ নির্বাচনটিই মনে হয়েছে দুঃসাহসিক।

পার্থবাবু ঐ প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ঐ অনুষ্ঠানে মাঝে মধ্যে শম্ভু মিত্র কবিতার কোনাে দু-তিনটি স্তবক বা পংক্তি বাদ দিয়ে আবৃত্তি করেন এবং শব্দ অনর্থক দু’বার উচ্চারণ করেন। কেন? বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতি প্রতারণা করতে পারে – এ-বিষয়ে তার মতাে শৃঙ্খলা নিষ্ঠ শিল্পীর কি সতর্ক থাকা উচিত ছিল না? দর্শক-শ্রোতা হয়ত বই দেখে মিলিয়ে নিচ্ছেনা কিন্তু প্রতারিত হচ্ছেন – এটা তাে ঘটনা। তার চেয়ে বই দেখে পাঠ করলেই বা ক্ষতি ছিল কী!

. পার্থ বসুর এই প্রতিবেদনে উচ্ছ্বাস.ও স্তুতির অংশই বেশি, সত্যিকারের মূল্যায়নের প্রয়াস অনেকটাই  ঢাকা পড়ে গেছে, তবু মঞ্চে শম্ভু মিত্রর আবৃত্তির একটা ছবি পাওয়া যাচ্ছে

দেখেই এই নিবন্ধটা থেকে ব্যাপক ভাবেই উদ্ধৃত করা হল – হয়ত বা এই ছবিটি ভবিষ্যৎ গবেষকদের কাজে লেগে যেতে পারে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আবৃত্তি রসিক ব্যক্তিরাও এর থেকে শম্ভু মিত্রর আবৃত্তি একটা চেহারা মনে মনে আঁচ করে নিতে পারবেন। আসলে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি কোনাে অসাধারণ প্রতিভার মূল্যায়নের সময় খােলাখুলি কথা বলতে আমরা দ্বিধাবােধ করি এবং এই জন্যেই সঠিক মূল্যায়ন হয় না ।

অথচ কিংবদন্তি প্রতিভার প্রতি সম্মান দেখানাে হবে তখনই যখন নির্মমভাবে সহানুভূতি সঙ্গে তাঁর সিদ্ধি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা নিরপেক্ষভাবে বিচার করে দেখব।‘চাঁদ বণিকের পালা’-র নাট্যকার সহজে কি অর্চনার ফুল নিবেদন করেছেন ? – আমরা কেন তারই মতাে দৃঢ়তায় তাকে নানান আলােকে-অন্ধকারে সাফল্য-স্থলনের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে যাবার চেষ্টা করব না ?

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত লিখেছেন : গােলাম কুদুসের ইলা মিত্র’ হাটে-মাঠে-বাটে পড়তে হলেও বস্তুত তিনি (শম্ভু মিত্র) রবীন্দ্রনাথের উত্তর আখ্যান পর্বের কবিতা পাঠেই স্বস্তি অনুভব করতেন।

শ্রীদাশগুপ্তের স্মৃতিতেও উজ্জ্বল হয়ে আছে   শম্ভু মিত্রকে নিয়ে একটি আবৃত্তিসন্ধ্যা। তিনি লিখেছেন :আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল ভবানীপুর এডুকেশন সােসাইটিতে একটি সান্ধ্য অনুষ্ঠানের কথা। সেখানে তখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক সমিতির বাৎসরিক অধিবেশন চলছিল। প্রতিদিনই অধিবেশনের শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এক সন্ধ্যায় কবিতা পাঠ করতে এসেছেন শম্ভু মিত্র।

আমাকে চিনতেন, হয়ত সামান্য স্নেহও করতেন। আসরে বসার আগে বললেন, তুমি আমার পাশে সঞ্চয়িতা নিয়ে বসবে আর রবীন্দ্রনাথের উত্তর-পূর্বের কিছু ব্যক্তিগত উচ্চারণের কবিতা বেছে দেবে।…চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসলাম। তিনি বসতেই প্রচণ্ড একচোট হাততালি। তাঁর প্রসন্ন মুখ হিটাইট যাজকের মতাে কঠিন হয়ে গেল। তারপরই শ্রোতাদের পক্ষ থেকে হুকুম আসতে লাগল, সহজেই কান-টানা এটা-ওটা কবিতা পড়াব।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর সব কিছুকে তুচ্ছ করে তিনি শুরু করলেন নিরুদ্দেশ যাত্রা’,তারপরই শেষ বসন্ত। পর পর ক্ষণিকার তিনটে কবিতা। ঘুরে বেড়াতে লাগলেন আরােগ্য’, ‘সানাই,‘সেঁজুতি’র নাতি-আলাে নাতি-অন্ধকারে এবং শেষ করলেন : দুঃখের আঁধার বারে বারে এসেছে আমার দ্বার দিয়ে। |

শ্রীদাশগুপ্ত একবার শম্ভু মিত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন : আপনি বড়জোর প্রেমেন্দ্র মিত্র বা জীবনানন্দ দাশ –এঁদের পর আর কারাের কবিতা পাঠ করেন না কেন? এর উত্তরে শম্ভ মিত্র বলেছিলেন :আদ্যন্ত রাবীন্দ্রিক হওয়ার ফলে, যে কবিতায় লিরিকের সুর ও অভিজ্ঞতার দর্শন লাগেনি বলে অন্তত তার মনে হয়, সেকবিতা তিনি বুঝতে পারেন না, পড়তেও পারেন ।

এ-প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই আসে – এত বিশাল মাপের একজন আবৃত্তিকারের পক্ষে এই সংকীর্ণ গণ্ডির সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত কি না ? লিরিকের সুর এবং অভিজ্ঞতার দর্শন কি তাহলে পরবর্তীকালে কবিতায় নেই। শম্ভু মিত্র কি এ-ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন?—নাকি পরবর্তীকালে কবিতা সম্পর্কে তিনি তেমন কোনাে আগ্রহ অনুভব করেননি ?

 

১৯৯৪ সালে বেতারের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার-এর সময় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন পরবর্তীকাল সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার কথা এবং এই উদাসীন থাকার দৃঢ় কোনাে যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। শম্ভু মিত্র কি তাহলে কোনাে এক জায়গায় থেমে গিয়েছিলেন? আমি বলব,অবশ্যই। হয়ত তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি সংগ্রামদীর্ণ,ক্লান্ত।

মহারাষ্ট্র নাট্য জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অশােক সাহানীকে তাে স্পষ্টই তিনি বলেছিলেন কঠিন ভাষায় যে কোনাে একজন একদা  বিষ্ঠার পাত্র ব’হে ছিলেন ব’লে চিরকালই তাকে বিষ্ঠার পাত্র বহে যেতে হবে? – এ কি উপমা ?

তাহলে এতকালের সাধনা বিষ্ঠার পাত্র বহনের নামান্তর ছিল ? আমার মনে হয় এক ধরনের অহংকার, নৈরাশ্য, সিনিসিজম এবং‘ডিসলােকেশন অফ থটস্তকে আদ্যন্ত জড়িয়েছিল এবংএর থেকে উদ্ধারের রাস্তা তিনি খুঁজে পাননি। একসময় শম্ভু মিত্র আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথের ‘লীলাসঙ্গিনী, ‘নীলমণিলতা’, জন্মান্তর’, শেষবসন্ত’ এবংনজরুল-এর ফাল্গুনী’। পরবর্তী কালে তিনি জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রর কবিতা আবৃত্তি করেছেন।

কবিতা আবৃত্তি করার সময় অনেকে বাদ্যযন্ত্র বা নেপথ্যসংগীত ব্যবহার করেন এ-বিষয় শম্ভু মিত্রের মত জিজ্ঞেস করতে ১৯৭৮-এর ২২শে এপ্রিল রবীন্দ্রসদনে ‘রসকলি’ আয়ােজিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন :কী জানি কেন, আমার মনে হয় কথাগুলাে হারিয়ে যাবে। তাই বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের কথা আমার মনে হয়নি।

কেউ যদিলাগান এবং শুনে যদি যাকে বলে রসােত্তীর্ণ মনে হয়, যদিও সেটা যে কী তা কেউই ডিফাইন করতে পারেন না, তবুও বলি, যদি রসােত্তীর্ণ হয় তাহলে খুব ভাল, আর না হলে ভাল নয়।

বর্তমানে মাইম, নৃত্য, ভিস্যুয়াল ইমেজমিশিয়েকবিতার আবেদন কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে কেউ কেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ফলাফল কি হচ্ছে তার বিচার পরে, কিন্তু আবৃত্তির চলমানতা ক্ষুন্ন হচ্ছে—একথা নিৰ্বিায়ই বলা যায়। তাছাড়া এই বিশাল কর্মকাণ্ডের জন্য স্বাভাবিকভাবেই টিকিটের দাম এত চড়া হচ্ছে যেতা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

শুধুমাত্র কণ্ঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের জয় করতে হলে আবৃত্তিকারদের অন্যের আত্মবিশ্বাস ও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী হতে হয়। অপরদিকে সংগীত প্রভৃতির ব্যবহারে কণ্ঠসৌকর্য যে কিছুটা ঢাকা পড়ে—এ-কথা বােধহয় অস্বীকার করা যায় না। কবি অরুণ মিত্র আবৃত্তিকারদের যে-স্বাধীনতা, এমনকি স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযােগ দিতে চেয়েছেন—অল্প কয়েকজন ক্ষমতাবান আবৃত্তিকারের মধ্যেই সীমিত থাকলে ভাল।নইলে স্বেচ্ছাচারিতা পদস্খলনের রাস্তায় চলে যাবার সম্ভবনা।

কিন্তু বর্তমানে শিল্পবােধ সম্পন্ন অসাধারণ মানের আবৃত্তিকার তেমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না। নবীন আবৃত্তিকারদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে ঐ সাক্ষাৎকারে শম্ভু মিত্র বলেছিলেন : এঁদের গলাটা শুনতে বেশ ভাল হওয়া দরকার। গলাটা কি করে বাড়বে তা আমাদের সময়ে বড়রা বলে দিতেন। বলতেন, মেঘনাদবধ আবৃত্তি কর। সেই ‘সম্মুখ সমরে পড়ি বীরচূড়ামণি বীরবাহু চলি যবে গেলা যমপুরে অকালে’ ইত্যাদি মানে অনেকখানি লাইন তাে।

এইরকম অনেকটা বলতে অভ্যাস ক’রলে পরে দম বাড়বে। শম্ভু মিত্র ‘বহুরূপীর’অফিসে ১৯৭৪ সালে আমাদের কয়েক জনের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন : কবির কোনাে কবিতা তােমার ভাল লাগলে, তুমি কবিতাটি কবির ভাবনা অনুযায়ী নানাভাবে আবৃত্তি করবে এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই  জানতে হবে এই কবিতাটি কবির কোন-পর্যায়ের লেখা এবং কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত—সেই কাব্যের মূল সুরটি কি—এইসব বুঝে নিয়ে তবেই কবিতাটির আবৃত্তির ধরনটি তােমার আবিষ্কার করতে হবে।

তবেই শ্রোতার মনে ঠিক ঠিকভাবে কবিতার আবেদনটি পৌঁছবে।ঐ সাক্ষাৎকারে শম্ভু মিত্র কবিতা ধরে ধরে দেখিয়েছিলেন, কোন কবিতার ভাষা ও ভাবের কোনখানটায় কী আছে, ছন্দ মাত্রা প্রকরণে কি আছে এবং সেটা আবৃত্তি করতে গেলে কি কি বিষয়ে সচতন  থাকতে হবে। আজ এতকাল পড়ে স্পষ্ট মনে নেই তিনি কোন্ কোন্ কবিতার কথা বলেছিলেন। তবু উজ্জ্বল হয়ে আছে স্মৃতিতে তার সেই অনবদ্য দৃষ্টান্ত সহযােগে আবৃত্তি।

শম্ভু মিত্র মনে করতেন :এক একটা যুগে এক এক রকম ভাবে কথার উচ্চারণ করা হয়। কোন কথাটার কেমন অনুভব হচ্ছে, সেটা বদলে যায়। সমাজের মধ্যে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, সেই সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও কোথায় যেন বদল হয়ে যায়। এক এক সময়ে, এক একটা যুগে শব্দের  রবীন্দ্রনাথ যেরকম করে যে কবিতাগুলাে আবৃত্তি করেছেন, এখন আমরা সেভাবে ক’রতে পারি

।তার ধরনটায় অনেক জায়গায় দেখা যাবে যে, সেগুলাে আমাদের ভাল লাগে, একই রকম লাগে, কিন্তু কিছু টান আছে, সেগুলাে তখন হয়তাে ঠিকই ছিল, এখন ভাল লাগে না, এখন আমরা তা করতে পারি না।

শম্ভু মিত্র ‘রসকলি’-আয়ােজিত ঐ সাক্ষাৎকারে আরাে বলেছিলেন:শিল্পী যখন কিছু সৃষ্টি করেন এবং সেটা যখন মহৎসৃষ্টি হ’য়ে ওঠে,তখন সেই সৃষ্টিটা শিল্পীর চেয়ে বড়। শেক্সপীয়র কী নিজে ভাবতে পেরেছিলেন যে, কত মানে ঐ কথার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে, যেটা পড়ে আমরা একশাে বছর পরেও এইরকম চিহ্নিত হব?

শেক্সপীয়র নিজেও তাে এইটা অনুভব করতে পারেননি। তাই সৃষ্টিটা যখন হয়ে যায়, তখন সেটা ওই সৃষ্টিকারের চেয়ে বড় হয়ে যায়। সেইজন্যতার সময়কার মতন তিনি একটা রূপবলতে পারেন যে,আমি এইরকম করে বলেছিলাম,

কিন্তু তাতে কিছুই প্রমাণ হয় না।শম্ভু মিত্র মনে করতেন : শুধু বিনােদন নয়, শুধু প্রমােদবিতরণ নয়, আরাে কোনাে গভীর আকাঙ্ক্ষা, আরাে কোনাে অজানা অথচ গূঢ় অন্বেষণা থাকে মানুষের মনে। সব মানুষের। আমরা সবাই সেই জ্ঞান চাই, সেই উপলব্ধি চাই, যাতে আমরা দৈনন্দিন তুচ্ছতার বেড়া পার হয়ে যেন শিখার মতাে জ্বলে উঠতে পারি। শিখার মতাে জ্বলে উঠে যেন নিজেকে নিবেদন করতে পারি। তিনি এ-প্রসঙ্গে বন্ধু কবি বিষ্ণু দে-র ভাষার বলতে চাইতেন :

দুর্দম প্রাণের বহ্নি জ্বেলে দাও তুমি।

আমার এ অন্ধকারে উদ্যত প্রদীপে।

এই অগ্নিময়, শিহরণময় প্রদীপ্ততার ধ্রুপদী সাধনা ছিল তার। বস্তুত এক্ষেত্রে তার . পূর্ববর্তী পথপ্রদর্শক নাট্যাচার্য শিশিরকুমারের মতােই তার মনে দৃঢ় বিশ্বাসের একটা সংকল্প গড়ে উঠেছিল যে, বিনােদন শুধু মােদের নামান্তর নয়—বিনােদনের একই সঙ্গে দর্শকরুচি তৈরির কাজে নিয়ােজিত থাকবে— যাতে শিল্পের যে-কোনাে দুরূহ, দুর্বোধ্য জায়গা সম্পর্কে দর্শকদের ধাঁধা না লাগে। |

প্রকৃতপক্ষে মানুষ তাে জড়পিণ্ড নয়—তীব্র আলােক রশ্মিতে তার চোখ ধাঁধাবেই ঠিক ভাবটি যদি ঠিক ঠিক ভাবে আবৃত্তিতে ফুটে ওঠে, তাহলে দর্শক/শ্রোতার দৃষ্টিতে কিসের  যেন ছোঁয়াচ লাগে—তার চাহনির মধ্যে বােঝার মতাে এক অব্যক্ত আভা ফুটে ওঠে।

১৯৪৩ সালে মৈমনসিংহ জেলার কর্মীদের মধ্যে গণনাট্য সংঘের আন্দোলন সম্পর্কে আলােচনা শিক্ষাদির জন্য একটি সাময়িক ইস্কুল’ খােলা হয় সজ্যের তরফ থেকে—এখানে শম্ভু মিত্রের আলাপ হয়েছিল গণ কণ্ঠশিল্পী নিবারণ পণ্ডিতের সঙ্গে। এইখানেই শম্ভুবাবুএক ঘরােয়া সভায় রবীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন এবং ‘সুপ্রভাত’ কবিতা দু’টি আবৃত্তি করার পর দর্শক/শ্রোতাদের অব্যক্ত মুগ্ধতার চাহনি লক্ষ্য করেছিলেন।

এ-চাহনি পরেও তিনি লক্ষ্য করেছিলেন মাহেশের রথতলা মাঠে বাঙালি-মজুরের চোখে, যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের চোখে আর কার্শিয়াঙে মৃত্যু-অবিশ্বাসী তরুণ যক্ষ্মা রােগীর চোখে।আর মনে পড়েছিল, রবীন্দ্র কবিতার দীপ্তিতে। ঝলমল নিবারণ পণ্ডিতের কথা। শম্ভু মিত্র লিখেছেন :এইভাবে অনেক মুহূর্তে দেশের মানুষকে তিনি নতুন করে চিনেছেন আর শ্রদ্ধাবনত হয়েছেন।

শম্ভু মিত্র লক্ষ্য করেছেন, মাহেশের মাঠে বাঙালি ও বিহারী মজুরদের সমাবেশে নজরুলের কুলিমজুর’এবং একজন আধুনিক কবিবন্ধুর কবিতা পড়ে যেখানে জয় খুবই স্তিমিত জায়গায় চিল, সেইখানে মধুবংশীর গলি ’আবৃত্তিকরার পর দেখা গেল মধ্যবিত্তের সাম্প্রতিক ভাষায় লেখা কবিতাটি মজুরদের মধ্যে ব্যাপক আবেদন সৃষ্টি করল। স্থানীয় ফ্যাক্টরির বছর তেইশ-চব্বিশের এক যুবক মজুর প্রশংসা করতে এসে কোনাে কথা খুঁজে পেল না—বলল, বড্ড ভাল।

শুধু তাই নয়, আবৃত্তিকারকে তারা নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল মজুরদের কোনাে এক ক্লাবে। সেখানেও আরাে দু-তিনজনের কবিতা আবৃত্তি হ’ল। ক্লাব ঘরের স্বল্প আলােতেও  মানুষদের মুগ্ধ করেছিল।

– আসলে, আমার মনে হয় একটা ভাষা আছে, যা আমাদের অনুভূতির ভেতরে সূক্ষ্ম আলােগুলােকে টুক টুক করে জ্বালিয়ে দেয় এবং ঐ ভেতর থেকে তখন ছড়িয়ে যায় নেশার মতাে এক বিভােরতা, যা তার দৃষ্টির অন্যতম রং-এর সঙ্গে মিশে তার সাধারণত্বের বর্মটিকেছিড়ে ফেলে আর বেরিয়ে আসে অকস্মাৎ উজ্জ্বলতার মতাে তার অন্য একমূর্তি।

শম্ভু মিত্র দেখেছেন, একই স্লোগান যুগে যুগে এতই বদলে যায় প্রায় চেনাই যায় না। তেমনি বদলে যায় যুগে যুগে শব্দের ধ্বনি’র ধরন।

যেমন একসময়ে মাইকেল অনুভব করেছিলেন পদ্যাংশ অভিনয়ের জন্য অমিত্রাক্ষর ছন্দের দরকার। তাই শর্মিষ্ঠা’ যাত্রার ধরনে অভিনীত ও জনপ্রিয় হওযার পর তিনি ‘পদ্মাবতী’ নাটকে প্রথম এই ছন্দের প্রবর্তন করলেন। এর আগে কাশীরাম দাসের মহাভারতের ছন্দ এই রকমভাবে বলা হ’ত :

মহাভারতের কথা । অমৃতসমান।।

কাশীরাম দাসভনে। শুনে পুণ্যবান।।

এই পাঠের ধরন অনুসৃত হ’ত পুরােন যাত্রার রীতির মধ্যে— সুর করে অনেকটা গানের মতাে ক’রে বলা হ’ত। কিন্তু সাধারণ চরিত্রগুলাে অভিনয়ে বানিয়ে বলবার সময় একেবারে গদ্য ব্যবহার করত। কিন্তু আঠার-ঊনিশ শতক থেকে এই ধারা বিবর্তিত হয়ে এমন একটা রীতির উদ্ভব হ’ল যেটা গদ্যের কাছাকাছি। মধ্য ঊনিশ দশক থেকে একটি দৃষ্টান্ত তুলে তিনি এর বলার পৃথক ধরণটির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন ,

কে হরিণ সবােরূহ হইয়া নির্দয়।

শােভাহীন সরােবর অন্ধকারময়।

হেরি সবশবময় শ্মশান সংসার।

পিতা মাতা ভ্রাতা দারা মরেছে আমার।

কিন্তু মাইকেল ‘পদ্মাবতী’নাটকে যে প্রবাহমানতা আনলেন, সেটা এইরকম:

একি? ওইনা সে পদ্মাবতী

আয় লাে কামিনী,

এইরূপেকুরঙ্গিণী নিঃশঙ্কে অভাগা।

পড়ে কিরাতের পথে; এইরূপ সদা

বিহঙ্গী উড়িয়া বসে নিষাদের ফাঁদে।

এই রীতির সূত্রপাত ‘পদ্মাবতী’-তে, পরে মেঘনাদবধ কাব্য’এবং কৃষ্ণকুমারী’ নাটকে বিকাশ লাভ করে। বিখ্যাত মেঘনাদবধ কাব্য’ পাঠককে চমকে দিয়েছিল, তার কারণ এর ধরণটাই সম্পূর্ণ অন্যরকম। যেমন :

সম্মুখেসমরে পড়িবীর চুড়ামণি।

বীরবাহু, চলি যবে গেলামপুরে

অকালে, কহ হে দেবি অমৃতভাষিণী

কোবীরবরেবরি সেনাপতিপদে

পাঠাইলারণে পুনঃ রক্ষকূলনিধি

রাঘবারি?

বাংলা কাব্যের এইশক্তি,এই ঐশ্বর্যআগেকখনাে লক্ষ্য করা যায়নি। বস্তুত মধুসূদনের ওপর থিয়েটারের দাবি অনেক বেশি, কেননা নাট্যকার হিসাবেই তার প্রথম আত্মপ্রকাশ এবং নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। পরবর্তী কালে গিরিশচন্দ্র দেখলেন প্রতিটি পংক্তিতে এই চোদ্দ মাত্রার কঠিন অনুশাসনে সংলাপের ধ্বনি অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে।

তিনি লক্ষ ক’রলেন আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতা হ’চ্ছে মানে-অনুযায়ী কেটে কেটে পড়া এবং অভিনেতার আবেগের ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্বসতি দেওয়া। সেজন্য গিরিশচন্দ্র অমিত্রাক্ষর ছন্দকে অভিনয়ের উপযােগী করার জন্য এর বদল ঘটালেন। যদি বলা যায় যে, আরাে কেউ কেউ এ চেষ্টা করেছেন, তবু গিরিশচন্দ্রের সৃষ্টি-সাফল্যের জন্যেই এর নাম হয়ে গেছে গৈরিশ ছন্দ।

এই গৈরিশ ছন্দকে অভিনেতা ও দর্শক সমাজ সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করলেন এবং এর সম্ভবনা সত্যি-সত্যি সীমাহীন ভাবে বিস্তৃত হ’ল।

মধুসূদনের অমিত্রাক্ষরকে তখনকার অনেকেই মনে করেছিল বিদেশ থেকে আমদানি করা জিনিস, যা আমাদের কাব্যধ্বনিরসঙ্গে মেলেনা। কিন্তু  গিরিশচন্দ্র যখন আমাদের বাস্পন্দের সঙ্গে সম্মতি রেখে ভাঙলেন,তখন আমাদের কানে দেশীয় আদিম পুরানাে অভিনয় রীতির মতাে ঐতিহ্যসম্ভুত বলে মনে হ’ল। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সাধারণ অশিক্ষিত লােক এই ছন্দে সংলাপ অনায়াসে বুঝতে পারে।

শম্ভু মিত্র লিখেছেন : আমি আমার ছেলেবেলাতেই দেখেছি, সাধারণ মানুষ কেমন করে কৃত্তিবাসের রামায়ণবা কাশীদাসী মহাভারত উপভােগ করে, তেমনভাবে যাত্রায় এই জাতীয় কাব্যের রসাস্বাদন করছে। এইজাতীয়কাব্যের জনপ্রিয়তা নিচেরমহলে তাে ছিলই, বিদগ্ধমহলেও এর সমাদর ছিল।

শম্ভু মিত্র এর থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, বাংলা থিয়েটার অন্তত একটি অঙ্গে নিজস্ব ঐতিহ্যকে আশ্রয় করেই বিবর্তিত হয়েছে এবং তাতেই দেশের বহুসংখ্যক লােকের মন ছুঁতে পেরেছে। ধ্বনির ধরন পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে শম্ভু মিত্র রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্র-পরবর্তী কয়েকটি কবিতা বেছে নিয়েছেন। যেমন রবীন্দ্র-কবিতা:

ওহেঅন্তরতম।

মিটেছে কি তব সকল তিয়াস আসি অন্তরে মম।

অথবা

দুয়ার বাহিরে যেমনি চাহিরে মনে হলাে চিনি

কবে নিরুপমা, ওগগা প্রিয়তমা, ছিলে লীলাসঙ্গিনী।

শম্ভু মিত্র দেখেছেন, দাঙ্গার সময়ে ‘দুঃসময়’কবিতাটি অদ্ভুত আবেদন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিন্তু এরকম আবেদন লক্ষ্য করা যায়নি।

রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ কবিতা পড়বার সময়েশম্ভুবাবুর মনে হয়েছিল, পংক্তির শেষ ভাগে স্বরক্ষেপওপরে উঠে যায়। এই প্রবণতা রবীন্দ্রোত্তর কবিদের মধ্যে অনুপস্থিত। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন জীবনানন্দের একটি কবিতা :

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি… অথবাবিষ্ণু দে’র।

শুনেছি সেকালে নিরাপদকবি গানে… অথবা সুধীন্দ্রনাথের

. আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি…

এইসব কবিতায় লাইনের শেষে শব্দের  ঝোঁক নিচের দিকে । (উচ্চারণের) এই পব্বির্তনের পেছনে যে মানসতা কাজ করেছে তা পূর্ববর্তী কবিদের মধ্যে একজনের সঙ্গে আরেক জনের যতই বৈপরীত্য থাক সবার মধ্যে কিছু একটা যুগ লক্ষণ থাকে, যার সাহায্যে আমরা এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগের পার্থক্য বুঝতে পারি।

শম্ভু মিত্র রবীন্দ্রনাথের লীলাসঙ্গিনী’, ‘নীলমণিলত’, ‘জন্মান্তর’, ‘চিরায়মানা’,উদাসীন’, নিমন্ত্রণ’,‘শেষ বসন্ত’, ‘প্রশ্ন’, ‘সুপ্রভাত’, ‘দুঃসময়’, ‘ঝুলন’, ‘পৃথিবী’ ইত্যাদি কবিতা আবৃত্তি করেও আবৃত্তির এক অনুপম মানে দৃষ্টান্ততুলে ধরেন দর্শকশ্রোতার কাছে।

বেতারে তার যেসব রবীন্দ্র-কবিতা আবৃত্তি সংরক্ষণ করা আছে তার মধ্যে রয়েছে-‘দায়মােচন, কৃতজ্ঞ’,ক্ষণিকা’, জীবনদেবতা’, ‘স্বপ্নে’ও ‘পথের বাঁধন’। বস্তুত লক্ষ্য করা যায়, শম্ভু মিত্রর রবীন্দ্র-অনুরাগের শুরু হয়েছিল তার শিল্পী-জীবনের প্রায় গােড়া থেকেই; এবং এই রবীন্দ্র-অনুরাগ প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল নাট্যচার্য শিশিরকুমারের সাহচর্যের ফলেই ।

শিশিরকুমার রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তিতে সকল স্নায়ুর আনন্দ’ অনুভব করতেন—নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় এই আনন্দের  উত্তরাধিকারকে শম্ভু মিত্র অন্তর থেকেই গ্রহণ করেছিলেন।রবীন্দ্র কবিতা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের আবৃত্তিচর্চা পরবর্তী যুগের কবিদের কবিতা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রবৃত্ত হয় এবং এই থেকেই আবৃত্তির একটি মৌলিক ফর্ম গড়ে ওঠে। সত্যি কথা বলতে কি, এই ফর্মটা ছিল শম্ভু মিত্রর একান্তই নিজস্ব, যা অনুকরণ করলে মুহূর্তে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা।

কিন্তু কেউ যদি এর অনুসরণ করে নিজস্ব জায়গাটি খুঁজে নিতে পারেন, তবেই তার বিশিষ্টতা প্রমাণিত হবে। বস্তুত শম্ভু মিত্রর আবৃত্তিও ছিল নানা জটিলতার আবরণ সরিয়ে, নানা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এক অনন্য সুজন এবং তিনিই প্রথম কবিতা এবং আবৃত্তির ব্যাপারে মানুষের মনস্কতাও ভালবাসা গড়ে তুলতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন।শম্ভু মিত্রর আবৃত্তি মানুষের মনে প্রচণ্ড আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম তাে হয়েছিলই, সঙ্গে সঙ্গে দর্শক-শ্রোতার নান্দনিক চেতনা ও বােধ গড়ে তুলতেও বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল।

এবং সম্ভবত শম্ভু মিত্রর সময় থেকেই আবৃত্তি একটি স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করতে শুরু করে। এমনকি মঞ্চে বা অন্যত্র আবৃত্তি’ একটি আবশ্যিক অনুষ্ঠান হিসেবে নিজের জায়গা করে নেয়।

রবীন্দ্র কবিতা ছাড়াও শম্ভু মিত্রের নির্বাচিত কবিদের মধে ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু,জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। প্রেমেন্দ্র মিত্রর যেসব কবিতা তিনি রেকর্ডে আবৃত্তি করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে হারিয়ে’, ‘নিরর্থক’, ‘জং’ও ‘মুখ’। এই ছােট কবিতাগুলির মেজাজ ও তন্ময়তা শম্ভু মিত্র অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনানন্দের বেশ কিছু কবিতার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হয় বােধ’–এছাড়া রয়েছে আট বছর আগের একদিন’, ‘শিকার’ ও ‘সিন্ধুসারস’।

চারটি আবৃত্তিই যতবার শুনবেন, ততবারই নতুন মনে হবে। তার কারণ,শম্ভু মিত্র তাঁর মধুর কণ্ঠ, বাচনভঙ্গি, বিন্যাস এবং ভাবপ্রকাশের সজীবতায় সেকাল থেকে এ কাল পর্যন্ত বাংলার সংস্কৃতি জগতকে আলােড়িত করে গেছেন- যা মনে হয় আর কেউ এমনভাবে পারেননি।শম্ভু মিত্রর আবৃত্তি শুনে বার বার শ্রোতার মনে হয়েছে কবিতাটি যেন কোন লীন চেতনা থেকে গােটা জীবন্ত, শিল্পরসে জারিত হয়ে উঠে আসছে।

বুদ্ধদেব বসুর কবিতাকবিমশাই’ এবং বিষ্ণু দে-রপচিশে বৈশাখ’কবিতা আবৃত্তিতে রসরসিকতা, মানুষের সংগ্রাম এবং অন্বেষণ নিয়ে আমাদের ভাবনায় যেন কোন্ ছায়া। বিশেষত বিষ্ণু দে-র পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটি আবৃত্তির সময় শ্রোতা যেন মন্ত্রমুগ্ধ এক স্তব্ধতা! আর জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের ‘মধুবংশীর গলি’ তাে কিংবদন্তি হয়ে গেছে। সুধীন্দ্রনাথের ‘উটপাখি’-র মতােশক্তকবিতাও বেছে নিতে তার দ্বিধা জাগেনি।

কিন্তু একইসঙ্গে বলতে হবে, শ্রোতারা শম্ভ মিত্রর বিশিষ্ট ভঙ্গির ম্যানারিজমকে পরবর্তীকালে বেশ খানিকটা যেন পরিত্যাগ করেছিলেন। শেষের দিকে শম্ভু মিত্র নিজেকে পাল্টাতে চেষ্টা করেছেন ব্যাপকভাবেই— কিন্তু সেটা নাটকের ক্ষেত্রে অনেকটাই, আবৃত্তির ক্ষেত্রে তা তেমন লক্ষ্য করা যায় না।

তবে ‘চাদবণিকের পালা’ নাট্যপাঠ এবং দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অশ্বমেধের ঘােড়া’ উপন্যাস-পাঠের অনুষ্ঠানে এই পরিবর্তন অনেকটাই আভাসিত হয়ে ওঠে। নাটকের কাব্যময় সংলাপ বলার সময়ও দেখা যেত শম্ভু মিত্রর কণ্ঠের নানাবিকিরত রশ্মির ঔজ্জ্বল্য। যেমন দেখছি নিঃশ্বাস ভরে তাঁকে রক্তকরবী’-তে, ‘চার-অধ্যায়’-এ, ‘রাজায়’-য়, ‘বিসর্জন’-এ, ‘ডাকঘর’-এ, ‘রাজা অয়দিপাউস’-এ। বেতারে  তার অসাধারণ মানের সাফল্যের পরিচয় আছে এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘কাক’, ‘কর্ণকুন্তীর সংবাদ, | ‘তাহার নামটি রঞ্জনা’ও ‘সারারাত্তির’নাটকে।

শম্ভু মিত্রর প্রসিদ্ধিতে অনুপ্রাণিত হ’য়ে তাঁর সমকালেই অনেকে আবৃত্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেন। এঁদের মধ্যে কাজী সব্যসাচী, সবিতা ব্রত দত্ত, তৃপ্তি মিত্র, কুমার রায়, উৎপল দত্ত, অনুভা গুপ্তা, বনানী চৌধুরী, রাধামােহন ভট্টাচার্য, বিকাশ রায়, নির্মলকুমার, শমিতা বিশ্বাস, বসন্ত চৌধুরী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেয়া চক্রবর্তী’র নাম বিশেষভাবে মনে পড়ে। এঁদের মধ্যে কাজী সব্যসাচী বাংলা কবিতা আবৃত্তির জগতে একটি স্মরণীয় নাম। শম্ভ মিত্রের অনেক পরে এসেও তিনি তার স্বর্ণময় কণ্ঠের যাদুতে বাংলার সংস্কৃতি জগতকে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। ঈশ্বরদত্ত অসামান্য কণ্ঠ ছিল তার এবং প্রতিশব্দ উচ্চারণে, ভাবের বিন্যাসে নিখুঁত

-হওয়া পর্যন্ত তিনি শান্তি পেতেন না। তার আবৃত্তির এলাকা ছিল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। তাছাড়া গ্রামােফোন রেকর্ডে তাঁর অসামান্য গ্রন্থনাও ধরা আছে। শম্ভু মিত্রর অসামান্য খ্যাতির পাশাপাশি তাঁর জনপ্রিয়তাও কম ছিল না। উৎপল দত্ত’র আবৃত্তির ঘরানা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নস্বাদের । দ্রুত গতির এই আবৃত্তি অনেকটাই পাশ্চাত্য-আদলের। এবং অবশ্যই সমকালীন আবৃত্তির ধারায় এক অনন্য ব্যতিক্রম বলে চিহ্নিত করা যায়।

তৃপ্তিমিত্র’র আবৃত্তিতেও প্রাণের স্পর্শ মেলে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ রূপেই শম্ভু মিত্রর ধারারই অনুসারী। কুমার রায়ও তাই। শুনেছি অভিনেতা রাধামােহন ভট্টাচার্যও বিকাশ রায়ও অসাধারণ আবৃত্তি করতেন মাঝে মাঝে। আমি শুনিনি। তাই এ- বিষয়ে আমার পক্ষে কিছুবলা সমীচীন নয়। অনুভা গুপ্তা এবং বনানী চৌধুরীর আবৃত্তিরও প্রশংসা করেন পুরনাে যুগের কিছুকিছু শ্রোতা। নির্মলকুমার, বসন্ত চৌধুরীর লিরিক্যাল কণ্ঠ আবৃত্তির পক্ষে খুবই উপযােগী ছিল। গীতিময় অংশের নাট্যাভিনয়ে তার অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও সুন্দর আবৃত্তি করেন।তবে বিশিষ্ট কোনাে ধারা সৃষ্টি করতে তিনি বােধহয় তেমনভাবে সফল হননি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্টাইলবিহীন আবৃত্তি পছন্দকরেন, কেননা কবিতার স্টাইলের কোনাে শেষ নেই।

তিনি মনে করেন :কবিতাকে ভালবেসে আবৃত্তিকার কবির রথের সারথ্যের দায়িত্ব নিয়ে কবিতাকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেবে আবৃত্তির কাছে এইটাই তার প্রথম প্রত্যাশা। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কেয়া চক্রবর্তীর কিছু কিছু আবৃত্তি আমি শুনেছি। এঁদের গতানুগতিক সাধারণ মানের আবৃত্তিকার বলেই আমার মনে হয়েছে।

এই সময়েই দেবদুলাল বন্দ্যোপধ্যায়, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, পার্থ ঘােষ, গৌরী ঘােষ, প্রদীপ ঘােষ, শঙ্কর ঘােষ, কাজল চৌধুরী প্রমুখ অনেকেই আবৃত্তি জগতে কাজ করতে আসেন। দেবদুলাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের যুদ্ধের সময়ে সংলাপ পাঠের সূত্রে এবং এই খ্যাতির রাস্তা ধরেই তিনি এগিয়ে আসনে আবৃত্তি জগতে।

সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী হওয়ার দরুণ আবৃত্তি জগতে তিনি আস্তে আস্তে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে অসাধারণ মানের কোনাে আবৃত্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে না পারার জন্যতার জনপ্রিয়তা ব্যাপক ভাবেই হ্রাস পেয়েছে।

অমিয় চট্টোপাধ্যায় বিশেষত জীবনানন্দ দাশের কবিতা আবৃত্তির চর্চা করেছেন নিবিষ্ট ভাবেই। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতার আবৃত্তিতে তিনি কোনাে মনে রাখার মত অবদান রাখতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। তবে তাৎক্ষণিক হাততালি পাওয়ার দিকে তার ঝোক ছিল না—এটা খুবই সুলক্ষণ। পার্থ ঘােষ, প্রদীপ ঘােষকে শ্রোতা  মােটামুটি বেশ কিছুকাল নিয়েছেন। কিন্তু আবৃত্তির নতুন কোনাে দিগন্ত আবিষ্কারের ব্যাপারে এঁরাও তেমন উজ্জ্বল স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে মনে হয় না।

যদিও এল.পি.এবং কমপ্যাক্ট ডিস্কে এঁদের আবৃত্তি বেরিয়েছে এবং তার বিক্রিও নাকি ভাল হয়েছে বলে খবর পাই। গৌরী ঘােষ তার চমৎকার কণ্ঠ এবং নিখুঁত উচ্চারণের জন্যে আবৃত্তি জগতে দীর্ঘকাল তার জনপ্রিয়তা আসনটি দখল করে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু নানা স্বাদের কবিতা-আবৃত্তির ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতা এবং ম্যানারিজম তাকে সাফল্যের শীর্ষে পৌছতে দেয়নি । কাজল চৌধুরী তাে ব্যাপকভাবে আবৃত্তি করেননি।

যা করেছেন, তাতে তাকে সাধারণ মানের আবৃত্তিকার হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়। এর পরবর্তীকালে আবৃত্তিকার হিসেবে শাঁওলি মিত্র, অপর্ণা সেন, রত্না মিত্র, তুলসী রায়, দেবেশ রায়চৌধুরী প্রভৃতি অজস্র আবৃত্তিকার আবৃত্তির চর্চা করেছেন। একসময়ে নীলাদ্রিশেখর বসু, অশােক পালিত এঁরাও পার্থ ঘােষ, প্রদীপ ঘােষ এঁদের সমকালেই নিয়মিত আবৃত্তি করতেন।

এঁদের অনুষ্ঠানও শ্রোতাদের দীর্ঘকাল ভাল লাগেনি । শংকর ঘােষ সুন্দর আবৃত্তি করেছেন কিছুকাল, কিন্তু তিনি এবং তার পূর্ববর্তীকালে সবিতাব্রত দত্ত নিয়মিত আবৃত্তির আসর থেকে ক্রমশই বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। মােটামুটি অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েই তাবৃত্তির চর্চা চলছে। হয়তাে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে। কিন্তু কবিতার নানাদিক সম্পর্কেনিখুঁত জ্ঞানের অভাবে আসর-মাতানাে কবিতার প্রতিই আবৃত্তিকারদের ঝোকপ্রকৃত সুস্থ আবৃত্তিচর্চার প্রাঙ্গণ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে।

আবার বেতারও দূরদর্শনে খ্যাত/খ্যাতারা এবং সংবাদ পাঠক-পাঠিকারাও হঠাৎহঠাৎ আবৃত্তিকার হয়ে অনুষ্ঠান করছেন। শ্রোতারাও দিশাহারা। পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে তারা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন, কিন্তু প্রাপ্তির দিকটা বােধহয় তেমনভাবে ভেবে দেখছেন না। আবার এই অসফল আবৃত্তিকাররাই স্কুল করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিচ্ছেন, ফলে অগ্রগতি কোনাে একটা জায়গায় যে আটকে থাকছে, এ-কথা অপ্রিয় হলেও সত্যি।

আসলে সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী হলেই যে ভাল আবৃত্তিকার হবেন,এ-কথা বলা যায়না। কাব্য আন্দোলন এবং তার চলমান ধারা সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান না থাকলে, কবিতার প্রকরণও ভাবার্থ ঠিকমত না বুঝলে এই নযযৌন তস্থৌ অবস্থার অবসান হবেনা। |

শম্ভু মিত্র নিজেই ছিলেন এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।বর্তমানে কোনাে আবৃত্তিকার এইরকম আশ্চর্য প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পেরেছেন কি? বােধহয় কেন নিশ্চিতভাবেই এর উত্তর ‘না’। এঁদের চেষ্টার ফলাফল আমরা এতকাল ধরে দেখেছি এখন এখান থেকেই নতুন রাস্তা তৈরির দিকে আমাদের এগােতে হবে। কিন্তু সে নেতৃত্ব দেবার লােককই ? দেশে জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবী অনেকেই তাে আছেন—এ-বিষয়ে তারা একটু ভাবলে, বিশেষত শ্রেষ্ঠ কবিরা যদি এক্ষেত্রে একটু নজর দেন, তাতে হয়তাে কিছুটা ফল মিললেও মিলতে পারে।

ছান্দসিক প্রবােধচন্দ্র সেন তাে অভিযােগ করেছেন, এখন তাে আবৃত্তি বলতে সবই গদ্যপাঠ। যে কোনাে কবিতা যে-ছন্দেই লেখা থাক সবই গদ্যের মতাে করে বলে।…এঁরা বলতে চায় যে, ছন্দ অত প্রকট হবে না, প্রচ্ছন্ন থাকবে। লােকে মনে মনে বুঝে নেবে। কিন্তু কবিতার ছন্দ তাে সেজন্য নয়, তাহলে ছন্দে লেখা কেন? গানের সুরটা বুঝে নেবে, তাহলে তাে আর গান থাকেনা। কবিতায় ছন্দ সেইরকম।

এ-অভিযােগ কি মিথ্যে। আমি তাে বলব,অনেক আবৃত্তিকার  ছন্দ জানেনই না। কবিতার ভাবার্থ না বুঝেই কবিতা আবৃত্তি করেন। এবং সতর্কভাবেই গভীর ধ্রুপদী কবিতাগুলি এড়িয়ে সরল কবিতাগুলি আবৃত্তির জন্য বেশি বেছে নেন। এর ফলে আবৃত্তিকারের মাধ্যমে অনেক উচ্চাঙ্গের কবিতা চিরকাল অনাদৃত হয়ে পড়ে থাকে।

কাব্যচর্চাই যদি আবৃত্তিকারের লক্ষ্য হয় তাহলে কবিতা-প্রবাহের নানা দিকের প্রতিফলন কেন আবৃত্তির অনুষ্ঠানে উঠে আসবেনা ?কবিতা নিয়ে আবৃত্তিকারদের এইঅজ্ঞ স্বেচ্ছাচারিতা আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছে, তা কি আজও আমরা বিশ্লেষণ করে দেখবে না? পকেটে পয়সা আসাটাই আবৃত্তিকারদের লক্ষ্য, ভাবতে হবে না

ভেতরের দুর্বলতার কথা? এবং এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য কোনাে চেষ্টা হবেনা ?হয়নি। আবৃত্তির নামে তাই এক অদ্ভুত খিচুড়ি ব্যাপক চলেছে। আরাে কতকাল চলবে কে জানে! শম্ভু মিত্রর উত্তরাধিকার এইতলানিতে এসে ঠেকা কি বিধিলিপি বলে মেনে নিয়ে আমরা চুপ করে থাকব? ভেবে দেখতে হবে। এবং সমাধানের রাস্তাও খুঁজে বের করতে হবে।

সবশেষে বলি, জীবন সায়াহ্নে শম্ভু মিত্রর ‘দিনান্তের প্রণাম’যুগ্ম-ক্যাসেটটির কথা। এই ক্যাসেটে পাওয়া যায় এক ক্লান্ত বিবর্ণ ধ্বস্ত শম্ভুমিত্রকে—ধরা ধরা গলায় এক নিঃশেষ প্রতিভার ম্লান চিহ্ন এই যুগ্ম ক্যাসেটটির পরতে পরতে ছড়ানাে।এ কোন শম্ভু  মিত্র? ভাবলে আমাদের কষ্ট লাগে !

সুচিত্রা মিত্র শম্ভু মিত্রের প্রণাম’ নিবন্ধে ক্যাসেটটির সমালােচনা করতে গিয়ে কিছু সংগত প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি লিখেছেন :আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করাে, পৃথিবী’কবিতাটিতে কতকগুলি পরিবর্তন শুনলাম।

যেমন মহাধূলিরাশি ’হয়েছে ধূলিরাশি,ধ্যানমগ্ন-ধ্যান নিমগ্না, ঝাঞ্ঝাবায়ুব বাতাসের,কলােচ্ছ্বাসে কল্লোলহ্বাসে এবং নির্মল হয়েছেনির্মম।…উৎসর্গকাব্যের ‘আলোেকে আসিয়া এরা লীলা করে যায়’-কবিতার শেষ স্তবক :‘নেমে এসে দূরে দাঁড়াবি যখন—/দেখিনি কেবল,নাহিখুঁজিবি,/এইহাসি রােদনের মহানাটকের / অর্থতখন কিছু বুঝিবি। এই হাসি রােদনের মহানাটকের ’অংশটি কেবলমাত্র স্থানচ্যুত হয়ে পরিসমাপ্তিতে স্থান পেয়েছে। -কেন? এক্ষেত্রে মঞ্চের শম্ভু মিত্রর মানসিকতা কি সক্রিয় ছিল?

শ্রীমতী মিত্র প্রশ্ন তুলেছেন :‘ক্ষণে ক্ষণে’উচ্চারণ কি খনে খনে’হবে? গীতাঞ্জলির ‘চাই গাে আমি তােমারে চাই/তােমায় আমি চাই’কবিতাটিতে যে-ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে তার সঙ্গে ‘মিথ্যে’ শব্দটি যেন খাপ খায় না। মনে একটু ধন্দ থেকে যায় আর একটি বিনম্ন জিজ্ঞাসা । একাকী’ শব্দটির উচ্চারণ নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের মতানুযায়ী একা’শব্দটি যখন তিনটি অক্ষরের শব্দে পরিণত হয়, তখন ‘এ’-র উচ্চারণ আর ‘অ্যা’নয়, তখন সেটিও ‘এ’। সেই মতানুযায়ী গানেও আমরা একাকী’শব্দের উচ্চারণ করে থাকি।

ক্যাসেট-দুটিরউপস্থাপনা সম্পর্কে শ্ৰীমতী মিত্র কিছু ক্রটির কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন—

‘আবার আসিব ফিরে’ (রূপসী বাংলা কবিতাটির পরিবর্তে আবৃত্তি করা হয়েছে, ‘হায় পাখি, একদিন কালীদহে ছিলে নাকি?(রূপসী বাংলা.)

অথবা,কবিতার প্রথম পংক্তির সঙ্গে কাব্যের উল্লেখ অথবা তদ্বিপরীত পদ্ধতি ? তাতে সামঞ্জস্য রক্ষিত হবে। যারা কাব্যনুরাগী শ্রোতা, তাঁদের পক্ষে বিশেষ করে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। উদ্যোক্তাদের ভেবে দেখতে অনুরােধ করি।’

: পরিশেষে শ্রীমতী মিত্র লিখেছেন :এই যুগ্ম ক্যাসেটটি ১৪০০ শতাব্দীর একটি সর্বোত্তম দান এ-পর্যন্ত।

শ্রীমতী মিত্রের এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেক রসজ্ঞ শ্রোতাই একমত হবেন বলে মনে হয় না।

এরপর ক্যাসেটটির বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে শ্রীমতী মিত্র আরাে লিখেছেন:আবৃত্তিকে শিল্পে যেমন নিয়ে এলেন শম্ভু মিত্র, তেমনই সেই শিল্পকে পৌছেদিলেন জন মানসের কাছেও যে কবিতা আমরা চোখে দেখে পড়ে এসেছি এ যাবৎ শম্ভু মিত্রের অবিস্মরণীয় আবৃত্তির মাধ্যমে সে-কবিতা শ্রবণেন্দ্রিয় লাভ  করল—কাব্য-আস্বাদের অনুভূতি পেল এক পৃথক ডাইমেনসন!

শ্রীমতী মিত্র মনে করেন :এই ক্যাসেটে জীবনানন্দের কল্পনার ব্যাপ্তি, চিত্রকল্পময়তা, গভীর সংবেদনশীল মনন মূর্ত হয়ে উঠেছে আর এক সংবেদনশীল শিল্পীর সতেজ নিটোল কণ্ঠস্বর, মডিউলেশন, আন্তরিক অনুভূতি এবং সংযত নাটকীয় উপস্থাপনায়।

তাঁর কবিতা আবৃত্তির সময় শম্ভুমিত্র যথেষ্ট সতর্ক। থেমে থেমে প্রতিটি পংক্তি উচ্চারণ, প্রতিটি শব্দের সুস্পষ্ট উচ্চারণ এবং এরই সঙ্গে স্থাননাপযােগী নাটকীয়তার মিশ্রণ শােনা যায়, ‘স্বপ্ন/হারপাখি/একদিন কালীদহে ছিলে নাকি/ বলিল অশ্বখ ধীরে কবিতাগুলিতে।

শ্রীমতী মিত্র প্রশ্ন তুলেছেন : এই নাটকীয়তা সৃষ্টির জন্যই কি বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি কবিতায় ‘ছিন্ন খঞ্জনার মতাে’কথাটির দ্বিরুক্তি ? আর সেই জন্যেই কি ‘সিন্ধুসারস’ কবিতাটিতে হে সিন্ধু সারস’সম্বােধনটি বারেবারে ফিরিয়ে এনেছেন ? কবিতাটির কিছু অংশ যে বর্জিত হয়েছে—তার কারণ কি একই? আবার নিরালােকে হায় চিল, কুড়িবছর পরে কবিতাগুলি অপেক্ষাকৃত শান্ত, কোমল, মৃদুস্বরে পাঠকরায় কবির জীবনযন্ত্রণা, মৃত্যুচেতনা, স্মৃতিরােমন্থনের বেদনা মনকে ভারাক্রান্ত করে তােলে।

এই সব দিনরাত্রি’ কবিতাটিতে একই সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণা ও অসহায়তার ছবি। তাই শব্দোচ্চারণে স্পষ্ট অথচ কোমল, স্থানে স্থানে একটু ব্যঙ্গের ছোঁওয়াও লেগেছে, যা উপভােগ্য কিন্তু নাটকীয়তা নেই। শুধুই একটি মর্মস্পর্শী কাহিনীর বৃত্তান্ত। আট বছর আগের একদিন’কাব্যেও আবৃত্তিকারের ভূমিকা একটি কাহিনীকারের, যিনি একটি ট্র্যাজিককাহিনী—একটি মর্মান্তিক দুঃখের কাহিনী আমাদের শােনাচ্ছেন।

অতএব এখানে তিনি আরাে সতর্ক, স্বরক্ষেপণ,শব্দোচ্চারণ এবং যতি সম্পর্কে।…রবীন্দ্র-কবিতা আবৃত্তিতেশম্ভ মিত্র অনেক সংযত-নাটকীয়তা একেবারেই বর্জিত। শ্বাসের জোর বা বিশেষ অক্ষরের ওপর বিশেষ জোর দেবার প্রয়ােজনও বােধ করেননি।

এই সঙ্গে এ-কথাটিও অবশ্যই স্মর্তব্য যে, রবীন্দ্রনাথের কাব্যের মতাে শম্ভু মিত্রর নির্বাচনও বৈচিত্র্যময়—যেমন গীতালির  গান, উৎসর্গ বা পত্রপুটের কবিতা।

সনেটে তাঁর আবৃত্তি একরকম, যেমন নৈবেদ্য। আবার যেখানে ছন্দবদ্ধ কাব্য সেখানে ছন্দ-রক্ষায় তিনি খুবই সাবধানী।এ-সব ক্ষেত্রে কখনই গদ্যময় বাআড়ে আবৃত্তি তিনি করেননি।

শব্দ উচ্চারণে অতিরিক্ত অথবা অনাবশ্যক কোনাে জোর নেই। কিন্তু  গীতালি কাব্যের ‘এই কথাটি ধরে রাখিস / মুক্তি তােরে পেতেই হবে, যেতেই হবে, যেতেই হবে’ প্রভৃতি বাক্যের উচ্চারণ এবং জোর কিংবা চিত্রা’কাব্যের ‘জীবনদেবতা’-য় আমার রজনী আমার প্রভাত প্রভৃতি বাক্যগুলাে কিছু দৃঢ়তা আর প্রশ্নের আকারে উচ্চারিত হওয়ায় বড় সুন্দর লাগে !

সম্পূর্ণ ক্যাসেটটি গভীর নির্লিপ্ততা— প্রগাঢ় এক বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন। তারই মাঝে ঝে লেগেছে মরমী আবেগ চাপা উপহাসের সুর আর প্রাজ্ঞ অভিব্যক্তি।

শ্রুতি টেপস অ্যান্ড রেকর্ড প্রকাশিত যুগ্ম ক্যাসেটটি ১৪০০ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ দান এ পর্যন্ত। এটা সে সময়ে জীবিত শম্ভু মিত্রের কথা মনে করে একটি সার্টিফিকেট দিয়ে বিতর্ক এড়ানাে ছাড়া আর কিছু বলে মনে হয় না। এই ক্যাসেটটিকে শম্ভু মিত্রের শেষ বয়সের এক নষ্প্রভ দলিল ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

শ্রোতা শম্ভু মিত্রের বয়সের ভার, নিঃসঙ্গতা, বিশৃঙ্খল মনােভাব এই সব সীমাবদ্ধতার কথা মেনে নিয়েই এই ক্যাসেটটি শুনবেন এবং হয়তাে অনেকাংশেই তাদের প্রিয় আবৃত্তিকারের কিংবদন্তি কণ্ঠের কথা ভেবে ব্যথিত হবেন।

ক্যাসেটটি সম্পর্কে স্বয়ং শম্ভু মিত্রের মনেও বােধহয় বেশ একটু দ্বিধা ছিল। ক্যাসেটটি ভাল হয়েছে এই প্রমাণ দেবার জন্যই সম্ভবত তিনি জ্যোতিষ রায় রােডে থাকার সময়ে একদিন সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন :জাননা, দিনান্তের প্রণাম’-এর কবিতা পাঠ শুনে একজন ভারী ভাল বললে। সে বললে, চোখে জল এল। তারপর বললে, চোখে জল আসে অনেক কারণে। কিন্তু যখন চোখের জল এলে মনটা পবিত্র হয়, তখন সেই চোখের জলকে খুব দামী মনে হয়। ভারী ভাল বলেছে, না?

এই ঘটনার উল্লেখকে আমরা তার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধার নিদর্শন বলেই মনে করব। তার বেশি কিছুই নয়। এরকম একটি সাধারণ ঘটনার উল্লেখই তার প্রমাণ।

বস্তুতু জীবনের শেষ বছরগুলি তিনি নানা কারণেই সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। সময় কিভাবে এগােচ্ছে, সাংস্কৃতিক জগতের পরিবর্তিত রূপটি কেমন—এসব বিষয়ে কোনাে খোঁজখবর রাখবার কোনাে আগ্রহই ছিল না তার। এ-কথা শম্ভু মিত্র নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন। শরীর বিগড়াচ্ছিল, মানসিক এক ভাঙনও তাঁর বেঁচে থাকার

স্পৃহাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। মনে হয় এইরকম এক পর্যায়ের মধ্যেই এই ক্যাসেটটি তৈরী হয়েছে। সুতরাং এতে নিজেকে পুরনাে দিনের মতাে মেলে ধরায় আত্যন্তিক আগ্রহের ঘাটতি ছিলই ছিল। এইসব কারণে দিনান্তের প্রণাম’যুগ্ম ক্যাসেটে শম্ভু মিত্রকে কাঙ্ক্ষিতরূপে পাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু সারা জীবনব্যাপী তিনি যেভাবে আমাদের রঙ্গমঞ্চ এবং আবৃত্তিকে সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে গেছেন, সেকথা ভুলে যাবার মতাে অকৃতজ্ঞ আমরা নই।

এই নিম্নমানের ক্যাসেটটি ছাড়াই তাকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করব বহুকাল। একটু টলবে না তার অধিকৃত আসন! সবশেষে বলি, শম্ভু মিত্র বাংলা কবিতা আবৃত্তির যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, তার কোনাে উত্তরসূরি তৈরী হয়নি আপতদৃষ্টিতে, কিন্তু তার নিঃশ্বাস বহে চলেছে বর্তমান কালের সমস্ত আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে।

এ-নিশ্বাস মরে না। এ সঞ্জীবিত হয়। এরই টানে ভবিষ্যৎ জয়ের রাস্তা তৈরী হয়। এই আবিষ্কার থেকেই জেগে ওঠে তন্ময় সন্ধানী আলাে। সে অন্তরে অন্তরে জ্বলে থাকে। বহুকাল। ইতিহাসের পাতা উল্টে তার মহিমময় কীর্তির কথা জেনে আমরা নত হই। এবং এই প্রণাম ছড়িয়ে যায়ৰ্তার দূরব্যাপ্ত চরণেচরণে । হাওয়ায়, আলােয়, আকাশে—সুপ্তের ঘুমন্ত গন্ধে, ছিন্নফুলের সৌন্দর্যশয্যায়  !

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা  //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী

যোগাযোগ : ( ৯১) ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *