কণ্ঠস্বর ও সাধনা – প্রকাশ নন্দী

sahityasmriti.com.png

প্রবন্ধটি নাটকাভিনয়ে কণ্ঠস্বর ও সাধনা প্রসঙ্গে লেখা। কিন্তু আবৃত্তির স্বরচর্চার ক্ষেত্রে প্রায় সবটাই মিলে যায়। আবৃত্তি বিষয় এই গ্রন্থে এই সংযােজন মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

অভিনয় করতে গিয়ে আপনি অনেক রকমের দায়িত্ব পালন করেন। সেই মূল দায়িত্বের অনেক দিকগুলােকে সংক্ষিপ্তভাবে সাজালে দায়িত্বগুলাে চারটে পর্যায়ে পড়বে।

যেমন প্রথমত মঞ্চে দাঁড়িয়ে আপনি দর্শকদের ভালাে কিছু ভাববেন এবং শেষে ভালােভাবে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনার অভিপ্লীত অভিনয় প্রতিভাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করবেন। কাজেই প্রথম দায়িত্ব যেখানে শােনানাে সেখানে কণ্ঠস্বর প্রসঙ্গে আলােচনা এসে পড়ে।সুতরাং এখনকার আলােচনা মূলতঃ কণ্ঠস্বর, স্বরক্ষেপণ রীতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে।

আপনি মঞ্চে এসে নিজেকে ( নিজেকে বলতে আপনার প্রতিভা এবং চরিত্রকে ব্যাখ্যা করার কথা বলতে চাইছি) যতটুকু প্রকাশ করতে চান তা প্রকাশ করেন বেশীর ভাগ সংলাপের মধ্য দিয়ে। সংলাপ কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। আবার কণ্ঠের মাধ্যমে বলতে তার উচ্চারণ ভঙ্গি আবেগ মিশ্রণ প্রণালী—ইত্যাদিকেও বােঝাবে। কাজেই মঞ্চের জন্যে কণ্ঠকে তৈরি করতে হবে। কণ্ঠকে সুরেলা করতে হবে। কণ্ঠস্বর অনেক সময় ভালাে হলে শরীরের গঠন ভালােনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বাড়ায়। যে লােকটার আপাত দৃষ্টিতে তেমন একটা চোখে লাগার মতাে চেহারা নেই, সেই রকম অনেক ব্যক্তির ভালাে কণ্ঠস্বরের জন্যে অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন, বেতার-নাটকে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয় তার কণ্ঠের মধ্য দিয়েই—বিশিষ্ট উচ্চারণ ভঙ্গিমার মাধ্যমেই।

এখন প্রশ্ন— অভিনয় করার জন্যে কি অনুশীলন বা তালিমের মধ্য দিয়ে ভালাে কণ্ঠস্বর তৈরি করা যায় ? এককথায় তার উত্তর না মােটেই না,কখনাে নয়। তাহলে কণ্ঠস্বরের । সাধনা নিয়ে এতাে লেখালেখির মামলা মােকদ্দমা কেন ? উত্তর কণ্ঠস্বরের জন্যে নিয়ম বা ব্যবহারিক জ্ঞানের তালিম নিলে ভালােকণ্ঠস্বর তৈরি করা যায় না বটে কিন্তু ভালাে কন্ঠে ভালাে স্বর প্রকৃতি থেকে নিয়ে জন্মালে তাকে কি করে আরাে ভালাে করা যায় এই শিল্প তার নির্দেশ দেয়। বিশেষ করে মঞ্চের এবং অভিনয়ের উপযুক্তকণ্ঠস্বর সৃষ্টির কাজে স্বরশিল্পের ব্যবহারিক জ্ঞানেরঅবশ্যই প্রয়ােজন আছে।

বাস্তব থেকে উদাহরণ নিন না কেন। আপনি রােজ যত রকমের মানুষ দেখেন—সে পথে হােক, আপনার কাজের জায়গায় হােককিংবা আপনার আত্মীয় হােক—তার মধ্যে কাউকে নাকাউকে অন্ততঃ একজনকে দেখতে পাবেন কণ্ঠস্বরকী সুন্দর—শ্রুতিমধুর – গাঢ় । কিন্তু তিনি অভিনয় করতে পারেন না—প্রকৃতি তাকে ভালাে কণ্ঠস্বর দিয়েছেন। কিন্তু ভালাে ভাবে বলতে  পারেন না। ভালাে বলতে পারেন না তার কারণ তিনি ভালােভাবে কথা বলার বিষয়ে অভ্যাস করেননি—প্রয়ােজনও হয়নি।

কিন্তু তিনি যদি আপনার মতাে শিখে জেনে ভালােভাবে নিয়ম মেনে বলা অভ্যাস করেন তাহলে নিশ্চয়ই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। অভিনয়ের প্রথম কথাই তাে ভালােভাবে কথা বলা। তা বলে এটা কিবলা যায়—ভালােভাবেকথা বলতে পারলেই। অভিনেতা হওয়া যায়? না, ভালােভাবে কথা বলাটা অভিনেতার অভিনয়ের একটা গুণ-একটা পর্যায়-এর সঙ্গে আরও অনেক দিক আছে। সে সব বিষয়ে একে একে আলােচনা হবে।

বাস্তবে দেখবেন অনেকে ভালাে বলছে। ভালাে কণ্ঠস্বরের অধিকারী কিন্তু মঞ্চের ওপর তুলে দেখুন কথা আটকে যাচ্ছে—মােটা থেকে সরু হয়ে যাচ্ছে—কাঁপছে । সুতরাং মঞ্চের জগৎবাস্তব থেকে বেশ কয়েক হাত দূরে। আর উল্টোদিক থেকে দেখুন—ভালােকণ্ঠস্বর নেই, প্রকৃতি হয়তাে ঠকিয়েছে কিন্তু ভালােভাবে কথা বলার ভঙ্গিমা আয়ত্ত করে খারাপকণ্ঠ নিয়ে তিনি অনেক ভালােভাবে সব কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছেন। অভিনয়ের বিশিষ্টতা ঠিক সেইখানেই। তবু খুব ভালাে ফল হবে যদি ভালাে গলা প্রকৃতি থেকে এনে তাকে অভ্যাসের মাধ্যমে আরাে ভালাে করে তােলার চেষ্টা করেন।

ভালােভাবে গুছিয়ে আবেগ দিয়ে কথা বলাটাও এক ধরনের শিল্প। রাজনীতি,অধ্যাপনা, ভাববিনিময় এসবের মধ্যে সবার আগেকথা বলাটাই আসল বিদ্যে—ভালােকণ্ঠ না হলেও বুদ্ধি দিয়ে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে থেমে নামিয়ে নানা ভঙ্গিতে কথা বলে অনেকেই বাজার মাত্ করেন যে যার লাইনে। অভিনয়ের আসরে আপনাকে বাজার মাত করতে গেলে ভালােভাবে কথা বলার অভ্যাস করতেইহবে—এটা প্রাথমিক শর্ত।

ভয়েস প্রােডাকশন বা শব্দ প্রক্ষেপণ শিল্পের গােড়ার কথা কিন্তু ব্রিদিং এক্সারসাইজ অর্থাৎ নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। শব্দ কিন্তু ব্রিদিং এক্সারসাইজ অর্থাৎ নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। শব্দ কি নিশ্বাসের মাধ্যমে যে বায়ু আপনি শরীরে ধারণ করলেন তাকে ছাড়ার সময় স্বরনালীর সাহায্যে যখন জিভ, ঠোট এবং মুখের বিভিন্ন প্রান্তে ধাক্কা দিয়ে বিভিন্ন ইংগিত সৃষ্টি করেন সেই ইংগিতই হচ্ছে শব্দ—আমি সাধারণ জ্ঞান থেকে বলছি, ব্যাকরণ ইত্যাদি পাণ্ডিত্যের অহমিকা থেকে বলছি না সেখানে হয়তাে তার অন্য কোনে সংজ্ঞা হতে পারে।

এই ইংগিত সৃষ্টির মূল প্রবক্তা কিন্তু বায়ু বা বাতাস—বাতাস গ্রহণ ও বর্জন। যিনি যত বেশী বায়ু ধারণ করতে পারেন আমার বিশ্বাস তিনি তত বেশী স্বরক্ষেপন করতে পারেন। যার দম কম অর্থাৎযিনিকম বায়ু ধারণ করতে পারেন তিনি একদমে বেশী কথা বলতে পারেন না— একটু বলেই হাঁপিয়ে পড়েন কণ্ঠে সুর সৃষ্টি করতে পারেন না। কাজেই অভিনেতা প্রথম থেকেই নিশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়মিত ব্যায়ামে অংশ নেবেন তালিম নেয়ার শুরু থেকে।

এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যার কণ্ঠস্বর জন্ম থেকেই খারাপ বা রােগগ্রস্থ তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আগে থেকে জেনে নেবেন সেই বিকল কণ্ঠস্বর ভবিষ্যতে ভালাে হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। যদি না থাকে তা হলে আমার মনে হয় অভিনয় জগতে তালিম নেয়া থেকে তার বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

তবে অভিনয় অনুশীলনে অংশ নেয়া থেকে বাদ গেলেও নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম থেকে বাদ না নিলেও চলে। কারণ নিশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়মিত অভ্যাস দুটি কারণে করা প্রয়ােজন।

এক, নিজের ব্যক্তিজীবনকে দীর্ঘস্থায়ী এবংসুস্থ রাখার জন্যে। দুই, অভিনয়-শিল্পের জন্যে।

বাস্তবিক, যার নিশ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক চলছে তার রক্ত সঞ্চালন ক্রিয়াও ঠিক চলছে এবং নিয়মিত রক্ত পরিশুদ্ধ থাকছে। আবার যার রক্ত সঞ্চালন ক্রিয়া ঠিক চলছে তার শরীরটাও সুস্থ আছে মনে করাটাই স্বাভাবিক। কাজেই কমপক্ষে নিজের শরীরটা সুস্থ রাখার জন্যে প্রত্যেক মানুষকে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। শুধু উচিত নয় জীবনে যতদিন বেঁচে থাকা যায় ততদিন রােগহীন দেহ নিয়ে বেঁচে থাকতে আপত্তি কিসের?

আবার অভিনয়ের প্রয়ােজনে দেখা যাবে আপনি যত বেশীবায় নিজের শরীরে আত্মস্থ করতে পারবেন তত বেশী শব্দ বা কথা একদমে সুন্দর, সুরেলা ভাবে প্রকাশ করতে পারবেন। আয়তনে দীর্ঘ সংলাপ প্রকাশের জন্যে ঘন ঘন দম নেয়ার প্রয়ােজন হবেনা।

. কোনাে জিনিস অভ্যাস করতে করতে মানুষ অভ্যাসের দাস হয়ে ওঠে। আর সেই অভ্যাসের ফলশ্রুতি— যা আয়ত্ত করতে করতে আপনার মনে গেঁথে গেল তা অদূর ভবিষ্যতে হয়তাে দেখা যাবে আপনার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে দাঁড়ালাে।জীবনের যে কোনাে অভ্যাসের ক্ষেত্রে এ কথাটা বিশেষভাবে প্রযােজ্য। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যাপারটা কিন্তু প্রকৃতিগত— ওটা আপনি হতেই চলে আপন নিয়মে চলে—আপনি পৃথিবীতে আসার ছাড়পত্র পাওয়ার দিন থেকে পৃথিবী থেকে যাত্রার শেষ দিন পর্যন্ত।

এটা স্বাভাবিক, জন্মগত। নিশ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া চলে আপনার শরীর যন্ত্রও বিকল হবে। তাহলে এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে নিয়ম প্রকৃতিদত্তযে নিয়মে আপনার জন্মগত অধিকার সেই নিয়মের ওপরআরাে নিয়ম ফলানাের কি দরকার?

সাধারণতঃ প্রকৃতিগত যে প্রক্রিয়া যা নিয়ম তা একরকম—অভিনয়ের সময় যে প্রক্রিয়া বা নিয়ম প্রয়ােগের প্রয়ােজন হয় তা আবার আর একরকমের। প্রথমটা ঈশ্বরপ্রদত্ত একান্ত ব্যক্তিগত। দ্বিতীয়টা নিজের অর্জিত, সার্বিক—অর্থাৎ অনেকের জন্যে। প্রথমটা স্বতঃস্ফুর্ত এবং অনেকটা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অন্যটা সংযত, সুসংহত শিল্পের প্রয়ােজন সৌন্দর্য প্রকাশের জন্যে। প্রথমটি জীবনধারণের জন্যে—

দ্বিতীয়টি অভিনয়ের জন্যে স্বাভাবিক জীবন নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্যে। অভিনয় করার সময় যা বলতে হবে তা গুছিয়ে, স্বাভাবিক এবং সুন্দর করে বলতে হবে। স্বাভাবিক জীবনে যে স্বাভাবিকত্ব থাকে মঞ্চের ওপর উঠে সেই স্বাভাবিকত্ব হয়তাে একটু উচ্চ পর্দায় ওঠাতে হবে সেই উচ্চ পর্দায় ওঠানাের  বিষয়টা যেন অবাস্তব হয়ে না ওঠে তা আপনাকে লক্ষ্য রাখতে হবে বিবেচকের দৃষ্টি দিয়ে।

বাস্তবে যা কুৎসিৎমঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে সেইকুৎসিৎকথাও সুন্দরভাবে শােনা যাবে (সুন্দর হয়ে নয়) এবং সুন্দর কথা সুন্দরের মতাে শােনাবে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে আপনার কণ্ঠের মূল স্বর প্রকৃতি থেকে নিয়ে জন্মাতে হবে আর শব্দঅভ্যাস এবং শিক্ষার মাধ্যমেই আয়ত্ত করতে হবে। এছাড়া শব্দকে ভালােভাবে প্রয়ােগের জন্যে আপনাকে তালিমও নিতে হবে। কেউ যদি বলেন আমি অনুশীলন ছাড়াই ভালােভাবে শব্দ ক্ষেপণ করতে পারি, আমি তা বিশ্বাস করবাে না।

কারণ জেনে হােক আপনি চর্চা করেন— অভ্যাস করেন পরিচালকের কাছ থেকে জেনে-বা বাস্তবের মানুষকে বিশিষ্ট স্বরক্ষেপণরীতিতে লক্ষ্য করে।ক্রমে অনুকরণ করার চেষ্টা করেন তারপর দীর্ঘ অভ্যাসের মধ্য দিয়ে আপনার একটা স্থায়ী নিজস্ব রীতি আপনি গড়ে তােলেন । সুতরাং অনুশীলন ছাড়া, তালিম ছাড়া ভালােভাবে শব্দক্ষেপণ করেন তা আমি বিশ্বাস করি না।

এখন  কিভাবে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামে অংশ নেবেন তার সম্পর্কে কিছু বলা যাক।

প্রথমত, এই ব্যায়াম নিয়মিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সকালে করাই ভালাে। তৃতীয়ত, কমপক্ষে প্রত্যেকদিন সকালে এক ঘন্টা সময় দেয়া প্রয়ােজন। চতুর্থত, কোনাে বিশেষ কারণে একদিন ব্যায়াম না করলে তারপর দিন যেন ফাঁকা সময়টুকু যথাসম্ভব পূর্ণ করে দেয়া হয়।

১। নিশ্বাস নিন নাক দিয়ে যথাসম্ভব ধীর গতিতে। তারপর শরীরের বিশেষ করে পেটের মধ্যে সেই বায়ু যথাসম্ভব দীর্ঘ সময় ধরে রাখুন। তারপর যে গতিতে নিশ্বাস নিয়েছেন ঠিক সেই গতিতে নিশ্বাস ছাড়ুন মুখ দিয়ে। দেখবেন যে গতিতে বাসাস গ্রহণ করেছেন ছাড়ার সময় তা দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। আপনাকে সময়সীমা ঠিক রেখে ঘড়ি দেখে গ্রহণ-বর্জনের সময় যাতে একই হয় তার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। তিন মাস কমপক্ষে অভ্যাস করলে তবেই ফল ভালাে পাওয়া যেতে পারে।

২। একই নিয়ম। মধ্যম গতিতে। নিশ্বাস-প্রশ্বাস যতক্ষণ সম্ভব থামিয়ে এবং ঘড়ির দিকে লক্ষ্য রেখে—সজাগ দৃষ্টিতে।

৩।একই নিয়ম, দ্রুত গতিতে।

৪। নিশ্বাস নাকমুখ গিয়ে প্রথমে ধীরে, পরে মধ্যম এবং শেষে দ্রুতগতিতে গ্রহণ করুণ যে পর্যন্ত না পেটটি বাতাসে ভর্তি হয়ে যায়। তারপর থামা এবং পরে বায়ু প্রক্ষেপণ একই  নিয়মে।

৫|এরপর মনে মনে প্রথমে দুবার গুণে নিশ্বাস নিন—থামুন—তারপর যে পর্যন্ত শ্বাস নিলেন তারপর আরাে পাঁচ এবং যথাক্রমে দশ থেকে ষাট—আশি সেকেণ্ড পর্যন্ত থেমে নিন ।

এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে,এই অভ্যাসের সময় তাড়াতাড়ি কোনাে কিছু করার চেষ্টা করবেন না। এতে ক্ষতি হতে পারে। ধীরে ধীরে একাগ্রতার সঙ্গে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন ব্যায়াম করে যেতে হবে।

৬।বিভিন্ন গতিতে নাক দিয়ে নিশ্বাস নিয়ে নাক দিয়ে প্রশ্বাস ছাড়ুন। ৭।বিভিন্ন গতিতে শ্বাস মুখ দিয়ে নিয়ে নাক দিয়ে ছাড়ুন। ৮মুখ দিয়ে শ্বাস নিয়ে নাক দিয়ে ছাড়ুন।

এখানেমনে রাখতে হবে, ব্যায়াম করার সময় প্রথমে নিশ্বাস নেয়ার পরে আপনি বেশী সময় হােলড করতে অর্থাৎ নিশ্বাস-প্রশ্বাসহীন অবস্থায় থাকতে পারবেন না—সে ক্ষেত্রে প্রথমে পাঁচ সেকেণ্ড রেআপ একটু বাড়িয়ে এইভাবে ধরে রাখার সময়টা বাড়াবেন।

৯। খুব মনোেযােগ সহকারে যতটা সম্ভব নিশ্বাস নিন নাক দিয়ে। হাত রাখুন পাজর এবং পেটে। অনুভব করুন নিশ্বাস নেবার সময় পাঁজর এবং পেট কতটা উঠছে ঠিক তেমনি মুখ। দিয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় অনুভব করুন পাঁজর ওপেট কতটা নামছে। হােল্ড বা ধরে রাখার দীর্ঘ সময়মনে মনে গুনে নিন। এই ব্যায়ামের সময় হঠাৎকরে শ্বাস নেয়া ছাড়া কোনােটাই করবেন না বা জোর করে, তাড়াহুড়াে করে সময় সংক্ষেপ করার চেষ্টা করবেন না। এই ব্যায়ামের সময় বন্ধু কিংবা বাড়ীর  লােকের সাহায্য নিতে পারেন সময়ের পরিমাপ করার জন্যে।

নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে শরীর সম্পর্কেদু-চার কথা বলতে হয়। এ বিষয়ে একটু পরে আলােকপাত করার চেষ্টা করছি। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের শেষ কথা বলে কিছু নেই। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করার সময় নিজের  শরীরটা কোথায় কিভাবে রাখতে হবে অর্থাৎ নিশ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ম জানার পর শরীরের অবস্থান সম্পর্কে কিছু  নিয়মকানুন… জানা দরকার।

১। প্রথমে সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে।

২। শিরদাঁড়া সােজা করে অনেকটা পদ্মাসন করে মাটিতে বসে।

৩। সােজা হয়ে চিৎহয়ে শুয়ে। ৪। চিৎহয়ে কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত বালিশ দিয়ে পিঠ খানিকটা উঁচু করে।

৫। দেহটা সােজা রেখে দাঁড়িয়ে কাঁধ মাথার বাঁ পাশ থেকে সরাসরি ডান পাশে এবং ডান পাশ থেকে বাঁ পাশে এনে।।

৬। অনুরূপ কাঁধ মাথা বুক থেকে এগিয়ে এবং যথাসম্ভব কাধ মাথা দেহ সােজা রেখে যথাসম্ভব পিঠের দিকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া।

৭।কাঁধ এবং দেহ সােজা রেখে মাথা ডান থেকে বাঁ দিকে এবং বাঁ থেকে ডান দিকে ঘােরানাে।

৮। কাঁধ এবং মাথাকে দেহ ঠিক রেখে গােল করে ঘােরানো ।

৯। সােজা হয়ে বসে পা জোড়া অবস্থায় পাছড়িয়ে পা পর্যন্ত মুখ এনে এবং পা থেকে মুখ নিয়ে আবার সােজা হয়ে থাকা।

ওপরের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের যে নিয়মগুলাে দেয়া হয়েছে ক্রমান্বয়ে তা অভ্যাস করতে হবে। অভ্যাসের শুরুতে হয়তাে আপনি একদিনে সবহ অভ্যাসগুলাে করতে পারবেন না—সময়ের অভাবে। এবং একসঙ্গে সব বিষয় অভ্যাস না করাই ভালো ।  আস্তে আস্তে ক্রমান্বয়ে অভ্যাস করতে হবে— চট করে অনেক কাজ করতে গেলে আপনার অজান্তে আপনি হয়তাে অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

এই অভ্যাসের আগে আপনার শারীরিক কাঠামাের কথা ভাবতে হবে। ব্যায়ামের সময় শরীরকে খুব নমনীয় রাখতে হবে। আড়ষ্টতা নয়—স্বাভাবিক হতে হবে। আপনাকে অনুভব করতে হবে—আপনি ভারী পদার্থনন। আপনি যখন ব্যায়াম করবেন তখন মনের একাগ্রতাকে কাজে লাগাতে হবে। কোনাে কারণে শরীরের মাংসপেশীকে শক্ত করার চেষ্টা করবেন না। শক্ত করলে সব বিষয়টা কঠিন হয়ে উঠবে।

যখন ব্যায়ামে অংশ নেবেন তখন দেহের প্রতিটি মাংসপেশী যেন স্বাভাবিক থাকে আপনি যে স্বাচ্ছন্দ্য বােধ করেন পেশীতে যেন টান না পড়ে। দ্বিতীয়ত, কিছুক্ষণ ব্যায়াম করার পর প্রতিক্ষেত্রে আপনাকে বিশ্রাম নিতে হবে। তারপর আবার শুরু করবেন। তৃতীয়ত, প্রতিটি ব্যায়ামের সময় শরীর এবং স্বর প্রয়ােজনের গতিপ্রকৃতিঅর্থাৎ প্রক্রিয়া ঠিকমতাে হচ্ছে কিনা তা গভীর মনােযােগের সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে। . প্রাথমিকভাবে স্বর-সাধনা সম্পর্কে কিছু বলা হলাে।

তবে এ বিষয়ে লিখে শেখার চেয়ে–পড়ে শেখার চেয়ে চোখে দেখে শেখা খুবই প্রয়ােজন। কিন্তু চোখে দেখে শেখার জায়গা এদেশে কোথায়? সুতরাং সংক্ষিপ্ত হলেও দুধের সাধ ঘােলে মেটাতে হচ্ছে। এর পরের পর্যায়ের স্বর ও শব্দক্ষেপণ সম্পর্কে আরাে বিস্তারিত আলােচনা করার ইচ্ছা রইলাে।

এবার দেহে বায়ু ধারণ বিষয়ে এবং তার সম্পর্কে আরাে প্রচলিত কিছু অভ্যাসের কথা উল্লেখ করবাে যেগুলি স্বর-সাধনার পক্ষে খুবই উল্লেখযােগ্য।

আমরা বায়ু বা বাতাস গ্রহণ করি সাধারণভাবে দু’দিক দিয়ে। মুখ আর নাক দিয়ে। ছাড়ার সময় সংখ্যাটা দাঁড়ায় তিনে। যেমন—   ১ । নাক ২। মুখ ৩। গুহ্যদ্বার। অভিনয় শিল্পীর পক্ষে নাক মুখ সচেতন হওয়াই ভালাে।

প্রথমত, যদি বলা হয় তাড়াতাড়ি এক চোট দম নিন তাে । নাকমুখ দিয়ে বাতাস নিতে গিয়ে কেই কাঁধ উঁচু করেন। কাঁধ উঁচু করে বাতাস নেয়াটাকে ‘সােলডার ব্রিদিং’ বলে। কেই আবার বুক উঁচু করে বাতাস নেন—এই প্রক্রিয়াকে চেষ্টব্রিদিং’ বলে। কিন্তু এর কোনােটাই ঠিক নয়। বাতাস গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দুটি প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে।

পেটভর্তি দম নেয়া কেডায়াফ্রাম  ব্রিদিং’বলে । মঞ্চাভিনয়ের ক্ষেত্রে ‘ডায়াফ্রাম ব্রিদিং’ সবচেয়ে  ভালাে প্রক্রিয়া । ঐ যে আমরা অনেক সময় বলি—আরে নাভিমূল থেকে বল না ! ওটা আর কিছুই নয়। ডায়াফ্রাম ব্রিদিং-এর একটা শৈল্পিক প্রকাশ।

এই প্রক্রিয়া নিজের আয়ত্তে আনতে গেলে গভীর মনোেযােগের প্রয়ােজন হবে। নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস গ্রহণ করার সময় শরীরের অন্যান্য প্রত্যঙ্গগুলি অচল হয়ে থাকবে।বাতাস গ্রহণ সম্পর্কে সচেতন হয়ে এবং মনােযােগসহ পেটের ভেতরে (মধ্যচ্ছদা) তা নিতে হবে ধীরে ধীরে। প্রথমবারে পেট দেখবেন চুপসে যাবে বেলুনের মতাে। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। পেট ক্রমশঃ বাতার গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ফুলবে।

এরপরে আর একটি বিষয় সম্পর্কে বলবাে। পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবার দিন থেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রাকৃতিক নিয়মে মানুষ বাতাস নিচ্ছে আর ছাড়ছে। যেইমাত্র শরীরে বাতাস নেয়া-ছাড়া শেষ হবে সঙ্গে সঙ্গে আপনার জীবন-নাট্যও শেষ হলাে। অধিদেবতার এ এক অদ্ভুত লীলা। এই বাতাস নেয়া-ছাড়াটা জ্ঞাত এবং অজ্ঞাতসারে চলে আসছে আপন নিয়মে। কিন্তু আপনি যখন মানুষ হয়েও অভিনয়-শিল্পের ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করতে চাইছেন তখন এই অজ্ঞাত বস্তু সম্পর্কে সচেতন হয়ে এর বিজ্ঞান-সচেতন দিকটার কথা ভাবতে হবে।

প্রকৃতি যা নিয়ম দিয়েছে তা অনেকটাই এই রকম। অর্থাৎ আস্তে আস্তে শরীরে শ্বাস গ্রহণ করা এবং দ্রুত ছাড়া। কথা বলার সময় এবং নীরবতার সময়ও এটা আমাদের অজান্তে ঘটে আসছে। কিন্তু অভিনয় শিল্পীরা বাতাসকে নিজের আয়ত্তে আনার জন্যে ঠিক উল্টো প্রক্রিয়া গ্রহণ করবেন। যেমন— দ্রুত শ্বাস নেওয়া—আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়া। আস্তে আস্তে কারণ—সংলাপ সৃষ্টির মধ্যে মাধুর্য আনার জন্য আপনি কোথাও বিরতি—কোথাও শব্দেরওপর আঘাত করবনে—কোথাও আবার দীর্ঘ বিরতি দিয়ে একসঙ্গে অনেকগুলি শব্দ শ্রুতিগ্রাহ্য করে শব্দ ক্ষেপণে বৈচিত্র্য আনবেন।

কাজেই দ্রুত দম নেয়ার ব্যাপারে একটা আছে—তা অভিনয়ের সময়ে—নইলে দম যদি ধীরে ধীরে নেন তাহলে কথা দ্রুত বলতে হবে শিল্পীর পক্ষে তা অমার্জনীয়। দ্রুত এবং অবকাশ মতাে শ্বাস নেয়া অভ্যাস অভিনয় শিল্পীর পক্ষে অপরিহার্য এক শিক্ষা।

শুধু দ্রুত শ্বাস নেয়া নয়— দম নেয়ার পর আপনাকে একটা বিরতি দিতে হয়। বিরতির শেষে আবার বাতাস ছাড়ার প্রশ্ন। তবে এই বিরতিযুক্তি বা বাস্তবতার সঙ্গে যেন সাযুজ্য রক্ষা করে।

এই বাতাস নেয়া-ছাড়ার অভ্যাস সম্পর্কে এই কথাটা মনে রাখুন।

sahityasmriti.com.png

পুকুরে

ভারতীয় যােগীরা পূ’ অর্থে পুরক।‘কু’অর্থে কুম্ভক(Hold) বা ধরে রাখা। আর অর্থে রেচক বা ছাড়াকে বােঝাতে চেয়েছেন। অভ্যাসের সময় সাগর নদী না ভেবেপকত মনে রাখলেই চলবে।

বাতাস নেয়া-ছাড়া বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা বাড়লে শব্দ ক্ষেপণ বিষয়টা আপ আয়ত্তের মধ্যে আসবে আপনা হতেই। আপনি অভিনয় করতে করতে হাঁপিয়ে পড়বেন না। গলা ভাঙবে না। শরীরটাও সুস্থ থাকবে। আপনি শেষ দর্শককেও আনন্দ দান করতে পারবেন সহ সংলাপ সুন্দরভাবে প্রয়োেগ করে। সবচেয়ে বড় কথা দমহীন মানুষ উচ্চ-শিল্পী হিসেবে কখনো প্রতিবাচ্য হতে পারে না।

দম যখন বাড়াতেই হবে তখন নিজে নিজে পরীক্ষা করুন। যে কোনাে একটি বাঁশি নিয়ে একই পর্দায় বাজান।

কিংবা একটি মােমবাতি জ্বালিয়ে একপেট দম নিয়ে সেই বাতির শিখাকে একইদিকে দিয়ে তার মেজাজ এবং গতি ঠিক রাখুন।

অথবা, দেওয়ালে একটুকরাে পাতলা কাগজ রেখে ফুঁ দিয়ে সেই কাগজকে ধরে রাখুন যতক্ষণ সম্ভব।

প্রথমে নিশ্বাস-প্রশ্বাস সচেতন না হয়ে প্রতিটি অভ্যাস করে সময় মেপে রাখুন। তারপর প্রতিদিন সাধনা এবং অনুশীলন করার পর আবার সময় মাপুন।এইভাবে তিন মাস অনুশীলনের পর আপনি এই সাধনার ব্যবহারিক দিকের উপযােগিতা সম্পর্কে নিজে নিজেই ফল প্রকাশ করতে পারবেন। তবে তিন মাস পর বাতির শিখা যদি গতি পরিবর্তন করে—বাঁশি যদি পর্দার বাইরে গিয়ে অন্য পর্দায় ওঠানামা করে—আর পাতলা কাগজের টুকরাে যদি হুট করে দেওয়াল ছেড়ে মাটিতে পড়ে যায় তাহলে সাধনার ক্ষেত্রে—অনুশীলন ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কোথাও ফাক বা গলতি থেকে যাচ্ছে এ বিশ্বাস সম্পর্কে বিশ্বাসী হতে হবে নিজেকেই।

ভড়ং, লম্ফঝম্প, তর্ক দিয়ে এ শিক্ষা শুরু করা যায় না এবং এই শিক্ষার এক কথা, শেষ কথা এবং চূড়ান্ত কথা ‘এ শিক্ষার শেষ নেই । ‘

এখন স্বরক্ষেপণের রীতি সম্পর্কে সামান্য কিছু আলােচনায় বসা যাক। অনেক বিজ্ঞ মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাস কথা দুটির ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে তর্ককরেন। আমি শ্বাস-প্রশ্বাস বলতে ইংরেজী ‘ব্রিদ-ইন’আর ‘ব্রিদ-আউট ’শব্দটিকে ব্যবহার করতে চাই তর্ক এড়ানাের জন্য।

সরলকথা বায়ু স্বরযন্ত্রের (Vocal Cord) সংস্পর্শে এসে শব্দের সৃষ্টি করে। এই শব্দের প্রকাশ ঘটে মুখ এবং নাক গিয়ে এবং কখনাে একসঙ্গে মুখ ও এবং নাকের মধ্য দিয়ে। মূলতঃ ঠোট, জিভমুখেরনরম অংশের সাহায্যে। ছন্দসৃষ্টির কাজ এই ঠোট ও জিভের সংকোচন, সংঘর্ষণের ফলে ঘটে থাকে। নাসিকা গহরও ছন্দসষ্টির ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করে। এছাড়া দাঁত এবং তালুর শেষে অর্থাৎমুখের ভেতর ওপর ভাগের পেছন দিকে নরম অংশও শব্দসুষমা  এবং ধ্বনি মাধুর্য বাড়াতে সহায়কের ভূমিকা নেয়।

জিভও ঠোটের ব্যায়ামের সাহায্যে তাদেরকে নমনীয় করতে হবে। দাঁত, তালুশক্ত। কাজেই তাদেরকে নমনীয় করার প্রশ্নই উঠছেনা। তবে শক্ত হলেও দাঁতের পরিপাটিকে ওপরে; নিচে এবং পাশে সরিয়ে কিছু ব্যায়াম করা যেতে পারে।

যে কোন অভিনেতার পক্ষে তার মুখ,নাক থেকে শুরু করে ঠোট, জিহ্বা, চিবুক পর্যন্ত সমস্ত জায়গাটিকে নমনীয় রাখতে হবেনমনীয় করার সহজ রীতি এইরকম –

১। ধরুন ‘অ’ বর্ণটা যথাসম্ভব মুখ সংকোচন করে তারপর ছড়িয়ে উচ্চারণ করুন। শব্দের পর্দাও সরু থেকে মােটাকরতে হবে ক্রমান্বয়ে।

২।এরপর ক্রমান্বয়ে বড় করে—স্থির হয়ে বসে, দাঁড়িয়ে, শুয়ে উচ্চারণ করুন।

অ—আই—ও

৩। ক্রমান্বয়ে ওপরের শব্দগুলি নিম্ন থেকে উচ্চ পর্দায় ওঠান একপেট দম নিয়ে। যেমন—

অ > অ > অ > অ

৪। একই ভাবে উচ্চ থেকে নিম্ন পর্দায় নামান। যেমন –

ই<ই<ই <ই

মনে রাখবেন, কোনােকারণেদম থামাবেন না নিজের কানকে বিশ্বাস করবেনস্বর ক্ষেপণের সময় স্বর ওঠা-নামা করছে কিনা লক্ষ্য রাখবেন।একইস্বরের সঙ্গে অন্য ধরনের স্বর এসে যুক্ত হচ্ছে কিনা তাও লক্ষ্য রাখতে হবে।

৫। যেকোন একটি স্বরকণ্ঠে একই পর্দায় ধরে রাখুন। উঁচুনিচু যেন না হয় তার দিকে লক্ষ্য বিশেষভাবে রাখবেন।

৬। একই পর্দায় স্বরক্ষেপণ করার সময় আলাদাভাবে শ্বাস না নিয়ে ধ্বনি ও শব্দের ওপরশ্বাসাঘাতকরুন।

৭।সরু থেকে শুরু করে একই দমেউচ্চপর্দায় স্বর তুলে আবার সরুতে মিলিয়ে দিন।

৮। বিভিন্ন শব্দকে ঠোটের (মুখ) বিভিন্ন অংশ গিয়ে প্রক্ষেপ করার চেষ্টা করুন। এখানে মুখের তিন অংশের কথা বলতে চাইছি। যেমন

মুখ

ডান । সামনের  । বাম

দিক। অংশ | দিক।

৯।এরপর একটু আত্মস্থ হয়ে মুখের ওপরে ঠোটের অংশ বিভিন্ন দিকে সংকোচন, ওঠা-নামা অর্থাৎ বিকৃত করার অভ্যাস করুন—মুখের ওপরের নিচের অংশকে নমনীয় করার জন্যে। সঙ্গে নাককেও সঙ্গী করতে পারেন। অবিশ্যি না করলেও আপনার অজান্তে নাকও আপনার ব্যায়ামের সঙ্গে অংশ নেবে।

১০। বিভিন্ন ধরনের মানুষের কথাবার্তা গভীর মনোেযােগ সহকারে লক্ষ্য করুন। লক্ষ্য করুন এবং মনে রাখুন কোন মানুষটি কিভাবে কথা বলছে, কোথায় জোর দিচ্ছে , পর্দায় শব্দকে ওঠাচ্ছে-নামাচ্ছে এবং কোথায় কতটুকু থামছে। আপনার অনুশীলনের সমত আপনার পরম বন্ধুর মতাে কাজ করবে। যার কণ্ঠস্বর ভালাে নয় তার কথাও শুনুন। বিচার কোথায় তার ঘাটতি আছে বা বাচনভঙ্গি কি কারণে কোথায় নিষ্প্রাণ হয়ে উঠেছে।

১১। দুই নাক দিয়ে মুখ বন্ধ রেখে সুর করে শব্দক্ষেপণ করুন। কখনাে একনায় করে অপর নাক দিয়ে এবং অপর নাক বন্ধ করে অন্য নাক দিয়ে শব্দক্ষেপণ করুন।

১২। শব্দ বা স্বর শাসনের জন্যে খােলা মুখের সাহায্যে প্রাণায়ামকে আশ্রয় কর। পারেন।

মােটামুটিভাবে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের জন্যে যে রীতিনীতির কথা উল্লেখ করেছি স্বরক্ষেপণের ক্ষেত্রেও সেই একই নিয়ম প্রযুক্ত করতে পারেন শুধু স্বরক্ষেপণের সময় স্বর যুক্ত হবে শ্বাস ছাড়ার সময়।

কণ্ঠস্বরের দিক থেকে শিল্পীর ছাড়পত্র পেতে গেলে অনুশীলন পর্বে যাবার সময় আপনাকে লক্ষ্য রাখতে হবে আপনি অন্য অভিনেতা বা বিশেষ মানুষের দ্বারা প্রভাবিত কিনা। কথা বলার সময়ই, এ্যা, হু, আচ্ছা ইত্যাদি জাতীয় কোনাে মুদ্রাদোষ আছে কিনা।কথা বলার সময় কোনাে কৃত্রিম অনুকরণে প্রবৃত্ত না হয়ে স্বাভাবিক ভাবেই স্বরসাধনা করলে ভালাে তাতে মৌলিকতা – থাকবে।

অনেক সময় অনেকে প্রখ্যাত অভিনেতাদের কণ্ঠস্বর নকল এমনকি বাচনভঙ্গি পর্যন্ত নকল করার চেষ্টা করেন অনেক পরিশ্রম করে। তাতে আপনার পরিশ্রম পণ্ড হবে—আপনার নিজস্বতা খুইয়ে আপনি তখন অপরের মুখোশ পরে চলবেন ।

এর আগে অভিনয় শিল্পীর কণ্ঠস্বরও স্বর-সাধনা নিয়ে বেশ কিছু আলােচনা হয়েছে। এখন কণ্ঠস্বর সম্পর্কে আরাে দু-একটা কথা বলবাে তারপর ধারাবাহিকভাবে অভিনয় শিল্পের অনুশীলনের বিষয় আলােচনাকরবাে।

এদেশে স্বরক্ষেপণের রীতি নিয়ে এ পর্যন্ত তেমন আলােচনা হয়নি। এ বিষয় নিয়ে আললাচনা করার চেয়ে ব্যবহারিকও শরীর নিয়ে দৃষ্টান্ত সহযােগ আলােচনাহলে উপকার হয়

বেশী।

মােটামুটিভাবে শব্দক্ষেপণের রীতিকে পাঁচভাগে ভাগ করা যায়। যেমন

১।ঠোঁট ও জিভের সহযােগে

২।নাভিমূল থেকে

৩।নাক দিয়ে

৪| মস্তিষ্ক ছুঁয়ে নাক, জিভ, ঠোটসহযােগে

৫। ফিসফিস করে

শুধু ঠোট ও জিভঅর্থাৎ লিপটাংসচেতন শিল্পীরা বেতার-নাটক, ছায়া-ছবিরঅভিনয়ের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। কিন্তু সার্থক মঞ্চাভিনেতা এবং অভিনেত্রীদের পক্ষ উল্লিখিতপাঁচরীতির সার্থকসম্মিলন না ঘটলে চলবেনা।প্রত্যক্ষভাবে শিল্পীদের গােটা দেহটা দর্শকদের সামনে হাজির করে নির্দিষ্ট দূর পর্যন্ত দর্শককে শিল্প সম্মত ভাবে আকৃষ্ট করতে হবে –

আর এই আকৃষ্ট করার কাজকে ত্বরান্বিত করতে গেলে প্রত্যেক রীতি সম্পর্কে সজাগ অভ্যাসে অভ্যস্থ হয়ে পাদপ্রদীপের আলােকে এসে দাঁড়াতে হবে। আর প্রতিটি রীতির সম্মিলন ঘটলে ছায়াছবি থেকে শুরু করে যাত্রাদলেও আপনাকে কেউ আটকাতে পারবে না। তাই বাস্তবে দেখা গেছে খুব কম সংখ্যায় শিল্পী আছেন যাঁরা মঞ্চজগৎ থেকে চিত্রজগতে গিয়ে পরাজিত হয়ে ফিরে এসেছেন।

উল্লিখিত বিষয়ের প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যাবার আগে প্রথমে সাধারণভাবে কিছু আলােচনা করতে চাই, বিষয়কে একঘেঁয়েমি থেকে মুক্ত করার জন্যে।

এছাড়া আর একটা কথা এ প্রসংগে মনে রাখা দরকার বিশেষভাবে। অনেকে অভিনয় শিক্ষার ব্যাপারে ভাষাগত অভিজ্ঞানকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিতে চান। কিন্তু আমি মনে করি প্রাথমিকভাবে প্রশিক্ষণে উত্তরণের জন্যে ভাষা খুব একটা সমস্যা নয়। ভাষার আগে আত্মগত উপলব্ধিকে সক্রিয় করা এবং সেই সক্রিয়তাকে প্রকাশ করার কৌশল আয়ত্ত করা সবার আগে প্রয়ােজন।

ইংরিজিতে যাকে ইনারম্যানস কোয়ালিটি এণ্ড টেকনিক্যালিটিস’বলে সেই বিষয়ে ধাতস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও বিভিন্ন উচ্চারণ ভঙ্গিমার পরিচিতি হওয়া প্রয়ােজন। নাট্য শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভাষা সমস্যা মূল নয়। পৃথিবীর যে কোনাে দেশের মানুষ প্রাথমিক প্রয়ােগ পদ্ধতি বিষয়ে যােগ্যতা অর্জন করে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে নিজের দেশে বসেও আয়ত্ত করতে পারেন অনায়াসে। কারণ ভাষা নিয়ে সমস্যা কোনাে একটা দেশের নিজস্ব ভাষাতাত্ত্বিক সমস্যা। এ বিষয়ে অধ্যয়নের ব্যাপারটা কিছু পড়াশােনা এবংঅনেকটা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানার্জনের পরিমণ্ডলেইসীমাবদ্ধ।

বাংলা ভাষায় যাঁরা অভিনয় করবেন তাদেরকে সাহিত্যিক ভাষা যেমন আয়ত্ত করতে হবে তেমনি অঞ্চলভেদে বিভিন্ন আঞ্চলিকভাষা সম্পর্কে সজ্ঞান এবং প্রকাশক্ষম জ্ঞানার্জনও করতে হবে।

একথা সত্য যে অভিনয় শিল্পীর আত্মগত দিকের স্ফুরণ নির্ভর করে একজন মানুষের আবেগকতটা আছেএবংকতটা ভালােভাবে সেই আবেগকে প্রকাশ করতে পারেন তার ভাষার মধ্য দিয়ে।

অভিনেতার কণ্ঠস্বর দিয়ে অভিনয়ের প্রাথমিক কাজ সারা যেতে পারে। কণ্ঠ ভালাে হােক কি মর্দ  হােক তা যেমন বিচার্য ঠিক সেইরকম সেই কণ্ঠস্বরের প্রকাশে কতােটা মাধুর্য আছে। অর্থাৎ কণ্ঠস্বর প্রয়ােগে ভাষার সঙ্গে ভাবের কতােটা সমতা রক্ষা হচ্ছে সেটাও বিচার-বিবেচনা করে দেখতে হবে। শুধু বেপরােয়া আবেগ প্রকাশ হট করে থেমে আমার খানিকটা উঁচু নিচু পর্দায় কথা বলা—কথা বলার মধ্যে মাত্রাহীন উচ্চারণ নিম্নচাপ সৃষ্টি করা একজন যথার্থ শিল্পীর পক্ষে মহৎকাজ হতে পারে না?

স্বর সাধনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত নিষ্ঠা প্রয়ােগ করলে কণ্ঠে যেমন ভলিউম সৃষ্টি হবে— তেমন আসবে সুর। অভিনয় করতে করতে শেষের শব্দ কখনাে ছেড়ে যাবে না—অর্থাৎtail dropping হবে প্রেক্ষাগৃহ থেকে ‘louder please’ কথাটা শুনতে হবেনা। জাত মঞ্চাভিনেতা বা অভিনেত্রী হতে গেলে পুর্বের উল্লিখিত পাঁচ প্রকারের স্বরক্ষেপণ সম্পর্কে সচেতন হয়ে চরিত্রের ভাবগত বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য রেখে পাঁচ প্রক্রিয়ার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা   //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *